প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

[ পূর্বের প্রকাশের পর ]

সুদকে নিশ্চিহ্ন করার অর্থ

আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন : আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন। এ উক্তি পরকালের দিক দিয়ে তো সম্পূর্ণ পরিষ্কারই; সত্যোপলব্ধির সামান্য চেষ্টা করলে দুনিয়ার দিক দিয়েও সুস্পষ্ট। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ উক্তির উদ্দেশ্যও তা-ই
সুদ যদিও বৃদ্ধি পায় কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে :
আল্লাহ তাআলা কোনো কাফির গুনাহগারকে পছন্দ করেন না।

এতে ইশারা করা হয়েছে যে, যারা সুদকে হারামই মনে করে না, তারা কুফরে লিপ্ত এবং যারা হারাম মনে করা সত্ত্বেও কার্যত সুদ খায়, তারা গুনাহগার, পাপাচারী।

তৃতীয় আয়াতে নামায ও যাকাতের নির্দেশের প্রতি অনুগত সৎকর্মশীল মুমিনদের বিরাট পুরস্কার ও পরকালীন সুখ-শান্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতে সুদখোরদের জন্য জাহান্নামের শাস্তি এবং লাঞ্ছনার কথা উল্লেখিত হয়েছিল। তাই কুরআন পাকের সাধারণ রীতি অনুযায়ী এর সাথে সাথে ঈমানদার সৎকর্মী তথা নামায ও যাকাত আদায়কারীদের সওয়াব ও পরকালীন মর্তবা উল্লেখ করে বলা হয়েছে :

অর্থাৎ এই আয়াতের সারমর্ম হলো- সুদের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হওয়ার পর সুদের যেসব বকেয়া অর্থ কারও কাছে প্রাপ্য ছিল, এ আয়াতে সেগুলোর লেনদেনও হারাম করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা এই যে, সুদের অবৈধতা অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আরবে ব্যাপকভাবে সুদী কারবারের প্রচলন ছিল। আলোচ্য আয়াতসমূহের প্রথম আয়াতে এর নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলে মুসলমানরা যথারীতি সুদের কাজ-কারবার পরিত্যাগ করেন। কিন্তু কিছুসংখ্যক লোকের বকেয়া সুদের দাবি তখনো অন্যদের উপর অবশিষ্ট ছিল। বনী সাকীফ ও বনী মাখযুমের মধ্যে পরস্পর সুদের কারবার বহাল ছিল এবং বনী সাকীফের কিছু সুদের দাবি তখনো পর্যন্ত বনী মাখযুমের উপর অবশিষ্ট ছিল। বনী মাখযুম মুসলমান হওয়ার পর সুদের টাকা পরিশোধ করাকে অবৈধ মনে করতে থাকে। আবার এদিকে বনী সাকীফ তাদের প্রাপ্য সুদ দাবি করতে থাকে। কারণ, তারা মুসলমান ছিল না; কিন্তু মুসলমানদের সাথে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। বনী মাখযুমের বক্তব্য ছিল এই যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর আমরা যে হালাল উপার্জন করছি, তা সুদ পরিশোধে ব্যয় করব না।

এ মতবিরোধের ঘটনাস্থল ছিল মক্কা মুকাররমা। তখন মক্কা বিজিত হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – এর পক্ষ থেকে মক্কার শাসক ছিলেন হযরত মু’আয (রাযি)। অন্য রেওয়ায়েত মতে ইতাব ইবনে উসায়দ (রাযি.)। তিনি নির্দেশলাভের উদ্দেশ্যে ঘটনার বিবরণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট লিপিবদ্ধ করে পাঠালেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন পাকের আলোচ্য এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। এর সারমর্ম এই যে, ইসলাম গ্রহণ করার পর সুদের পূর্ববর্তী সব কাজ-কারবার অবিলম্বে মওকুফ করে দিতে হবে। অতীত সুদও গ্রহণ না করে শুধু মূলধন আদায় করতে হবে। এই ইসলামী আইন কার্যকর হলে মুসলমানরা তো তা মানতে বাধ্য ছিলই, যেসব অমুসলিম গোত্র মুসলমানদের সাথে শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ইসলামী আইন কবুল করে নিয়েছিল, তারাও এই আইন মেনে নিতে বাধ্য হলো।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিদায় হজ্বের ভাষণে এ আইন ঘোষণা করলেন, তখন একথাও প্রকাশ করেন যে, এ আইন ব্যক্তিবিশেষ, সম্প্রদায়বিশেষ কিংবা মুসলমানদের আর্থিক স্বার্থের প্রতি লক্ষ করে নয়; বরং সমগ্র মানব সমাজের উন্নতি ও কল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখেই জারি করা হয়েছে। তাই আমি সর্বপ্রথম অমুসলমানদের কাছে মুসলমানদের প্রাপ্য বকেয়া সুদের বিরাট অংক মওকুফ করে দিচ্ছি। এখন তাদের নিজ নিজ বকেয়া সুদের অংক ছেড়ে দিতে আপত্তি থাকা উচিৎ নয়। তিনি এ ভাষণে বলেন :

অর্থাৎ জাহিলিয়াতের যুগে সুদের যেসব লেনদেন হয়েছে, সবগুলোর সুদ ছেড়ে দেওয়া হলো। এখন প্রত্যেকেই মূলধন পাবে। সুদের অতিরিক্ত অংক পাবে না। তোমরা সুদ আদায় করে আর কারও উপর জুলুম করতে পারবে না এবঙ কেউ মূলধন পরিশোধ করতে অস্বীকার করে তোমাদের উপর জুলুম করতে পারবে না। সর্বপ্রথম যে সুদ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল আব্বাস ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের প্রাপ্য সুদ। এ সুদের বিরাট অংক অমুসলিমদের কাছে প্রাপ্য ছিল। কুরআন পাকের আলোচ্য আয়াতে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত এবং বকেয়া সুদ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে (আল্লাহকে ভয় করে) আদেশ দ্বারা আয়াতটি শুরু করা হয়েছে। এরপর আসল বিষয়ের নির্দেশ বর্ণনা করা হয়েছে। এ বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমেই কুরআন পাক সমগ্র বিশ্বের অন্য সকল সংবিধানের তুলনায় এক অনন্য স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী।

যখনই এরূপ কোনো আইন কুরআন পাকে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের পক্ষে পালন করা কঠিন মনে হয়, তখনই আগে-পরে আল্লাহর সামনে হাজিরা, হিসাব-নিকাশ এবং পরকালের শাস্তি অথবা সওয়াবের কথা উল্লেখ করে মুসলমানদের অন্তর ও মন-মানসকে তা পালন করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এর পর নির্দেশ শোনানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অতীত সুদের অংক ছেড়ে দেওয়া মানব-মনের পক্ষে কঠিন হতে পারত। তাই আগে বলে এর পর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, অর্থাৎ বকেয়া সুদ ছেড়ে দাও। আয়াতের শেষে বলা হয়েছে অর্থাৎ যদি তোমরা ঈমানাদর হয়ে থাকো। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর নির্দেশ মান্যকরা এবং বিরুদ্ধাচরণ না করাই ঈমানের পরিচায়ক। নির্দেশটি পালন কষ্টসাধ্য ছিল বলেই নির্দেশের পূর্বে এবং নির্দেশের পরে যুক্ত করা হয়েছে। এরপর পঞ্চম আয়াতে এ নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণকারীদেরকে কঠোর শাস্তির কথা শোনানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা যদি সুদ না ছাড়ো, তবে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। কুফর ছাড়া অন্য কোনো বৃহৎ গুনাহের কারণে কুরআন পাকে এত বড় শাস্তির কথা আর উচ্চারিত হয়নি। এ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে :

অর্থাৎ যদি তোমরা তাওবা করে ভবিষ্যতের জন্য বকেয়া সুদ ছেড়ে দিতে কৃতসংকল্প হও, তবে তোমরা আসল মূলধন ফেরত পেয়ে যাবে। মূলধনের অতিরিক্ত আদায় করে তোমরা কারও উপর জুলুম করতে পার না এবং কেউ মূলধন হ্রাস করে কিংবা পরিশোধে বিলম্ব করে তোমাদের উপরও জুলুম করতে পারবে না। আয়াতে আসল মূলধন দেওয়াকে তাওবার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যদি তোমরা তাওবা করো এবং ভবিষ্যতে সুদ ছেড়ে দিতে কৃতসংকল্প হও, তবেই তোমরা আসল মূলধন পাবে।

এ থেকে বাহ্যত বোঝা যায় যে, সুদ ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প করে তাওবা না করলে মূলধনও পাবে না। এ মাসআলার বিবরণ এই যে, যদি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও সুদকে হারামই মনে না করে, উপরন্তু আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক সুদ ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাওবা না করে, তবে এ ব্যক্তি ইসলাম থেকে খারিজ, ধর্মত্যাগী-মুরতাদ। মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগীর ধনসম্পদ তার মালিকানায় থাকে না। মুসলমান অবস্থায় সে যা উপার্জন করে, তা তার মুসলমান ওয়ারিশগণ পায়। আর কুফর অবস্থায় অর্থাৎ মুরতাদ হওয়ার পর যা উপার্জন করে তা বাইতুল মাল তথা সরকারী ধনাগারে জমা হয়। তাই সুদ ছেড়ে দেওয়ার জন্য তওবা না করা যদি হালাল মনে করার কারণে হয়, তবে আসল মূলধনও সে ফেরত পাবে না।

পক্ষান্তরে যদি হারাম মনে করেও কার্যত সুদ থেকে বিরত না হয় এবং দল গঠন করে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, তবে সে বিদ্রোহী। বিদ্রোহীরও সকল সহায়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বাইতুল মাল তথা সরকারী ধনাগারে আমানত হিসাবে জমা করা হয়। যখন সে তাওবা করে তখন আবার সহায়-সম্পত্তি প্রত্যর্পণ করা হয়। বস্তুত এ জাতীয় সূক্ষ্ম দিকগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করার জন্যই শর্তের আকারে বলা হয়েছে অর্থাৎ যদি তাওবা না করো, তবে তোমাদের মূলধনও বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। এরপর ষষ্ঠ আয়াতে সুদখোরীর মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিপরীতে পূত-পবিত্র চরিত্র এবং দরিদ্র ও নিঃস্বদের প্রতি কৃপামূলক ব্যবহার শিক্ষা দিয়ে বলা হয়েছে :

অর্থাৎ যদি তোমরা কতক যদি রিক্তহস্ত হয়, ঋণ পরিশোধে সক্ষম না হয়, তবে শরীয়তের নির্দেশ এই যে, তাকে স্বাচ্ছন্দ্যশীল হওয়া পর্যন্ত সময় দেওয়া বিধেয়। যদি তাকে ঋন থেকেই রেহাই দিয়ে দাও, তবে তা তোমার জন্য আরও উত্তম। সুদখোরদের অভ্যাস এই যে, খাতক নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধে সক্ষম না হলে সুদের অংক আসলের সাথে যোগ করে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের কারবার চালায় এবং সুদের হারও আগের চাইতে বাড়িয়ে দেয়। এখানে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারপতি আল্লাহ তাআলা আইন প্রণয়ন করে দিয়েছেন যে, কোনো খাতক বাস্তবিকই নিঃস্ব হলে এবং ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হলে তাকে অতিষ্ঠ করা জায়েয নয়; বরং তাকে সক্ষম হওয়া পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। সাথে সাথে এ ব্যাপারেও উৎসাহিত করেছেন যে, যদি এ গরীবকে ক্ষমা করে দাও, তবেতা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম। এখানে ক্ষমা করাকে কুরআন পাক সদকা শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেছে। এতে ইঙ্গিত আছে যে, এ ক্ষমা প্রদর্শন তোমাদের জন্য সদকা হয়ে যাবে এবং বিরাট সওয়াবের কারণ হবে। এছাড়া আরও বলেছেন : ক্ষমা করা তোমাদের জন্য উত্তম। অথচ বাহ্যত এতে তাদের ক্ষতি। কারণ , সুদ তো ছেড়েই দেওয়া হয়েছিল, এখন মূূলধনও গেল। কিন্তু কুরআন পাক একে উত্তম বলেছেন, এর কারণ দ্বিবিধ :

১. এটা যে উত্তম, তা এ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পর চোখের সামনে এসে যাবে। তখন এ সামান্য অর্থের বিনিময়ে জান্নাতের চিরস্থায়ী নেয়ামত অর্জিত হবে।

২. এতে সম্ভবত ইঙ্গিত রয়েছে যে, দুনিয়াতেও একাজের কল্যাণ প্রত্যক্ষ করা যাবে। অর্থাৎ তোমাদের ধনসম্পদে বরকত হবে। বরকতের স্বরূপ এই যে, অল্প ধনসম্পদ দ্বারা অধিক কাজ সাধিত হবে। এর জন্য ধনসম্পদের পরিমাণ ও সংখ্যা বেড়ে যাওয়া জরুরী নয়। চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা এই যে, খয়রাতকারীদের ধনসম্পদে অপরিসীম বরকত হয়। তাদের অল্প ধনসম্পদ দ্বারা এত অধিকতর কাজ সাধিত হয় যে, হারাম মালের অধিকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থকড়ি দ্বারা তত কাজ সাধিত হয় না। বরকতহীন ধনসম্পদের অবস্থা এই যে, যে উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয়, তা অর্জিত হয় না কিংবা উদ্দেশ্যে নয়, এমন কাজেই তা অধিক ব্যয় হয়ে যায়। যেমন : ঔষধপত্র , চিকিৎসা এবং ডাক্তারের দর্শনী ইত্যাদি। এসব কাজে ধনীদের বিস্ত অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। গরীবদের এগুলোর দরকার খুব কমই হয়ে থাকে। প্রথমত আল্লাহ তাআলা তাদের সুস্থতার নেয়ামত দান করেন। ফলে চিকিৎসায় অর্থ ব্যয় করার বড় একটা প্রয়োজনই তাদের দেখা দেয় না।

দ্বিতীয়ত, অসুস্থ হলেও মামূলী খরচেই তাদের জন্য সুস্থতা অর্জিত হয়ে যায়। এ হিসাবে নিঃস্ব খাতককে কর্জ মাফ করে দেওয়া বাহ্যত অলাভজনক দেখা গেলেও কুরআনের এ শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি উপকারী ও লাভজনক কাজ। নিঃস্ব খাতকের সাথে ন¤্রতার শিক্ষাসম্বলিত সহীহ হাদীসসমূহের কতিপয় বাক্য শুনুন : তাবারানীর এক হাদিসে আছে- যেদিন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ছায়া ছাড়া মাথা গুঁজবার কোনো ছায়া পাবে না সেদিন যে ব্যক্তি স্বীয় মস্তকের উপর আল্লাহর রহমতের ছায়া কামনা করে,তার উচিৎ নিঃস্ব খাতকের সাথে ন¤্র ব্যবহার করা কিংবা তাকে মাফ করে দেওয়া। সহীহ মুসলিমেও এ বিষয়ের হাদীস রয়েছে। মুসনাদে আহমাদের এক হাদীসে আছে- যে ব্যক্তি কোনো নিঃস্ব দেনাদারকে সময় দেবে, সে প্রত্যহ দেনা পরিমাণ অর্থ সদকা করার সওয়াব পাবে। দেনার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বে সময় দেওয়ার জন্য হবে এ হিসাব। যখন দেনার মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যায় এবং দেনাদার দেনা পরিশোধ করতে সক্ষম না হয়, তখন সময় দিলেন প্রত্যহ দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ সদকা করার সওয়াব পাবে। এক হাদীস আছে- যে ব্যক্তি চায় যে তার দুআ কবুল হোক কিংবা বিপদ দূর হোক, তার উচিৎ নিঃস্ব দেনাদারকে সময় দেওয়া। এরপর শেষ আয়াতে পুনরায় কেয়ামতের ভয়, হাশরে হিসাব-নিকাশ এবং সওয়াব ও আযাব উল্লেখ করে সুদ সংক্রান্ত এ আয়াত সমাপ্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে :

ঐ দিনকে ভয় করো, যেদিন তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে হাজিরার জন্য আনীত হবে। অতঃপর প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের পুরোপুরি প্রতিদান পাবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি) বলেন, অবতরণের দিক দিয়ে এটি সর্বশেষ আয়াত। এরপর কোনো আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। এর একত্রিশ দিন পর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পান। কোনো কোনো রেওয়াতে নয় দিন পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওফাতের কথা বর্ণিত আছে। এ পর্যন্ত সুদের বিধি-বিধান সম্পর্কিত সূরা বাকারার আয়াতসমূহের তাফসীর বর্ণিত হলো। সুদের অবৈধতা ও নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কুরআন পাকে সূরা বাকারায় সাত আয়াত, সূরা আল- ইমরানে এক আয়াত এবং সূরা নিসায় দুটি আয়াত বর্ণিত হয়েছে। সূরা রুমেও একটি আয়াত আছে, যার তাফসীরে মতভেদ রয়েছে। এভাবে কুরআন পাকের দশটি আয়াতে সুদের বিধি-বিধান উল্লেখিত হয়েছে। সুদের পূর্ণ স্বরূপ বর্ণনা করার পূর্বে সূরা আলে-ইমরান, সূরা নিসা এবং সূরা রুমে উল্লেখিত অবশিষ্ট আয়াতসমূহের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যাও এ স্থলে করে দেওয়া সমীচীন মনে হয়। তাতে সবগুলো আয়াতই একত্র হওয়ার ফলে সুদের স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে।