প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

আনাস ইবন মালিক ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী, খাদিমে রাসূল, ইমাম, মুফতী, মুয়াল্লিমে কুরাআন, মুহাদ্দিস, খ্যাতিমান রাবী, আনসারী, খাযরাজী ও মাদানী। কুনিয়াত আবু সুমামা ও আবু হামযা। খাদিমু রাসূলিল্লাহ লকব বা উপাধি। (দায়িরা-ই-মায়ারিফ ইসলামিয়া-৩/৪০২, তাজকিরাতুর হুফফাজ-১/৪৪)। আনাস বলতেন ঃ আমি হামযা নামক এক প্রকার সবজী খুটতাম, তাই দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর করে আমাকে ডাকতেনঃ ইয়া আবা হামযা। সে দিন থেকেই এটাই আমার কুনিয়াত বা ডাকনাম হয়ে যায়। (তারীখে ইবন আসাকির-৩/১৪১) ইয়াসরিবের (আল-ইসাবা-১/৭১) বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখায় হিজরাতের দশ বছর পূর্বে ৬১২ খ্রীস্টাব্দে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। (আল-আলাম-১.৩৬৫ আল ইসাবা-১/৭১) এই গোত্রটি ছিল আনসারদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত। আনাসের পিতা মালিক ইবন নগর এবং মাতা উম্মু সুলাইম সালহা বিনতু মিলহান আল-আনসারিয়্যা। উম্মু সুলাইম বিনতু আমর ইবন আমির ইবন হাতেম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা সালমা বিনতু আমর ইবন আমির ইবন গানাম-এ গিয়ে আনাসের মার বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ১/১২৭, আসাহহুল সীয়াব-৬০৬)

উম্মু সুলাইমের আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যেমন : সাহলা, রুমাইলা, রুমাইসা, সুলাইকা, আল-ফায়সা ইত্যাদি। (সীরাতুন ইবন হিশাম-২/৩৪০) আনাসের চাচা আনাস ইবন নাদর উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। কাফিররা কেটে কুটে তাঁর দেহ বিকৃত করে ফেলেছিল। তাঁর দেহ মোট আশিটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাঁর এক বোন ছাড়া আর কেউ সে সনাক্ত করতে পারেনি। আনাস বলতেন, আমার এ চাচা আনাসের নামেই আমার নাম রাখা হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৮৩ হায়াতুস সাহাবা-১/৫০৪, ৫০৫) আনাসের মামা হারাম ইবন মিলহাব বিরে মাউনার দুঃখজনক ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেন। (দায়িরা-ই-মায়ারিফ ইসলামিয়্যা-৩/৪০২) আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করে। এ কারণে তাঁর পিতা ক্ষোভ ও ঘৃণায় শামে চলে যায় এবং এবং সেখানে কুফরী অবস্থায় মারা যায়। মা আবু তালহাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। আবু তালহা ছিলেন খাযরাজ গোত্রের একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। মা বালক আনাসকেও সাথে করে আবু তালহার বাড়ীতে নিয়ে যান। আনাস এখানেই প্রতিপালিত হন।

আবু তালহার সাথে তাঁর মার বিয়ে সম্পর্কে আনাস বর্ণনা করেছেন: আবু তালহা যখন উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। উম্মু সুলাইম বললেন ঃ আবু তালহা তুমি কি জানো, যে ইলাহর ইবাদত তুমি কর তা মাটি দিয়ে তৈরী? বললেনঃ হাঁ, তা জানি। উম্মু সুলাইম আরও বললেন ঃ একটি গাছের ইবাদত করতে তোমার লজ্জা হয় কেন? তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তোমাকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই এবং তোমার কাছে কোন মোহরের দাবীও আমার থাকবে না। আমি ভেবে দেখবো এ কথা বলে আবু তালহা উঠে গেলেন। পরে ফিরে এসে তিনি উচ্চারণ করলেন ঃ আশহাদু আন লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহা নেই। মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তখন উম্মু সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেন ঃ আনাস, তুমি আবু তালহার বিয়ের কাজটি সমাধা কর। আনাস তাঁর মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৯৫,১৯৬)

মদ হারাম হওয়ার পূর্বে আবু তালহার বাড়ীতে মদ পানের আসর বসতো। বালক আনাস সেই আসরে সাকীর দায়িত্ব পালন করতেন এবং নিজেও মদের অভ্যাস করতেন। এই বালককে মদ পান থেকে বিতর রাখার কেউ ছিল না। (মুসনাদ-৩/১৮১)

আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন মদীনায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়ে যায়। ইসলাম কবুলের ব্যাপারে বনু নাজ্জার গোত্র সবার আগে ভাগেই ছিল। এ খান্দানের বেশির ভাগ সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় আসার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আনাসের মা উম্মু সুলাইম ও তৃতীয় আকাবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পূর্বেই বলা হয়েছে উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর স্বামী অর্থাৎ আনাসের পিতা স্ত্রী ও সন্তান ত্যাগ করে শামে চলে যায়। স্বামী পরিত্যক্তা উম্মু সুলাইম আবু তালহাকে বিয়ে করতে রাজী হন এবং এশর্তে যে, তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে উম্মু সুলাইমের চেষ্টায় আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় যান এবং তৃতীয় আকাবায় শরীক হয়ে রাসূলুল্লাহর হাতে (স) বাইয়াতের গৌরব অর্জন করেন। এভাবে আনাসে বাড়ী ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। তাঁর জান্নাতী মা উম্মু সুলাইম ইসলামের এক আলোক বর্তিকা, আর তাঁর স্বামী দ্বীনের এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। এমনই এক আশ্রয়ে আনাস বেড়ে ওঠেন। আনাস যখন দশ বছরের বালক তখন হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসেন। আনাসের বয়স অল্প হলেও তিনি খুবই উৎসাহী ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন বার্তা পৌছে দিয়েছিলেন। এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ থেকে ভীড় একটু কম হলে আনাস তাঁর চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং সাহাবিয়্যাতের মর্যাদা লাভে ধন্য হন।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আসেন প্রসিদ্ধ মতে আনাসের বয়স তখন দশ বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু স্থির হওয়ার পর আনাসের মা একদিন তাঁর হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে যান। এ সম্পর্কে আনাস বলেন ঃ আমার মা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেলেন ঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আনসারদের প্রত্যেক নারী-পুরুষ আপনাকে কিছু না কিছু হাদিয়া দিয়েছে। আমি তো তেমন কিছু দিতে পারছিনা। আমার এ ছেলেটি আছে, সে লিখতে জানে। এখনও সে বালেগ হয়নি। আপনি একেই গ্রহণ করুন। সে আপনার খিদমাত করবে। সেই দিন থেকে আমি একাধারে দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খিদমাত করেছি। এর মধ্যে কখনও তিনি আমাকে মারেননি, গালি দেননি, বঝাঝকা করেননি এবং মুখও কালো করেননি। তিনি সর্ব প্রথম আমাকে এই অসীয়তটি করেন ঃ ছেলে, তুমি আমার গোপন কথা গোপন রাখবে। তা হলেই তুমি ঈমানদারদের হবে। আমার মা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মীণীগণ কখনও আমার কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন কথা জিজ্ঞাসা করলে, বলিনি। আমি তাঁর কোন গোপন কথা কারও কাছে প্রকাশ করিনি। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু তালহা তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যান। (তারীখে ইবন আসাকির ৩/১৪১; আনসাবুল আশরাফ-১/৫০৬, আল -ইসাবা) হযরত আনাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় দশ বছর অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে তাঁর খিদমাতের দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য তাঁর গর্বের শেষ ছিল না। ফজর নামাযের পূর্বেই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমাতে হাজির হয়ে দুপুরে বাড়ী ফিরতেন। কিছুক্ষণ পর আবার আসতেন এবং আসরের নামায আদায় করে বাড়ী ফিরতেন। আনাসের মহল্লায় একটি মসজিদ ছিল, সেখানে মুসল্লীরা তাঁর অপেক্ষায় থাকতো। তাঁকে দেখে তারা আসরের নামায়ে দাঁড়াতো। (মুসনাদে আহমাদ-৩/২২২)

উপরোক্ত সময় ছাড়াও তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে কোন নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। যখনই প্রয়োজন পড়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দুপুরে বাড়ীর দিকে চলছেন। পথে দেখলেন, তাঁরই সমবয়সী ছেলেরা খেলছে। তাঁর কাছে খেলাটি ভালো লাগলো। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন তাদের খেলা দেখতে। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দিকে আসছেন। তিনি এসে প্রথমে ছেলেদের সালাম দিলেন, তারপর আনাসের হাতটি ধরে তাঁকে কোন কাজে পাঠালেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অপেক্ষায় একটি দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আনাস কাজ সেরে ফিরে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ীর দিকে ফিরলেন, আর তিনি চললেন বাড়ীর দিকে। ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরী হলো কেন? তিনি বললেন ঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি গোপন কাজে গিয়েছিলাম। এই জন্য ফিরতে দেরী হয়েছে। মা মনে করলেন, ছেলে হয়তো সত্য গোপন করছে, এই জন্য জানতে চাইলেন, কী কাজ? আনাস জবাব দিলেন, একটি গোপন কথা, কাউকে বলা যাবে না। মা বললেন ঃ তাহলে গোপনই রাখ কারও কাছে প্রকাশ করোনা। আনাস আজীবন এ সত্য গোপন রেখেছেন। একবার তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র সাবিত যখন সেই কথাটি জানতে চাইলেন তখন তিনি বললেন, কথাটি কাউকে জানালে তোমাকেই জানাতাম। কিন্তু আমি তা কাউকে বলবো না। (আল- ফাতহুর রাব্বনী মায়া বুলুগুল আমানী-২২/২০৪, হায়াতুস সাহাবা-০১/৩৪৩,২/৫০৩)

হযরত আনাস সব সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে থাকতেন। আবাসে-প্রবাসে, ভিতরে-বাইরে কোন বিশেষ স্থান বা সময় তাঁর জন্য নির্ধারিত ছিল না। হিজাবের আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি স্বাধীনভাবে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে যাতায়াত করতেন। আনাস বলেন ঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে আসতাম এবং অন্দর মহলে আযওয়াজে মুতাহহারাতদের কাছেও যেতাম। একদিন আমি অন্দরে প্রবেশ করতে যাব, এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকলেন : আনাস, পিছিয়ে এস। হিজাবের আয়াত নাযিল হয়ে গেছে। (আনাসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৪) আনাস আরও বলেন ঃ আমি যে দিন বালেগ হলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সে কথা জানালাম। (তিনি বললেন ঃ এখন থেকে অনুমতি ছাড়া মেয়েদের কাছে যাবে না। আনাস বলেন ঃ সেই দিনটির মত কঠিন দিন আমার জীবনে আর আসেনি। (তারীখে ইবন আসাকির- ৩/১৪৪)

একদিন ফজরের নামাযের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আজ রোজা রাখার ইচ্ছা করেছি, আমাকে কিছু খাবার দাও। আনাস খুব তাড়াতাড়ি কিছু খুরমা ও পানি হাজির করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই দিয়ে সেহরী সেরে ফজরের নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। (মুসনাদ-৩/১৯৭) ওয়াকিদী বলেন ঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদিমদের মধ্যে যারা তার দরজা থেকে দূরে যেত না তাদের মধ্যে আনাস একজন। আবু হুরাইরা (রা) বলতেন ঃ আমি তো মনে করতাম আনাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাস। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪৮৫)

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে আবু আইউব আল আনাসারীর (রা) অতিথি হন। সেই সময় তিনি আনাসের পিতা মালিক ইবন নাদরের কুয়োর পানি সবচেয়ে বেশী তৃপ্তি সহকারে পান করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু আইউবের বাড়ী থেকে নিজের বাড়ীতে চলে গেলে আনাস সেই কুয়োর পানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বয়ে নিয়ে আসতেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৫৩৫)

হযরত আনাস অত্যন্ত নিপুণতার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কাজ সম্পাদন করতেন। আনুগত্যের মাধ্যমে সর্বক্ষণ তাঁকে খুশী রাখতেন। তিনি নিজেই বলেন ঃ আমি দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমাত করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কক্ষণও আমার ওপর নারাজ হননি। আমার কোন কাজের জন্য কক্ষণও বলেননি ঃ কাজটি তুমি কেন করলে? অথবা তুমি ভুল করেছ বা যা করেছ, খুবই খারাপ করেছ- এমন কথাও আমার কোন ভুলের জন্য তিনি বলেননি। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪৬৪, ৫০৬) এভাবে আনাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে এক বিশেষ স্থান দখল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্নেহভরে কখনও ছেলে আবার কখনও উনাইস বলে ডাকতেন। তিনি মাঝে মধ্যে আনাসদের বাড়ীতে যেতেন, আহার করতেন, দুপুরের সময় হলে বিশ্রাম নিতেন, নামায আদায় করতেন এবং আনাসদের জন্য দু আও করতেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। (আল -ফাতাহুল রাব্বানী-২২/২০৩) আসান বলেনঃ একদিন আবু তালহা আমার মা উম্মু সুলাইমকে বললেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কণ্ঠস্বর একটু দুর্বল শুনতে পেলাম। মনে হলো তিনি ক্ষুধার্ত। তোমার কাছে কোন খাবার আছে কি? মা বললেনঃ আছে। তিনি কয়েক টুকরো রুটি আমার কাপড়ে জড়িয়ে দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠালেন। আমাকে দেখেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন ঃ আবু তালহা পাঠিয়েছে? বললাম, হাঁ। বললেন ঃ খাবার? বললাম ঃ হাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথের লোকদের বললেন ঃ তোমরা ওঠো। তাঁরা চললেন, আমি তাদের আগে আগে চললাম। আবু তালহা সকলকে দেখে স্ত্রীকে ডেকে বললেন ঃ উম্মু সুলাইম, দেখ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজন সংগে করে চলে এসেছেন। সবাইকে খেতে দেওয়ার মত খাবার তো নেই। উম্মু সুলাইম বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কথা ভালোই জানেন। আবু তালহা অতিথিদের নিয়ে বসালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ঢুকে বললেন ঃ যা আছে নিয়ে এসো। সামান্য খাবার ছিল, তাই হাজির করা হলো। তিনি বললেন ঃ প্রথমত দশজনকে আসতে বল। দশ জন ঢুকে পেট ভরে খেয়ে বের হয়ে গেল। তারপর দশ জন। এ ভাবে মোট সত্তুর জন লোক পেট ভরে সেই খাবার খেয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা-২/১৯৪)

আনাস আরও বলেন, আমার মা উম্মু সুলাইমের আবু তালহার পক্ষের আবু উমাইর নামে একটি ছোট ছেলে ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীতে এলে তার সাথে একটু রসিকতা করতেন। একদিন দেখলেন আবু উমাইর মুখ ভারে করে বসে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আবু উমাইর এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছে কোন? মা বললেনঃ তার খেলার সাথী নুগাইর টি মারা গেছে। তখন থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখলে কাব্য করে বলতেনঃ ইয়া আবা উমাইর- মা ফা য়ালান নুগাইর- ওহে আবু উমাইর তোমার নুগাইরটি কি করলো? উল্লেখ্য যে, নুগাইর লাল ঠোট বিশিষ্ট চড়–ই-এর মতো এক প্রকার ছোট্ট পাখী। (তারীখে ইবন আসাকির-৩/১৩৯, হায়াতুস সাহাবা-২/৫৭০,৫৭১)

আনাসদের বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরআনের বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী নাযিলের সময় ঘেমে যেতেন আর তাঁরা সেই ঘাম সংরক্ষণ করতেন। আনাস বলেনঃ একদিন দুপুরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়ীতে এসে বিশ্রাম নিলেন এবং ঘেমে গেলেন। আমার মা একটি বোতল এনে সেই ঘাম ভরতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেড়ে উঠে বললেন ঃ উম্মু সুলাইম, একি করছো? মা বললেন ঃ আপনার এই ঘাম আমাদের জন্য সুগন্ধি। আনাস বলতেন ঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুগন্ধি থেকে অধিকতর সুগন্ধিযুক্ত মিশক অথবা আম্বার আমার জীবনে আর শুকিনি। (তারিখে ইবন আসাকির-৩/১৪৪,১৪৫)

আমরা আগেই বলেছি, আনাসদের কল্যাণময়ী মা সম্পর্কে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খালা) তিনি অন্তর দিয়ে তাঁকে ভালোবাসতেন, ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর কথা কখনও বিস্মৃত হননি। এই সম্মানিত মহিলাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন। (দায়িরা -ই-মা য়ারিফ ইসলামিয়্যা (উদু)-৩/৪০২) খাইবার যুদ্ধে হযরত সাফিয়া (রা) বন্দী হলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে শাদী করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাফিয়্যাকে উম্মু সুলাইমের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনিই বিয়ের সকল ব্যবস্থা সম্পাদন করলেন। এ সম্পর্কে ইবন ইসহাক বলেনঃ খাইবারে অথবা খাইবার থেকে ফেরার পথে হযরত সাফিয়্যার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাদী মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। আনাসের মা উম্মু সুলাইম তাঁর সাজানো, চুল বাঁধা ইত্যাদি যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৩৯,৩৪০, আনসাবুল আশরাফ-১/৪৪৩)

এমনিভাবে হযরত যয়নবের সাথে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিয়ে হয় তখনও উম্মু সুলাইম কিছু খাবার তৈরী করে পাঠান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের দা ওয়াত দিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করে সেই খাবার পরিবেশন করেন। (মুসনাদে আহমাদ-৩/১৬৩)

ই সব বৈশিষ্ট্যসহ আনাসকে নবী খান্দানের একজন সদস্যে পরিণত করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে হালকা মিযাজ হয়ে যেতেন। এই যেমন তাঁকে ডাকলেন, আবু হামযা বলে। একবার তো ডাকলেন, ইয়া জাল উজনাইন-ওহে দুই কান ওয়ালা বলে। (উসুদুল গাবা-১/১২৭)

আমরা পূর্বেই দেখেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আনাসের কত গভীর সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের কারণেই ঘরে- বাইরে, আবাসে-প্রবাসে সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে থাকতেন। যুদ্ধের ময়দানেও সেই সংগ ত্যাগ করেননি। বদর যুদ্ধের সময় আনাসের বয়স এমন কিছু হয়নি। মাত্র বারো বছর। তাসত্ত্বেও মুসলিম মুজাহিদদের পাশাপাশি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবা ও সৈনিকদের সাজ-সরঞ্জাম ও মাল-সামান দেখার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বয়স অতি অল্প থাকার কারণে তাঁর এ যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে পরবর্তীকালে অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। একবার তো সংশয়ের সূরে এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেই বসেঃ আপনি কি বদরে হাজির ছিলেন? জবাব দিলেনঃ আমি কীভাবে গায়ের হাজির থাকতে পারি?(আল-ইসাবা-১/৭১, দায়িরা-ই- মা য়ারিফ ইসলামিয়্যা-৩/৪০২)

বদরের এক বছর পর উহুদ যুদ্ধ হয়। তখনও আনাস অল্প বয়স্ক। হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদাইবিয়ার বাইয়াতে শাজারার গৌরব অর্জন করেন। তখন তাঁর বয়স ষোল বছর। যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। হিজরী সপ্তম সনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরাতুল কাদা (কাজা উমরাহ) আদায় করেন। আনাস সংগে ছিলেন। এ বছরই খাইবার বিজিত হয়। এই অভিযানে আনাস আবু তালহার সাথে উটের পিঠে সাওয়ার ছিলেন। এক পর্যায়ে বিজয়ীদের বেশে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র পা স্পর্শ করে। এর ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইযার হাটুর ওপর উঠে যায় এবং তা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। (মুসনাদে-৩/১০২) এরপর মক্কা বিজয়, তায়িফ ও হুনাইন অভিযানে যোগ দেন। সর্বশেষে হিজরী দশ সনে বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলেন।

আনাস বলেনঃ হুনাইন যুদ্ধের দিন আবু তালহা হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন ঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি দেখেছেন, উম্মু সুলাইমের হাতে খঞ্জর? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ উম্মু সুলাইম খঞ্জর দিয়ে কী করবে? জবাব দিলেনঃ কেউ আমার দিকে এগিয়ে এলে এটা দিয়ে আমি আঘাত করবো। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯৭) হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিযানের সংখ্যা ছিল ২৬ অথবা ২৭টি। তবে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এমন অভিযানের সংখ্যা মাত্র ৯টি। যেমনঃ বদর, উহুদ, খন্দক, কুরায়জা, মুসতালিক, খাইবার, হুনাইন ও তায়িফ। আনাস এর সব কটিতে উপস্থিত ছিলেন। এক ব্যক্তি আনাসের ছেলে মূসাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার সম্মানিত পিতা কতটি যদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন ঃ আটটি যুদ্ধে। সম্ভবতঃ বদর যুদ্ধটি বাদ দিয়েছিলেন । তার কারণ এই হতে পারে যে, সে সময় জিহাদে যাওয়ার যে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল, আনাস তার চেয়ে ছোট ছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর (রা) খলীফা হলেন। এ সময় ভন্ড নবীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইয়ামামার যুদ্ধে আনাসের অংশগ্রহণের কথা জানা যায়। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৩৭) খলীফা আনাসকে বাহারাইনে আমিলে সাদাকার পদে নিয়োগ দান করতে চান। এ ব্যাপারে উমারের পরামর্শ চাইলে তিনি বলেনঃ আনাস বুদ্ধিমান ও লেখাপড়া জানা মানুষ। তার জন্য যে খিদমতের প্রস্তাব আপনি করেছেন আমি তা সমর্থন করি। খলীফা আনাসকে ডেকে পাঠান এবং আমিলে সাদাকার দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে বাহারাইনে ফিরে পাঠিয়ে দেন। (বুখারী, কিতাবুজ যাকাত, আল-ইসাবা-১/৭২) তিনি যখন বাহারাইনের থেকে ফিরে আসেন তখন আবু বকর (রা) আর নেই। তাঁর স্থলে উমার (রা) খলীফা। তিনি বাহারাইন থেকে অনীত অর্থ থেকে চার হাজার দিরহাম আনাসকে দান করেন। আনাস বলেনঃ আমি সেই অর্থ পেয়ে মদীনাবাসীদের মধ্যে একজন অধিক অর্থশালী ব্যক্তি হয়ে যাই। (হায়াতুস সাহাবা-২/২২)

আনাস আরও বলেনঃ আবু বকর (রা)-এর মৃত্যুর পর উমার খিলাফতের দায়িত্বভার হাতে নিলে আমি মদীনায় এসে তাঁকে বললামঃ দেখি, আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন। যে কথার ওপর আপনার পূর্ববর্তী বন্ধুর হাতে আপনি বাইয়াত করেছিলেন সেই কথার ওপর আমি আপনার হাতে বাইয়াত করবো। এভাবে তিনি উমারের (রা) হাতে বাইয়াত করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/২৫৮) .খলীফা হযরত আবু বকর (রা) ইয়ামনবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি পত্রসহ আনাসকে ইয়ামনে পাঠান। সেই পত্রে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে পড়ার জন্য তাদের প্রতি আহবান জানান। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪৪১, ৪৪২)

হযরত মুগীরা ইবন শু বা (রা) বসরায় গভর্ণর ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে হযরত আবু কাকরার (রা) নেতৃত্বে এক মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হয়। (দ্রঃ আনসাবুল আশরাফ-১/৪৯০- ৪৯২) খলীফা হযরত উমার (রা) তাঁকে বরখাস্ত করে আবু মুসা আল -আশয়ারীকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন। ঘটনার তদন্তের জন্য তাঁর সহকারী হিসাব আরও চার ব্যক্তিকে বসরায় পাঠান। তারা হলেন, ১. আনাস ইবনে মালিক, ২. আনাসের ভাই আল-বারা ইবন মালিক, ৩. ইমরান ইবনুল হুসাইন, ৪. আবু নাজীদ আল- খুযাঈ। (আনাসাবুল আশরাফ-১/৪৯১)

এই বসরা শহরে হযরত আনাস স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। খলীফা উমার (রা) যাঁদের ওপর এখানকারফিকাহ ও ফাতাওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন তাঁদের মধ্যে আনাস একজন। জীবনে বাকী অংশ তিনি এই বসরা শহরেই কাটিয়ে দেন। এখানে ফিকাহ ও ফাতওয়ার দায়িত্ব পালন ছাড়াও যখন যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে তিনি দক্ষতার সাথে তা পালন করেন। এই সময় পরিচালিত সকল অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তুসতার অভিযানে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। তুসতার বিজিত হয় এবং পারশ্য সেনাপতি হুরমুযানকে সপরিবারে বন্দী করে মুসলিম সেনাপতি আবু মুসা আল- আশয়ারীর (রা) সামনে হাজির করা হয়। হযরত আবু মুসা (রা) তিনশো সদস্যের একটি বাহিনীর হিফাজতে হুরমুযানকে মদীনায় খলীফার দারবারে পাঠিয়ে দেন। আনাস (রা) ছিলেন এ বাহিনীর আমীর এবং তিনি তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। এভাবে দীর্ঘদিন পর প্রিয় জন্মভূমির যিয়ারত লাভের সুযোগ পান। (হায়াতুস সাহাবা-১/৬৬, দায়িরা-ই- মায়ারিফ ইসলামিয়া-৩/৪০৩)

কিছুদিন মদীনায় অবস্থান করার পর আবার বসরায় ফিরে গেলেন। হিজরী ২৩ সনের জ্বিল হজ্জ মাসে হযরত উমার (রা) শাহাদাত বরণ করলে হযরত উসমান (রা) তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন। তাঁর খিলাফতের প্রথম কয়টি বছর খুবই শান্ত ছিল। তবে কিছুকাল পরে নানারকম ফিতনা ও অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। চতুর্দিকে স্থার্থান্বেষী হাঙ্গামাবাজ লোকেরা বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দেয় এবং তারা মদীনা অভিমুখে যাত্রা করে। তখনও কিন্তু ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা কোন রকম বিদ্রোহ ও হুমকির পরোয়া করতেন না। সুতরাং মাজলুম খলীফার আর্ত চিৎকার সর্ব প্রথম এই সত্যের সৈনিকদের কানে পৌছে। তারা তাঁর সাহায্যের জন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ান। ইরাকের রাজধানী বসরাতেও এমন লোকের অভাব ছিলনা। এমন ভয়াবহ অবস্থার খবর যখন সেখানে পৌছলো তখন আনাস ইবন মালিক, ইমরান ইবন হুসাইনসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বসরাকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উত্তোজিত করে তোলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত: তাদের সাহায্য মদীনায় পৌছার পূবেই বিদ্রোহীদের হাতে খলিফা উসমান (রা) শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উসমান (রা) এর পর হযরত আলী (রা) খিলাফতের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করলেন। ছয় মাস যেতে না যেতেই তাঁর বিরুদ্ধে এক মস্ত বড় ফিতনা সেই বসরাতেই মাথা তুলে দাঁড়ায়। আর তাতে বিশিষ্ট সাহাবা-ই-কিরামও জড়িয়ে পড়েন। বসরা ছিল আনাসের আবাস স্থল। সেখানে তার বিশেষ প্রভাবও ছিল। কিন্তু তিনি আরও বহু বিশিষ্ট সাহাবীদের মত নির্জনতা অবলম্বন করেন। এ কারনে, হযরত আলী ও হযরত আয়িশার (রা) উটের যুদ্ধে, যা এই বসরার অনতি দূরে সংঘটিত হয়- তাতে কোন পক্ষে আনাসের (রা) কোন ভূমিকা দেখা যায় না। এসব ঘটনায় তিনি সম্পূণ নিরপেক্ষ থাকেন।

হযরত আলী (রা) এর খিলাফতের পরেও হযরত আনাস বহুদিন জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে নানা রকম দৃশ্য ও অবস্থা অবলোকন করেন; কিন্তু সব সময় নির্জনতাকে প্রাধান্য দান করেন। কোন অবস্থাতেই নিজেকে জাহির করা তিনি মোটেই পছন্দ করেননি। তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে স্বৈরচারী উমাইয়্যা শাসকদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারেননি। খলীফা আবদুল মালিকের সময় উমাইয়া সা¤্রাজ্যের পূর্ব অঞ্চলের গর্ভণর ছিলেন হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ। অত্যাচারী ও নিপীড়ক হিসেবে ইতিহাসে তিনি খ্যাতিমান। একবার তিনি বসরায় এসে আনাসকে ডেকে শাসান এবং জনগণের মাঝে হেয় করার জন্য তাঁর ঘাড়ে ছাপ মেরে দেন। ওয়াকিদী ইসহাক ইবন ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ আমি এই ছাপ মারা অবস্থায় আনাসকে দেখেছি। (আল-ইসতীয়াব : আল- ইসাবার পাশ্বটিকা-১/৭২)