প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
৮২। কোন কোন নামের ব্যতিক্রম
কোন কোন লোকের এমন নাম খ্যাত হয়ে যায়, যা আসলে মন্দ, কিন্তু এই নাম ব্যতীত কেউ তাকে চেনে না। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হেয় লাঞ্ছিত করার ইচ্ছা না থাকলে তাকে এই নামে ডাকা জায়েয। এ ব্যাপারে আলিমগণ একমত। যেমন, কোন কোন মুহাদ্দিসের নামের সাথে আহদাব, আ’রাজ ইত্যাদি খ্যাত আছে। খোদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক অপেক্ষাকৃত লম্বা হাতবিশিষ্ট সাহাবীকে যুল য়াদাইন নামে পরিচিত করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়ঃ হাদীসের সনদে কতক নামের সাথে কিছু পদবী যুক্ত হয়; যেমন মারওয়ান আখদার, সুলায়মান আ’মাশ, হামীদুত তবিল ইত্যাদি। এসব পদবী সহকারে নাম উল্লেখ করা যায়েয কি না? তিনি বললেনঃ দোষ বর্ণনা করার ইচ্ছা না থাকলে এবং পরিচয় পূর্ণ করার ইচ্ছা থাকলে জায়েয। (কুরতুবী)
৮৩। ভাল নামে ডাকা সুন্নত
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ মুমিনের হক অপর মুমিনের উপর এই যে, তাকে অধিক পছন্দনীয় নাম ও পদবী সহকারে ডাকবে। একারণেই আরব দেশে ডাকনামের প্রচলন ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তা পছন্দ করেছিলেন। তিনি বিশেষ বিশেষ সাহাবীকে কিছু পদবী দিয়েছিলেন। হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রা.) কে আতীক, হযরত ওমর (রা.) কে ফারুক, হযরত হামযা (রা.) কে আসাদুল্লাহ এবং খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.) কে সাইফুল্লাহ পদবী দান করেছিলেন।
যারা উচ্চমর্যাদা ও আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন কসম না খায় যে, তারা আত্মীয়-স্বজনকে, অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না। তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়। (নূর, আয়াত-২২)
আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দিন এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরও। এটা তাদের জন্য উত্তম, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। তারাই সফলকাম। (রূম, আয়াত-৩৮)
আনুষঙ্গিক জ্ঞাতব্য বিষয় : পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছিল যে, রিযিকের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। তিনি যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা হ্রাস করে দেন। এ থেকে জানা গেল যে, কেউ যদি আল্লাহ প্রদত্ত রিযিককে তার যথার্থ খাতে ব্যয় করে, তবে এর কারণে রিযিক হ্রাস পায় না। পক্ষান্তরে কেউ যদি কৃপণতা করে এবং নিজের ধন-সম্পদ সংরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে, তবে এর ফলে ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায় না।
এই বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে আলোচ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এবং হাসান বসরী (রহ.) এর মতে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ যে ধন-সম্পদ দান করেছেন, তাতে কৃপণতা করো না; বরং তার হৃষ্টচিত্তে যথার্থ খাতে ব্যয় কর। এতে তোমার ধন-সম্পদ হ্রাস পাবে না। এর সাথে সাথে আয়াতে ধন-সম্পদের কয়েকটি খাতও বর্ণনা করা হয়েছে। (এক) আত্মীয়-স্বজন, (দুই) মিসকীন, (তিন) মুসাফির। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ তাদেরকে দান কর এবং তাদের জন্য ব্যয় কর। সাথে সাথে আরও বলা হয়েছে যে, এটা তাদের প্রাপ্য, যা আল্লাহ তোমাদের ধন-সম্পদ শামিল করে দিয়েছেন। কাজেই দান করার সময় তাদের প্রতি কোন অনুগ্রহ করছ বলে বড়াই করো না। কেননা, প্রাপকের প্রাপ্য পরিশোধ করা ইনসাফের দাবি; কোন অনুগ্রহ নয়।
যাবিল কুরবা বলে বাহ্যতঃ সাধারণ আত্মীয় বোঝানো হয়েছে, মাহরাম হোক বা না হোক। হক বলেও ওয়াজিব যেমন পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি ও অন্যান্য আত্মীয়ের হক কিংবা শুধু অনুগ্রহমূলক হক সবই বোঝানো হয়েছে। অনুগ্রহমূলক দান অন্যদের করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, আত্মীয়-স্বজনকে করলে তার চাইতেও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এমনকি, তফসীরবিদ মুজাহিদ বলেনঃ যে ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন গরীব, সে তাদের বাদ দিয়ে অন্যদের দান করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় নয়। কেবল আর্থিক সাহায্যই আত্মীয়-স্বজনের প্রাপ্য নয়; বরং তাদের দেখাশোনা, দৈহিক সেবা এবং তা সম্ভব না হলে কমপক্ষে মৌখিক সহানুভূতি ও সান্ত্বনাদানও তাদের প্রাপ্য। হযরত হাসান বলেন, যার আর্থিক সচ্ছলতা আছে, তার জন্য আত্মীয়-স্বজনের প্রাপ্য হল আর্থিক সাহায্য করা। পক্ষান্তরে যা সচ্ছলতা নেই তার কাছে দৈহিক সেবা ও মৌখিক সহানুভূতি প্রাপ্য। (ইমাম কুরতুবী)
আত্মীয়-স্বজনের পরে মিসকীন ও মুসাফিরের প্রাপ্য বর্ণনা করা হয়েছে। এটাও ব্যাপক অর্থে তথা সচ্ছলতা থাকতে আর্থিক সাহায্য, নতুবা সদ্ব্যবহার।
‘এই সুসংবাদ আল্লাহ দেন তার বান্দাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। বলুন আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে আত্মীয়তার সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না। যে উত্তম কাজ করে আমি তার জন্য তাতে কল্যাণ বর্ধিত করি। আল্লাহ ক্ষমাশীল গুণগ্রাহী।’ (সূরা, আয়াত-২৩)
‘ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত ঃ তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন।’ (মুহাম্মাদ, আয়াত-২২, ২৩)
