প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. যারা কোন জীবিত বা মৃত আলিম, পীর, ওলী, বুজুর্গের কাছে গায়েবী সাহায্য চায়, তারা এভাবে ওযর পেশ করে আমরা পাপী, পাপীর দুআ আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না। তাই এ সকল বুজুর্গ ব্যক্তিরা আমাদের জন্য আল্লাহপাকের কাছে সুপারিশ করবেন। উকীল ছাড়া যেমন জজের কাছে পৌঁছা যায় না, সিঁড়ি ছাড়া যেমন ছাদে ওঠা যায় না, পিএ বা গার্ডদের ডিঙ্গিয়ে যেমন প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়া যায় না, তদ্রুপ কোন দুআ, আরজি, প্রার্থনা, ইবাদত সরাসরি মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পীর, ওলী, বুজুর্গ ব্যক্তিরা উকীল, সুপারিশকারী, সিঁড়ি, মধ্যস্থতাকারী, পিএ হিসেবে কাজ করে বান্দার ইবাদত , জিকির, দুআ বা প্রার্থনা আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেন।
২. তাদের এই অজুহাতের সাথে তৎকালিন কাফির মুশরিকদের বক্তব্যের একটা মিল রয়েছে। মুশফিকরা মূর্তি পূজা করে বলতো আমরাতো দেব দেবীর পূজা করি না, বরং তাদের কাছে প্রার্থনা করি এজন্য যে তারা সুপারিশ করে আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। আর এরা বলছে- আমরা তো শিরক করি না, আমাদের ধারণাগুলি আউলিয়া আম্বিয়াগনের নিকট জানিয়ে থাকি মাত্র। যদি আমরা তাদেরকে আল্লাহর তুল্য বলে মনে করতাম, তবে শিরক হতো বটে, কিন্তু তা তো আমরা করি না। বরং আমরা তাঁদেরকে আল্লাহরই সৃষ্ট বান্দা বলে জানি। আর তাদের যা ক্ষমতা তা সেই আল্লাহ তায়ালাই তাঁদেরকে দিয়েছেন। এবং তাঁরই ইচ্ছায় তারা তা জগতের উপর প্রয়োগ করে থাকেন। তাঁরা আল্লাহর অত্যন্ত ভালবাসার পাত্র এবং যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন; আল্লাহর নিকট তাঁরা আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন; তাদেরকে ধরে আল্লাহকে পাওয়া যায়। তাদেরকে আমরা যতই ভক্তি ভরে ডাকব, তাদের ওসিলা দিয়ে যতই আমরা জিকির ও ইবাদত করবো ততই আল্লাহর নিকটে পৌঁছাতে পারবো। সুতরাং তাদেরকে ডাকা আর তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা বাস্তবিক পক্ষে সেই আল্লাহকেই ডাকা এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।
৩. এরূপ প্রলাপের কারণ এই যে, তারা আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ ছেড়ে দিয়ে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি মত চলতে আরম্ভ করেছে; মিথ্যা গল্প গুজব ও দূষিত চাল-চলনকে প্রমাণ বলে মেনে নিয়েছে। যদি তারা আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথাগুলি ভালোভাবে বুঝতে চেষ্টা করত, তা হলে নিশ্চয়ই জানতে পারত যে, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়ে কাফিরগণও ঠিক ঐ প্রকার প্রলাপ বকতো। কিন্তু আল্লাহতাআলা তার একটিও গ্রাহ্য করেন নাই, বরং সেগুলি যে মিথ্যা তা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে।
৪. তিনি বলেছেন: وَ يَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَالَا يَضُرُّ هُمْ وَ لَا يَنْفَعُهُمْ وَ يَقُوْلُوْنَ هٰٓؤُلَآءِ شُفَعَآ ؤُنَا عِنْدَ اللهِ ؕ قُلْ اَ تُنَبِّئُوْنَ اللهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِى السَّمٰوٰةِ وَ لَا فِى الْاَرْضِ ؕ سُبْحَانَهٗ وَ تَعَالٰى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ
এবং তারা আল্লাহকে ছেড়ে এমন বস্তুর উপাসনা করে যা তাদের উপকার বা অপকার কিছুই করতে পারে না এবং তারা বলে থাকে যে, তারা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশ করবে। হে মুহাম্মাদ! আপনি বলুন, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্য থেকে তোমরা কি আল্লাহতাআলাকে এমন কিছুর সংবাদ দিতে চাও যা তিনি জানেন না? তিনি পুত: পবিত্র ও মহান সে সমস্ত থেকে যাকে তোমরা শরিক করছ। (সূরা ইউনূস: ১৮)
৫. মুর্খ লোকেরা বলে বেড়ায় যে, বুজুর্গ লোকদের নিকট যে আমরা প্রার্থনা করি, তা এ উদ্দেশ্যে যে তারা আল্লাহর নিকট থেকে নিয়ে আমাদের দান করে থাকেন। আমরা তাদেরকে আসল দাতা মনে করি না। দাতা তো আল্লাহ, তবে তারা হলেন মাধ্যম। এ সম্পর্কে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ (রহ:) লিখেছেন : অর্থাৎ জেনে রাখ মৃত লোকের নিকট হাজত তলব করা এ বিশ্বাসে যে তারা হাজত পূরণ ক্ষেত্রে কেবল মাধ্যম এটি কুফরী। কিন্তু এ যুগের লোকেরা তাতে বেশী মগ্ন। (আল-খায়রুল কাছীর, পৃঃ ১০৫)
৬. মুশরিকগণ আল্লাহকে সৃষ্টি কর্তা ও প্রতিপালক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, যেমন আল্লাহতাআলা বলেন:
وَ لَئِنْ سَاَلْتَهُمْ مَّنْ خَلَقَ السَّمٰوٰةِ وَ الْاَرْضَ لَيَقُوْلَنَّ اللهَ
আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। এরূপ আরও বেশ কয়েকটি সমার্থক আয়াত রয়েছে। (দেখুন ফাতাওয়ায়ে সিদ্দিকীন, তাওহীদ ফিস সিফাত অধ্যায়)
৭. তবুও আল্লাহতাআলা তাদেরকে কাফিরই বলে থাকেন এ জন্যে যে, তারা মূর্তি, দেব-দেবীর জিনপরীদের সাথে ভ্রান্ত সম্পর্ক স্থাপন করে এবং বলে থাকে-
هٰؤُلَآءِ شُفَعَآؤُنَا عِنْدَ اللهِ
এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। (সূরা ইউনুস : ১৮)
