প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ وَلَسْتُمْ بِآخِذِيهِ إِلَّا أَنْ تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করো এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না; কেননা, তা তোমরা কখনো গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও! জেনে রেখো, আল্লাহ অভাবমুক্ত, গুণী। (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

হে ঈমানদারগণ! স্বীয় উপার্জন থেকে উত্তম বস্তু (সৎকাজে) ব্যয় করো এবং তা (উত্তম বস্তু) থেকে যা আমি তোমাদের (ব্যবহারের) জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি এবং অকেজো বস্তু ব্যয় করতে মনস্থ করো না, অথচ (এমন বস্তুই যদি কেউ তোমাদেরকে প্রাপ্যের বিনিময়ে কিংবা উপঢৌকনরূপে দিতে চায়, তবে) তোমরা কখনো তা নেবে না; কিন্তু চক্ষু বুজে (এবং খাতিরে যদি নিয়ে নাও, তবে ভিন্ন কথা) এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন, (যে, তিনি এমন অকেজো বস্তুতে সন্তুষ্ট হবেন, তিনি) প্রশংসার যোগ্য (অর্থাৎ সত্তা ও গুণাবলিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অতএব তাঁর দরবারে প্রশংসার যোগ্য বস্তুই পেশ করা দরকার)।

বিস্তারিত জ্ঞাতব্য বিষয়

আল্লাহর পথে উত্তম বস্তু খরচ করা আবশ্যক

পূর্ববর্তী রুকুতে আল্লাহর পথে ব্যয় করার বর্ণনা ছিল। এখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি আলোচ্য রুকুর সাতটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এর বিবরণ নিম্নরূপ :

এই আয়াতের শানে নুযূলের-দৃষ্টি طيب শব্দের অর্থ করা হয়েছে উৎকৃষ্ট । কেউ কেউ দান করার জন্য নিকৃষ্ট বস্তু নিয়ে আসতো; এর পরিপ্রেক্ষিতেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। কোনো কোনো তাফসীরকার শব্দের ব্যাপকতা দৃষ্টে এর অর্থ করেছেন হালাল । কেননা, মাল পূর্ণরূপে উৎকৃষ্ট তখনই হয়, যখন তা হালালও হয়। এ তাফসীর দ্বারা এও প্রমাণিত হয় যে, খয়রাতের মাল হালাল এবং উৎকৃষ্ট, দুটোই হওয়া শর্ত।

যার কাছে উত্তম মাল নেই, সে কী করবে?

মনে রাখা দরকার যে, আয়াতে উৎকৃষ্ট মাল দেওয়ার নির্দেশ ঐ ব্যক্তির জন্য, যার কাছে উৎকৃষ্ট বস্তু থাকা সত্ত্বেও মন্দ ও নিকৃষ্ট বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করে مَا كَسَبْتُمْ ও أَخْرَجْنَا শব্দ দ্বারা বোঝা যায় যে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে অকেজো জিনিস ব্যয় করে। পক্ষান্তরে সে ব্যক্তির কাছে মূলত উৎকৃষ্ট বস্তুই নেই, সে এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। সে নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করলেও গ্রহণীয় হবে।ও

পুত্রের উপার্জন থেকে পিতার খাওয়ার হুকুম

مَا كَسَبْتُمْ শব্দ থেকে কোনো কোনা আলিম মাসআলা চয়ন করেছেন যে, পিতা পুত্রের উপার্জন ভোগ করতে পারে, এটা জায়েয। কেননা, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের উপার্জনের একটি পূত-পবিত্র অংশ। অতএব, তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে সন্তান-সন্ততির উপার্জন ভক্ষণ করো। (কুরতুবী)]

উশর-বিধি

مِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ এই বাক্যে أَخْرَجْنَا শব্দ দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, উশরী জমিনে (যে জমিনের উৎপন্ন শস্যের এক-দশমাংশ ইসলামী বিধান অনুযায়ী যাকাতের ন্যায় দান করতে হয়। যে ফসল উৎপন্ন হয়, তার এক-দশমাংশ দান করা ওয়াজিব। আয়াতের ব্যাপকতাদৃষ্টে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন যে, উশরী জমিনে ফল অল্প হোক বা বেশি হোক, উশর দেওয়া ওয়াজিব। সূরা আন আমের واتو حقه يوم حصادة আয়াতটি উশর ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশসূচক।

ঈমানদারগণকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয়ের নির্দেশ

উশর ও খেরাজের অর্থ ও দুয়ের পার্থক্য

উশর ও খেরাজ ইসলামী শরীয়তের দুটি পারিভাষিক শব্দ। এ দুয়ের মধ্যে একটি বিষয় অভিন্ন। উভয়টিই ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভূমির উপর আরোপিত কর। পার্থক্য এই যে, উশর শুধু কর নয়, এতে আর্থিক ইবাদতের দিকটিই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; যেমন : যাকাত। এ কারণেই উশরকে যাকাতুল-আরদ বা ভূমির যাকাতও বলা হয়। পক্ষান্তরে খেরাজ নিরেট কর। এতে ইবাদতের কোনো দিক নেই। মুসলমানরা ইবাদতের যোগ্য ও অনুসারী। তাই তাদের কাছ থেকে ভূমির উৎপন্ন ফসলের যে অংশ দেওয়া হয়, তাকে উশর বলা হয়। অমুসলিমরা ইবাদতের যোগ্য নয়। তাই তাদের ভূমির উপর যে কর ধার্য করা হয়, তাকে খেরাজ বলা হয়।

উশর ও যাকাতের পার্থক্য

যাকাত ও উশরের মধ্যে কার্যগত আরও পার্থক্য এই যে, স্বর্ণ, রৌপ্য ও পণ্যদ্রব্যের উপর বছরান্তে যাকাত ওয়াজিব হয়, কিন্তু উশরী জমিনে উৎপাদনের সাথেই উশর ওয়াজিব হয়ে যায়।
দ্বিতীয় পার্থক্য এই যে, জমিনে ফসল উৎপন্ন না হলে উশর দিতে হয় না। কিন্তু পণ্যদ্রব্য ও স্বর্ণ-রোপ্যে মুনাফা না হলেও বছরান্তে যাকাত ফরয হবে। উশর ও খেরাজের বিস্তারিত মাসআলা বর্ণনার স্থান এটা নয়। ফিকহ গ্রন্থসমূহে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ দ্রষ্টব্য।
[সূত্র : তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খ-, পৃষ্ঠা : ৬৩৬-৬৪০]