প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

প্রশ্ন-৫১: ছ্যুত-ছাত, কুলক্ষণ, কুসংস্কার, সংক্রামকব্যাধি, ছোঁয়াচে রোগ ইত্যাদি বিষয়ক মেডিকেল Conceft সম্পর্কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে কি ?

উত্তর : রোগ সংক্রমণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরবি ইবনে মাজাহ কিতাবের অনুবাদক মাওলানা মুহাম্মদ মূসা (২০০২) অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত একটি হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রোগ সংক্রমণ, কুলক্ষণ ও হামাহ বলে কিছু নেই এবং সফর মাসও অশুভ নয়।” (ইবনে মাজাহ)

অপরদিকে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসেও নবীজির একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে। “রোগ সংক্রমণ, কূলক্ষণ ও হামাহ বলতে কিছু নেই। এক ব্যক্তি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! কোনো উট চর্মরোগে আক্রান্ত হলে অন্য উট তার সংস্পর্শে এসে চর্ম রোগাক্রান্ত হয়। তখন তিনি বললেন, এটা তাক্দীর! তা না হলে প্রথম উটটিকে কে চর্ম রোগাক্রান্ত করেছে?” (ইবনে মাজাহ)

সহীহ মুসলিম শরীফে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত অনেকগুলো রিওয়ায়াত রয়েছে। (সহীহ মুসলিম)
উপরোক্ত সবগুলো রিওয়ায়াতের ভাষ্য হচ্ছে রোগ সংক্রমণের কোন বাস্তবতা, অস্তিত্ব বা সত্যতা নেই, আর উটপালের রাখাল অসুস্থ উটগুলোকে সুস্থ উটপালের নিকট আনবেনা। অপরদিকে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ছোঁয়াচে ব্যাধি, ক্ষুধা, পেট কামড়ানো কীট ও পাখির কুলক্ষন বলে কোনো কিছু নেই। জনৈক বেদুঈন আরব জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রসূলুল্লাহ! তবে সেই উটপালের অবস্থা কি যা কোনো বালুকাময় প্রান্তরে অবস্থান করে এবং সুস্থ-সবল থাকে? অতঃপর তথায় কোনো খুজলী-পাঁচড়ায় আক্রান্ত উট তাদের মধ্যে এসে পড়ে এবং সবগুলোকে ঐ রোগে আক্রান্ত করে ছাড়ে? (এর জবাবে) তিনি বললেন, তাহলে প্রথম উটটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছিলো?” (সহীহ মুসলিম)
সংক্রামক রোগ সম্পর্কে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সংক্রামক রোগ, অশুভ লক্ষণ, পেট কামড়ানো কীট ও পাখির অশুভ লক্ষণ বলে কোনো কিছু নেই।” (সহীহ মুসলিম)

সহীহ আল বুখারীতে শুভ-অশুভ লক্ষন বিষয়ে পাঁচটি হাদীস উদ্ধৃত আছে। (সহীহ আল বুখারী)
এসবের ভেতর তিনটি হাদীস বর্ণনা করেছেন হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু। বাকী দুটো বর্ণনা করেছেন ইবনে উমর ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম। হাদীসগুলোর সারমর্ম একত্রে করলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য এভাবে দাঁড়ায়:
ক. “ছোঁয়াচে রোগ, সংক্রামকতা ও অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই।” খ. “কোনো কিছুকে অশুভ বা কুলক্ষণ বলে গণ্য করোনা।” গ. “রোগের সংক্রামক হওয়ার কোন ভিত্তি নেই বা রোগের সংক্রামকতা বলতে কিছু নেই। কোন কিছুকে অমঙ্গলজনক মনে করার কোনো কারণ নেই। পেঁচার মধ্যে কূলক্ষণের কিছু নেই, আর সফর মাসেও অশুভ বলতে কিছু নেই।” ঘ. “কোনো কিছুকে শুভ লক্ষণ মনে করা ভালো। (কারো সম্পর্কে) ভালো ও সুন্দর বা অর্থবোধক কথা উত্তম যা সে শুনতে পায়।”
সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসের ভাষ্য একটু ভিন্ন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সংক্রামক রোগ, অশুভ লক্ষণ এবং পথে-ঘাটে পথ ভুলিয়ে দেয়ার ভূত-প্রেত প্রভৃতির কোনো বাস্তবতা নেই।” (সহীহ মুসলিম)
সুপ্রিয় পাঠক! আমি এখানে রোগ সংক্রামণ ও ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে চাই। জাহেলী যুগে আরবরা হাম্মাহ বলতে কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাসকে বুঝে থাকতো। কারো কারো মতে হাম্মাহ অর্থ পেঁচা। কারো বাড়িতে রাতে পেঁচা থাকলে এটা অশুভ লক্ষণ মনে করা হতো। হাম্মাহ শব্দ দ্বারা আরো কতগুলো অশুভ লক্ষণকে বুঝানো হতো। তদানীন্তন আরবদের বিশ্বাসমতে কোনো ব্যক্তি নিহত হলে এবং তার প্রতিশোধ না নেয়া হলে তার মস্তক থেকে একটি কীটের আবির্ভাব হবে। ইসলামের আগমনের আগে তদানীন্তন আরব সমাজে এ বিশ্বাসও ছিলো যে, মৃত ব্যক্তির হাড়গোড় উড়ন্ত পাখিতে রূপান্তরিত হয়, যাকে হাম্মাহ বলা হতো। যাহোক , নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কুসংস্কারকে অলীক ধারণাপ্রসূত বলে অভিহিত করেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকে এসব ধারণা পোষণ করতে নিষেধ করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব বিশ্বাস করা হারাম এবং তা নিঃসন্দেহে শিরক ও কুফর।

পক্ষান্তরে, আমাদের এ বিশ্বাস রাখা বাঞ্ছনীয় যে জীবাণু সংক্রমিত হওয়া অনেক সময় রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, অন্যান্য ক্ষতিকর বস্তু ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এগুলো সবই আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত ও তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ তিনি যদি ইচ্ছা না করেন, তাহলে রোগ জীবাণু সংক্রমিত হবে না অথবা সংক্রমিত হবে, কিন্তু রোগের কারণ হবে না। এমন বিশ্বাস শরীআতের দৃষ্টিতে যেমন অবাঞ্চিত নয়, তেমনি সংশ্লিষ্ট হাদীসের বিপরীতও নয়। কিন্তু কিছু রোগ ছোঁয়াচে বা সংক্রমণ হওয়ার ব্যাপারে সমাজে একটি ধারণা রয়েছে। যেমন, কুরোগ ও মহামারী। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কেননা এ উপদেশ গ্রহণ করা তাকদীর এবং তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি নয়, বরং এসব আল্লাহ পাকের ইচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল। এ কারণেই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের রোগ যদিও সংক্রামক কিন্তু তাঁর সংক্রমণ আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এসবের নিজস্ব কোন শক্তি বা প্রভাব নেই। এ ব্যাখ্যা শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ তকী উসমানী তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। (সূত্র : তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, ৪/৩৭২, চিকিৎসা অধ্যায়)

মোট কথা, হাদীসে ছোঁয়াচে রোগকে অস্বীকার করা হয়নি, বরং ভ্রান্ত আকীদা ও ধারণাকে খন্ডন করা হয়েছে মাত্র। আর দুনিয়া হলো দারুল আসবাব তথা উপকরণনির্ভর স্থান। তবে একজন মুমিনের জন্য এ বিশ্বাস রাখা জরুরী যে পার্থিব জগতের অন্যান্য উপকরণসমূহের ন্যায় রোগ সংক্রমণ ও কার্যত আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছা ও হুকুমের ওপর নির্ভরশীল। অতএব, ছোঁয়াচে রোগী থেকে সতর্ক থাকা শরীআত পরিপন্থি নয়, বরং রোগ ছোঁয়াচে হওয়ার কারণে রোগী থেকে সতর্ক থাকাই বাঞ্ছনীয়। (সূত্র : মুফতী দেলাওয়ার হোসাইন প্রণীত ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা, পৃা ১১, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১১)

ওপরে বর্ণিত বিভিন্ন সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে ইসলামের দৃষ্টিতে সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই এবং আবার নবীজি কুরোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। বাহ্যিক দিক থেকে এ দুটো বক্তব্য পরস্পর বিরোধী মনে হচ্ছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে কোনো অসংগতি নেই। জাহেলী যুগে মনে করা হতো যে ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে গেলেই রোগ হয়। এখানে তারা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতাকে অস্বীকার করতো। ইসলাম বলে যে, রোগ-ব্যাধি আল্লাহ্র সৃষ্টি এবং তিনি যাকে ইচ্ছা রোগে আক্রান্ত করেন, আর যাকে ইচ্ছা রোগ থেকে হিফাজত করেন। কিন্তু জাহেলী যুগে মানুষের বদ্ধমূল বিশ্বাস ছিলো যে, বাহ্যিক উপকরণ ও কার্যকারণ সূত্রই রোগ ছড়ায়। আল্লাহ্র তাতে হাত নেই। ইসলাম এ ধারণার কঠোর বিরোধী। তাই ইসলাম রোগের বাহ্যিক কার্যকারণ ও উপকরণসমূহ থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়। তবে এসব কার্যকারণ ও উপকরণও আল্লাহর সৃষ্টি।

যেসব বাহ্যিক কারণে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তা পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান থাকলেও আল্লাহর হুকুম ব্যতীত রোগ হতে পারেনা। এসবের প্রতি বিশ্বাস রাখাই মুসলমানদের ঈমান। আধুনিক বিজ্ঞান ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে রোগের উপকরণ ও কার্যকারণ আবিষ্কার করতে পেরেছে এবং এ দুটোই রোগ সৃষ্টির মূল কারণ বলে অভিমত দিয়েছে। তবে এখানে এসেই বিজ্ঞান থেমে গেছে। কিন্তু every cause originates from a cause, and islam has reached to that ultimate cause অর্থাৎ প্রত্যেক কারণের পিছনে এক বা একাধিক মূল কারণ রয়েছে। আর ইসলাম সে সব মূল কারণের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে চায়। যাহোক, সংক্রমণ (infection) যদি রোগের উৎপত্তি ও রোগ সৃষ্টির মূল কারণ হতো, তাহলে প্রথম যে ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হলো, তার রোগ কোথা থেকে এলো?

রোগ সংক্রমণ সম্পর্কিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির একটি মানবিক দিকও রয়েছে। রোগ সংক্রমণ বা ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস করলে এ ধরনের ব্যাধির রোগীরা সবাই অস্পৃশ্যে পরিণত হবে। মানবতার হক আদায় তখন নিদারুণভাবে বাধাগ্রস্থ হবে। কেউ এ ধরনের রোগীর সেবা-শুশ্রƒষা করতে এগিয়ে আসবেনা। ফলে আল্লাহর অগণিত বান্দা চিকিৎসা বা সেবা-শুশ্রƒষা থেকে বঞ্চিত হবে। তাই ইসলামের মহান নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে যেমন কু, প্লেগ রোগ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, (যা আমি আগের হাদীসগুলোতে আলোচনা করেছি), এবং তিনি যথাযথ সতর্কতা গ্রহণ করতে বলেছেন: আবার অপরদিকে রোগীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে তখন সব ধরনের কুসংস্কারমূলক ধারণা উপেক্ষা করে আর্ত-মানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই তিনি একই প্লেটে জনৈক কুরোগীর সাথে খানা খেয়ে রোগীর সেবার এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যা ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরোগে আক্রান্ত জনৈক ব্যক্তির হাত ধরে তাঁর হাত নিজের আহারের পাত্রের মধ্যে রেখে বলেন, আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে এবং আল্লাহর নামে খাও। (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)
ছ্যুত-ছাত, সংক্রামক ব্যাধি বা ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে আমাদের দেশে দুটি বিপরীত মত দেখা যায়। একদল লোক কোনো প্রকার ছ্যুত-ছাত বা সংক্রামক ব্যাধিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের মতে এমন কোনো রোগ নেই যা একজন থেকে অন্যের মধ্যে ছড়াতে পারে। তারা ছ্যুত-ছাতকে মনগড়া খেয়াল মনে করে এবং ঈমানের দুর্বলতার কারণ অথবা কমপক্ষে আল্লাহ্ প্রদত্ত তাকদীর থেকে দূরে চলে গেছে বলে অহেতুক মন্তব্য করে থাকে।

অপরদিকে একদল লোক এ নিয়ে খুবই বাড়াবাড়ি করে থাকে। তারা সব কিছুতেই ছোঁয়াচে রোগের গন্ধ পায়। এই দলের লোক ছ্যুত-ছাত সম্পর্কে কল্পিতভাবে ভয়ের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রোগীর সাথেও মিশেনা, শরিকানায় পানির গ্লাস ব্যবহার করেনা এবং রুমাল, তোয়ালে একজন অন্য জনেরটা ব্যবহার করেনা। তাদের মন-মগজে ছ্যুত-ছাত লাগার চিন্তা এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে যে প্রতিটি শরিকানা বিষয়কেই তাদের নিকট স্বাস্থ্য রক্ষানীতির পরিপন্থি বলে মনে হয়।
সম্মানিত দর্শক-শ্রোতা! বাস্তবে বেশ কয়েকটি সংক্রামক ব্যাধি রয়েছে। যেমন : যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, বসন্ত রোগ, কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আমরা ংরিহব ভষঁব -এর নাম শুনে আসছি, যা এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বস্তুত এসব রোগের জীবাণু একজন অসুস্থ ব্যক্তি থেকে অপর সুস্থ ব্যক্তির উপর এমন প্রভাব ফেলে যেমন আগুন, পানি, ঠান্ডা ও গরম শরীরের উপর স্বীয় বৈশিষ্ট্যগত প্রভাব বিস্তার করে। তবে এগুলো সবই আল্লাহ্র হুকুমে হয়ে থাকে। এ বিষয়ে হযরত ইবনে আতীয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি হাদীস বর্ণনা করেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ছ্যুত-ছাত পেঁচা ও মৃত আত্মার শুভা-শুভ গণনা (ভবিষ্যতে ভালো-মন্দের লক্ষণ) কোনো বিষয় নয়। আর সফর মাসেও কোনো কিছু নেই। অবশ্য রুগ্ন পশুকে সুস্থ পশুর নিকট নিয়ে যাবেনা। সুস্থ জানোয়ারকে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যাও। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! এর কারণ কী? তিনি ইরশাদ করলেন, এটা ঘৃণা অথবা কষ্টের বিষয়। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক ও মুআমূল আওসাত)

প্রশ্ন-৫২। সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন ?

উত্তর : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার রোধে বেশ কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন। এ বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাহোক, আমি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ছয়টি হাদীস এখানে আলোচনায় নিয়ে আসবো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

১. “সুস্থ ব্যক্তি যেকোনো জায়গায় বা আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ ব্যক্তিদের মাঝে নানা উচিত নয়। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক ও ইবনে মাজাহ)

২. “অসুস্থ উটগুলোর মালিক তার উটগুলোকে সুস্থ পশুর দলে পাঠিয়ে দেবেনা। (কারণ এতে ঐসব সুস্থ প্রাণী অসুস্থতায় আক্রান্ত হতে পারে।) (আবু হুরায়রা (রা.); সহীহ মুসলিম ও ইবনে মাজাহ)

৩. “কুরোগে আক্রান্ত রোগীর দিকে অপলক নেত্রে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকবেনা।” (ইবনে আব্বাস (রা.); ইবনে মাজাহ)

৪. যখন কোনো কুরোগীর সাথে কথা বলার প্রয়োজন হয়, তখন তাদের মাঝে এক ধনুকের দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলবে। (মুসনাদে আবি ইয়ালা)

৫. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সিংহের আক্রমণ থেকে পালাবার বা বাঁচবার জন্য যেমন চেষ্টা করো, তেমন কুরোগী থেকেও দূরে থেকো। (সহীহ আল বুখারী)

৬. হযরত আমর ইবনে আশ-শারীদ (রহ.) তাঁর পিতা থেকে জেনে বলেন, “সাকিফ-এর প্রতিনিধি দলে এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি কুরোগে আক্রান্ত। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ পাঠালেন, তোমরা ফিরে যাও। আমরা তোমাদের আনুগত্যের অঙ্গীকারনামা (বায়আত) কবুল করে নিয়েছি।” (সহীহ মুসলিম ও ইবনে মাজাহ)

সম্মানিত পাঠক! উপরে বর্ণিত ৪টি হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরোগ ও তজ্জাতীয় রোগাক্রান্ত লোকদের নিকট থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কুরোগ ও কুরোগী সম্পর্কে যে কটি হাদীস বর্ণনা করলাম তা জেনে একথা বলা ঠিক হবেনা যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরোগীকে ঘৃণা করতেন। বরং তিনি কুরোগীর সাথে একত্রে খানা খেয়েছেন। হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক কু রোগীর ডান হাত ধরে তিনি যে প্লেটে খানা খাচ্ছিলেন সে প্লেটে তার হাত রেখে বলেন, আল্লাহর উপর আস্থা রেখে আল্লাহর নামে খাওয়া শুরু করো। (আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)

এ হাদীসটি এ কথাই প্রমাণ করে যে তিনি কুরোগীকেও খাদ্য গ্রহণের সময় শরীক করতেন।

পাঠক!
আমি যে কয়েকটি সহীহ হাদীস আলোচনা করলাম তা প্রমাণ করে যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বে ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি নামক concept এর প্রথম আবিষ্কারক। স্পেনে মুসলমানগণ যখন বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় নিয়োজিত, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত বাণীগুলো গ্রীক ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। সে সময় অনেক সাদা চামড়ার লোক ঐ Prophetic traditions গুলোতে যেসব scientific wisdom লুকায়িত ছিলো, তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন। সাদা চামড়ার লোক বলতে আমরা সাধারণত European, American I Australian-দেরকে বুঝে থাকি। We are neither black nor white। আমাদের গায়ের রং কিছুটা হলদে। অর্থাৎ আমরা আমাদেরকে Yellow or Brown skinned বলতে পারি।

যাহোক, ঐসব গবেষণার ফলে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিই স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অনেক বিষয়ের নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেন। তাই ঐ মেডিকেল concept গুলো যে তারাই আবিষ্কার করেছেন তা মেনে নেয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বস্তুত ইসলামের ইতিহাস আমাদের তাই বলে। মূলত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন spreading contagious diseases, contra-indications in sickness, adverse effects of medicines, quarantine system ইত্যাদি বিস্ময়কর মেডিকেল conceptগুলোর প্রথম আবিষ্কারক। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যগুলো ছিলো ৭ম শতাব্দীতে। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের concept গুলোর অধিকাংশই আবিষ্কার হয়েছে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে