প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

১. পর্দা সূর্যরশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করে

(১) মানুষের গায়ের রঙ কালো বা ধলো বা ফর্সা হওয়ার পেছনে যে উপাদানটি সক্রিয় তার নাম মেলানিন পিগমেন্ট। কারো শরীরে মেলানিন পিগমেন্ট যত বেশি থাকবে তার গায়ের রঙ হবে ততো কালো। আর মেলানিন পিগমেন্টের পরিমাণ যত কম হবে রঙ হবে ততো ফর্সা। শুনতে আশ্চর্য শোনালেও এটি বাস্তব সত্য যে, মেলানিন পিগমেন্ট যার যত বেশি থাকে তার চামড়ার ক্যান্সার ততো কম হয়, আর মেলানিন পিগমেন্ট যার যত কম থাকে তার চামড়ার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ততো বেশি। অর্থাৎ কালো লোকদের চামড়ার ক্যান্সার ফর্সা লোকদের চামড়ার ক্যান্সারের চেয়ে কম। আবার উল্টো হিসেবে ফর্সা লোকদের চামড়ার ক্যান্সার কালো লোকদের চামড়ার ক্যান্সারের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এই ক্যান্সার তৈরি করার প্রধান উপাদান সূর্যরশ্মি। ফলে শরীরে সূর্যরশ্মির স্পর্শ যত কম হবে চামড়ার ক্যান্সার হওয়ার হার ততো কমে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারীদের বাইরে বেরুলে আপদমস্তক ঢেকে পর্দা করার নির্দেশ দিয়ে পরোক্ষভাবে সূর্যরশ্মির শরীরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার উপায় করে দিয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছেন।

(২) সূর্য প্রতিনিয়ত চতুর্দিকে তার রশ্মি বিকিরণ করে চলছে। পৃথিবীতে সূর্যরশ্মি যতটা পৌঁছে তার মাঝে শতকরা ৫৬ ভাগ হলো ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি, শতকরা ৩৯ ভাগ হলো রোদ -যা আমাদের চোখে দেখতে পাই, আর বাকি শতকরা ৫ ভাগ হলো বিভিন্ন ধরনের আল্ট্রা-ভায়োলেট রে বা অতিবেগুণী রশ্মি। এই অদৃশ্য আল্ট্রা-ভায়োলেট রে-এর সংক্ষিপ্ত নাম ইউভি রে। ইউভি রে সাধারণত তিন রকম। এগুলো হচ্ছে- ইউভি রে-এ, ইউভি রে-বি এবং ইউভি রে-সি। এই তিনটির মধ্যে ইউভি রে-এ এবং ইউভি রে-বি-এর প্রভাব ত্বকের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে একটি স্তর রয়েছে, যার নাম ওজোন স্তর। এটা অনেকটা ছাকনির মত। তাই আল্ট্রা-ভায়োলেট রে-এর অনেকটাই শুষে নেয় এই ওজোন স্তর, বিশেষ করে ইউভি রে-সি’র পুরোটাই এবং ইউভি রে-বি’র অনেকাংশ। এই ইউভি রে চামড়ার ক্যান্সার উৎপাদন করে। ওজোন স্তরের ঘনত্ব মাত্র ১ শতাংশ কমে গেলে ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ২ থেকে ৪ শতাংশ।

(৩) ইউভি রে-সি’র আরেক নাম জার্মিসাইডাল রে। অর্থাৎ জীবাণুনাশক রশ্মি। এটি শর্ট রে। এটা আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ ঘটায় না। কেননা এর পুরোটাই স্ট্রাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তরে আটকে যায়। ইউভি রে-বি হলো মিডিয়াম রে। এটি রোদের ০.১% উপাদান। এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী উপাদান। তাই এটি যে ধরনের মারাত্মক ক্ষতি করে তাকে বলে ফটো ড্যামেজ। ইউভি রে ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না, তাই ত্বকের উপরের স্তর এপিডার্মিসের ক্ষতি করে। ইউভি রে-বি ত্বকের এপিডার্মিস স্তরে অবস্থিত মেলানিন পিগমেন্ট-এর কোষ মেলানোসাইট-এর মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এতে ত্বকের উপর রোদে পোড়া ছাপ, ত্বকের ক্যান্সার, পি-ম্যাচিউর এজিং (বয়স বাড়ার আগেই বেশি বয়সের ছাপ) এবং র্যা শ ইত্যাদির জন্ম দেয়। ইউভি রে-এ হচ্ছে একটি লং রে। এটি রোদের ৪.৯ শতাংশ জুড়ে অবস্থান করে গভীরে ঢুকে পড়ে। এই রে ত্বকের মেলানোসাইট কোষগুলো দ্বারা তৈরি মেলানিন পিগমেন্ট-এর রঙ আরো গাঢ় করে দেয়। ফলে ত্বকের রঙ কালো হয়ে যায়। এই রশ্মির প্রভাবে ত্বকের রঙ অধিক কালো হওয়া ছাড়াও ত্বকে বলিরেখা পড়ে, যা বার্ধক্যের ছাপ ফুটিয়ে তোলে।

(৪) ইনফ্রারেড রে খুব বেশি গরম হলে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে। ত্বকে খুব বেশিক্ষণ ইউভি রে-এ প্রতিফলিত হলে দ্রুত কালো ছোপ পড়ে। এটি ত্বকের মেলানিন কণাকে ঘন করে দেয়ার কারণে ত্বক দ্রুত কালো হয়ে যায়। ইউভি রে-বি ও ইউভি রে-এ যখন যৌথভাবে ত্বকের উপর ও ভিতরে প্রবেশ করে তখন মেলানোসাইট কোষ উদ্দীপ্ত হয়ে পড়ে। কয়েকদিন ক্রমাগত রোদে ঘোরাঘুরি করলে রঙবিহীন মেলানিন তৈরি হয় এবং ইউভি রে-এ এই মেলানিনের রঙ আরো গাঢ় করে ত্বকে পোড়া ছাপ বা ট্যানিং তৈরি করে।

(৫) আল্ট্রা-ভায়োলেট রে-এর বিক্রিয়া দু’ধরণের হয়। একটিকে বলে একিউট এফেক্ট এবং অন্যটিকে বলে ক্রনিক এফেক্ট। শরীরে কয়েক ঘন্টা বা কয়েকদিন ইউভি রে লাগলে একিউট এফেক্ট হয়ে এরিথিমা, সানবার্ন দেখা দেয় এবং এর প্রভাবে ত্বকের উপরের স্তরের রক্তনালী বড় হয়ে যায়। একিউট এফেক্টে মেলানিন কণা আরো ঘন হয়ে যায় ও চামড়ার রঙ কালো হয়ে পড়ে। ত্বকের উপরিভাগ ক্ষয়ে যায় ও চামড়া শুল্ক হয়ে ঝরতে থাকে। ক্রনিক এফেক্টের কারণে বয়স বাড়ার আগেই বেশি বয়সের ছাপ পড়ে, যাকে বলে প্রি-ম্যাচউর এজিং। এছাড়া ডৎরহশষরহম, ষবধঃযবৎরহম, ঢ়যড়ঃড়ধমরহম হয়। চামড়ার শুষ্কতা দেখা দেয়, এতেও বয়স বেশি মনে হয়। সারা জীবনের জন্য ক্যাপিলারি বড় হয়ে যায়। মেলানিন পিগমেন্ট বেড়ে যায়, ফলে চামড়ায় প্যাঁচ বা ছোপ পড়ে। চামড়ার ক্যান্সার যেমন -রোডেন্ট আলসার, বেসাল সেল কারসিনোমা, স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা এবং ক্ষতিকর ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা জন্ম নেয়।

(৬) বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যারা তাদের শরীরের বেশিরভাগ অংশ অনাবৃত রাখেন, স্বল্প পোশাক পরেন এবং এ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ সরাসরি সূর্যালোকে অবস্থান করেন, তাদের মধ্যে এসব রোগে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক। এমনকি টাইটফিটিং পাতলা ও স্বচ্ছ পোশাক পরিহিতদেরও এসব রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞগণ এই ক্ষতিকর অতিবেগুণি রশ্মি থেকে শরীরকে রক্ষা করতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত (মুখমণ্ডলসহ) সারা শরীর ঢিলেঢালা মোটা কাপড়ের গাঢ় রঙের (বিশেষ কালো) পোশাক ব্যবহার করে ঢেকে রাখতে উপদেশ দিয়েছেন।

(৭) ইসলাম নারীদের লম্বা চাদর বা বোরকা গায়ে জড়িয়ে বাইরে বেরুতে বলে। চাদর বা বোরকা শরীরের সমুদয় অংশ স্বাভাবিকভাবেই ঢেকে দেয়। সাধারণত তা রঙিন, বিশেষ করে কালো হয়ে থাকে। ফলে তা ইউভি রে প্রতিরোধ করে শরীরকে অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষাসহ চামড়ার রঙ কালো হওয়া থেকে রক্ষা করে। ইসলাম পাতলা পোশাক পরিধান করতে নিষেধ করে আর পাতলা পোশাক যেহেতু ইউভি রে’কে শরীরে প্রবেশ করতে দেয়, তাই পাতলা পোশাকের বদলে মোটা পোশাকের ব্যবহার শরীরের রক্ষাকবচ, অন্যদিকে পর্দাও। চোখের উপর পাতলা নেট জাতীয় কালো কাপড় ব্যবহার করলে বা কালো চশমা পরলে চোখের রেটিনাকে ইউভি রে থেকে রক্ষা করে এবং পর্দা পূর্ণাঙ্গভাবে পরিপালিত হয়। বিজ্ঞানের এ গবেষণা পর্যালোচনা করলে নারীদের জন্য আল্লাহর নির্দেশিত পর্দাপ্রথা কত যে উপকারী তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।