প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৬৯ : একজন সুস্থ মানুষ কতোটুকু আহার গ্রহণ করলে তার স্বাস্থ্য ভালো বা অটুট থাকবে এবং সহসা তার কোনো রোগ-ব্যাধি হবে না?
উত্তর : এ প্রশ্নের জবাব আমি সহীহ হাদীস থেকে দেবার চেষ্টা করবো। হাদীসটি বর্ণনা করেন ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে। মিকদাম ইবনে মাদীকারিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে খারাপভাবে আর কোনো পাত্রই পূর্ণ করেনা। মানুষের জন্য কোমর সোজা রাখার লক্ষ্যে কয়েক লোকমা বা সামান্য খাদ্যই যথেষ্ট। আর যদি একান্তই বেশি খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যদ্রব্য, আর এক-তৃতীয়াংশ পানীয় বা পানি দিয়ে পূর্ণ করবে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি হবে। (হাদীসটি মুসনাদে আহমদ, আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ শরীফে উল্লেখ আছে)
হাদীসটির ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে, \’The son of Adam never fills a vesel worse than his stomach. The son of Adam only needs for requires a few bitesto sustain him, so that he does not loose his strength and become inactive. If one intends to exceed the minimum requirements, he should ensure that one third of his stomach is filled with food, one third for water or drink and the remaining one third for breathing.\’ (Musnade Ahmad, At-Tirmizi and Ibn Majah)
ঠিক এই হাদীসের অনুরূপ আরেকটি বর্ণনা এসেছে A Medical History of Persia and the Eastern Caliphate\’ নামক বইয়ে। বইটি লিখেছেন C. Elgood in 1951. Oxcford University Press বইটি Publish
করেছে।
পারস্যের এক রাজা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক পাঠান। তিনি প্রায় ১ থেকে ২ বছর মদীনা শরীফৈ ছিলেন। কিন্তু এ সুদীর্ঘ সময়ে কোনো রোগী চিকিৎসার জন্য তার শরণাপন্ন হয়নি। অবশেষে তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাজির হয়ে অভিযোগ করলেন, আমাকে আপনার সহকর্মীদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে অসুস্থতার কারণে কেউই আমার শরণাপন্ন হয়নি বা আমার ব্যবস্থাপত্র নিতে আসেননি। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখানকার লোকদের অভ্যাস হচ্ছে, ক্ষুধা না লাগলে তারা খাবার গ্রহণ করেন না এবং খাবারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এক পর্যায়ে তারা খাওয়া বন্ধ করে থাকে। তখন চিকিৎসক বললেন, এটিই তাদের সুন্দর স্বাস্থ্যের মূল কারণ। That is the perfect reason of their excellent health চিকিৎসকটি তখন পবিত্র মাটিকে চুমু দিলেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সে স্থান থেকে বিদায় নিলেন। বস্তুত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে সাহাবায়ে কিরামের স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত ভালো ছিলো। তারা যখন তখন অসুস্থ হতেন না। ইতিহাস বলে যে, ঐ সময়ের লোকদের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আমাদের সময়ের লোকদের স্বাস্থ্যের অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। ঐ সময়ের লোকেরা সামনা-সামনি যুদ্ধ করতেন তলোয়ার দিয়ে, যেখানে অনেক কৌশল ও দৈনিক শক্তির প্রয়োজন হতো। সামান্য কয়েকটি খেজুরই তাদের সেই শক্তি জোগাতো।
প্রশ্ন-৭০ : মুহতারাম, একটু আগে যে হাদীসটি আলোচনা করলেন যে খাদ্য গ্রহণের সময় পেটের ১৩ অংশ খালি রাখা। বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে বলুন, যাতে সবাই, বিশেষ করে গ্রামের মানুষগণ বুঝতে পারে যে মানুষের কতোটুকু খাদ্য গ্রহণ করা উচিত?
উত্তর : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাওয়ার সময় পেটের ১৩ ভাগ খাদ্যদ্রব্য এবং ১৩ অংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করতে বলেছেন। আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতে বলেছেন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বা বাতাসের জন্য। সত্যি, কী সুন্দর শিক্ষা! এ শিক্ষাটিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান পরোপুরি সমর্থন করে। এবার দেখি হাদীসটির ভাষ্যের সাথে বিজ্ঞানের মিল কতটুকু, অর্থাৎ বিজ্ঞান এই হাদীস সম্পর্কে কি বলেন? আমরা যারা শহরে থাকি, তাদের প্রায় অনেকের বাসায় blender বা লিকুইডাইজার থাকে ফলমূল থেকে শরবত তৈরি আর পেঁয়াজ-রসুন-আদা একত্রে মিশিয়ে আধা তরল মিশ্রণ তৈরি করার জন্য, যা তরকারি রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আপনি যদি blender-এ কানায় কানায় পেঁয়াজ, রসুন, আদা ইত্যাদি ভর্তি করেন এবং পানি না দেন, তাহলে কি blender-এর বেলড ঘুরবে বা blender কাজ করবে? কতোটুকু খালি রাখলে বা কতোটুকু পানি দিলে ভেতরের sharp blade গুলো ঘুরবে, আর দ্রুত ঘুরে পেঁয়াজ-রসুনকে মিহি করে সামান্য পানির সাহায্যে মিশ্রিত করে একটি আধা তরল মিশ্রণ তৈরি করবে, তা নিশ্চয়ই আমাদের গৃহিনীগণ জানেন। আপনি নিজেও blender-এর catalogue থেকে জেনে নিতে পারেন।
তেমনি মানুষের পেট একটি blender বা reaction tank যেখানে নানাবিধ খাবার, কঠিন ও তরল জাতীয় একত্রে থাকে। হজমসহ অনেক ধরনের Physiological process এখানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পেট যদি শুধু খাবার দিয়ে পূর্ণ করেন আর পানি বা বাতাসের জন্য জায়গা না রাখেন, তখন হজম প্রক্রিয়া কি স্বাভাবিকভাবে চলবে? কখনই চলবে না। আমার বিশ্বাস সকল জ্ঞানী ব্যক্তিই আমার এ যুক্তির সাথে একমত হবেন।
পরিশেষে সম্মানিত পাঠকদের নিকট বিনীত অনুরোধ জানাব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথ যদি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক হয়, তবে কেনো তা পুরোপুরি অনুসরণ করবো না বা সমাজে চালু করবো না? এখানে দু টো উপকার পাওয়া যাবে। এক, আপনার স্বাস্থ্য অটুট থাকবে, আপনি সর্বদা সুস্থ ও ভালো থাকবেন, আপনি সহসা অসুস্থ হবেন না। দ্বিতীয়ত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস পালন করার জন্য আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে আপনাকে সাহায্য করবেন ও পুরস্কৃত করবেন।
প্রশ্ন-৭১ : পরিমিতখাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের পাশাপাশি আর কী কী গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা এসেছে? মেহেরবানী করে বলুন?
উত্তর : বিখ্যাত আরবীয় চিকিৎসক হারিস ইবনে কালাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, \’What is the best medicine?\’ অর্থাৎ সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ওষুধ কী? তিনি উত্তরে বলেন, Necessity. অর্থাৎ প্রয়োজন, মানে ক্ষুধা বা Hunger. যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রোগ কী? তখন তিনি উত্তর দেন \’Entry of food upon food\’` বা খাবারের পর খাবার গ্রহন অর্থাৎ অতি ভোজন।এই রিওয়ায়েতটি আস সুয়ুতী রহঃ বর্নণা করেছেন। (আস সুয়ুতী,আহার ও শিষ্টাচার পৃঃ১২)
হারিস ইবনে কালাদাহ (রাঃ) বলেন ক্ষুধাই রোগ নিরাময়ের উপায়। Hunger is a care. কথা গুলো ভাল ভাবে উপলব্ধি করুন।অপরদিকে Hppocrates বলেন \’All excess is contrary to the laws of nature. Let your eating, your drinking, your sleeping and your sexual intercourse, all be in moderation\’ (As-Suyuti)209
ইবনে সীনা বলেন, \’Never have a meal until the one before it has been digested.\’ অর্থাৎ আগের খাবার হজম না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় খাদ্য গ্রহণ করো না। (আস্-সুয়ূতী)
হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, \’Avoid a no-belly, for it spoils the body.\’ causes disease and makes doing prayer tiring. Make use of bloodletting, for this puts the body right. Avoid all excess, for Allah hates a learned man who is fat/; (As-Suyuti)
এ রিওয়ায়াতটি আস-সূয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও আবু নুয়াইম রহমাতুল্লাহি আলাইহি রচিত তিব্বুন নববী হাদীস গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করেছে। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাল্লাম বলেছেন, দুনিয়াতে যারা বেশি পরিতৃপ্ত হবে (উদরপূর্ণ করে আহার করবে), কিয়ামতের দিনে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে। (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ্)
সম্মানিত পাঠক! মানুষের পেট ও খাবারই হচ্ছে সকল প্রকার অসুস্থতা ও রোগ-ব্যাধির উৎস তা আমরা এ আলোচনা থেকে জানলাম। উপরোক্ত সবগুলো বর্ণনাই অতি ভোজনের কুফল সম্পর্কে ইঙ্গিত বহন করেছে। বস্তুত সুষম খাবার সঠিক পরিমাণে না খেলেই মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে। অপরদিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহারের কারণে হজমের সমস্যা ও অন্যান্য ব্যাধির লক্ষণ দেখা দেয়। বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষ হঠাৎ অতিরিক্ত ও চর্বি জাতীয় খাবার খেয়ে পরদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে বলে যে food poisoning বা খাবারে বিষক্রিয়া হয়েছে।
মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকা কী পরিমাণ খাবার খাবে তার উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে খাদ্যদ্রব্যের গুণগত মানের উপর। সম্ভবত এ কারণেই প্রখ্যাত আরবীয় ডাক্তার হারিস ইবনে কালাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, খাদ্যদ্রব্য বা পথ্যই উৎকৃষ্ট রোগ নিরাময়। পেট হচ্ছে সকল প্রকার অসুখের কেন্দ্রবিন্দু। প্রত্যেককে তার অভ্যাস ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত খাবার ও ওষুধ দাও। (ইবনুল কাইয়িম)
