প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

অর্থ : হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)

যোগসূত্র : কেবলা পরিবর্তনের ব্যাপারে বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা চলছিল। ফলে দু ধরনের প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল। আঘাত এবং মুসলমানদের মনে নানা প্রকার সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছিল। পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে সেসব কূট-প্রশ্নের জবাব দিয়ে সেগুলোকে প্রতিহত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ওদের তরফ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ জবাব দেয়ার পরও যেহেতু আরও নতুন নতুন প্রশ্ন উত্থাপন এবং তর্কের পর তর্কের অবতারণা করে মুসলমানদের মন-মস্তিষ্ককে বিষাক্ত করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছিল, সেহেতু এ আয়াতে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আত্মিক শক্তি অর্জন করে সেসব আঘাতের মোকাবেলা করার উপদেশ দেয়া হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত তাফসির

হে ঈমানদারগণ! (মানসিক আঘাত ও দুশ্চিন্তার বোঝা হালকা করার লক্ষ্যে) ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা (সর্ব বিষয়েই) ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন; বিশেষত, নামাযীগণের সাথে তো তিনি অবশ্যই থাকেন। কেননা, নামায হলো সর্বোত্তম ইবাতত। ধৈর্যধারণের ফলেই যদি আল্লাহ তায়ালা সঙ্গী হন, তবে নামাযের মধ্যে তো এ সুসংবাদ আরও প্রবলতর হওয়াই স্বাভাবিক।

বিস্তারিত জ্ঞাতব্য বিষয়
ধৈর্য ও নামায যাবতীয় সংকটের প্রতিকার

ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।

এ আয়াতে বলা হয়েছেÑ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, যাবতীয় প্রয়োজন ও সমস্ত সংকটের নিশ্চিত প্রতিকার দুটি বিষয়ের মধ্যে নিহিত। একটি সবর বা ধৈর্য এবং অপরটি নামায।

বর্ণনা-রীতির মধ্যে শব্দটিকে বিশেষ কোনো বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট না করে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করার ফলে এখানে যে মর্মার্থ দাঁড়ায়, তা এই যে, মানবজাতির যে কোনো সংকট বা সমস্যার নিশ্চিত প্রতিকার হচ্ছে ধৈর্য ও নামায। যে কোনো প্রয়োজনেই এ দুটি বিষয়ের দ্বারা মানুষ সাহায্য লাভ করতে পারে। তাফসীরে মাযহারীতে শব্দ দুটির ব্যাপক অর্থে ব্যবহারের তাৎপর্য এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। প্রসঙ্গত, স্বতন্ত্রভাবে দুটি বিষয়েরই তাৎপর্য অনুধাবন করা যেতে পারে।

সবর-এর তাৎপর্য

সবর শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফস-এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা।

কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সবর-এর তিনটি শাখা রয়েছে : (১) নফসকে হারাম ও নাজায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা। (২) ইবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করা এবং (৩) যে কোনো বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা অর্থাৎ যেসব বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয় সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা রাখা। অবশ্য কষ্টে পড়ে যদি মুখ থেকে কোনো কাতর শব্দ উচ্চারিত হয়ে যায় কিংবা অন্যের কাছে তা প্রকাশ করা হয়, তবে তা সবর-এর পরিপস্থি হবে না। (ইবনে কাসীর, সায়ীদ ইবনে জুবায়ের-এর সূত্রে)

সবর-এর উপরোক্ত তিনটি শাখাই প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্যপালনীয়। সাধারণ মানুষের ধারণায় সাধারণত তৃতীয় শাখাকেই সবর হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রথম দুটি শাখা যে এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারে মোটেও লক্ষ করা হয় না। এমনকি এ দুটি বিষয়ও যে সবর-এর অন্তর্ভুক্ত এ ধারণাও যেন অনেকের নেই।

কুরআন-হাদীসের পরিভাষায় ধৈর্যধারণকারী বা সাবেরীন সে সমস্ত লোককেই বলা হয়, যারা উপরোক্ত তিন প্রকারেই সবর অবলম্বন করে থাকেন। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, হাশরের ময়দানে ঘোষণা করা হবে, ধৈর্যধারণকারীরা কোথায়? এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোক উঠে দাঁড়াবে, যারা তিন প্রকারেই সবর করে জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। এসব লোককে প্রথমেই বিনা হিসাবে বেহেশতে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। ইবনে-কাসীর এ বর্ণনা উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেছেন যে, কুরআনের অন্যত্র :সবরকারী বান্দাগণকে তাদের পুরস্কার বিনা হিসাবে প্রদান হবে ।এ আয়াতে সেদিকেই ইশারা করা হয়েছে।

নামায

মানুষের যাবতীয় সমস্যা ও সংকট দূর করা এবং যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কুরআন-উল্লেখিত দ্বিতীয় পন্থাটি হচ্ছে নামায।
সবর-এর তাফসির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকার ইবাদতই সবরের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এরপরও নামাযকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে, নামায এমনই একটি ইবাদত, যা-তে সবর তথা ধৈর্যের পরিপূর্ণ নমুনা বিদ্যমান। কেননা, নামাযের মধ্যে একাধারে যেমন নফস তথা রিপুকে আনুগত্যে বাধ্য রাখা হয়, তেমনি যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ, নিষিদ্ধ চিন্তা, এমনকি অনেক হালাল ও মোবাহ বিষয় থেকেও সরিয়ে রাখা হয়। সে-মতে নিজের নফস-এর উপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে সর্বপ্রকার গুনাহ ও অশোভন আচার-আচরণ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও নিজেকে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে সবর-এর যে অনুশীলন করতে হয়, নামাযের মধ্যেই তার একটা পরিপূর্ণ নমুনা ফুটে ওঠে।
যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করা এবং সর্বপ্রকার বিপদাপদ থেকে মুক্তি লাভ করার ব্যাপারে নামাযের একটা বিশেষ তাছীর বা প্রভাবও লক্ষ করা যায়। যদিও তার কারণ ও হেতু জানা না থাকে। যেমনÑ বিশেষ বিশেষ রোগে কোনো কোনো ঔষধী গুল্ম-লতা ও ডাল-শিকড় গলায় ধারণ করায় বা মুখে রাখায় যেমন বিশেষ ফল লক্ষ করা যায়; লোহার প্রতি চুম্বকের বিশেষ আকর্ষণ যেমন স্বাভাবিক, কিন্তু কেন এরূপ হয়, তা যেমন সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে বলা যায় না, তেমনি বিপদ-মুক্তি এবং যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে নামাযের তাছীরও ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে এটা পরীক্ষিত সত্য যে, যথাযথ আন্তরিকতা ও মনোযোগ সহকারে নামায আদায় করলে যেমন বিপদমুক্তি অবধারিত, তেমনি যে কোনো প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারেও এতে সুনিশ্চিত ফল লাভ হয়।
হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র অভ্যাস ছিল যে, যখনই তিনি কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখনই নামায আরম্ভ করতেন। আর আল্লাহ তায়ালা সে নামাযের বরকতেই তাঁর যাবতীয় বিপদ দূর করে দিতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছেঃ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখনই কোনো বিষয় চিন্তিত করে তুলত, তখনই তিনি নামায পড়তে শুরু করতেন।

আল্লাহর সান্নিধ্য

নামায ও সবর-এর মাধ্যমে যাবতীয় সংকটের প্রতিকার হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, এ দু-পন্থায়ই আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত সান্নিধ্য লাভ হয়।

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

বাক্যের দ্বারা এদিকে ইশারা করা হয়েছে যে, নামাযী এবং সবরকারীগণের সাথে আল্লাহর সান্নিধ্য তথা তাঁর শক্তির সমাবেশ ঘটে। যেখানে বা যে অবস্থায় বান্দার সাথে আল্লাহর শক্তির সমাবেশ ঘটে, সেখানে দুনিয়ার কোনো শক্তি কিংবা কোনো সংকটই যে টিকতে পারে না, তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পরে না। বান্দা যখন আল্লাহর শক্তিতে শক্তিমান হয়, তখন তার প্রতি অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। তার অগ্রগমন ব্যাহত করার মতো শক্তি কারও থাকে না। বলাবাহুল্য, মাকসুদ হাসিল করা এবং সংকট উত্তরণের নিশ্চিত উপায় একমাত্র আল্লাহর শক্তিতে শক্তিমান হওয়াই হতে পারে।
[সূত্র : তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৩-৩৯৫]