প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
অতএব (এসব অনুগ্রহের জন্যে) তোমরা আমাকে স্মরণ কর, (তাহলে) আমিও তোমাদের স্মরণ করব, তোমরা আমার কৃতজ্ঞতা আদায় কর এবং কখনো তোমরা আমার অকৃতজ্ঞ হয়ো না। (সূরা বাকারা : আয়াত -১৫২)
১
কখনোই সময় নষ্ট কর না
নবী করী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে আয়েশা!, যদি তুমি কোনো পাপ কর তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার কাছে অনুতপ্ত হও, যদি কোনো ব্যক্তি তার পাপ সম্পর্কে অবগত হয় এবং অনুতপ্ত হয়, আল্লাহ তায়ালা তার তওবাকে কবুল করবেন।
মনে কর, তুমি এ পর্যন্ত যত টাকা চেয়েছ সব টাকার মালিক হয়েছে। এবং তুমি তোমার সকল স্বপ্ন এবং আশা পূরণ করেছ, অতঃপর সব হারিয়ে ফেলেছ। তুমি কাঁদ এবং অভিযোগ কর এবং অনুতপ্ত হও। তুমি যা হারিয়েছ তার দুঃখে তুমি ব্যথিত হয়ে সময় নষ্ট কর না। তুমি ছাড়া তোমার জীবন থেকে যা কিছি চলে গিয়েছে তাতে তোমার কী হয়েছে, কখনো ভেবেছ এটা?
“তোমার জীবন একটি মহামূল্যবান খনি। যার মূল্য পার্থিক কোনো বিষয় দিতে পারে না। তোমার জীবন থেকে চলে যাওয়া প্রতিটি মিনিট আর কখনো ফিরে আসবে না। এই মিনিটগুলো এই পৃথিবীতে তোমার এক একটি সম্পদ। তুমি চাইলে যা দ্বারা জান্নাতের আনন্দ ক্রয় করতে পার। কিভাবে তুমি অনুশোচনাহীন-উদাসীনভাবে জীবনের এই মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করবে?
সুখী হওয়ার একটি পথ আছে, তোমার অধিনস্থ সকল কিছুর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়া বন্ধ কর।
তাই আল্লাহ তায়ালা তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন (সূরা বাকারা : আয়াত -১৩৭)
২
টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না
এক ব্যক্তি ছিল, যে তার যৌবন এবং স্বাস্থ্য ব্যয় করল সম্পদ আহরণ করার জন্য। অতঃপর সে তার জীবনে সব সম্পদ সুখ কিনতে ব্যয় করল। কিন্তু সব কিছু তাকে দুঃখ জর্জরিত করল। অথবা সে তার যৌবন ফিরে পেতে চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে পৌঢ়ত্ব তাকে গ্রাস করে ফেলল এবং সে তার স্বাস্থ্য ফিরে পেতে চেষ্টা করল। কিন্তু দূরারোগ্য ব্যধি তাকে আক্রমণ করে বসল।
একজন বিখ্যাত অভিনেতা বলেছিল, টাকাই ছিল তার একমাত্র চাওয়া-পাওয়ার।
সে ভেবেছিল টাকার দ্বারাই সে এই পৃথিবীতে শত বছর ধরে একজন সুখী মানুষ হতে সক্ষম হবে! সে আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, যদি তার টাকা থাকে সে তার সব ইচ্ছা পূরণ করতে সক্ষম হবে এবং তার আকাঙ্খিত সবকিছুই তার হাতের মুঠোয় এসে পড়বে। বিশ বছর পর আল্লাহ তাকে তার কাক্সিক্ষত টাকার মালিক করলেন। কিন্তু তার স্বাস্থ্য, যৌবন এবং স্বপ্ন সবকিছুই কেড়ে নিলেন। এটা খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল যে, সে চিৎকার করে বলত, হায়! আমি আল্লাহর কাছে আর টাকা চাই না, আমি আল্লাহর কাছে আমার জীবন অতীত-একশত বছর চাই তা যদি দারিদ্রমণ্ডিতও হয়, রান্না করা মটরশুটি খেয়ে হলেও, গাড়ি ভাড়া ছাড়া হেটে হলেও। এই অভিনেতা স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুস্বাস্থ্যের মূল্য জানতেন না এবং সে এটা বুঝতে পারেনি যে, টাকা সবকিছু কিনতে পারে না। মিশরের বিখ্যাত অভিনেতা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে এটা উপলব্ধি করতে পারেননি যে, জীবনে শেষ হয়ে যাওয়া একটি দিনও সে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
তোমার জীবনের একটি সময়ও ঝগড়া করে কাটানো উচিৎ নয়।
হে ঈমানদার ব্যক্তিরা! তোমরা সবর ও নামাযের
মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। (সূরা বাকারা : আয়াত -৪৫)
৩
তাড়াহুড়া এবং বেপরোয়া হওয়া দুঃখের কারণ
ধৈর্য হলো ধারালো ছুড়ির মতো যা অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা পরাজিত করতে পারে। বিচক্ষণতা অর্থ স্থির হওয়া, তাড়াহুড়া নয়। যৌক্তিক চিন্তা এবং জ্ঞান থেকে পদক্ষেপ নেয়া। এই দুটি গুণ দুঃশ্চিন্তাকে দূরীভূত করতে পারে; যার মধ্যে এই দুটি গুণের কমতি থাকবে সে অনেক ভালো কিছু থেকে দূরে চলে যাবে এবং অত্যাধিক দুঃশ্চিন্তায় পতিত হবে। একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি অনেক খারাপ কিছুকে দূরে রাখতে পারে এবং বোকা তার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং খারাপী বৃদ্ধি হতে দেয় এবং যা মনের গভীরে দুঃশ্চিন্তা বৃদ্ধি হওয়ার কারণ। একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি মাঝে মাঝে পরিতাপ অনুভব করেন অথবা এমন কিছু ধারণা করেন যার পরিণাম অনাকাক্সিক্ষত। কিন্তু একজন বোকা এবং অস্থির ব্যক্তি দুঃশ্চিন্তা বা উদ্বেগ এবং খারাপ পরিণতির ব্যাপারে কোনো অনুভূতি নেই। এমননিভাবে যদি কোনো ব্যক্তি নিজের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি দয়ালু হয় তাহলে সে সফলকাম হবে এবং শান্ত হওয়া অভ্যন্ত হবেন এবং মনের শান্তি খুঁজে পাবেন। আমাদের ইসলাম ধর্ম উদার প্রকৃতি, ধৈর্যশীল এবং আত্মসংযমী হতে উৎসাহ দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো কিছু সুন্দর করার মতো দয়া আর নেই এবং কোনো কিছু কুৎসিত করার মতে অপূর্ণতা আর নেই।
আমরা আমাদের সুখী সময় অর্থহীন কাজে নষ্ট করি
অবশ্যই কিয়ামত আসবে, তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই, যারা কবরে (শুয়ে) আছে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তাদের পুনরুত্থিত করবেন। (সূরা হাজ্জ : আয়াত – ৭৮)
৪
সম্পদ জমানোর খেলার কোনো শেষ নেই
বিভারবুক বলেন, আমি অনেক সম্পদ অর্জন করেছিলাম, কিন্তু আমি আমার বাস্তব জীবনে অভিজ্ঞতা দ্বারা বুঝলাম যে, সম্পদ জমানোর খেলার প্রতি গুরুত্ব দেয়া খুবই বিপদজনক, যার পরিণতি সুখকর হয় না। এটা জীবন এবং সুখকে ধ্বংস করে। যা আমার জীবনে ঘটেছিল আর আমি আমার পেশা পরিবর্তন করে ফেলি এবং একটি চাকুরীর সন্ধান করি। আমি প্রকাশনার কাজ পছন্দ করতাম, সেখানে সাধারণত অনেক সম্পদ নেই। কিন্তু আমি আমার সুখ-সম্পদ খুঁজে পাই এবং দেশ ও জাতির সেবা করি। আমি মানুষকে উপদেশ দেই যারা নিজেদের জন্য যথেষ্ট সম্পদ অর্জন করেছে, তারা টাকার খেলা বন্ধ করুক এবং দ্রুত এর পরিসমাপ্তি করুক। যাতে সে যা উপার্জন করেছে তা উপভোগ করতে পারে এবং তার পছন্দমত পরিকল্পনা অনুযায়ী কল্যাণময় কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, কেননা সে সমাজের সেবা এবং সময়কে উপভোগ করে।
এক ব্যক্তি অনেক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তার একটি ছোট পরিকল্পনা ছিল যে, তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু করবে, তাই সে তার ওয়ারিসদের জন্যে প্রচুর সম্পদ রেখে মারা গেল। কেননা, সে জানে; সে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ায় এই অল্প সম্পদ কিছু না। অনেক সময় সম্পদ কখনো দোয়ার চেয়ে অভিশাপ হয়ে যায়। সুখের চেয়ে কষ্ট হয়। যখন মানুষ সহজভাবে চাকচিক্যের সাথে তাদের শরীরের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়। তাদের মন কুমন্ত্রণা এবং অলস কর্মকাণ্ডে পূর্ণ হয়ে যায়। এবং তাদের যৌবন মৃত্যুর আগেই বিলীন হয়ে যায়।
শক্ত বিশ্বাস রাখ যে, পৃথিবীতে অসম্ভব বলতে কিছু নেই
অপরদিকে আমি আগুনকে বললাম, হে আগুন!
তুমি ইবরাহীমের জন্যে শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও। (সূরা আম্বিয়া : আয়াত -৬৯)
৫
অমর হওয়ার চিন্তা অলসতা থেকে তৈরি হয়
মানুষ কর্মহীন অলস থাকলে তার মনের মধ্যে অমর হওয়ার চিন্তা আসে এবং মৃত্যুর জীবাণু তাকে আক্রান্ত করে এবং অচেতনতা তৈরি হয়। কিন্তু যদি জীবিকার আকাক্সক্ষা থাকে তাহলে কর্মঠ হয়ে যায়, তখন অলসতা মৃত্যুবরণ করে। যদি কারো এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতে আরো সুন্দর জীবন যাপনের প্রস্তুতি নিতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে এই অলস লোকদের জন্য কপর্দকহীনতাই উত্তম। সে জীবনের সব হারিয়ে সর্বশ্রান্ত হয়ে যাবে জীবনের কোনো কুল কিনার খুঁজে পাবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেন যে, অনেক মানুষ আছে সম্পদ এবং অবসর সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে অচেতন, যা তাদের জীবনে অনেক কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পৃথিবীতে দুটি কল্যাণ রয়েছে যেই বেশিরভাগ মানুষই উদাসীন, সুস্বাস্থ্য এবং অবসর সময়।
অনেক জীবন্ত মানুষ আছে, উদ্দেশ্যহীনতা যাদের জীবনকে পরিচালিত করে, তাদের কোনো পেশা নেই। কোনো দায়িত্বই তাদের জীবনের সর্বোচ্চ চেষ্টা কাজে লাগিয়ে সফল হওয়াকে অনুরক্ত করে না।
মানুষকে কি কোনো কিছু সৃষ্টি করার জন্য তৈরি করা হয়নি? মোটেই না, আল্লাহ তায়ালা বলেন –
অর্থ : তোমরা কি (সত্যি সত্যিই) এটা ধরে নিয়েছ, আমি তোমাদের এমনিই অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের (কখনোই) আমার কাছে সমবেত করা হবে না। (না, তা কখনো নয়) মহিমান্বিত আল্লাহ তায়ালা তিনিই সব কিছুর যথার্থ মালিক, তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, সম্মানিত আরশের একক অধিপতিও তিনি।
(সূরা মুমিন : আয়াত -১১৫-১১৬)
জীবনকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের জন্য তৈরি কর, তা হলো জান্নাত প্রাপ্তির। পৃথিবীর সবকিছুই এর মধ্যে নিহিত। মানুষের বেঁচে থাকতেই এই উদ্দেশ্য অনুধাবন করা উচিত। কিন্তু সে যদি তার সংকীর্ণ ও হীন আকাঙ্ক্ষার ছায়াতলে বাস করে এবং নিজেকে সীমাবদ্ধতার চাদরে ঢেকে রাখে তাহলে এটাই হবে তার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত।
সর্বদা সফলতার ছবি মনে রাখ এবং এটাকে মনের মধ্যে জীবিত রাখ।
