প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১. পিতামাতা সন্তানের সদাচরণ পাওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত (অধিকারী)

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার সৎ ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বলেন, তোমার মা। অতঃপর সে জিজ্ঞেস করল, এরপর কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমার মা। অতঃপর পুনরায় জিজ্ঞেস করল, এরপর কে? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমার মা। অতঃপর পুনরায় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তোমার মা। আবার জিজ্ঞেস করল, এরপর কে? তিনি বলেন, তোমার পিতা। (বুখারী ও মুসলিম)

২. কোন কোন সময় পিতা-মাতার সেবা করায় জিহাদের সমান সওয়াব

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিহাদের অনুমতি প্রার্থনা করল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বলেন, তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছে কী? সে বলল, জ্বী হ্যাঁ। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তুমি তাদের সেবা-যত্ন কর (এটাই তোমার জন্য জিহাদ)। (বুখারী ও মুসলিম)

৩. নফল নামাজ ছেড়ে পিতামাতার ডাকে সাড়া দেওয়া বৈধ

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, কেবল মাত্র তিন ব্যক্তি শৈশবে মায়ের কোলে কথা বলেছে। যথা :

  • হযরত ঈসা (আ.)
  • বনী ইসরাঈলের জুরাইজ নামক একজন ব্যক্তি সে নামাযরত অবস্থায় ছিল। তার মা এসে তাকে ডাকল। সে মনে মনে ভাবল উত্তর দিব না নামায পড়ব? অতঃপর তার মা তাকে (বদ-দুআ করে) বলল হে আল্লাহ! তুমি তাকে ব্যাভিচারীনীর চেহারা না দেখিয়ে মৃত্যু দিয়ো না। জুরাইজ তার ইবাদতগাহে অবস্থান করছিল। অতঃপর জনৈক নারী তার পিছু নিল। তার সাথে কথা বলতে চাইল। সে তা অস্বীকার করল। অতঃপর এক রাখালের নিকট গেল। তাকে সে (ব্যাভিচারের) সুযোগ দিল। ফলে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিল। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলে, মহিলাটি বলল, তার গর্ভে জুরাইজের সন্তান। লোকেরা জুরাইজের নিকট এসে তার ইবাদতগৃহ ভেঙ্গে দিল। তাকে নামিয়ে আনল এবং গালিগালাজ করল। অতঃপর জুরাইজ অযু করে নামাজ পড়ল। তখন শিশুটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, হে বৎস ! তোমার পিতা কে? শিশুটি বলল, রাখাল আমার পিতা। লোকেরা তখন বলল, আমরা তোমার ইবাদতখানা স্বর্ণ দ্বারা তৈরি করে দিব। তিনি বললেন, না মাটি দ্বারাই তৈরী করে দাও।
  • বনী ইসরাঈলের একজন মহিলা স্বীয় দুধ পান করাতো। একদা সুদর্শন এক আরোহী তার নিকট দিয়ে অতিক্রম করল। অতঃপর উক্ত মহিলা দুআ করল, হে আল্লাহ! তুমি আমার ছেলেকে তার মতো সুন্দর করে দাও। (এ কথা শুনে) ছেলেটি তার মায়ের দুধ খাওয়া ছেড়ে দিল এবং আরোহী ব্যক্তির দিকে ফিরে দুআ করল, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এর মতো বানিয়ো না। অতঃপর সে পুনরায় দুধ চুষতে লাগলো। আবূ হুরায়রা রা. বলেন, আমি যেন দেখছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় আঙ্গুল চুষছেন। অতঃপর এক বাঁদী তার (মহিলার) নিকট দিয়ে অতিক্রম করল। তখন সে বলল, হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এ বাদীর মতো বানিয়ো না। ছেলেটি মায়ের দুধ ছেড়ে বলল, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে এমনই বানান। তাকে তার মাতা বলল, তুমি এমন কথা কেন বলছ? ছেলেটি বলল, আরোহী একজন জালিম ব্যক্তি। আর এই বান্দী সম্পর্কে লোকেরা তাকে বলত, তুমি চুরি করেছ, ব্যভিচার করেছ। অথচ সে এসব কিছুই করেনি।(বুখারী)

৪. রক্তের সম্পর্ক রক্ষাকারীর সাথে আল্লাহ সম্পর্ক রাখবেন এবং ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা সমস্ত মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর যখন তা থেকে অবসর হলেন, তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক দয়ালু আল্লাহ তাআলার আচলে আশ্রয় নিল। আল্লাহ তাআলা তাকে বললেন, থাম। সে বলল, এটা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় নেয়ার স্থান। আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যে ব্যক্তি তোমাকে সুদৃঢ় রাখবে আমি তার সাথে সম্পর্ক রাখবো। আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব। সে বলল, হ্যাঁ, হে প্রভু। আল্লাহ তাআলা বললেন, ঠিক আছে তাই হবে। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, তোমরা যদি পড়তে চাও তবে এ আয়াতটি পড়তে পার- (ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন। (মুহাম্মাদ, আয়াত – ২২, ২৩)। (বুখারী ও মুসলিম)

৫. রক্তের সম্পর্ক রক্ষায় জীবিকা ও আয়ু বৃদ্ধি পায়

হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি পাবে বা সে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে (বিলম্বে মৃত্যু আসবে)? তাহলে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক সমুন্নত রাখে। (বুখারী)

৬. রাগ করে ভাইয়ের সাথে তিন দিনের অধিক কথা না বলা বৈধ নয়

হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, (আপন মুসলিম) ভাইয়ের সাথে তিন দিনের অতিরিক্ত কথা বন্ধ রাখা জায়েজ নেই যে, তারা যখন পরস্পরে মিলিত হয় তখন একে অপরের পাশ দিয়ে চলে যায়। তাদের মধ্যে হতে উত্তম সেই ব্যক্তি যে আগে সালাম প্রদান করে। (বুখারী)

৭. অত্যাচার-নির্যাতনের পরিণতি

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ যুলুম-নির্যাতন কিয়ামতের দিন ঘন গাঢ় অন্ধকারের কারণ হবে।

হযরত আবু মূসা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা জালিমকে সুযোগ দিতে থাকেন। কিন্তু ধরলে ছাড়েন না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আয়াত তিলাওয়াত করেন, আপনার প্রভুর পাকড়াও এমনই হয়। যখন তিনি কোন বসতীকে যারা (নিজেদের উপর যুলুম করতে থাকে) ধরেন। নিশ্চয়ই তার পাকড়াও খুবই যন্ত্রণাদায়ক ও কঠিন। (বুখারী)

৮. মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হতে হবে

হযরত আবু মূসা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, মুমিন মুমিনের জন্য ইমারত স্বরূপ। তারা একে অপরের মাধ্যমে শক্তি অর্জন করে। (এ কথাটি বুঝানোর জন্য) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের আঙ্গুলসমূহকে পরস্পরের মাঝে প্রবেশ করালেন। (বুখারী ও মুসলিম)

৯. অসৎ ও অসদাচরণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য নম্র ব্যবহার করা শ্রেয়

হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিবাদ মিটিয়ে দেয় এবং এ উদ্দেশ্যে সে ভাল কথা আরোপ করে বা ভাল কথা বলে। সে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

১০. সত্যে কল্যাণ এবং মিথ্যায় অকল্যাণ রয়েছে

হযরত ইবন মাসউদ (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সততা ভাল কাজের পথ প্রদর্শন করে আর ভাল পথ দেখায় জান্নাতের দিকে। মানুষ সত্য কথা বলে যার ফলে সে সিদ্দীক হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মিথ্যা খারাপ কাজের দিকে পথ প্রদর্শন করে, আর খারাপ কাজ পথ দেখায় জাহান্নামের দিকে। কোন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে যার ফলে আল্লাহ তাআলার নিকটে সে বড় মিথ্যাবাদী হিসেবে বিবেচিত হয়। (বুখারী ও মুসলিম)