প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি রেনি গ্যাননের আস্থা ছিলনা। তাই তিনি সত্যকে খুঁজতে থাকেন। অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি। তার সংস্পর্শে এসে বহু ইউরোপীয় ও আমেরিকান পণ্ডিত মুসলমান হন। -ওয়াহিদ
রেনি গ্যাননের বর্তমান নাম শেখ আব্দুল ওয়াহিদ ইয়াহিয়া। ফ্রান্সের একজন নামকরা পণ্ডিত ব্যক্তি তিনি। রেনি একাধারে প্রখ্যাত লেখক এবং দার্শনিক। ফ্রান্সের এক ধনী ক্যাথলিক পরিবারে ১৮৮৩ সালের ১৫ নভেম্বর তার জন্ম। তার পিতা খুব নামকরা একজন প্রকৌশলী ছিলেন। বলতে গেলে রেনি সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই রেনি অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এবং সব সময় তিনি ডিসটিংশন নিয়ে পাশ করেন। অত্যন্ত কুতিত্বের সাথে রেনি স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি সত্যের অনুসন্ধান চালাতে থাকেন। কেননা, তিনি তার পূর্ব পুরুষদের ধর্মের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি খ্রিস্টানদের তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসনে ছিলেন বীতশ্রদ্ধ। ধর্ম সম্পর্কে তার বিশেষ কোন জ্ঞানের গভীরতা ছিল না। তবে তার জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। তাই তিনি নামকরা চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করার চেষ্টা করতেন। তারপরও তার মনের প্রশান্তি হয়নি। তাই তিনি তার মানসিক অশান্তি দূর করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন। তখনও তার লেখাপড়া শেষ হয়নি। এ অবস্থা ১৯০৯ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। ইতোমধ্যে দুজন নও-মুসলিমের সাথে তার সাক্ষাত ঘটে। এ দুজন নও-মুসলিম শুধু খ্যাতনামাই ছিলেন না বরং তারা নির্ভরশীল ব্যক্তিত্বও ছিলেন। এর একজন হচ্ছেন শেখ আব্দুল হক। তিনিও ফ্রান্সেরই লোক। হক একজন পণ্ডিত ব্যক্তি এবং তিনি আল তারিক নামের একটি পত্রিকায় সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যজনের নাম ছিল আব্দুল হাদি। তিনি ফিনল্যান্ডের অধিবাসী। হক খ্রিস্টান নাম ছিল আইভন গোষ্টার। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আরবী শিক্ষা লাভ করেন এবং তার উপর পূর্ণ দখল অর্জন করেন। তিনি মিশর থেকে প্রকাশিত আনসারী পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন।
১৯০৯ সালে রেনি গ্যানন আল মারেফাত নামক একটি ম্যাগজিন চালু করেন। এতে পণ্ডিত ব্যক্তিদের লেখা প্রকাশ হতে থাকে। পত্রিকাটিতে বিভিন্ন ধর্মের উপর তুলনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকাটি প্রায় চার বছর ধরে চালু ছিল। ১৯১২ সালে রেনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আব্দুল ওয়াহিদ ইয়াহিয়া নাম ধরাণ করেন। ইসলামে আসার পেছনে কাজ করেছিল তার অবিশ্রান্ত গবেষণা ও সত্যকে জানার আগ্রহ। এক্ষেত্রে শেখ আব্দুল হক এবং শেখ হাদীরও অবদান ছিল অফুরন্ত। এছাড়াও তিনি সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট হন শেখ আবদুর রহমান ইলিয়াস আল কবীর আল আমিন আমি মালিকী আল মাগরিবীর দ্বারা। তারপরই ািতনি ইসলাম গ্রহণ করেন। শেখ আবদুর রহমান ছিলেন মিশরের গ্র্যাণ্ড মুফতি এবং একজন খ্যাতনামা ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদ। শেখ আবদুল হাদী ছিলেন শেখ আবদুর রহমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
সে সময় প্যারিসের একটি বিখ্যাত পাবলিশিং হাউস রেনিকে চাকুরীর অফার দেয়। তারা তাকে কায়রো গিয়ে বিভিন্ন সূফীদের মূল্যবান লেখা অনুবাদ করে তা ছাপানোর দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৯৩০ সালের ফেব্র“য়ারীতে রেনি গ্যানন কায়রো ছেড়ে আসার আগেই তার পিতা, মাতা এবং স্ত্রী মারা যান। তাই তিনি খুবই মর্মবেদনা নিয়ে কায়রো ছেড়ে আসেন। ১৯৩৭ সালে রেনি কারিমা বিনতে আবদুর রহমানকে বিয়ে করেন। তিনি তার বাকী জীবন ইসলাম ও মুসলমাদের জন্য উৎসর্গ করেন। উল্লেখ্য যে, রেনি গ্যাননের লেখা ও গবেষণা পড়ে এবং তার ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসে বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার মাধ্যমে যে সব পণ্ডিত ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তাদের একজন হচ্ছেন শেখ ইসা উদ্দিন। তিনি দর্শনের একজন নামকরা প্রফেসর। বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক গবেষণামূলক লেখায় তার খুব নাম ছিল। তিনি বহুগ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- Understanding Islam, Dimension of Islam, In the tracks of Buddhism, Spiritual perspective of the self genosis, Divine wisdom, stations of wisdom, In the face of Absolute Survey of Metaphysics and Esoterism, To have a center, christianity and Islam.
অপর এক নও-মুসলিম হচ্ছেন আবু বকর সিরাজ উদ্দিন। তার পূর্ব নাম মার্টিন লিংস। তিনি রেনি গ্যাননের অনুপ্রেরণায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মার্টিন ইংরেজী ও আরবীতে ছিলেন সমান পারদর্শী। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন না, বরং একজন বড় মাপের কবি ও অনুবাদকও ছিলেন।
তিতাস বুচারদার হচ্ছেন আরেকজন পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনিও রেনি গ্যাননের অনুপ্রেরণা পেয়ে ইসলাম কবুল করেন। জার্মান, ইংরেজী, ফ্রান্স, সুইস, আরবী এবং পারসিয়ান ভাষায় তিনি ছিলেন খুবই পারদর্শী। তার লেখা অনেক বই রয়েছে। এগুলো হলো- Marokko, An introduction to sufi Doctrine, Sacred Art in East and West, Moorish culture in Spain, Art of Islam.
এ ছাড়াও আর বহু পণ্ডিত ব্যক্তি, শিক্ষাবিদ ও গুণীজন রেনি গ্যাননের মাধ্যমে ইসলামের পতাকাতলে এসে জড়ো হয়েছেন। তাদের অনেকেই একন ইউরোপ ও আমেরিকায় ইসলামের প্রচার প্রপাগাণ্ড ও ইসালাম প্রসারের কাজে ব্যাপৃত হয়েছেন। রেনি গ্যানন ১৯৫১ সালের ৭ জানুয়ারী ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যু সারা দুনিয়ার মুসলমালদের মনে দুঃখের ছায়াপাত করে যায়।
