প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

একটি অতি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ হাদীস: আমার উম্মতের ইখতিলাফ (মতবিরোধ) রহমত (করুণা)

কখনো বলা হয় : আলিমদের ইখতিলাফ রহমত এবং কেউ বলেন আমার সাহাবীগণের ইখতিলাফ রহমত। মুহাদ্দিসগণ ঘোষণা করেছেন যে, এ বাক্যটি হাদীস হিসাবে সমাজে বহুমুখে প্রচারিত হলেও কোনো হাদীসের গ্রন্থে এ হাদীসটি সনদসহ পাওয়া যায় না। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও এ কথাটি বর্ণিত হয় নি। সনদবিহীনভাবে অনেকেই বিভিন্ন গ্রন্থে এ বাক্যটিকে হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা সুবকী বলেছেন: মুহাদ্দিসগণের কাছে এটি হাদীস বলে পরিচিত নয়। আমি এ হাদীসের কোন সনদ-ই পাই নি, সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট কোন রকম সনদই এ হাদীসের নেই। (মোল্লা কারী, আল-আসরার, ৫১ পৃ, সুযূতী, আল -জামি আস সগীর ১/১৩, আলবানী, যায়ীফাহ ১/১৪১, নং ৫৭, যায়ীফুল জামিয় ৩৪ পৃ)

ইখতিলাফ বা মতভেদ মূলত নিন্দনীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা অনুমোদিত বা প্রশংসিত হতেও পারে। আমরা ইখতিলাফের প্রশংসায় বা নিন্দায় অনেক কিছু বলতে পারি। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই রাসূলুল্লাহ -এর নামে এ কথাটি বলতে পারি না; কারণ তা সনদহীন ভিত্তিহীন কথা।

মুআবিয়ার (রা) কাঁধে ইয়াযীদ: বেহেশতীর কাঁধে দোযখী
খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নামে প্রচলিত রাহাতিল কুলুব পুস্তকে রয়েছে, ফরীদউদ্দীন গঞ্জে শক্কর বলেন: হযরত রাসূলে মাকবুল একদিন সাহাবাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বসেছিলেন, এমন সময় মোয়াবিয়া তার পুত্র এজিদকে কাঁধে নিয়ে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলো, তাঁকে দেখে হুজুর পাক মুচকি হেসে বললেন, দেখ-দেখ, বেহেস্তীর কাঁধে দুজখী যাচ্ছে।…. (রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৩০)

এ কথাটি যে ভিত্তিহীন বানোয়াট তা বুঝতে বেশি জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে যার সাধারণ জ্ঞান আছে তিনিও জানেন যে, ইয়াযীদের জন্ম হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের প্রায় ১৪ বছর পরে।

সাহাবীগণের যুগে যমিন-বুসি
নিজামুদ্দীন আউলিয়ার (রাহ) নামে প্রচলিত রাহাতিল কুলুব পুস্তকে রয়েছে: একদিন রাসূলুল্লাহ সাহাবাগণ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন… এমন সময় একজন আরবী এসে জমিনে আদব-চুমু খেয়ে আরজ করলেন। (রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৩০)

কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। আমরা আগেই বলেছি যে, এ বইটি পুরোটাই জালিয়াতদের রচিত বলেই প্রতীয়মান হয়। যমিন-বুসী তো দূরের কথা কদমবুসীর রীতিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে প্রচলিত ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে তাঁর ২৩ বছরের নবুয়তী যিন্দেগিতে তাঁর লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দু-একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহস্রাধিকবার এসেছেন। এসকল ক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাত ছিল সালাম প্রদান। কখনো কখনো দেখা হলে তাঁরা সালামের পরে হাত মিলিয়েছেন, বা মুসাফাহা করেছেন। দুএকটি ক্ষেত্রে তাঁরা একজন আরেক জনের হাতে বা কপালে চুমু খেয়েছেন বা কোলাকুলি করেছেন। কয়েকটি যয়ীফ বর্ণনায় দেখা যায় কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পায়ে চুমু খেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২৩ বছরের নবুয়তী যিন্দেগিতে লক্ষ মানুষের অগণিতবার আগমণের ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪/৫ টি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেন নি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা বেদুঈণ বা ইহুদী, যারা দরবারে থাকে নি বা দরবারের আদব জানত না। (বিস্তারিত দেখুন : ইবনুল মুকরি, আবু বাকর মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম, আর রুখসাতু ফী তাকবীলিল ইয়াদ, ৫৫-৮০ পৃ) আবু বাকর, উমার, উসমান, আলী, ফাতিমা, বিলাল ও তাঁদের মতো প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে ২৩ বছরে কমপক্ষে ১০ হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদম মুবারকে চুমু খান নি বা সেখানে হাত রেখে সে হাতে চুমু খান নি, তাঁর সামনে মাটিতে চুমু খাওয়া তো অনেক দূরের কথা।

হিন্দুগন মানুষকে সাজদা, গড় বা প্রণাম করতে অভ্যস্ত ছিলেন। ইসলামের আগমনের পরে ভারতের মুসলমানদের মধ্যেও পীর, মুরব্বী বা রাজা-বাদশাহকে সাজদা করা, তাদের পায়ে মুখ দিয়ে চুমু খাওয়া বা তাদের সামনে মাটিতে চুমু খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। এ রীতিটি নিঃসন্দেহে ইসলাম বিরোধী। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, একে হাদীস বলে মনে করা।

উয়াইস কারনী (রহ.)
তাবিয়ী ও পরবর্তী যুগের বুযুর্গগণের বিষয়ে অগণিত বানোয়াট কথা প্রচলিত। তন্মধ্যে উয়াইস কারনী (রাহ) বিষয়ক গল্পগুলো প্রসিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় ইয়ামানের র্কান গোত্রের উয়াইস ইবনু আমির নামক এক ব্যক্তির কথা সাহাবীগণকে বলেন এবং তাঁর ওফাতের পরে উমারের (রা) সাথে তাঁর সাক্ষাতের কথা সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী যুগে উয়াইস (রাহ)- কে কেন্দ্র করে অনেক আজগুবি মিথ্যা কথা বানানো হয়েছে। অনেক বক্তা শ্রোতাগণকে বিমুগ্ধ করার জন্য আজগুবি কথা বানিয়েছেন। অনেক সরলপ্রাণ দরবেশ যা শুনেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু আছে উয়াইস কেন্দ্রিক। আর কিছু কথা বানানো হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামর নামে। এগুলো নিঃসন্দেহে বেশি ভয়ঙ্কর ও কঠিনতম গোনাহ।

উয়াইস ইবনু আমির আল-র্কানী (রাহ) সম্পর্কে সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত সহীহ হাদীসে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে তার সারসংক্ষেপ হলো: উমার (রা) যখন খলীফা ছিলেন (১৩-২৩ হি) তখন তাঁর কাছে ইয়ামানের সৈন্যদল আগমন করলে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন: আপনাদের মধ্যে কি উয়াইস ইবনু আমির নামে কেউ আছেন? এভাবে একবার তিনি উয়াসকে পেয়ে যান। তিনি বলেন: আপনি উয়াইস? উয়াইস বলেন: হ্যাঁ। উমার বলেন: আপনার শরীরে কু রোগ ছিল এবং শুধুমাত্র নাভীর কাছে একটি দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া বাকী সব আল্লাহ ভাল করে দিয়েছেন? তিনি বলেন: হ্যাঁ। তিনি বলেন: আপনার আম্মা আছেন? তিনি বলেন: হ্যাঁ। তখন উমার বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
ইয়ামানের সৈন্যদলের সাথে উয়াইস ইবনু আমির তোমাদের কাছে আগমন করবে। যে র্কান গেত্রের শাখা মুরাদ গোত্রের মানুষ। তার শরীরে কু রোগ ছিল। আল্লাহ এক দিরহাম পরিমাণ স্থান ছাড়া বাকী সব ভাল করে দিয়েছেন। তার আম্মা আছেন। সে তার আম্মার সেবা করে। সে যদি আল্লাহর কাছে কসম করে কিছু বলে তবে আল্লাহ তার কথা রাখবেন। যদি তুমি তার কাছে তোমার গোনাহ মাফের জন্য দুআ চাইতে পার তবে চাইবে। অন্য বর্ণনায়: তাবিয়ীগণের মধ্যে শ্রে উয়াইস নামক এক ব্যক্তি।… তোমরা তাকে বলবে তোমাদের জন্য ক্ষমা চাইতে।

একথা বলে উমার (রা) বলেন: আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তখন উয়াইস আল্লাহর কাছে উমারের গোনাহের ক্ষমার জন্য দুয়া করেন। উমার তাঁকে বলেন: আপনি কোথায় যাবেন? তিনি বলেন: আমি কুফায় যাব। উমার বলেন: তাহলে আমি আপনার জন্য কুফার গভর্নরের কাছে চিঠি লিখে দিই? উয়াইস বলেন: অতি সাধারণ মানুষদের মধ্যে মিশে থাকাই আমার বেশি পছন্দ। পরের বছর কুফার একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হজ্জে গমন করেন। তিনি খলীফা উমারের (রা) সাথে দেখা করলে তিনি তাকে উয়াইস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ঐ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বলেন: তাকে তো একটি অতি ভগ্ন বাড়ীতে অতি দরিদ্র অবস্থায় দেখে এসেছি। তখন উমর (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপরের হাদীসটি তাকে বলেন। তখন ঐ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কুফায় ফিরে উয়াইসের কাছে গমন করে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার অনুরোধ করেন। উয়াইস বলেন: আপনি তো হজ্জের নেক সফর থেকে ফিরে আসলেন, আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আপনি কি উমারের (রা) সাথে দেখা করেছিলেন? তিনি বলেন: হ্যাঁ। তখন উয়াইস তাঁর জন্য আল¬াহর কাছে গোনাহের ক্ষমা চান। এ ঘটনার পরে মানুষেরা উয়াইস সম্পর্কে জেনে যায়। ফলে তাঁর কাছে মানুষ আসা যাওয়া করতে থাকে। তখন উয়াইস লোকচক্ষুর আড়ালে কোথাও চলে যান।

পরবর্তী প্রায় দুই দশক উয়াইস কারনী লোকচক্ষুর আড়ালে সমাজের অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করেন। যে এলাকায় যখন বসবাস করতেন সেখানে মসজিদে সাধারণ মুসল্লী হিসাবে নিয়মিত নামাযে ও ওয়ায আলোচনায় বসতেন। কখনো নিজেও কিছু বলতেন। মসজিদে বসে কয়েকজনে কুরআন তিলাওয়াত করতেন বলেও জানা যায়। এভাবেই তিনি বিভিন্ন জিহাদে শরীক হতেন বলে বুঝা যায়। ৩৭ হিজরীতে আলী (রা) ও মুআবিয়ার (রা) মধ্যে সিফফীনের যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এ যুদ্ধে উয়াইস কারনী (রাহ) আলীর সেনাদলে ছিলেন। তিনি আলী (রা)-এর পক্ষে যুদ্ধ করতে করতে এক সময় শহীদ হয়ে যান। (মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৯৬৮-১৯৬৯; আহমাদ, আল-মুসনাদ ৩/৪৮০, হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৩/৪৫৫-৪৬১, আবু নুআইম, হিলয়মাতুল আউলিয়া ২/৭৯, যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/২০, যিরিকলী, আল-আলাম ২/৩২)

এ হলো তাঁর সম্পর্কে সহীহ বর্ণনা। তাঁকে কেন্দ্র করে অনেক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা আমাদের দেশে প্রচলিত। যেমন তিনি নাকি তাঁর আম্মাকে বহন করতেন, তিনি নাকি উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দাঁত আহত হওয়ার সংবাদে নিজের সকল দাঁত ভেঙে ফেলেছিলেন, ইত্যাদি। এ সকল কথার কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না। বলা হয়, উমার (রা) ও আলী (রা) নাকি তাঁর কাছে যেয়ে দেখা করেন বা দোয়া চান। এগুলো সবই মিথ্যা কথা। উপরের সহীহ হাদীসে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে উয়াইসই উমারের (রা) দরবারে এসেছিলেন।

তবে আরো মারাত্মক তাঁকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বানোয়াট কথা। যেমন বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ওফাতের পূর্বে তাঁর মুবারক পিরহান উয়াইস কারানীর (রাহ) জন্য রেখে যান এবং উমার (রা) ও আলী (রা) তাঁকে সে পোশাক পৌঁছে দেন। কথাগুলো সবই বানোয়াট ইবনু দাহিয়া, ইবনুস সালাহ, ইবনু হাজার, সাখাবী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস একমত যে, এগুলি সবই বাতিল ও বানোয়াট কথা। (ইবনু হিব্বান, আল-মাজরূহীন ২/২৯৭-২৯৮; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত ১/৩৫০, সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/৪৪৯, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ: ৩৩৫, নং ৮৫২, ইবনু র্আরাক, তানযীহ ২.৩২-৩৬; মোল¬া আলী কারী, আল-আসরার, পৃ: ১৮১, নং ৭০১, আল-মাসনূয়, পৃ: ১১১, নং ২৩৫, আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/১৮০-১৮১, নং ২০৩৫, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ: ১৫৬, নং ৭৮৮)

হাসান বসরী (রহ.)
হাসান বসরী (২২-১০৯ হি) একজন প্রসিদ্ধ তাবিয়ী ছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট কথা সমাজে প্রচলিত। যেমন, হাসান বসরী ও রাবেয়া বসরী দুজনের কথাবার্তা, আলোচনা ইত্যাদি আমাদের সমাজে অতি পরিচিত। অথচ দুজন সমবয়সী বা সমসাময়িক ছিলেন না। রাবেয়া বসরী ১০০ হিজরী বা তার কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮০/১৮১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। হাসান বসরী যখন ইন্তেকাল করেন তখন রাবেয়া বসরীর বয়স মাত্র ১০/১১ বছর। এ থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, এ দুজনকে নিয়ে প্রচলিত গল্পকাহিনীগুলো সবই বানোয়াট।
তবে সবচেয়ে মারাত্মক তাঁকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বানোয়াট কথা। যেমন, প্রচলিত আছে যে, হাসান বসরী আলীর (রা) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে “তরীকত” গ্রহণ করেন বা চিশতিয়া তরীকতের খিরকা, লাঠি ইত্যাদি গ্রহণ করেন। এ কথাটি ভিত্তিহীন।

হাসান বসরী (রাহ) তাবিয়ীগণের মধ্যে অন্যতম শ্রে মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুজাহিদ, ওয়ায়িয ও সংসারত্যাগী বুযুর্গ ছিলেন। তিনি হাদীস ও ফিক্হ শিক্ষা দানের পাশাপাশি জাগতিক লোভ-লালসার বিরুদ্ধে এবং জীবনকে আল্লাহর ভালবাসা ও আখিরাত কেন্দ্রিক করার জন্য ওয়ায করতেন। সঙ্গীগণের সাথে বসে আখিরাতের কথা স্মরণ করে আল্লাহর প্রেমে ও আল্লাহর ভয়ে কাঁদাকাটি করতেন। তাঁর এসকল মাজলিসের বিশেষ প্রভাব ছিল সে যুগের মানুষদের মধ্যে। পরবর্তী যুগের অধিকাংশ সূফী দরবেশ তাঁর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁর থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।

হাসান বসরীর (রা) যুগে তাসাউফ, সূফী ইত্যাদি শব্দ অপরিচিত ছিল। এছাড়া প্রচলিত অর্থে তরীকতও অপরিচিত ছিল। তাঁরা মূলত কুরআন ও হাদীসের আলোকে আল্লাহর মহব্বত ও আখিরাতের আলোচনা করতেন এবং বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতেন। তরীকতের জন্য নির্দিষ্ট কোন মানুষের কাছে গমনের রীতিও তখন ছিল না। বিভিন্ন সাহাবী ও তাবিয়ীর সামগ্রিক সাহচর্যে মানুষ হৃদয়ের পূর্ণতা লাভ করত। প্রায় ৫০০ বছর পরে, যখন সমগ্র মুসলিম বিশ্ব বিচ্ছিন্নতা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ও তাতারদের ভয়াবহ হামলায় ছিন্নভিন্ন, তখন হিজরী ৬ ও ৭ম শতকে প্রচলিত তরীকাগুলো প্রতিা ও প্রসার লাভ করে।

কাদিরীয়া তরীকার সম্পর্ক আব্দুল কাদির জীলানীর (মৃ ৫৬১হি/১১৬৬ খৃ) সাথে। তবে তিনি প্রচলিত কাদিরীয়া তরীকা প্রতিতি বা প্রচলিত করেন নি। তাঁর অনেক পরে তা প্রচলিত হয়েছে। রিফায়ী তরীকার প্রতিাতা আহমাদ ইবনু আলী রিফায়ী (মৃ ৫৭৮ হি)। সোহরাওয়ার্দী তরীকার প্রতিাতা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (মৃ. ৬৩২ হি)। মুঈনউদ্দীন চিশতী চিশতিয়া তনরীকার মূল প্রচারক। তিনি ৬৩৩হি/১২৩৬খৃ ইন্তেকাল করেন। আলী ইবনু আব্দুল্লাহ শাযলী (৬৫৬হি/১২৫৮ খৃ) শাযলিয়া তরীকা প্রতিা করেন। মুহাম্মাদ ইবনু মুহাম্মাদ বুখারী বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (মৃ ৭৯১ হি/১৩৮৯খৃ) নকশাবন্দিয়া তরীকার প্রতিা করেন। রাহিমাহুমুল্লাহ- আল্লাহ তাঁদেরকে রহমত করুন। তাঁরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে মাসনূন ইবাদতগুলো বেছে তার আলোকে মুসলিমগণের আধ্যাত্মিক উন্নতির চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে সে অন্ধকার ও কষ্টকর দিনগুলোতে এঁরাই সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম প্রচার ও প্রতিার দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী যুগের একটি প্রচলিত কথা হলো, চিশতিয়া তরীকা ও অন্য কিছু তরীকা হাসান বসরী (রাহ) আলীর (রা) মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে লাভ করেছেন। তিনি আলী (রা) থেকে খিরকা বা খিলাফত লাভ করেছেন ও তরীকতের সাজ্জাদ-নশীন হয়েছেন। কথাটি ভিত্তিহীন।
হাসান বসরী (রাহ) ২২ হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বয়স যখন ১৩ বছর তখন ৩৫ হিজরীতে আলী (রা) খলীফা নিযুক্ত হন এবং খিলাফতের রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। এরপর আর হাসান বসরী (রাহ) আলীকে (রা) দেখেন নি। তিনি আলী (রা)-এর দরবারে বসে শিক্ষা গ্রহণেরই কোনো সুযোগ পান নি। ৪০ হিজরীতে আলী (রা) শহীদ হন। আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, আলী (রা) তাঁর যোগ্যতম সন্তানগণ, অগণিত নেতৃস্থানীয় ভক্ত, ছাত্র ও সহচরদের বাদ দিয়ে ১৩ বছরের কিশোরকে খিরকা ও খিলাফত দিয়ে যান নি বা সাজ্জাদ-নশীন করেন নি। ইবনু দাহিয়া, ইবনুস সালাহ, যাহাবী, ইবনু হাজার, সাখাবী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস উলে¬খ করেছেন যে, এগুলো সব ভিত্তিহীন ও বাতিল কথা। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ: ৩৩৫; মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ: ১৮১; আল-মাসনূ, পৃ: ১১১; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/১৮০-১৮১; যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ: ১৫৬)