প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
নাম যায়িদ, ডাকনাম আবু তালহা। এ নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। হিজরাতের ৩৬ বছর পূর্বে ৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আলাম-৩/৯৮) পিতা সাহল ইবন আল-আসওয়াদ ইবন হারাম। বনু জাজীলার সন্তান। মাতা উবাদাহ্ বিনতু মালিক। প্রাচীন জাহিলী যুগে ইয়াসরিবে আবু তালহার খান্দান বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাঁর পিতৃ ও মাতৃ বংশের মধ্যেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। বর্তমান মসজিদে নববী সংলগ্ন পশ্চিম দিকে তাঁর খান্দানের বসতি ছিল। তিনি তাঁর সময়ে খান্দানের রয়িস বা নেতা ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ – ১/৪২, আল-ইসতীয়াব -৪/১১৩, তাহজীবুল আসমা – ১/৪৪৫)
ইসলাম-পূর্ব জীবনে সাধারণ আরববাসীর মত মূর্তি পূজারী ছিলেন। তাঁর মদ পানের আসরটিও ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। পানের আসরে নিয়মিত আড্ডা জমতো। সেই জাহিলী যুগে তিনি ইয়াসরিবের হাতেগোনা গুটি কয়েক সাহসী তীরন্দাযদের মধ্যে গণ্য হতেন। (বুখারী – ২/৬৬৪, আল-আলাম-৩/৯৮)
আবু তালহা যখন কুড়ি/বাইশ বছরের যুবক তখন মক্কায় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেন। প্রথম কয়েক বছর ইয়াসরিবে এর কোন প্রভাব তেমন একটা না পড়লেও পরের বছরগুলিতে ধীরে ধীরে পড়তে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় হিজরাতের কয়েক বছর পূর্বে মক্কা থেকে হযরত মুসয়াব ইবন উমাইরকে সেখানে পাঠান ইসলাম প্রচারের জন্য। তাঁরই নিকট মদীনার এক মহিয়সী মহিলা উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। এই মহিলার প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে আবু তালহা মূর্তি ত্যাগ করে মুসলিম হন এবং তাঁকে বিয়ে করেন।
আবু তালহা কখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনা করলে সে সম্পর্কে দুইটি ধারণা পাওয়া যায়। একটি এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদীনায় হিজরাতের পূর্বে মুসয়াব ইবন উমাইরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবঙ তাঁর সাথে হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় গিয়ে সর্বশেষ আকাবায় তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতে বাইযাত (আনুগত্যের শপথ) করেন। এই বাইয়াতে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বারো জন নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন তাঁদের একজন ছিলেন আবু তালহা। অন্যটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার পর আবু তালহা ইসলাম গ্রহন করেন। তবে প্রথম ধারণাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ একথাই বর্ণনা করেছেন। (তারীখুল ইসরাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আলাম – ২/১১৯, শাজারাতুজ জাহাব -১/৪০, উসুদুল গাবা – ৫/২৩৪)
আবু তালহার ইসলাম গ্রহণ এবং উম্মু সুলাইমের সাথে বিয়ের ঘটনার মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের সম্মানিতা মা হলেন হযরত উম্মু সুলাইম। আনাস (রা:) -এর পিতা মালিক ছিল তাঁর ইসলাম-পূর্ব জীবনের স্বামী। উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করলে দুঃখ ও ক্ষোভে মালিক স্ত্রী-পুত্র ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়। তারপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এই বিয়ে সম্পর্কিত কয়েকটি বর্ণনা এখানে আমরা তুলে ধরছি।
আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। উম্মু সুলাইম বললেন কোন মুশরিককে বিয়ে করা আমার উচিত হবে না। আচ্ছা আবু তালহা, তুমি কি দেখনা তোমাদের এইসব ইলাহ, যার তোমরা ইবাদাত করে থাক, তা তো অমুকের ওখানে তৈরী! আগুন লাগালে তা জ্বলে যায়। কথাগুলি শুনে আবু তালহা উঠে চলে গেলেন। তবে অন্তরে একটা ভাবনা দেখা দিল। কিছুতেই ঘুম এলো না। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে। উম্মু সুলাইম বলেছিলেন তোমার এই প্রস্তাবে তো আমার কোন আপত্তি নেই। তবে সমস্যা হলো, তুমি যে একজন কাফির ব্যক্তি, আর আমি একজন মুসলিম নারী। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তবে তো কোন সমস্যাই নেই। তখন তোমার ইসলামই হবে আমার মোহর। তাছাড়া অন্য কিছুই আমি চাইনা। আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। সাবিত বলতেন উম্মু সুলাইমের মোহরের চেয়ে উত্তম মোহরের কথা আমরা আর শুনিনি। তাঁর সেই মোহর ছিল ইসলাম। ইবন আসাকির বলেন, তাবারানী, আবু নুঈম ও ইবন দুরাসতাওয়াইহ উপরোক্ত কথা বর্ণনা করেছেন। (তারীখে ইবন আসাকির -৬/৫) উরওয়া, মূসা ইবন উকবা, আল্লামা জাহবী, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী, ইবনুল আসীর প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন, এটা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরাতের পূর্বের ঘটনা। কারণ, আবু তালহা আকাবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইয়াত করেন ও নাকীব মনোনীত হন।
ইবন আসাকির বলেন উম্মু সুলাইমের সাথে আবু তালহার বিয়ের যেসব বর্ণনা এসেছে তাতে ধারণা জন্মে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় হিজরাতের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি নাদর ইবন আনাস থেকে বর্ণিত হাফেজ ও বায়হাকীর একটি বর্ণনা উদ্ধার করেছেন। নাদর বলেন আনাসের পিতা মালিক একদিন তাঁর স্ত্রী উম্মু সুলাইমকে বললো এ ব্যক্তি [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তো দেখছি মদ হারাম করেছেন। তারপর সে স্ত্রী ও সন্তান ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়।
অতঃপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলাইম বললেন শোন আবু তালহা, তোমার মত ব্যক্তিকে ফেরানো যায় না। তবে তুমি কাফির, আর আমি মুসলিম। সমস্যাটি এখানেই। এ বিয়ে হতে পারে না। আবু তালহা বললেন তুমি সোনা-রূপো চাও? উম্মু সুলাইম বললেন না, আমি তা চাইনা। আমি শুধু তোমার ইসলাম চাই। আবু তালহা বললেন এ ব্যাপারে আমাকে কে সাহায্য করবে? বললেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আবু তালহা চললেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তিনি তখন সাহাবীদের নিয়ে বসে ছিলেন। আবু তালহাকে আসতে দেখে বললেন আবু তালহা আসছে। ইসলামের দীপ্তি তার কপালে দেখা যাচ্ছে। আবু তালহা এসে উম্মু সুলাইম যা বলেছিলেন সেই কথাগুলি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন। এভাবে আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। (তারীখে ইবন আসাকির -৬/৫, হায়াতুস সাহাবা-১/১৯৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনসারদের মধ্যে দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্কের প্রচলন করেন। আবু তালহার দ্বীনী ভাই কে হয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও নানা জনের নানা কথা আছে। প্রখ্যাত কুরাইশ মুহাজির আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহর (রা) সাথে তাঁর ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিতি হয়েছিল – এটা সংখ্যাগরি সীরাত লেখকের মত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে এই আবু উবায়দাহ্ আমীনুল উম্মাহ খিতাবসহ জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। ইবন আসাকির বলেন হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা ও বিলালের হাত ধরে তাঁদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিা করে দিয়েছিলেন। (তারিখে ইবন আসাকির -৬/৯) ইবন সাদ এ সম্পর্কে আসিম ইবন উমারের একটি বর্ণনা পেশ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহা ও আরকাম ইবন আল-আরকাম আল-মাখযুমীর মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করেন। (তাবাকাত-৩/৫০৫)
বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যোগ দেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি প্রায়ই এই চরণটি আওড়াতে আমি আবু তালহা, আমার নাম যায়িদ। প্রতিদিন আমার অস্ত্রে থাকে একটি শিকার। (তাহজীবুল আসমা – ১/৪৪৫, তারীখে ইবন আসাকি -৫/৪)
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ বদর। আবু তালহা অতি উৎসাহের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইবন সাদ তাঁর তাবাকাতে বদরী সাহাবীদের নামের তালিকায় তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন বদরে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমার হাত থেকে তরবারি পড়ে গিয়েছিল। একবার নয়, তিনবার। আর এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন। (সূরা আল-আনফাল-১১, (তারীখে ইবন আসাকির -৬/৬) উল্লেখ্য যে, বদর যুদ্ধের ময়দানে এক সময় ক্ষণিকের জন্য মুসলিম বাহিনী তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়। এতে তাঁদের ক্লান্তি ও ভয়ভীতি দূর হয়ে যায়।
উহুদ যুদ্ধে তিনি আল্লাহর নবীর জন্য আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন তীরন্দায বাহিনীর সদস্য। (আনসাবুল আশরাফ – ১/১২৫) প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে রাসূূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। তখন আবু তালহাসহ মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে শত্র বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। এদিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের পেছনে আড়াল করে রেখে শত্রদের দিকে তীর ছুড়লেন। একটি তীর ছুড়লে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু মাথা উঁচু করে দেখছিলেন, তা কোথায় গিয়ে পড়েছে। আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বুকে হাত দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলছিলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! বসুন! এভাবে থাকুন। তাহলে আপনার গায়ে কোন তীর লাগবে না। তিনি একটু মাথা উঁচু করলেই আবু তালহা খুব দ্রুত তাঁকে আড়াল করে দাঁড়াচ্ছিলেন। সেদিন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরও বলেছিলেন, আমার এ বুকে আপনার বুকের সামনেই থাকবে। এক পর্যায়ে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন আমি শক্তিশালী সাহসী মানুষ। আপনার যা প্রয়োজন আমাকেই বলুন। তিনি শত্রদের বুক লক্ষ্য করে তীর ছুড়ছিলেন আর গুন গুন করে কবিতার একটি পংক্তি আওড়াচ্ছিলেন
আমার জীবন হোক আপনার জীবনের প্রতি উৎসর্গ, আমার মুখমন্ডল হোক আপনার মুখমন্ডলের ঢাল। আবু তালহা ছিলেন বলবান বীর পুরুষ। এই উহুদ যুদ্ধে তিনি দুই অথবা তিনখানি ধনুক ভেঙ্গেছিলেন।
আক্রমণের প্রচন্ডতায় তাঁর হাত দুইখানি অবশ হয়ে পড়ছিল। তবুও তিনি একবারও একটু উহ্ শব্দ উচ্চারণ করেননি। কারণ, তখন তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিফাজত ও নিরাপত্তা।
(উসুদুল গাবা – ৫/২৩৪, তারীখে ইবন আসাকির -৬/৭, তাবাকাত -৩/৫০৭, বুখারী-কিতাবুল মাগাযী)
হযরত আবু তালহা খাইবার যুদ্ধে যোগদান করেন। এই যুদ্ধের সময় তাঁর ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ের উট খুবই নিকটে পাশাপাশি ছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাধার গোশত হারাম ঘোষণা করার জন্য ঘোষক হিসেবে তাঁকেই মনোনীত করেন। (মুসনাদে আহমাদ-/১২১)
এই অভিযান থেকে ফেরার সময় হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত সাফিয়্যা ছিলেন এক উটের ওপর। মদীনার কাছাকাছি এসে উটটি হোঁচট খায় এবং আরোহীদ্বয় ছিটকে মাটিতে পড়ে যান। আবু তালহা দ্রুত নিজের উট থেকে লাফিয়ে পড়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছে বলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে আল্লাহ আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন! আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন? বললেন না। তবে মহিলার খবর লও। আবু তালহা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হযরত সাফিয়্যার নিকটে যান এবং উটের হাওদা ঠিক করে আবার তাঁকে বসিয়ে দেন। (মুসনাদে আহমাদ -৩/১৮০)
হুনাইন যুদ্ধেও তিনি দারুণ বাহাদুরী দেখান। এই যুদ্ধে তিনি একাই বিশ মতান্তরে একুশজন কাফিরকে হত্যা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছিলেন কেউ কোন কাফিরকে হত্যা করলে সে হবে নিহত ব্যক্তির সকল জিনিসের মালিক। এ দিন আবু তালহা একুশ ব্যক্তির সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী হন। হিজরী অষ্টম সনে সংঘটিত এই যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ।
(তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর – ২/১১৯, তারীখে ইবন আসাকির ৬/৭, উসুদুল
এই যুদ্ধের সময় তিনি হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! উম্মু সুলাইমের হাতে একটি খঞ্জর , আপনি কি তা দেখেছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, উম্মু সুলাইম, এই খঞ্জর দিয়ে কি করবে? বললেন মুশরিকরা কেউ আমার নিকটে এলে এটা দিয়ে তাঁর পেট ফেঁড়ে ফেলবো। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম – ২/৪৪৬, ৪৪৬, হায়াতুস সাহাবা – ১/৫৯৭)
বিদায় হজ্জে আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন। মিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা হলক (চুল ছেঁচে ফেলা) করছিলেন। তিনি মাথার ডান দিকের কর্তিত চুল একটি/দুইটি করে পাশে বসা সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। কিন্তু মাথার বাম পাশের চুলগুলির সবই আবু তালহাকে দান করেন। (তারীখে ইবন আসাকির -৬/৭) ইমাম মুসলিমও একথা বর্ণনা করেছেন।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের কাছাকাছি সময় মদীনায় সাধারণতঃ দুই ব্যক্তি কবর খুঁড়তেন। মুহাজিরদের মধ্যে আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ। তিনি খুঁড়তেন মক্কাবাসীদের মত। আর আনসারদের মধ্যে আবু তালহা। তিনি খুঁড়তেন মদীনাবাসীদের মত। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম মসজিদে নববীতে বসে দাফন – কাফনের বিষয় পরামর্শ শুরু করলেন। প্রশ্ন দেখা দিল, কে এবং কোন পদ্ধতিতে কবর তৈরি করবে? উপরোক্ত দুই্ ব্যক্তি তখন এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন না। হযরত আববাস (রা) একই সময়ে দুইজনের নিকট লোক পাঠালেন, তাঁদেরকে ঢেকে আনার জন্য। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুইজনের মধ্যে যিনি পৌঁছবেন তিনিই এই সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। তাঁদের ডাকার জন্য লোক পাঠিয়ে দিয়ে হযরত আব্বাস (রা) সহ উপস্থিত সাহাবীরা দুআ করতে লাগলেন হে আল্লাহ, আপনার নবীর জন্য এই দুই জনের একজনকে নির্বাচন করুন। কিছুক্ষণের মধ্যে যে ব্যক্তি আবু তালহার খোঁজে গিয়েছিল, তাঁকে সংগে করে ফিলে আসে। অতঃপর আবু তালহা মদীনাবাসীদের নিয়ম অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর তৈরি করেন। (আনসাবুল আশরাফ -১/৫৭৩, ৫৭৪, আসাহ আস-সীয়ার-৫৮৭)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর বহু সাহাবী মদীনা ছেড়ে শামে আবাসন গড়ে তোলেন। আবু তালহাও তথাকার অধিবাসীদের একজন। তবে যখনই কোন দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় পিষ্ট হতেন, তখনই এই মাসাধিক কালের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মাযারে হাজির হতেন এবং মানসিক প্রশান্তি লাভ করতেন। (তারীখে ইবন আসাকির – ৫/৪)
হযরত আবু বাকরের (রা) খিলাফত কাল আবু তালহা মোটামুটি শামে (সিরিয়া) কাটান। হযরত ফারুকে আজমের খিলাফত কালের বেশির ভাগ সময় সেখানেই ছিলেন। হযরত উমারের (রা) বাইতুল মাকদাস সফরের সময় তিনি শামে ছিলেন। আনাস থেকে বর্ণিত। উমার ইবনুল খাত্তাব শাম সফরে গেছেন। আবু তালহা ও আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে বললেন আপনার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাছা বাছা সাহাবীরা আছেন। অথচ আমরা পিছনে রেখে এসেছি এক প্রজ্জ্বলিত আগুন। (তাঁরা মহামারি আকারে প্লেগের দিকে ইঙ্গিত করেছে।) আপনি এ যাত্রা শামে প্রবেশ না করে মদীনায় ফিরে যান। উমার ফিরে গেলেন। পরের বছর তিনি এই স্থগিত সফর শেষ করেন। (তারীখে ইবন আসাকির – ৬/৪)
হযরত উমারের (রা) অন্তিম সময়ে আবু তালহা মদীনায় ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার প্রতি খলীফা উমারের (রা) প্রবল আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি যখন জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে পড়লেন, তখন পরবর্তী খলীফা পদের জন্য ছয়জন সর্বজনমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়ন দান করলেন। তারপর আবু তালহাকে ডেকে বললেন আপনাদের দ্বারাই আল্লাহ তায়ালা ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিা করেছেন। আমার মৃত্যুর পর আপনি ৫০ জন আনসারকে সংগে নিয়ে এই ছয় ব্যক্তির কার্যকলাপের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। যদি তাঁদের চারজন এক দিকে যায় আর দুই জন বিরোধিতা করে তাহলে এই দুইজনের গর্দান উড়িয়ে দিবেন। আর তাঁরা সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে যে দলে আবদুর রহমান ইবন আউফ থাকবে না সে দলকে হত্যা করবেন। তিন দিনের মধ্যে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তাদের সকলের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন। আমার মৃত্যুর পর পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আপনিই হবেন অন্তনবর্তীকালীন খলীফা। (কানযুল উম্মাল – ৩/১৫৬, ১৫৭, হায়াতুস সাহাবা-২/৩৪)
হযরত মিসওয়ার ইবন মাখরামর গৃহে ঐ ছয় ব্যক্তির বৈঠক বসলো। আবু তালহা সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে বাড়ীর দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। বনু হাশিম প্রথম থেকেই এই পরামর্শের বিরোধী ছিল। কারণ, তারা ছিল আলীকে (রা) খলীফা বানানোর অভিলাষী। হযরত আব্বাস (রাঃ) সেই সময় চুপে চুপে আলীকে (রা) বলেছিলেন, আপনি নিজের বিষয়টি ঐ লোকদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। আপনি নিজেই ফায়সালা করুন। আলী (রা) কিছু একটা জবাব দিয়েছিলেন। আবু তালহা পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের এ সংলাপ শুনেছিলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি আলীর দৃষ্টি পড়তেই তিনি কিছু একটা যেন চিন্তা করলেন। আবু তালহা তা বুঝতে পেরে বলেছিলেন আবুল হাসান, ভয়ের কিছু নেই।
একদিন এই ছয় ব্যক্তির গোপন বৈঠক চলছে। আবু তালহাও তাঁর বাহিনী নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে। এমন সময় আমর ইবনুল আস ও মুগীরা ইবন শুবা এসে দরজায় বসে পড়েন। আবু তালহা তাঁদেরকে তেমন কিছু বললেন না; তবে সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তিনি ওঁদের দুইজনের ভাব-ভঙ্গিমায় স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি কঙ্কর উঠিয়ে তাঁদের প্রতি নিক্ষেপ করে বললেন এরা এসেছে মদীনায় একথা প্রচার করতে যে, আমরাও শূরার সদস্য ছিলাম। কঙ্কর নিক্ষেপ করায় আমর ও মুগীরা ক্ষ্ব্ধু হন এবং ঝগড়া শুরু করেন। আবু তালহা বিরক্ত হয়ে বললেন ঃ আমার আশংকা হচ্ছে, আপনারা এমন অহেতুক ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে আসল বিষয়টি ছেড়ে না দেন। সেই সত্তার নামে শপথ, যিনি উমারকে মৃত্যু দান করেছেন, আমি তিনদিনের বেশি একটুও সময় দেব না। খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারটি শেষ হওয়ার পর আবু তালহা মন্তব্য করেন খিলাফতের দায়িত্ব লাভের জন্য এই ছয় ব্যক্তি প্রতিযোগিতা করবে, এমন আশংকার চেয়ে আমার বেশি ভয় ছিল তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে না থাকে। কারণ, উমারের মৃত্যুর পর প্রতিটি গৃহে দ্বীন ও দুনিয়ার ঘাটতি দেখা দিয়েছিল।
(হায়াতুস সাহাবা – ২/৪৭৩)
খলিফা নির্বাচনের পর আবু তালহা সম্পূর্ণ নির্জনে চলে যান এবং বাকী জীবন একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দেন। হযরত উম্মু সুলাইমের (রা) গর্ভে আবু তালহার একাধিক সন্তান হয়; কিন্তু তাদের কেউই বেশি দিন বাঁচেনি। তাঁর এক ছেলের নাম ছিল আবু উমাইর। ছোট বেলায় তার ছিল একটি ছোট পাখী। পাখীটি মারা গেল। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাড়ীতে গিয়ে তাকে খুবই বিমর্ষ দেখতে পেলেন। তার এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকৃত ঘটনা খুলে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হাসানোর জন্য একটু কাব্য করে বললেন ইয়া আবা উমাইর, মা ফায়ালান নুগাইর – ওহে আবু উমাইর, তোমার ছোট পাখীটি কী করলো? (হায়াতুস সাহাবা – ২/৫৭০, আল-ইসতীয়াব)
আবু তালহার অন্য একটি ছেলে কিছু দিন রোগ ভোগের পর মারা যায়। ছেলেটির অসুস্থতার মধ্যে আবু তালহা একদিন মসজিদে নববীতে যান এবং তখন সে মারা যায়। উম্মু সুলাইম ছেলের বাবার জন্য অপেক্ষা না করে তাকে দাফন করে দেন এবং বাড়ীতে লোকদের বলেন, তারা যেন ছেলের দাফন-কাফনের কথা আবু তালহাকে না বলে। এদিকে আবু তালহা মসজিদ থেকে আরও কয়েকজন মেহমানসহ বাড়ী ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ছেলে কেমন আছে. ছেলের মা বললেন আগের চেয়ে ভালো। আবু তালহা মেহমানদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। খাবার এলো এবং সবাই এক সাথে বসে খেয়ে নিলেন। মেহমান বিদায় নিলে আবু তালহা ভিতর বাড়ীতে আসলেন। রাতে স্বামী-স্ত্রী এক বিছানায় কাটালেন এবং মিলিত হলেন। শেষ রাতে উম্মু সুলাইম ছেলের মৃত্যুর খবর সহ কাফন-দাফনের কথা প্রকাশ করে বললেন ঃ সে ছিল আমাদের কাছে আল্লাহর এক আমানত। তিনি সেই আমানত ফিরিয়ে নিয়েছেন। এতে কার কি আপত্তি থাকতে পারে? আবু তালহা ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন উচ্চারণ করলেন। তবে এভাবে খবরটি গোপন করাতে তিনি একটু ক্ষুদ্ধ হলেন।
চলবে
