প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
৫৩. ইয়াহ্ইয়াহ্ ইব্ন সাঈদ (র) আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমির ইব্ন আমির ইব্ন রবী’আ (র)-এর নিকট একটি প্রশ্ন করিলেন এমন এক লোক সম্পর্কে, যে নামাযের জন্য ওযূ করিয়া আগুনে রন্ধন করা খাদ্যবস্তু আহার করিল, সে কি ওযূ করিবে? তিনি বলিলেনঃ আমার পিতাকে দেখিয়াছি তিনি এইরূপ রাঁধা খাদ্য খাইতেন ও ওযূ করিতেন না।
৫৪. আবূ নঈম ওহাব ইব্ন কায়সান (র) জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছেঃ আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে দেখিয়াছি, তিনি গোশ্ত খাইলেন, অতঃপর নামায পড়িলেন অথচ ওযূ করিলেন না।
৫৫. মুহাম্মদ ইব্ন মুনকাদির (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে (খানার জন্য) দাওয়াত করা হইল, তাঁহার সমীপে রুটি-গোশ্ত পেশ করা হইল। তিনি উহা হইতে আহার করিলেন, তারপর অযূ করিলেন ও নামায পড়িলেন। অতঃপর সেই খাদ্যেও অবশিষ্ট তাঁহার নিকট আনা হইল। তিনি উহা হইতে আহার করিলেন, তারপর নামায পড়িলেন, আর ওযূ করিলেন না।
৫৬. আনাস ইব্ন মালিক (রা) ইরাক হইতে আগমন করিলেন। তাঁহার নিকট আবূ তালহা ও উবাই ইব্ন কা’ব (রা) আগমন করিলেন । আগুনে রন্ধন করা হইয়াছে এরূপ খাদ্য তাঁহাদের উভয়ের নিকট পেশ করা হইল। সকলে উহা হইতে আহার করিলেন, অতঃপর আনাস (রা) উঠিলেন এবং ওযূ করিলেন। (ইহা দেখিয়া) আবূ তালহা ও উবাই ইব্ন কা’ব (রা) বলিলেনঃ হে আনাস! ইহা কি? ইহা কি ইরাকী আমল? আনাস (রা) বলিলেনঃ আমি যদি ইহা না করিতাম (তবে ভাল হইত)। আবূ তালহা ও উবাই ইব্ন কা’ব (রা) উঠিলেন এবং নামায পড়িলেন, তাঁহারা ওযূ করিলেন না।
ওযূ সম্পর্কীয় বিবিধ হাদীস
৫৭. উরওয়াহ্ ইব্ন যুবায়র (র) হইতে বর্ণিত- ‘ইস্তিতাবা’ (‘ইস্তিতাবা’ অর্থ ইস্তিনজা অর্থাৎ পেশাব-পায়খানা হইতে পবিত্রতা অর্জন।) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেনঃ তোমাদের একজন কি তিনটি পাথরও পায় না (যদ্বারা সে পবিত্রতা লাভ করিতে সক্ষম হয়)?
৫৮. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- (একদা) কবরস্থানের দিকে গমন করিলেন। তিনি সেখানে পৌঁছার পর বলিলেনঃ “তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। হে মু’মিন সম্প্রদায়ের বাসস্থানে (অর্থাৎ গোরস্তানে) বসবাসকারিগণ! আমরা তোমাদের সহিত মিলিত হইব, ইনশাআল্লাহ্।” আমার আকাক্সক্ষা, যদি আমার ভাইদিগকে দেখিতাম! তাঁহারা বলিলেনঃ হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা আপনার ভাই নই কি? তিনি বলিলেনঃ তোমরা আমার আসহাব, আমার ভাই তাঁহারা যাঁহারা এখনও (ইহজগতে) আসেন নাই। আমি তাঁহাদের অগ্রদূত হইব হাওযের নিকট। তাঁহারা বলিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার উম্মতের মধ্যে যাঁহারা আপনার পরে আগমন করিবে আপনি তাঁহাদের পরিচয় পাইবেন কিভাবে? তিনি বলিলেনঃ তোমরা আমাকে বল দেখি, যদি কোন ব্যক্তির কাছে পায়ে ও ললাটে সাদা চিহ্নযুক্ত ঘোড়া থাকে এবং সেগুলি গাঢ় কাল রং-এর ঘোড়ার সহিত একত্র থাকে, তবে সেই ব্যক্তি কি তাহার (সাদা চিহ্নযুক্ত) ঘোড়া চিনিতে পারিবে না? তাঁহারা বলিলেনঃ হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! চিনিতে পারিবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিলেনঃ আমার উম্মতকে আমি চিনিতে পারিব। কারণ তাঁহারা ওযূর দরুন রোজ কিয়ামতে জ্যোতির্ময় চেহারা এবং জ্যোতির্ময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়া উপস্থিত হইবে। আমি হাওযে তাঁহাদের অগ্রদূত থাকিব। দলভ্রষ্ট উটকে যেরূপ তাড়াইয়া দেওয়া হয়, আমার হাওয হইতে কাহাকেও তদ্রƒপ তাড়াইয়া দেওয়া হইলে আমি তাহাকে আহ্বান করিবঃ ‘ওহে (আমার নিকট) আস, (আমার নিকট) আস, (আমার নিকট) আস। তারপর আমাকে বলা হইবেঃ ইহারা (আপনার সুন্নতকে) আপনার পরে পরিবর্তন করিয়াছে। আমি বলিবঃ- তবে দূর হও, দূর হও, দূর হও।’
৫৯. হুমরান (রা) হইতে বর্ণিত- উসমান ইব্ন আফ্ফান (রা) (একদা) মাকা’ইদ বৈঠকখানায় বসিলেন। মুয়াযযিন আসিয়া তাঁহাকে আসরের নামাযের সংবাদ দিলেন। তিনি পানি আনাইলেন, তারপর ওযূ করিলেন এবং বলিলেনঃ আল্লাহ্র কসম, আমি নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট একটি হাদীস বয়ান করিব। কিতাবুল্লাহ্র (কুরআনের) একটি আয়াত যদি না থাকিত তবে আমি তোমাদের নিকট হাদীস বয়ান করিতাম না। অতঃপর বলিলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলিতে শুনিয়াছি- যে ব্যক্তি ওযূ করে এবং সে তাহার ওযূকে উত্তমরূপে নামায পর্যন্ত তাহার (পাপ) মার্জনা করা হইবে অর্থাৎ পরবর্তী নামায সমাপ্ত করা পর্যন্ত অর্থাৎ পরবর্তী নামায আদায় করিলেই এই মার্জনা পাওয়া যাইবে।
৬০. আবদুল্লাহ্ সুনাবিহী (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলিয়াছেনঃ মু’মিন বান্দা যখন ওযূ করে এবং কুলি করে, তাঁহার মুখ হইতে পাপসমূহ বাহির হইয়া যায়। সে যখন মুখমণ্ডল ধৌত করে তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে তখন পাপসমূহ বাহির হইয়া যায়। এমনকি চক্ষুদ্বয়ের পালকের নিচ হইতেও গুনাহ্ বাহির হইয়া যায়। তারপর যখন সে তাঁহার উভয় হাত ধোয় তখন পাপসমূহ হস্তদ্বয় হইতে বাহির হইয়া যায়; এমনকি তাঁহার উভয় হাতের নখসমূহের নিচ হইতেও গুনাহ্ বাহির হইয়া যায়। অতঃপর যখন সে তাঁহার মাথা মসেহ করে তাঁহার পাপসমূহ তখন তাঁহার মাথা হইতে বাহির হইয়া যায়; এমনকি তাঁহার উভয় কান হইতেও বাহির হইয়া যায়। যখন সে তাঁহার উভয় পা ধোয় তখন পাপসমূহ তাঁহার উভয় পা হইতে বাহির হইয়া যায়; এমনকি তাঁহার উভয় পায়ের সকল নখের নিচ হইতেও গুনাহ বাহির হইয়া যায়। তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ অতঃপর সেই ব্যক্তির মসজিদে গমন এবং নামায পড়া তাঁহার জন্য নফল (অতিরিক্ত সওয়াবের বস্তু)- স্বরূপ হয়।
৬১. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ যখন মু’মিন বান্দা ওযূ করে এবং তাঁহার মুখমণ্ডল ধোয় তখন তাঁহার মুখমণ্ডল হইতে সকল গুনাহ্ যাহা দেখার দরুন অর্জিত হইয়াছে, বাহির হইয়া যায়; পানির সঙ্গে অথবা পানির শেষ কাতরার (ফোটা) সঙ্গে অথবা (ইহার সমার্থবোধক) অনুরূপ কোন বাক্য। তারপর যখন সে তাঁহার উভয় হাত ধোয় তখন তাঁহার হস্তদ্বয় হইতে হস্তদ্বয় দ্বারা অর্জিত সকল পাপ বাহির হইয়া যায়। পানির সঙ্গে অথবা (বলিয়াছেন) পানির শেষ কাত্রার সঙ্গে; এমনকি সে যাবতীয় পাপ হইতে পবিত্র হইয়া যায়।
৬২. আনাস ইব্ন মালিক (রা) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে এমন সময় দেখিলাম যখন আসরের নামাযের সময় নিকটবর্তী। লোকজন ওযূর জন্য পানি তালাশ করিলেন, কিন্তু তাঁহারা পানি পাইলেন না। পরে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নিকট একটি পাত্রে কিছু পানি আনা হইল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের হাত সেই পাত্রে রাখিলেন। তারপর লোকজনকে উহা হইতে ওযূ করার নির্দেশ দিলেন। আনাস (রা) বলেনঃ আমি হযরতের অঙ্গুলিসমূহের নিচ হইতে পানি নির্গত হইতে দেখিলাম, লোকজন ওযূ করিলেন। এমনকি তাঁহাদের (দলের) সর্বশেষ ব্যক্তিও ওযূ করিলেন ।
৬৩. নু‘আয়াম ইব্ন আবদুল্লাহ্ মুজমির (র) আবূ হুরায়রা (রা)- কে বলিতে শুনিয়াছেন, যে ব্যক্তি ওযূ করিয়াছে এবং তাঁহার ওযূকে উত্তমরূপে সম্পাদন করিয়াছে, অতঃপর নামাযের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়াছে, সে নামাযে থাকিবে (সওয়াবের দিক দিয়া নামাযে গণ্য হইবে) যতক্ষণ নামাযের নিয়ত রাখিবে এবং তাঁহার জন্য প্রতিটি প্রথম পদ উত্তোলন একটি করিয়া নেকী লেখা হইবে, আর প্রতিটি দ্বিতীয় পদ উত্তোলনের পরিবর্তে তাঁহার পাপ মোচন করিয়া দেওয়া হইবে। তাই তোমাদের কেউ ইকামত শুনিতে পাইলে দৌড়াইবে না, কারণ তোমাদের মধ্যে সেই লোকই বেশি সওয়াবের অধিকারী যাহার ঘর মসজিদ হইতে অধিক দূরে। শ্রোতারা বলিলেনঃ এইরূপ কেন, হে আবূ হুরায়রা? তিনি বলিলেনঃ কদমের আধিক্যের কারণ।
৬৪. ইয়াহ্ইয়া ইব্ন সাঈদ (র) শুনিয়াছেন যে, সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র)- কে প্রশ্ন করা হইল, মল-মুত্র ত্যাগের কারণে পানি দ্বারা ইন্তিন্জা (মল-মূত্র ত্যাগের পর বিশেষ স্থান ধৌত করা) করা সম্পর্কে। সাঈদ (র) বলিলেনঃ ইহা অবশ্য মেয়েদের ইস্তিন্্জা।
৬৫. আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ তোমাদের কাহারও পাত্র হইতে কুকুর আহার করিলে, তবে অবশ্যই উহাকে সাতবার ধুইবে।
৬৬. মালিক (র) বলেনঃ তাঁহার নিকট হাদীস পৌঁছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ যে শরীয়ত তোমাদের জন্য নির্ধারিত করা হইয়াছে উহার উপর তোমরা দৃঢ়তার সহিত থাক, পূর্ণ ইস্তিকামাত বা দৃঢ়তার সামর্থ্যও তো তোমাদের নাই। কাজ করিতে থাক। তোমাদের আমালসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমাল নামায। মু’মিন ব্যতীত অন্য কেউ ওযূর যথাযোগ্য হিফাযত (ওযূতে যাহিরী ও বাতেনী পরিচ্ছন্নতা অর্জনের প্রতি লক্ষ্য রাখার নাম মুহাফিযাত) করে না।
পরিচ্ছেদ ঃ মাথা ও দুই কান মসেহ-এর বর্ণনা
৬৭. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) তাঁহার উভয় কানের জন্য দুই আঙুল দ্বারা পানি লইতেন।
৬৮. মালিক (র) বলেনঃ তাঁহার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়াছে যে, জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ আনসারী (রা)- কে মসহ্ আলাল ইসাবাহ্ (পাগড়ির উপর হাত বুলাইয়া যাওয়া) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইল। তিনি বলিলেনঃ না, (ইহা যথেষ্ট নহে) যতক্ষণ পানি দ্বারা চুল মসেহ করা না হয়।
৬৯. হিশাম ইব্ন উরওয়াহ্ (র) বলেনঃ আবূ উরওয়াহ্ ইব্ন যুবাইর (র) পাগড়ি খুলিয়া ফেলিতেন এবং পানি দ্বারা মাথা মসেহ করিতেন।
৭০. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- যখন তিনি বালক তখন আবূ উবায়দার কন্যা, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা)- এর স্ত্রী সফিয়্যা- কে তাঁহার ওড়না নামাইয়া পানি দ্বারা মসেহ করিতে তিনি দেখিয়াছেন।
ইয়াহ্ইয়া (র) বলেনঃ পাগড়ি ও ওড়নার উপর মসেহ করা সম্পর্কে মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলিলেনঃ কোন পুরুষ কোন নারীর পক্ষে (যথাক্রমে) পাগড়ি কিংবা ওড়নার উপর মসেহ করা জায়েয নহে। তাহারা উভয়েই তাহাদের মাথা মসেহ করিবে।
মালিক (র)- কে এক ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইল, যে ব্যক্তি ওযূ করিয়াছে কিন্তু মাথা মসেহ করিতে ভুলিয়া গিয়াছে, (এই অবস্থায়) তাঁহার ওযূও অঙ্গসমূহ শুকাইয়া গিয়াছে, এখন সে কি করিবে? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ আমার মতে সে তাঁহার মাথা মসেহ করিবে। আর যদি সে (মসেহ ব্যতীত) ওযূ দ্বারা নামায পড়িয়া থাকে তবে সে নামায পুনরায় পড়িবে।
পদাবরণী বা মোজা মসেহ
৭১. মুগীরা ইব্ন শু‘বা (রা) হইতে বর্ণিত- তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনে বাহিরে গেলেন। মুগীরা বলেনঃ আমি পানি লইয়া তাঁহার সঙ্গে গমন করিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তাহার প্রয়োজন পূর্ণ করিয়া) আসিলেন, আমি তাঁহার হস্তদ্বয়ের উপর পানি ঢালিলাম, তিনি তাঁহার মুখমণ্ডল ধুইলেন । তারপর তাঁহার হস্তদ্বয় জুব্বার আস্তিন হইতে বাহির করিতে চেষ্টা করিলেন। জুব্বার আস্তিনের সংকীর্ণতার দরুন তিনি (বাহির করিতে) সক্ষম হইলেন না। তাই জুব্বার নিচ দিয়া উভয় হাত বাহির করিলেন, তারপর দুই হাত ধুইলেন, মাথা মসেহ করিলেন এবং মোজার উপর মসেহ করিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তশরীফ আনিলেন, তখন আবদুর রহমান ইব্ন ‘আউফ (রা) (লোকের) ইমামতি করিতেছিলেন, তিনি এক রাকাত সমাপ্তও করিয়াছেন। যেই এক রাকাত তাঁহাদের অবশিষ্ট ছিল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহাদের সহিত সেই রাকাত পড়িলেন। লোকজন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে দেখিয়া (তাঁহার অনুপস্থিতিতে নামায আরম্ভ করায় বেআদবী হইয়াছে ভাবিয়া) ঘাবড়াইয়া গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁহার নামায সমাপ্ত করার পর বলিলেনঃ তোমরা ভাল করিয়াছ।
৭২. সাদ‘ ইব্ন ওয়াক্কাস (রা) যখন কুফার আমীর ছিলেন তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) কুফায় সা‘দ ইব্ন আবি ওয়াক্কাস (রা)- এর নিকট আসিলেন এবং তাঁহাকে মোজার উপর মসেহ করিতে দেখিলেন। ইব্ন উমর (রা) তাঁহার এই মসেহ-এর প্রতি অস্বীকৃতি জানাইলেন। সা‘দ (রা) তাঁহাকে বলিলেনঃ আপনার পিতার নিকট গেলে ইহা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন। আবদুল্লাহ্ (রা) (মদীনায়) আগমন করিলেন; কিন্তু তাঁহার পিতাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিতে ভুলিয়া গেলেন। সা‘দ পরে (মদীনায়) আসিলেন এবং ইব্ন উমর (রা)- কে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ আপনার পিতার নিকট সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন কি? তিনি বলিলেনঃ না। অতঃপর আবদুল্লাহ্ (রা) তাঁহার পিতাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করিলেন। উমর (রা) উত্তরে বলিলেনঃ যদি মোজাদ্বয়ের মধ্যে তোমার উভয় পা পবিত্র অবস্থায় (ওযূ পরে) ঢুকাও তবে (পুনরায় ওযূর সময়) তুমি মোজার উপর মসেহ কর। আবদুল্লাহ (রা) বলিলেনঃ আমাদের এক ব্যক্তি পায়খানা-প্রস্রাব হইতে আসিলে তাহার জন্যও কি এই হুকুম? উমর (রা) বলিলেনঃ হ্যাঁ, তোমাদের কেউ মলমূত্র ত্যাগ করিয়া আসিলে তাহার জন্যও এই হুকুম।
৭৩. নাফি‘ হইতে বর্ণিত – আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা) বাজারে (প্রস্রাবের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে) প্রস্রাব করিলেন। তারপর অযূ করিলেন এবং তাঁহার মুখমণ্ডল ও উভয় হাত ধুইলেন এবং মাথা মসেহ করিলেন। তারপর তিনি মসজিদে প্রবেশ করার পর তাঁহাকে জানাযার নামায পড়াইবার জন্য আহ্বান করা হইল, তিনি মোজার উপর মসেহ করিলেন, তারপর জানাযার নামায পড়িলেন।
৭৪. সা‘ঈদ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন রুকাইশ আশআরী (র) বলেনঃ আমি আনাস ইব্ন মালিক (রা)-কে দেখিয়াছি, তিনি কোবা আসিলেন, তারপর প্রস্রাব করিলেন। অতঃপর তাঁহার নিকট পানি আনা হইলে তিনি ওযূ করিলেন, মুখমণ্ডল ধুইলেন, হস্তদ্বয় ধুইলেন কনুই পর্যন্ত, মাথা মসেহ করিলেন, আর মোজার উপর মসেহ করিলেন, তারপর মসজিদে আসিলেন এবং নামায পড়িলেন।
ইয়াহ্ইয়া (র) বলেনঃ মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এক ব্যক্তি সম্পর্কে যে ব্যক্তি ওযূ করিয়াছে নামাযের ওযূর মত, অতঃপর তাহার মোজা পরিধান করিয়াছে তারপর সে প্রস্রাব করিয়াছে। তারপর মোজা বাহির করিয়া লইয়াছে। অতঃপর মোজা উভয় পায়ে পরিধান করিয়াছে। সেই ব্যক্তি ওযূ পুনরায় করিবে কি? তিনি বলিলেনঃ সে মোজা বাহির করিয়া লইবে। তারপর ওযূ করিবে এবং উভয় পা ধুইবে। যে লোক উভয় পা মোজায় ওযূর মত পবিত্রাবস্থায় দাখিল করিয়াছে, সেই লোক মোজায় মসেহ করিতে পারিবে। আর যে ওযূর মত পবিত্রাবস্থায় উভয় পা মোজায় দাখিল করে নাই সে মোজা মসেহ করিবে না।
মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক লোক সম্পর্কে, যে ব্যক্তি ওযূ করিয়াছে তাহার পরিধানে মোজা থাকা অবস্থায়, কিন্তু সে মোজায় মসেহ করিতে ভুলিয়া গিয়াছে। (এই অবস্থায়) তাহার ওযূ (ওযূর অঙ্গসমূহ) শুকাইয়া গিয়াছে এবং সে নামায পড়িয়াছে। (তাহার হুকুম কি?) তিনি বলিলেনঃ সেই ব্যক্তি মোজার উপর মসেহ করিবে এবং নামায পুনরায় পড়িবে, ওযূ পুনরায় করিতে হইবে না।
মালিক (র)- কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক লোক সম্পর্কে, যে তাহার দুই পা (প্রথমে) ধুইয়াছে, তারপর মোজা পরিধান করিয়াছে, অতঃপর ওযূ শুরু করিয়াছে। তিনি বলিলেনঃ সে মোজা খুলিয়া ফেলিবে, তারপর ওযূ করিবে এবং (যথারীতি) উভয় পা ধুইবে।
৭৫. হিশাম ইব্ন উরওয়াহ্ (র) হইতে বর্ণিত- তিনি তাঁহার পিতাকে মোজার উপর মসেহ করিতে দেখিয়াছেন। তিনি মোজা মসেহ করার সময় ইহার অতিরিক্ত কিছু করিতেন না; মোজার উপরের অংশে মসেহ করিতেন, তলদেশ মসেহ করিতেন না।
মালিক (র) ইব্ন শিহাব (র)- কে প্রশ্ন করিলেনঃ মোজা মসেহ কিরূপে সম্পাদন করিতে হয়? ইব্ন শিহাব তাঁহার এক হাত মোজার নিচে দাখিল করিলেন এবং অপর হাত মোজার উপর স্থান করিলেন। অতঃপর উভয় হাত মসেহ- এর জন্য চালিত করিলেন।
মালিক (র) বলিয়াছেনঃ মোজা মসেহ- এর ব্যাপারে আমি যাহা শুনিয়াছি তন্মধ্যে ইব্ন শিহাবের মতামত আমার নিকট সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয়।
নাক দিয়া রক্ত ঝরা ও বমি সম্পকীর্য় বর্ণনা
৭৬. নাফি‘ (র) হইতে বর্ণিত- যখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর (রা)- এর নাক দিয়া রক্ত বাহির হইত, তখন নামায হইতে তিনি ফিরিয়া যাইতেন। অতঃপর ওযূ করিতেন এবং পুররায় আসিয়া অবশিষ্ট নামায পড়িতেন, আর তিনি (এই অবস্থায়) কথা বলিতেন না।
৭৭. মালিক (র) বলেনঃ তাঁহার নিকট রেয়ায়ত পৌঁছিয়াছে যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা)- এর নাক দিয়া রক্ত নির্গত হইলে তিনি বাহির হইতেন এবং রক্ত পরিস্কার করিতেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করিয়া নামায যতটুকু পড়িয়াছেন উহার (উপর ভিত্তি করিয়া) অবশিষ্ট নামায পড়িতেন।
৭৮. ইয়াযিদ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন কুসাইত লাইসী (র) বলেনঃ তিনি সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র)- কে দেখিয়াছেন, তিনি যখন নামায পড়িতেছিলেন তখন তাঁহার নাক দিয়া রক্ত বাহির হইল। তিনি নবী করীম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর পত্নী উম্মু সালমার হুজরায় আসিলেন। তাঁহার জন্য পানি আনা হইল, তিনি ওযূ করিলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং নামায যতটুকু বাকি ছিল তাহা আদায় করিলেন।
নাক হইতে রক্ত প্রবাহিত হইলে কি করিতে হয় তাহার বর্ণনা
৭৯. আবদুর রহমান ইব্ন হারমলা আসলামী (র) বলেনঃ আমি সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র)- কে দেখিয়াছি। নকসীরের কারণে তাঁহার নাক হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল, এমনকি তাঁহার নাক হইতে প্রবাহিত রক্তের দ্বারা তাঁহার আঙুল রঞ্জিত হইয়া গেল। অতঃপর তিনি নামায পড়িলেন অথচ ওযূ করিলেন না। (রক্ত যদি বহিয়া যায় বা বিন্দু বিন্দু হইয়া পতিত হয় তবে হানাফী মতানুসারে ওযূ নষ্ট হইবে। -আওজায।)
৮০. আবদুর রহমান ইব্ন মুজাব্বার (র) হইতে বর্ণিত- তিনি সালিম ইব্ন আবদুল্লাহ্ (র)- কে দেখিয়াছেন, তাঁহার নাক হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতেছে, এমনকি (সেই রক্তে) তাঁহার আঙুলসমূহ রঞ্জিত হইয়া গিয়াছে। অতঃপর তিনি নাক মোচড়াইলেন, তারপর নামায পড়িলেন, অথচ ওযূ করিলেন না।
জখম অথবা নাক হইতে প্রবাহিত রক্ত প্রবল হইলে কি করিতে হইবে
৮১. মিসওয়ার ইব্ন মাখরামা (র) হইতে বর্ণিত- যে রাত্রে উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)- কে ছুরিকাঘাত করা হয়, সেই রাত্রে জনৈক ব্যক্তি (কোন কোন বর্ণনায় বোঝা যায় যে, প্রবেশকারী সেই ব্যক্তি ছিলেন স্বয়ং মিসওয়ার ইব্ন মাখরামা।) উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)- এর নিকট প্রবেশ করিল। উমর (রা)- কে ফজরের নামাযের জন্য জাগানো হইল। উমর (রা) বলিলেনঃ হ্যাঁ, আমি এই অবস্থায়ও নামায পড়িব। যে ব্যক্তি নামায ছাড়িয়া দেয়, ইসলামে তাহার কোন অংশ নাই। অতঃপর উমর (রা) নামায পড়িলেন অথচ তাঁহার জখম হইতে তখন রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল।
৮২. ইয়াহ্ইয়া ইব্ন সাঈদ (র) হইতে বর্ণিত- সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র) বলিয়াছেনঃ নকসীরের কারণে যে ব্যক্তির রক্ত প্রবল হইয়াছে এবং তাহার রক্ত পড়া বন্ধ হয় নাই সেই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদের মতামত কি? ইয়াহ্ইয়া ইব্ন সাঈদ (র) বলেনঃ অতঃপর সাঈদ ইব্ন মুসায়্যাব (র) বলিলেনঃ আমার মতে সে মাথার দ্বারা কেবল ইশারা করিবে। মালিক (র) বলেনঃ এই বিষয়ে আমি যাহা কিছু শুনিয়াছি তন্মধ্যে ইহাই আমার নিকট উত্তম।
