প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

প্রশ্ন-৩৬ : রোগ, ওষুধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি? অনুগ্রহপূর্বক কুরআন ও হাদীসের আলোকে বুঝিয়ে বলুন।

উত্তর : রোগ, ওষুধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী তা আমরা হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণিত সুপ্রসিদ্ধ হাদীস থেকে জানতে পারি। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক রোগেরই ওষুধ আছে। সুতরাং যখন রোগ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহ্র হুকুমে রোগী আরোগ্য লাভ করে থাকে। (সহীহ মুসলিম)

Every sickness or ailment has a cure. So when right medicines are given as per diagnosis, the disease gets healed by the will of Allah (Sahih Muslim)

হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীসটি হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক এমন কোনো রোগ বা ব্যাধি সৃষ্টি করেননি, যার ওষুধ বা প্রতিষেধক তিনি পাঠাননি বা সৃষ্টি করেননি। (সহীহ আল বুখারী)

Allah (SWT) has not sent down a disease except that He has also sent down its cure. (Sahih Al Bukhari)

তিব্বুন নববীর মূল কথা হচ্ছে, মা আনযালাল্লাহু দাআন ইল্লা আনযালা লাহু শিফায়া। Every sickness has a cure চিকিৎসার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে ওষুধ ও ডাক্তারই রোগ নিরাময়ের একমাত্র অবলম্বন; অন্য কিছু নয়। কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক ও ইসলামী বিধিসম্মত নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি ছয়জন শিশুর ডায়রিয়া হয়েছে। একই ধরনের উপসর্গ, একই কারণ, একই চিকিৎসা, তবে এদের মধ্যে চারজন ওষুধ সেবনের পরও মৃত্যুবরণ করে। কেন? দশজন ক্যান্সার রোগীরও (cancer patients) একই ধরনের উপসর্গ ও রোগ নিরূপণ একই। পাঁচজন কেমোথেরাপি ও রেডিওথিরাপীর সাহায্যে চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করে আর পাঁচজন করে না, কেন? কেন সবাই মৃত্যুবরণ করলো না অথবা কেন সবাই আরোগ্য লাভ করলো না?

বস্তুত ওষুধ তখনই রোগ মুক্তির কারণ বা অসীলা হয় যখন আল্লাহ্ তা ইচ্ছা করেন। তিনি যদি ইচ্ছা না করেন তা হলে কোনো ওষুধই কার্যকরী হয়না। এমনকি চিকিংসকও সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেননা বা সঠিক ওষুধ নির্বাচনে ব্যর্থ হন। জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি বলেছেন, মানুষের মৃত্যু যখন উপস্থিত হয় তখন অভিজ্ঞ ডাক্তার পর্যন্ত বোকা বনে যায়। সূরা আনআম-এর ১৭ নং

আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেন
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِير

আল্লাহ যদি তোমাকে দুঃখ-কষ্টে ফেলেন তবে তিনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না। (আনআম ৬ : ১৭)
ইংরেজীতে আয়াতটির অনুবাদ হচ্ছে, If Allah touch thee with affliction, none can remove it but He; if He touch thee with happiness, He hath power over all things.

যে নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক সারাটা জীবন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থানকারী অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তুলতে প্রাণপন চেষ্টা করে আসছেন, সেই ডাক্তারও বিভিন্ন রোগে ভুগে যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হন, তখন অন্য কোনো ডাক্তার তাকে বাঁচাতে পারে না। এ বক্তব্যের সমর্থনে কুরআনের আরেকটি আয়াত বর্ণনা করছি। সূরা শুআরার ৮০নং আয়াতে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সাল্লাম-এর যবানীতে আল্লাহ্ পাক বলেন,

وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ

এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন। (আশ্ শুআরা ২৬:৮০)
And when I am ill, it is He who heals me. (Ash-Shuara 26:80)

প্রশ্ন – ৩৭ : স্বাস্থ্য, সুস্থতা স্বাস্থ্য সুরক্ষা তথা রোগ প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী বকব্য রেখেছেন তা সংক্ষেপে আমাদের অসংখ্য দর্শকবৃন্দের উদ্দেশ্যে বলুন।

উত্তর : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোগ প্রতিরোধকল্পে যেসব বক্তব্য রেখেছেন ও ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন, তা আলোচনা করার পূর্বে আমি সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট বা ডায়াটেসিয়ান হিসেবে ছিলোনা। তথাপিও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে স্বাস্থ্য, সুস্থতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, রোগ নিরাময় ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি বিষয়েই তিনি অনেক বক্তব্য রেখেছেন এবং দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন যা পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিজ্ঞানসম্মত। তিনি তাঁর বক্তব্য এমন এক সময় পেশ করেছেন যখন বিজ্ঞানের অবদান সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানতোনা। He spoke on every aspect of health and wellness, sickness and cure, be it material physical or spiritual. He was in fact a physician of the body and the soul.

যাহোক, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় হাদীস উল্লেখ করে আমি আমার আলোচনা শুরু করবো ইনশাআল্লাহ। হয়রত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি এক বছর পূর্বে আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই মানুষকে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার চেয়ে শ্রেয় আর কোনো নিয়ামত প্রদান করা হয়নি। (আন-নাসাঈ)

সহীহ আল বুখারীতে যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে তার ভাষা হচ্ছে, আল্লাহ্ও নিয়ামতসমূহের মধ্যে দুটো নিয়ামত রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ লোক ধোঁকায় পড়ে আছে । একটি স্বাস্থ্য আর অপরটি অবসর বা বিশ্রাম। (সহীহ আল বুখারী)

প্রশ্ন-৩৮ : সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সুন্দর অভ্যাস বজায় রাখা এবং preventive measures নেওয়া, প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কি করতেন, স্বাস্থ্য অটুট রাখার জন্য আল্লাহর নিকট দুয়া করার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো বাণী আছে কি?

উত্তর : আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিন যা দিয়ে আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে পারি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহুকে বলেন, হে আব্বাস! হে আল্লাহর রসূলের চাচা! আপনি আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দুআ করুন। (আত-তিরমিযী)

আর দুনিয়াতে শান্তি ও নিরাপত্তা থাকা মানেই সর্বদা সুস্থ থাকা। হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। এক সাহাবী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! কোন দুয়া সর্বোত্তম? রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার প্রতিপালকের নিকট সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কমনা করো। লোকটি দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন এসে একই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ জবাব দিলেন এবং বললেন, তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করলেই সফলকাম হবে। (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)

হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দুয়াই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। (আত-তিরমিযী)

No other supplication is more pleasing, more rewarding, more important, more favourite than a request for good health and safety. (At-Tirmizi)

সম্মানিত পাঠক ভাইবোনেরা! এসব সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে সুস্বাস্থ্যের প্রতি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতো গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বাস্থ্যই সম্পদ, আর স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল (Health is wealth. Health is the root of all happiness) এ উক্তি দুটি মূলত তাঁর বক্তব্যগুলোর উপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে। বস্তুত প্রায় ১৪৫০ বছর আগে স্বাস্থ্য সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা যা বলেছেন, আধুনিক বিশ্ব আজ তারই প্রতিধ্বনি করছে মাত্র। এতে নতুন কিছুই নেই। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাই ঊনবিংশ, বিংশ আর একবিংশ শতাব্দীতে অমুসলিম বিশ্ব একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রচার করে আসছে।

সম্মানিত পাঠক, আমি এখানো আরো একটি হাদীস আলোচনা করবো যা হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন এবং যা আস-সুয়ূতী উদ্ধৃত করেছেন। এ হাদীসটি আমি পূর্বেও একবার আলোচনা করেছি। হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু একদা রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, হে আল্লাহর নবী! যদি আমার স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং আমি সুস্থ থাকি তখন আমি আল্লাহর শোকর আদায় করি। এই অবস্থাটি আমার নিকট সেই অবস্থার চেয়ে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় যে আমি অসুস্থতা দ্বারা পরীক্ষায় পতিত হই এবং ধৈর্য ধারণ করি। তার একথা শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর রসূলও তোমার সাথে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা পছন্দ করেন। (আল-মুজামুল আওসাত ও আস-সুয়ূতী)

সম্মানিত পাঠক, স্বাস্থ্য আল্লাহর কতো বড় নিয়ামত যে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে পছন্দ করতেন ও ভালোবাসতেন। তিনি আল্লাহর নিকট এ নিয়ামত বেশি বেশি চাইতেন। আর এজন্যই আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ সর্ব অবস্থায়ই ধৈর্যধারণ করতেন এবং শোকর আদায় করতেন। তারা কোনো সময় অসুস্থ হলে ধৈর্যধারণ করতেন, দুয়া করতেন এবং একে দরজা বুলন্দী ও উন্নত মর্যাদার মাধ্যম মনে করতেন এবং দুয়া করতেন, হে করুণাময় প্রভু! আপনি অসুস্থতাকে সুস্থতার সুমহান নিয়ামত দ্বারা বদল করে দিন। তারা এরূপ দুয়া এজন্যই করে থাকেন যে অসুখ-বিসুখে পতিত হয়ে সবর ও ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব। আর সুস্থতার সময় শোকর করাও ওয়াজিব মনে করতেন।