প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১. তাওয়াক্কুল অর্থ মনের প্রগাঢ় নির্ভরতা। মানুষ যার বা যাদের উপাসনা করে, অন্তরের গভীরে তার বা তাদের অতিপ্রাকৃতিক সাহায্য ও রক্ষণাবেক্ষনের আশা করে এবং এই সাহায্যের উপর তার নির্ভরতা থাকে। সে তার উপাস্যের নাম নিয়ে বা তার উপাস্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করে তার কর্ম শুরু করে। এই নির্ভরতা এক প্রকার ইবাদত। কেউ যদি কারো নাম নিয়ে বা কারো অতিপ্রাকৃতিক সাহায্য ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর অন্তরের আস্থা বা নির্ভরতা নিয়ে কোন কর্ম শুরু করেন, তাহলে তিনি তার উপাসক বলে গণ্য হবেন। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না। কুরআন করীমে একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভর করতে, তাওয়াক্কুল করতে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

وَ عَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْنَ

আর মুমিনগণ (বিশ্বাসীগণ) একমাত্র আল্লাহর উপরেই নির্ভর করুক। (সূরা আল ইমরান : ১২২, ১৬০; মাইদা : ১১; তাওবা (বারাআত) : ৫১; ইব্রাহীম : ১১ মুজাদালাহ : ১০, তাগাবুন: ১৩, ইউসুফ : ৬৭, ইব্রাহীম : ১২, যুমার : ৩৮

وَ تَوَكَّلْ عَلَى اللهِ ؕ وَ كَفٰى بِاللهِ وَكِيْلًا

এবং আপনি আল্লাহর উপরে নির্ভর করুন, ভরসা করুন, নির্ভরযোগ্য কর্ম বিধায়ক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা নিসা: ৮১, ও সূরা আহযাব : ৩)

২. অন্যত্র বলা হয়েছে:
اِنْ كُنْتُمْ اٰمَنْتُمْ بِاللهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوْا اِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِيْنَ

তোমরা যদি আল্লাহর উপরে ঈমান এনে থাক, আল্লাহর উপর বিশ্বাস করে থাক, যদি তোমরা মুসলিম হও (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনকারী হও) তাহলে শুধু মাত্র তার উপরেই নির্ভর কর, ভরসা কর। (সূরা ইউনুস: ৮৪)
৩. আল্লাহ আরো বলেছেন:

قُلْ هُوَ رَبِّىْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَ اِلَيْهِ مَتَابِ

আপনি বলুন : তিনিই আমার প্রভু, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই, আমি একমাত্র তার উপরেই নির্ভর (তাওয়াক্কুল) করেছি এবং তার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। (সূরা রাদ : ৩০)
৪. কাজেই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহর ইবাদাতের একত্বে বিশ্বাসকারী কোন অবস্থাতেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর নির্ভর করবেন না। তাঁর অন্তরের প্রগাঢ় নির্ভরতা ও সমর্পণ একমাত্র আল্লাহর উপরেই থাকবে। যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কোন কাজ করেন, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অতিপ্রাকৃতিক সাহায্যের উপর মনের নির্ভরতা রেখে কর্ম শুরু করেন তাহলে তিনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তে বিশ্বাসী বলে গণ্য হবেন না। বরং তিনি যার উপর নির্ভর করলেন, যার নামে তার কর্ম শুরু করলেন তিনি তারই উপাসক।

গায়রুল্লাহকে ভয় করা বা গায়রুল্লাহর কাছে
আশা করা সম্পর্কে আকীদা

১. তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতার সাথে সম্পৃক্ত বিশেষ ইবাদত হলো আশা ও ভয়। আমাদের ভয়-ভীতি আশা-ভরসা ও ভালবাসা দুই প্রকারের: প্রাকৃতিক বা বৈষয়িক ও অতিপ্রাকৃতিক বা ঐশ্বরিক। সাধারণত: প্রাকৃতিক ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ও ভালবাসার সৃষ্টি হয় দুনিয়ার জীবনের বিভ্ন্নি বস্তুগত ও বৈষয়িক কারণে। যেমন আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজন, সন্তান সন্তুতি ও বন্ধু বান্ধবকে ভাল বাসি। হিংস্র বা বিষাক্ত জীব দেখলে ভয় পাই। অনুরূপভাবে পার্থিব জীবনে একে অপরের বিভিন্ন ধরণের উপকারের আশা করি। এ ধরণের পার্থিব ও বৈষয়িক ভয়-ভীতি, আশা-ভরসা ও ভালবাসা মানুষ এবং মানবেতর জীব জানোয়ারের মধ্যে বিরাজমান এবং তা ইবাদতের মধ্যে গণ্য নয়।

২. পক্ষান্তরে মানুষ যখন কোন ব্যক্তি, সত্ত্বা বা শক্তিকে প্রগাঢ়ভাবে ভ্িক্ত করে, স্বাভাবিক মানবীয় বা প্রাকৃতিক শক্তির ঊর্ধ্বে তাকে শক্তিমান বলে বিশ্বাস করে, অর্থাৎ বিশ্বাস করে যে, তিনি অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী, তিনি ইচ্ছা করলেই কল্যাণ বা অকল্যাণ, উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন, তখন ঐ মানুষের মনে ঐ ব্যক্তি, সত্ত্বা বা শক্তির প্রতি ভয় ও আশার সঞ্চার হয়। এই অতিপ্রাকৃতিক ভয়-ভীতি ও আশা-ভরসা ইবাদত বলে গণ্য যা একমাত্র আল্লাহর নিমিত্ত নির্ধারিত।

৩. কুরআন করীমে বলা হয়েছে:
فَاِيَّاىَ فَارْهَبُوْنِ

অতএব তোমরা একমাত্র আমাকেই ভয় কর। (সূরা নাহল : ৫১)

৪. অন্যত্র মুমিন বা বিশ্বাসীদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে:

اِنَّمَا يَعْمُرُ مَسٰجِدَ اللهِ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَ الْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَ اَقَامَ الصَّلٰوةَ وَ اٰتٰى الزَّكٰوةَ وَ لَمْ يَخْشَ اِلَّا اللهَ  فَعَسٰۤى اُولٰٓئِكَ اَنْ يَّـكُوْنُوْا مِنَ الْمُهْتَدِيْنَ

আল্লাহর মসজিদসমূহকে আবাদ করে তারাই যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন, আখেরাতের প্রতি ঈমান এনেছেন, সালাত (সালাত) কায়েম করেন, যাকাত প্রদান করেন এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেন না। আশা করা যায় এরা সুপথপ্রাপ্ত হবেন। (সূরা তাওবা: ১৮)