প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ডাক নাম আবু দারদা। কন্যা দারদার নাম অনুসারে এ নাম এবং ইতিহাসে এ নামেই খ্যাত। আসল নামের ব্যাপারে মত পার্থক্য আছে। যথাঃ ’আমির ও ’উয়াইমির। আল-আসমা’ঈর মতে, ’আমির, তবে লোক ’উয়ামির বলতো। এর এটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। কেউ বলেছেন, ’উয়াইমির তার লকব বা উপাধি। পিতার নামের ব্যাপরেও বিস্তর মত পার্থক্য রাছে। যথাঃ মালিক, ’আমির, সা’লাবা, আবদুল্লাহ, আয়িদ ইত্যাদি। মায়ের নাম মুহাব্বাত বা ওয়াকিদাহ। (তাহজীব আত-তাহজীব-৮/৮/১৫৬; আল-ইসাবা-২/৪৫; উসুদুল গাবা-৫/২৮৫; আল-ইসতী’য়াবঃ পার্শ্ব টীকা: আল-ইসাবা-৪/৫৯) মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের ‘বালহারিস’ শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমবয়সী বা কিছুদিনের ছোট। (দানিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা (উর্দু)-১/৮০০)
তিনি ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, অশ্বারোহী ও বিচারক। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন মদীনার একজন সফল ব্যবসায়ী। তারপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করেন। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলতেনঃ ‘রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে আমি ছিলাম ব্যবসায়ী। তারপর যখন ইসলাম এলো, আমি আমার ব্যবসা ও ইবাদাতের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা সমন্বিত হলো না। সুতরাং আমি ব্যবসা ছেড়ে ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করলাম।’ (আজ-জাহাবীঃ তারীখুল ইসলাম-২/১০৭; আল-আ’লাম-৫/২৮১; হায়াতুস সাহাবা-২/২৯৬) শেষে ব্যবসার প্রতি দারুণ বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন। অনেক সময় বলতেন, এখন যদি আমার মসজিদে নববীর সামনে একটি দোকান থাকে, প্রতিদিন তাতে ৪০ দীনার করে লাভ হয় এবং তা সাদাকা করে দিই, আর এ জন্য নামাযের জামা’য়াতও ফাওত না হয়-তবুও এমন ব্যবসা এখন আমার পছন্দ নয়। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেনঃ শেষ বিচার দিনের কঠিন হিসাবের ভয়। (তাজকিরাতুল হুফফার-১/২৫; হায়াতুস সাহাবা-২/২৯৬; আল-হুল্যা-১/২০৯) ইসলাম গ্রহণের পর বীরত্ব, খোদাভীরুতা ও পার্থিব ভোগ-বিলাসিতার প্রতি উদাসীনতার জন্য সাহাবাকুলের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। (আল-আ’লাম-৫/২৮১; আল-ইসাবা-২/৪৫)
আবু দারদার বীরত্ব, অশ্বারোহণ ও বিজ্ঞতার স্বীকৃতি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞতা সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ’উয়াইমির হাকীমু উম্মাতি-’উয়াইমির-আমার উম্মাতের একজন মহাজ্ঞানী হাকীম। তার অশ্বারোহণ সম্পর্কে বলেছেনঃ নি’মাল ফারিসু ’উয়াইমির-’উয়াইমির একজন চমৎকার অশ্বারোহী। (তারীখুল ইসলাম-২/১০৮; আল-ইসাবা-২/৪৪; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা-৪/৬০) তাঁর বিজ্ঞতাসূচক অনেক বাণী বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। তার কিছু অংশ ‘আল-ইসতীয়াব’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। (টীকা আল-ইসাবা-২/১৭) এ কারণ ইমাম ইবনুল জাযারী তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেনঃ ‘কানা মিনাল ’উলামা আল-হুকামা’- তিনি ছিলেন বিজ্ঞ জ্ঞানীদের একজন। (আল-আ’লাম-৫/২৮১)
সা’ঈদ ইবন ’আবদুল আযীয বলেনঃ আবু দারদা বদর যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। (তারীখুল ইসলাম-২/১০৯) আবার অনেকে বলেছেন বদর যুদ্ধের পর। (শাজারাতুজ জাহাব-৫/৩৯) আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থকার বলেনঃ তিনি তার পরিবারের সকলের শেষে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উত্তরকালে একজন ভালো মুসলিমে পরিণত হন। (টীকা-আল-সাদাবা-৪/৫৯) জুবাইর ইবন নুফাইর বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ আমাকে আবু দারদার ইসলামের অঙ্গীকার করেছেন। জুবারি বলেনঃ অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (তারীখুল ইসলাম-২/১০৯)
এ খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এত বড় বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য শ্রেষ্ঠ আনসারদের সাথে ইসলাম গ্রহণ না করে হিজরী দ্বিতীয় সন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এর একমাত্র কারণ, তার ইসলাম গ্রহণ অন্যের দেখাদেখি নয়; বরং ভেবে-চিন্তে ও জেনেশুনে ছিল। সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় আগমনের পর এক বছর পর্যন্ত তিনি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং ভালো মত খোঁজখবর নেন। তবে এই একটি বছর পেছনে পড়ার কারণে সারা জীবন অনুশোচনা করেছেন। পরবর্তীকালে প্রায়ই বলতেনঃ এক মুহূর্তের প্রবৃত্তির দাসত্ব দীর্ঘকালের অনুশোচনার জন্ম দেয়।
জাহিলী যুগে প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার (রা.) সাথে আবু দারদার গভীর বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃ সম্পর্ক ছিল। আবদুল্লাহ আগে ভাগেই ইসলাম গ্রহণ করেন; কিন্তু আবু দারদা পৌত্তলিকার ওপর অটল থাকনে। তবে আবদুল্লাহর সাথে সম্পর্ক পূর্বের মতই বজায় রাখেন। আবদুল্লাহও বন্ধুকে ইসলামের মধ্যে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। তিনি আবু দারদাকে বারবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। অবশেষে তারই চেষ্টায় আবু দারদা মুসলমান হন। বিভিন্ন গ্রন্থে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটি এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ
‘সেদিন আবু দারদা ’উয়াইমির প্রত্যুষে ঘুম থেকে জেগে তার প্রতীমাটির কাছে গেলেন। সেটি থাকতো বাড়ির সবচেয়ে ভালো ঘরটিতে। প্রথমে তার প্রতি আদাব ও সম্মান প্রদর্শন করলেন। নিজের বিশাল দোকানের সর্বোত্তম সুগন্ধ তেল তার গায়ে ভালো করে মালিশ করলেন। তারপর গতকালই ইয়ামন থেকে আগত একজন ব্যবসায়ী তাকে যে একখানি উৎকৃষ্ঠ রেশমী কাপড় উপহার দিয়েছেন তাই দিয়ে খুব সুন্দরভাবে প্রতীমাটি ঢেকে রাখলেন। অতঃপর একটু বেলা হলে তিনি দোকানের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন, মদীনার রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি সর্বত্রই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গি-সাথী গিজ গিজ করছে। তারা দলে দলে বদর যুদ্ধ থেকে ফিরছেন। আর তাদের আগে আগে ছলছে কুরাইশ বন্দীরা। তিনি তাদের এড়িয়ে পথ চলতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ খাযরাজ গোত্রের এক যুবক তার সামনে এসে পড়লো। তিনি যুবকের কাছে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কুশল জিজ্ঞেস করলেন। যুবক বললেন, বদরে তিনি দারুণ যুদ্ধ করেছেন এবং গণীমতের মাল নিয়ে নিরাপদে মদীনায় ফিরেছেন। আবদু দারদা দোকানে গিয়ে বসলেন।
এদিকে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বদর থেকে ফিরে তার ভাই আবু দারদার বাড়িতে গেছেন তার সাথে দেখা করতে। বাড়ির ভিতরে ঢুকে দেখলেন, আবু দারদার স্ত্রী বসে বসে চুলে চিরুনী করছেন। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু দারদা কোথায়? স্ত্রী বললেনঃ আপনার ভাই তো এই মাত্র বেরিয়ে গেলেন। এ কথা বলে আবদুল্লাহকে ঘরে বসতে দিয়ে তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে আবদুল্লাহ একটি হাতুড়ি হাতে তুলে নিয়ে যে ঘরে প্রতীমাটি ছিল সেখানে ঢুকে গেলেন এবং বিভিন্ন শয়তানের নামের একটি কাসীদা আবৃত্তি করতে করতে হাতুড়ির আঘাতে মূর্তিটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে
ফেলেন।
কাসীদাটির শেষাংশ ছিল নিমরূপঃ
‘ওহে সাধবান! আল্লাহ ছাড়া আর যত কিছুই ডাকা হোক না কেন সবই বাতিল ও অসার।’
আবু দারদার স্ত্রী হাতুড়ির আঘাতের শব্দ শুনে ছুটে এসে ঘটনাটি দেখে চেঁচিয়ে বলে ওঠেনঃ ‘ওহে ইবন রাওয়াহা! আপনি আমার সর্বনাশ করেছেন।’ আবদুল্লাহ কোন জবাব না দিয়ে এমনভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন যেন কিছুই ঘটেনি।
আবু দারদা বাড়ি ফিরে দেখলেন, স্ত্রী বসে বসে কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কি হয়েছে? বললেনঃ আপনার ভাই আবদুল্লাহ এসে ঐ দেখুন কি কাণ্ডই না ঘটিয়ে গেছেন। আবু দারদা প্রথমতঃ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারপর গভীরভাবে চিন্তা করার পর আপন মনে বলে ওঠেনঃ যদি এ প্রতীমার মধ্যে সত্যি সত্যিই কোন কল্যাণ থাকতো তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করতো। এমন চিন্তার পর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যান এবং ইসলাম কবুল করেন।’ (সুওয়ারুন মিন হায়াতুস সাহাবা-৩/৯৫-১০০; হায়াতুস সাহাবা-১/২৩২-২৩৩; ৩/৩৮৪; আল-মুসতাদরকি-৩/৩৩৬) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান আল-ফারেসীর সাথে তার দ্বীনি-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৭১; তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/২৫; উসুদুল গাবা-৫/১৮৫)
বদর যুদ্ধের সময় আবু দারদা অমুসলিম ছিলেন। এ কারণে সে যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। তবে খলিফা হযরত ’উমার (রা.) তার ফিলাফতকালে সাহাবাদের যে ভাতার ব্যবস্থা করেন তাতে আবু দারদার ভাতা বদরী সাহাবীদের সমান নির্ধারণ করেন বলে বর্ণিত হয়েছে। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা-১/৮০০) উহুদ যুদ্ধের সময় তিনি মুসলমান। এ যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন এবং একজন অশ্বারোহী সৈনিক হিসেবেই এতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রতিপক্ষের একটি অশ্বারোহী বাহিনীকে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি একাই তাদের তাড়িয়ে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে দিন তার বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে দারুণ পুলীকত হন এবং মন্তব্য করেনঃ ‘নি’মাল ফারিসু ’উয়াইমির’- ’উয়াইমির এক চমৎকার ঘোড় সওয়ার। (তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/২৪; তারীখুল ইসলাম-২/১০৭) উহুদ ছাড়াও অন্যান্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তবে সে সব ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে আবু দারদা মদীনায় ছিলেন। তার এ সময়ের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। হযরত ’উমারের (রা.) খিলাফতকালে মদীনা ছেড়ে শামে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা তার মদীনা ত্যাগের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। ১. মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্মৃতি তাকে সব সময় কষ্ট দিত। ২. তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসার নবীর ওয়ারিসদের ওপর ফরজ। এই বোধ তাকে মদীনা ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। ৩. তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একথা শুনেছিলেন যে, ফিতনার অনধিকারে ঈমানের প্রদীপ শামে নিরাপদ থাকবে। মূলতঃ এসকল কারণে শামের রাজধানী দিমাশ্কে তিনি বসতি স্থাপন করেন। (সীয়ারে আনসার-২/১৯০)
[ চলমান ]
