প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
৩৬. অমুসলিম মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ
হযরত আসমা রা. বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তখন আমার কাফের মা মক্কায় আমর বাড়ীতে আসতো।
ফায়দা : ইসলামের প্রথম যুগে কাফেরদের পক্ষ থেমে মুসলমানদের উপর যেসব অত্যাচার ও নির্যাতন হয়েছিল তা বর্ণনাতীত। ইতিহাসের বইপত্রে এসব ঘটনা ভুরি ভুরি রয়েছে। তখন মুসলামানরা মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিল। সেখানে উপস্থিতির পরও মুশরিকদের পক্ষ সকল প্রকার যুদ্ধ ও কষ্ট- যাতনার ধারা অব্যাহত ছিল। একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণের সাথে উমরা (ছোট হজ্জ) আদায় করার জন্য মক্কায় আগমন করেন। তখন কাফিররা মক্কা প্রবেশে বাধা দেয়। ফলে অগত্যা বাহির থেকে তারা ফেরে যেতে বাধ্য হন। তবে তৎপূর্ব ঐসময় পরস্পরের মধ্যে কয়েক বছরব্যাপী একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তিপত্রে শর্ত সাপেক্ষ কয়েক বছর পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ঘটনাটি প্রসিদ্ধ। আসমা (র) উল্লিখিত হাদীসে এই চুক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, যখন কুরাইশদের সাথে চুক্তি চলছিল তখন আবু বকর (রা) এর স্ত্রী, আসমার মা মুসলমান ছিল না। সে স্বীয় কন্যা আসমার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে উপস্থিত হয়। যেহেতু সে মুশরিক মহিলা ছিল সেহেতু আসমা দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে ছিল যে, তার সাথে সদাচরণ (সাহায্য) করবে কি না? তাই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জিজ্ঞাসা করলে তার প্রতি সদাচরণ ও সাহায্য করার নির্দেশ দেন।
ইমাম খাত্তাবী (রহ.) বলেন, এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, কাফের আত্মীয়দের প্রতি দান-অনুদান নিজ সম্পদ থেকে প্রদান করা জরুরী, যেমন মুসলমান আত্মীয়দের সাথে জরুরী।
দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবঙ তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন, এ আয়াতে ঐসব কাফির উদ্দেশ্য যারা যিম্মী (কর দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী) বা যারা আপোষকারী অর্থাৎ তাদের সাথে মহানুভবতা ও সদাচরণ প্রকাশ করা বৈধ। এটাকেই ন্যায়বিচার ও ন্যায়সঙ্গত সদাচরণ বলা হয়েছে। অতএব এখানে ইনসাফ দ্বারা বেশেষ ইনসাফ উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ তাদের যিম্মী হওয়া বা আপোষের কারণে ইনসাফের দাবী এটাই যে, তাদের প্রতি সাহায্য ও সদাচরণে বিরত না থাকা। অন্যথায় সাধারণ ইনসাফ তো প্রত্যেক কাফির এমনকি পশুর সাথেও করা ওয়াজিব।
আসমা (রা.) এর মা (তার নাম কীলাহ বা কতীলা বিনতে আব্দুলউজ্জা) ইসলাম কবুল না করার কারণে আবু বকর রা. তাকে তালাক দিয়ে দেন। অপর বর্ণনা মতে সে কিছু ঘি. পনির ইত্যাদি হাদীয়াস্বরূপ নিয়ে আসমার নিকট যায়। কিন্তু আসমা তাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেননি। বরং সৎ বোন আয়িশার নিকট মাসায়াল জিজ্ঞেস করার জন্য লোক প্রেরণ করেন। যেন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে থেকে জেনে নিয়ে তাকে অবহিত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (তার মাকে) ঘরে) বসার অনুমতি দেন। উক্ত আয়াতে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়। ঐসব মনীষীদের দীনের মজবুতি ও ঈর্ষণীয় প্রেরণা ছিল যে, মা গৃহে এসেছে কেবল মেয়ের সাথে সাক্ষাত করতে। অথচ তখন সাহায্য করার সময় আসেনি। কিন্তু আসমা রা. বিষয়টি তদন্ত করার জন্য লোক প্রেরণ করেন যে, মুশরিক মাকে গৃহের মধ্যে প্রবেশ করার অনুমতি ইসলামে আছে কি না? অন্যান্য বর্ণনায় উল্লেখ আছে, সাহাবীগণ বিধর্মীদের দান-সদকা করাকে পছন্দ করতেন না। এ কারণে
আল্লাহ নিচের আয়াত নাযিল করেন :
তাদের সৎপথ গ্রহণ করাণোর দায়িত্ব আপনার নয়; বরং আল্লাহর যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। যে ধনসম্পদ তোমরা দান কর তা তোমাদের নিজেদের জন্য। তোমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে ব্যয় করে থাকে।
৩৭. মেহমানদারীর অহী আসায় কাফের (অগ্নিপূজক) মুসলমান হয়ে যায়
ইমাম গাযালী (রহ.) লিখেছেন একদা জনৈক অগ্নিপূজক ইবরাহীম (আ.) এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার মেহমান হওয়ার আবেদন জানায়। তিনি বলেন, তুমি যদি মুসলমান হও তবে আমি তোমাকে মেহমান হিসেবে কবুল করব। একথা শুনে অগ্নিপূজক চলে যায়। তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী আসে, হে ইবরাহীম ধর্ম পরিবর্তন না করায় তুমি তার এক বেলা খানা দিতে পারলে না। অথচ আমি তাকে ৭০ বছর যাবত কুফুরী অবস্থার মধ্যে খানা দিয়ে যাচ্ছি। তাকে একবেলা খানা খাওয়ালে এমন কী ক্ষতি হত। তখন ইবরাহীম আ: দ্রুত ঐ ব্যক্তির সন্ধানে বের হন এবং তাকে পেয়ে সাথে করে নিয়ে আসেন। অতঃপর তাকে খানা খাওয়ান। অগ্নিপূজক জিজ্ঞাসা করে কী ব্যাপার আপনি নিজেই আমার সন্ধানে বের হলেন? তখন ইবরাহীম আ. তার কাছে ওহী নাযিলের ঘটনা বর্ণনা করেন। একথা শুনে অগ্নিপূজক বলল, আল্লাহ আমার প্রতি এত সুন্দর আচরণ করলেন? আমাকে ইসলামের দীক্ষাদান করুন। এ বলে সে মুসলমান হয়ে যায়।
