প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

প্রশ্ন-৭৭ : এবার বলুন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী হালাল খাবার বর্জন করতেন, খেতেন না বা অপছন্দ করতেন? বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের খাদ্যদ্রব্য কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন করতেন?

উত্তর : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বিভিন্ন প্রকার খাদ্যদ্রব্য আহারের ব্যাপারে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। তার এই উপদেশগুলো যদি আমরা মেনে চলতে পারি তবে অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দুটো খাদ্যদ্রব্য একত্রে খেতেন না, যা একই স্বভাব ও মেজাজবিশিষ্ট। অর্থাৎ ঊষ্ণ প্রকৃতির খাদ্যের সঙ্গে শীতল বা আর্দ্র প্রকৃতির খাবার একত্রে মিশিয়ে নিতেন এবং এই নীতির উপর ভিত্তি করেই খাদ্য নির্বাচন করতেন। এতে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতো। ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের ক্রিয়াকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে হতো। যেমন:

১. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধ ও মাছ দুধ ও টক জাতীয় জিনিস একত্রে খেতেন না।

২. তিনি দুটি গরম জাতীয় খাবার কিংবা দুটি ঠাণ্ডা জাতীয় খাবার একত্রে খেতেন না।

বিজ্ঞান আমাদের বলে যে দুটি গরম জাতীয় খাবার একত্রে খেলে একসঙ্গে বেশি ক্যালরি খাওয়া হয়। ফলে রক্ত ও চর্বিতে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।

৩. তিনি দুটো শক্ত অথবা দুটো অত্যধিক নরম খাদ্য একত্রে খেতেন না।

৪. তিনি ভুনা গোশতের সাথে টাটকা গোশতের তরকারি একত্রে খেতেন না। অর্থাৎ মুরগির রোষ্ট-এর সাথে মুরগির তরকারি একত্রে খেতেন না।

৫. তিনি জোলাপ সৃষ্টিকারী খাবার অর্থাৎ যেসব খাবার একই সাথে ডায়রিয়া বা আমাশয় সৃষ্টি করে, তা একত্রে খেতেন না। অথবা এমন দুটি খাবার একত্রে খেতেন না, যা উভয়ই কোষ্ঠকাঠিন্য সৃষ্টি করে।

৬. তিনি তাজা খাবার ও বাসি (অর্থাৎ আগের দিনের রান্না করা) খাবার একত্রিত করে খেতে নিষেধ করেছেন।

৭. তিনি দ্রুত হজমশীল ও দেরীতে হজমশীল খাবার একত্রে খেতে নিষেধ করেছেন।

৮. তিনি রসুন ও পেঁয়াজ একসাথে খেতে নিষেধ করেছেন।

৯. তিনি ডালিম ও গোশতের পুডিং একত্রে খেতে নিষেধ করেছেন।

১০. তিনি কোনো পেঁয়াজ-রসুন বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার ও চটপটি জাতীয় খাবার পছন্দ করতেন না।

১২. তিনি রাতের রান্না পরের দিন খেতেন না। এর সম্ভাব্য কারণ মরুভূমির তাপমাত্রা বেশি থাকে। চব্বিশ ঘণ্টা পর খাবার স্বভাবতই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া সেখানে ঐ সময় কোনো ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ছিলো না যার ভেতর আগের দিনের রান্নাকরা খাবার সংরক্ষণ করা যেতো। খাদ্য ও পানাহার সম্পর্কিত এসব তথ্যাবলি বিখ্যাত লেখক, গবেষক ও হাদীসশাস্ত্র বিশারদ হাফিজ ইনবুনল কাইয়িম -এর বিখ্যাত গ্রন্থ যাদুল মা’আদ-এ উল্লিখিত আছে।

প্রশ্ন-৭৮ : প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানাহার সম্পর্কে হাদীসে কোনো বর্ণনা এসেছে কি?

উত্তর : সঠিক পানাহার সম্পর্কে নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেশ ক’টি হাদীস রয়েছে। তিনি বলেন,

ক. ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অধিক খাবে, কিয়ামত দিবসে সে ঐ পরিমাণ ক্ষুধার্ত থাকবে।’ (আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহা)

খ. ‘মুমিন ব্যক্তি এক আঁতে খায় আর কাফির ব্যক্তি সাত আঁতে খায়।’ (আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও আঁত-তিরমিযী) অর্থাৎ মুসলমান এক নাড়ি বা পাকস্থলী দিয়ে খায়, আর কাফির সাত নাড়ি দিয়ে খায়। অন্যভাবে বলা যায় যে একজন অবিশ্বাসী একজন মুসলমানের চেয়ে সাতগুণ বেশি আহার করে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুও অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আত-তিরমিযী)

প্রশ্ন-৭৯ : অতিথিদের খাওয়ানোর ব্যাপারে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো উপদেশ আছে কি? প্রতিবেশীদের আপ্যায়নের ব্যাপারে তিনি কি বলেছেন?

উত্তর : ধন্যবাদ। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে উত্তম, যে মেহমানদেরকে বা অতিথিদেরকে খানা খাওয়ায়।’ (হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ ও মুসতাদরাকে হাকিম গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। শু’আবুল ঈমানেও উদ্ধৃত আছে।)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীদের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যা আমাদের দর্শকদের অনেকেই জানেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সে সত্যিকার মুসলমান নয়, যে পেটভরে খায় আর তার প্রতিবেশী অভুক্ত বা না খেয়ে থাকে।’ (মুসতাদরাক ও আল-মু’জামূল কাবীর)
এখানে আমি আরো দুটো হাদীস আলোচনায় আনবো যে খাদেম বা দাসের খাবারের বিষয়ে নবী করীম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সজাগ ও সহানুভূতিশীল ছিলেন।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কারো খাদেম তার জন্য খাবার এনে উপস্থিত হলে সে যেনো তাকে নিজের সাথে বসায় ও নিজের সাথে খাওয়ায়। সে যদি তাকে নিজের সাথে বসাতে না চায় তবে খাবার থেকে যেনো তাকে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ)
অপরদিকে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কারো খাদেম যখন তার নিকট খাদ্য নিয়ে আসে তখন সে যেনো তাকে নিজের সাথে বসায় অথবা খাদ্য থেকে তাকেও খেতে দেয়। কারণ সে খাদ্যদ্রব্য রান্না করতে গিয়ে গরম ও ধোঁয়া সহ্য করেছে।’ (ইবনে মাজাহ)
সত্যি কি এক মহানুভব ও বিস্ময়কর শিক্ষা! তথাকথিত কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশেও এ ধরনের মহানুভবতার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।

প্রশ্ন-৮০ : মুহতারামের নিকট প্রশ্ন, কোন্ হাতে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করা জায়েয, আর কোন হাতে খাবার খাওয়া নিষেধ বা নাজায়েয? আমরা যুগ যুগ ধরে ডানহাতে খাবার খেয়ে আসছি। ইদানিং কিছু লোক আবার বামহাতে খানা খায়। এ বিষয়ে হাদীস বর্ণনাপূর্বক বিস্তারিত আলোচনা করুন। আমাদের বিষয়টি উদাহরণ স্বরূপ বুঝিয়ে বলুন?

উত্তর : ধন্যবাদ আপনাকে অত্যন্ত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করার জন্য। কোন্ হাতে খাদ্যদ্রব্য খাওয়া যাবে এ বিষয়ে আমি ৫টি হাদীস বর্ণনা করবো ইনশা’আল্লাহ। প্রথম হাদীসটি বর্ণনা করেন, হযরত ইবনে উমর রাদিয়অল্লাহু আনহু। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেনো বামহাতে আহার না করে আর পানও না করে। কেননা শয়তান বামহাত দিয়ে পানাহার করে।’ (আত-তিরমিযী)
আবু দাউদ শরীফে উদ্ধৃত হাদীসের ভাষা হচ্ছে, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খায় সে যেনো ডানহাত দিয়ে খায় এবং যখন কেউ পানি পান করে সে যেনো তখন ডানহাতে পান করে। কেননা শয়তান বামহাতে খায় ও পনি পান করে।’ (আবু দাউদ)

ইবনে মাজাহ শরীফের উদ্ধৃত হাদীসের বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু।
মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হাদীসের ভাষা নিম্নরূপ-
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা বামহাত দিয়ে খানা খাবে না। কারণ শয়তান বাম হাত দিয়ে খানা খায়।’ (সহীহ মুসলিম)
তৃতীয় হাদীসটি বর্ণনা করেন ইবনে আবু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন যে রসূল আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কেউ খানা খেতে চায়, তার উচিত সে যেনো ডানহাত দিয়ে খায়, যখন কেউ পানি পান করতে চায়, তার উচিত সে যেনো ডানহাত দিয়ে পানি পান করে। কারণ শয়তান বাহমাত দিয়ে খানা খায় ও বামহাত দিয়ে পানি পান করে।’ (সহীহ মুসলিম ও আত-তিরমিযী)

চতুর্থ হাদীসটি হযরত উমর ইবনে আবু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘একদা আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, হে বৎস! আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করো, ডানহাতে খাও, আর তোমার সামনে (নিকটবর্তী স্থান) থেকে খাও।’ (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও আত-তিরমিযী)
নিচের হাদীসটি বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি বলেন, ‘নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ডানহাত ছিলো তার উযু ও খাবার গ্রহণের জন্য, আর বামহাত ছিলো পায়খানা-প্রস্রাবের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবার জন্য এবং এমন কাজের জন্য যা ছিলো অপছন্দনীয়।’ (হাদীসটি আবু দাউদ শরীফ থেকে নেয়া)

নাক পরিষ্কারের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বামহাত ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসটি মুসা ইবনে আবদুর রহমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি সূত্রে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু, থেকে বর্ণিত।
‘তিনি পানি আনতে বলেন, পরে তিনি কুলি করেন এবং নাকে পানি দেন। বামহাতে তিনবার নাক ঝাড়েন এবং বলেন, এই হলো নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উযু।’ (আন-নাসাঈ)

এ হাদীস দুটোর শিক্ষা আধুনিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্পূর্ণ সমর্থন করে। কারণ নাক থেকে যে শ্লেষা বের হয় তা দূষিত পদার্থ এবং অনেক সময় তাতে জীবাণু থাকে। তাই এ কাজে ডানহাত ব্যবহার করা উচিত নয়। অপরদিকে মুখে অভ্যন্তর পরিষ্কার করতে হলে ডানহাতই ব্যবহার করতে হয় কারণ সাধারণত ডানহাত দিয়ে খাদ্যদ্রব্য মুখের প্রবেশ করানো হয় এবং খাদ্য গ্রহণের সময় বিভিন্ন অবস্থায় ডানহাতই সর্বদা ব্যবহৃত হয়ে থাকে।