প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
আল্লাহতা’আলা কর্তৃক সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত শরিয়তী বিধানের পরিবর্তন সম্পর্কে আকীদা
১. কুরআন মাজীদের একটি বক্তব্য ও এর ব্যাখ্যা এ বিষয়ে যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত কুরআন মাজীদের প্রচারে যখন আত্মনিয়োগ করলেন, এ পথে তিনি শত্রুদের পক্ষ থেকে চরম বাধাপ্রাপ্ত হলেন। এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভ্রান্তিতে ফেলতে চেষ্টা তদবীরের ত্রুটি করেনি। তারা প্রস্তাব রেখেছিল, এ কুরআন বাদ দিয়ে অন্য কুরআন নিয়ে আসা হোক অথবা, এ কুরআন সমাজের লোকদের সুবিধামত পরিবর্তন পরিবর্ধন করা হোক। যারা এ ধরনের প্রস্তাব রেখেছিল, তাদেরকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে আল্লাহতা’আলা বলে দিলেন:
وَ اِذَا تُتْلٰى عَلَيْهِمْ اٰيٰتُنَا بَيِّنَاتٍؕ قَالَ الَّذِيْنَ لَا يَرْجُوْنَ لِقَآءَنَا ائْتِ بِقُرْاٰنٍ غَيْرِ هٰذَا اَوْ بَدِّلْهؕ قُلْ مَا يَكُوْنُ لِىْۤ اَنْ اُبَدِّلَه مِنْ تِلْقَآئِ نَفْسِىْ اِنْ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا يُوْحٰۤى اِلَىَّ ۚ اِنِّىْۤ اَخَافُ اِنْ عَصَيْتُ رَبِّىْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيْمٍ
‘তাদের সামনে যখন আমার সুস্পষ্ট বর্ণনা সম্পন্ন আয়াতগুলো পড়ে শোনানো হয়, যারা পরকালে আমার সাক্ষাতের আশা কিংবা ভয় রাখে না তারা (কাফিররা) বলে, হে মুহাম্মদ, আপনি এ কুরআন ব্যতীত অপর একটি কুরআন নিয়ে আসুন অথবা এ কুরআনেই পরিবর্তন পরিবর্ধন করে দিন। (তখন আল্লাহতা’আলা বললেন), হে মুহাম্মদ! আপনি বলুন, আমার মনগড়া মতে এ কুরআনে পরিবর্তন-পরিবর্ধন ঘটানোর সাধ্য নেই। আমি তো কেবল সেসব কিছুরই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি অহী করা হয়। আমি কিয়ামতের কঠোর দিনের ভয়াবহ আযাবকে ভয় করি, যদি আমি আমার পালনকর্তার হুকুমের বিপরীত করি (তবে খোদায়ী বিচার আমাকেও বিপদগ্রস্থ করতে পারে)।’ (সূরা ইউনূস : ১৫)
২. উল্লেখিত কুরআনিক বক্তব্যটিতে স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, খোদায়ী বিধান অমান্য করার অধিকার কোন মানুষ কিংবা জিনের নেই। এমনকি রাসূলে খোদা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরও এ ক্ষমতা ছিল না। কুরআন মাজীদের উক্ত দ্বার্থহীন ঘোষণার নিরিখে শিক্ষা নিতে হবে সকল মানুষকে। বিশেষ করে মুসলমান হওয়ার দাবীদার হয়ে যারা কুরআন মাজীদের কিছু অংশ মানছে, আর কিছু অংশকে প্রত্যাখান করছে তাদেরকে। তাছাড়া যারা নিজেদের ইচ্ছা মোতাবেক কুরআন মাজীদের বিষয়াবলীতে বিকৃতি ঘটাচ্ছে তাদেরকে ভেবে দেখতে হবে, তারা কুফরী করছে কিনা।
দ্বীনের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ এবংদ্বীনের অবমাননা করা প্রসঙ্গে আকীদা
১. দ্বীনকে নিয়ে উপহাস করার অর্থ প্রকৃত পক্ষে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা এবং দ্বীন হতে সার্বিক ভাবে বের হয়ে যাওয়া। আল্লাহতা’আলা বলেন-
قُلْ اَبِاللهِ وَ اٰيٰتِهِ وَ رَسُوْلِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِءُوْنَ۞ لَا تَعْتَذِرُوْا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ اِيْمَانِكُمْ
‘হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ তায়ালার সাথে এবং তাঁর হুকুমসমূহের সাথে এবং রাসূলের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছিলে, বাহানা বাদ দাও, তোমরা কুফরী করেছো ঈমান লাভ করার পর।’ (সূরা তাওবা, ৬৫-৬৬)
২. সুতরাং উপরে উল্লেখিত আয়াতের মর্মার্থ দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আল্লাহ তায়ালার সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফরী কাজ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে উপহাস করারও কুফরী। অনুরূপভাবে আল্লাহতায়ালার বিধি নিষেধের সাথে খেল তামাশা করাও কুফরী কাজ। সুতরাং যে ব্যক্তি দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন একটি বিষয়ের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করল, সে যেন গোটা দ্বীনের সাথেই উপহাস করল।
৩. মুনাফিকরা হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইনদের সাথে উপহাস বিদ্রুপ করার পরিপ্রেক্ষিতেই কুরআনের এই আয়াত নাজিল হয়। সুতরাং দ্বীনি কোন বিষয়ে উপহাস করা কুফরীরই নামান্তর মাত্র।
র্শিক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهٖ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرٰى إِثْمًا عَظِيْمًا
‘আল্লাহ অবশ্যই তার সাথে শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য যত গুনাহই হোক না কেন, তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেছে সেতো এক বিরাট মিথ্যা রচনা করেছে এবং কঠিন গুনাহের কাজ করেছে।’ (সূরা আন-নিসা: আয়াত ৪৮)
র্শিকমুক্ত ঈমান থাকলে অন্যান্য গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়
১. আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মি’রাজ করানো হয় তখন তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছেন যা সপ্তম আকাশে রয়েছে। যে জিনিস উপরে উঠে তা এখান পর্যন্ত পৌঁছে, তারপর এখান থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। আর যে জিনিস অবতরণ করে তা এখান পর্যন্ত অবতারিত, তারপর এখান থেকে গ্রহণ করা হয়। ঐ গাছের উপর সোনার ফড়িং ছেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এবং সূরা বাক্বারার শেষের দুই আয়াত দেয়া হয়। এবং এটাও দেয়া হয় যে, তার উম্মাতের মধ্যে যারা র্শিক করবে না তাদের কবীরা গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। (হাদীসটি সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/৪৪৯; মুসনাদে [আহমাদ হা/৩৬৬৫; বায়হাক্বীর দালায়িলুন নবুওয়াত হা/৪/৪৭৪; আবু ইয়ালা, নাসায়ী সুনানুল কুবরা হা/৩১৫।)
২. আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। যেসব অপরাধী আল্লাহর সাথে র্শিক করে নি তাদেরকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু পরস্পর সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি সম্পর্কে (আল্লাহ বলেন): এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে, এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে, এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে। (হাদীসটি সহীহ: সহীহ মুসলিম হা/৬৭০৯, মুয়াত্তা মালিক, তিরমিযী হা/২০২৩, আবু দাউদ হা/৪৯১৬; আহমাদ হা/৭৬৩৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক হা/৭৯১৪, ২০২২৬; তার থেকে আবু ইয়ালা হা/৬৬৮৪, ইবনু হিব্বান হা/৩৬৪৪, বাগভী, বায়হাক্বী, গায়াতুল মারাম হা/৪১২।)
৩. আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন: কেউ একটি নেক আমল করলে এর বিনিময়ে তাকে এর দশগুন বা আরো অধিক দিবো। কেউ যদি একটি গুনাহ করে তাহলে এর বিনিময়ে কেবল একটি গুনাহ (লিখা) হবে অথবা আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। আর কেউ যদি আমার কাছে পৃথিবীর সমান গুনাহসহ উপস্থিত হয় এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে থাকে তাহলে আমিও ঠিক পৃথিবীর সমান ক্ষমা নিয়ে তার কাছে এগিয়ে যাবো। (আহমাদ হা/২১৩৬০; তিরমিযী হা/৩৫৪০; মুস্তাদরাক হাকিম হা/৭৬০৫।)
নেক আমল গুনাহ দূর করে দেয়
১. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ــ
‘পূণ্য কাজ (নেক আমল) অবশ্যই গুনাহ দূর করে দেয়।’ (সূরা হুদ: আয়াত ১১৪)
২. শ্রদ্ধেয় তাফসীরকারকদের মতে এখানে পূণ্য কাজ বলতে নামায, রোযা, হাজ্জ, যাকাত, সাদাকা, সদ্ব্যৎবহার, উত্তম লেনদেন প্রভৃতি যাবতীয় পূণ্য কাজ বুঝানো হয়েছে। তবে তন্মধ্যে নামায সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাগ্রগণ্য। অনুরূপভাবে পাপ কাজের মধ্যে সগীরা ও কবীরা যাবতীয় গুনাহ শামীল রয়েছে। কিন্তু কুরআন মাজীদের জন্য এক আয়াত এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিভিন্ন হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, এখানে পাপ কাজ দ্বারা সগীরা গুনাহ বুঝানো হয়েছে।
এমতাবস্থায় আয়াতের মর্ম হচ্ছে, যাবতীয় নেক কাজ, বিশেষ করে নামায সাগীরা গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে: ‘তোমরা যদি বড় (কবীরা) গুনাহসমূহ হতে বিরত থাক যা থেকে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের ছোট ছোট (সাগীরা) গুনাহগুলো মিটিয়ে দেব। (সূরা নিসা: আয়াত ৩১) (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন সংক্ষিপ্ত বংলা সৌদি সংস্করণ, পৃ. ৬৪৮)
৩. আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন: তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, মন্দ কাজের পরপরই নেক কাজ করো, তাতে গুনাহ দূরীভূত হয়ে যাবে এবং মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করো। (হাদীসটি হাসান : তিরমিযী হা/১৯৮৭, আহমাদ হা/২১৩৫৪, মুস্তাদরাক হাকিম হা/১২৮, দারিমী হা/২৭৯১, বায়হাক্বী, রাওযুন নাযীর হা/৮৫৫, মিশকাত হা/৫০৮৩।)
