প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৪৬ : আমাদের ভেতর অনেকেই লম্বা গোঁফ রাখেন। এই বড় গোঁফ রাখা যে অনুচিত তা আমরা এ হাদীস থেকে জানলাম। এবার মুহতারামের নিকট প্রশ্ন, গোঁফ রাখা স্বাস্থ্যসম্মত কি না, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি এবার বলুন।
উত্তর : From medical scientific and religious points of view গোঁফ মাত্রাতিরিক্ত বড় রাখা অসুন্দর ও অগ্রহণযোগ্য কাজ। গোঁফ অত্যধিক বড় রাখলে কেউ প্রশংসা করেনা; বরং অনেকেই উপহাস এবং সমালোচনা করে। তাই এটি কিছুতেই স্বাস্থ্যসম্মত কাজ হতে পারেনা। যেকোনো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন তিনি এ কথাই বলবেন। আমি তাই বিনয়ের সাথে বলতে চাই, যারা লম্বা গোঁফ রাখেন তারা কেউই স্বাস্থ্য সচেতন নন। কারণ সারাদিন চলাফেরার সময় গোঁফে প্রচুর ধূলাবালি ও ময়লা জমে। গোঁফ ও মাথার চুল ময়লা আটকে থাকার উত্তম ও নিরাপদ জায়গা। যারা সাবান বা শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিষ্কার করেন তারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন কি পরিমাণ ময়লা প্রতিদিন চুল থেকে বের হয়। তাই চা, দুধ, কফি ও পানি পান করার সময় বা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করার সময় এসব দূষিত ময়লা যাতে খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়কে দূষিত করতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
আমি লক্ষ্য করেছি যে যাদের গোঁফ লম্বা থাকে, তাদের গোঁফের অর্ধেকই পানীয় পান করার সময় পানীয়তে ডুবে যায়। ফল কী হয়? আপনি গোঁফের ময়লা চা, দুধ ও পানীয়ের সাথে মিশিয়ে পান করেছেন, তাই নয় কি? এটিই কি আধুনিককালের স্বাস্থ্য সচেতনতা? কম্পিউটার বিজ্ঞানের যুগে এটিই কি আমাদের good drinking practice ?
সম্মানিত পাঠক! তাই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোর প্রতিটিই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। আমাদের দেশের প্রায় ৬০ হাজার চিকিৎসক আর প্রায় ২৫ হাজার ফার্মাসিস্ট রয়েছেন, যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একমত হবেন।
প্রশ্ন-৪৭ : দাড়ি রাখলে আর গোঁফ নিয়মিত ছোট রাখলে আর কী কী উপকার হয়। Medical science কী বলে ?
উত্তর : প্রথমত: উপকার হচ্ছে আর্থিক সাশ্রয়। আপনি দেখুন যদি প্রতিদিন বাসায় Clean shave করেন তাহলে প্রায় ১০ টাকা খরচ হয়। আর সেলুনে গেলে কমপক্ষে ২০ টাকা লাগে। অর্থাৎ মাসে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়। এই টাকা shave করার জন্য অপচয় হয়। দাড়ি রাখলে এ অপচয় হবেনা। এতে আপনার আর্থিক সাশ্রয় হবে। আশা করি আপনারা সবাই এ বিষয়ে একমত হবেন।
দ্বিতীয়ত : সময়ের সাশ্রয়, saloon-এ shave করতে আসা-যাওয়ার সময়সহ কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় ব্যয় হয়ে থাকে। আর যদি সেলুনে কিউ থাকে তখন আরো বেশি সময় ব্যয় হয়। এই সময়টা কেউ অন্য কাজে লাগাতে পারে। বাসায় shave করলে সর্বাপেক্ষা ২০ মিনিট সময় লাগে। তাই প্রতিদিন ৩০ মিনিট হিসেবে একজন লোক সারা জীবনে কতো দিন দাড়ি shave করার পেছনে সময় ব্যয় করে থাকেন ? চিন্তা করুন। ধরুন, প্রতিদিনে ৩০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা, তাহলে তাহলে ১ বছর তথা ৩৬৫ দিনে ১৮৩ ঘণ্টা অর্থাৎ প্রায় ৮ দিন। তিনি যদি ৬০ বছর এভাবে প্রত্যহ shave করেন তবে তার সময় অপচয় হবে মোট ৪৮০ দিন। এ সময় কি নগন্য ?
তৃতীয়ত : পানীয় দূষিত না হওয়া, গোঁফ কামিয়ে ফেলা বা তা ছোট করে রাখার বিষয়ে হাদীস শরীফে বর্ণনা এসেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস অনুযায়ী সপ্তাহে একবার গোঁফ ছাটলেই হবে। এক সপ্তাহে গোঁফ যতোটুকু বড় হবে তা পানীয়কে দূষিত করার কারণ হবে না।
চতুর্থত : দাড়ি যতোই বড় হোক না কেনো, তা পানীয়কে দূষিত করতে পারবেনা। কারণ পান করার পানির গ্লাস বা কাপ সর্বদা দাড়ির উপরে থাকে। অর্থাৎ পানির পাত্রটির নিচেই দাড়ি থাকে। ফলে তা পানীয়তে ঢোকার সুযোগ নেই। আর গোঁফ বড় থাকলে পান করার সময় পানীয়ের স্পর্শ থেকে রক্ষা করার কোনো উপায়ই থাকেনা। কারণ গোঁফ তা ঠোঁটের উপরিভাগে থাকে। পান করার সময় তা সর্বদা কাপের বা গ্লাসের ভেতর পড়ে যায়।
পঞ্চমত : দাড়ি পুরুষের সৌন্দর্যবর্ধক। এটি পুরুষত্বের চিহ্ন। দাড়ি রাখলে চোখের উপকার হয়। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায়। গবফরপধষ ংপরবহপব আমাদের বলে যে দাড়ি মানুষের মুখমন্ডলকে গরম রাখে। এটি আমাদের মুখ ও চামড়াকে সুরক্ষা করে। দাড়ি ক্ষতিকর ও দূষিত পদার্থ থেকে মুখকে রক্ষা করে।সুতরাং আমাদের সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দাড়ি রাখা এবং গোঁফ কামিয়ে ফেলা বা ছোট রাখা উচিত।
প্রশ্ন-৪৮ : আজকাল আমরা লক্ষ্য করছি যে এক শ্রেণির মহিলা যারা নিজেদের স্মার্ট দাবি করেন, তাদের অনেকে ১-১.৫ ইঞ্চি লম্বা নখ রাখেন এবং তাতে বিভিন্ন রং দেন। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং ধর্মীয় বিজ্ঞান কি বলে ?
উত্তর : নিয়মিত নখ কাটা ও তা পরিষ্কার রাখা সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। এটি কোনো medical scientist অস্বীকার করতে পারবেনা। তাছাড়া প্রতিটি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠনের worker-দের সপ্তাহান্তে নখ কাটা, চুল ছাঁটা ইত্যাদি Good Manufacturing Practice এর আওতাভুক্ত। প্রতি সপ্তাহে ওষুধ তৈরির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, হাতে-পায়ে ঘা,আঙ্গুলের নখ, লম্বা চুল ইত্যাদি inspection করা হয়ে থাকে। যারা এসব GMP guidelines মেনে চলবেনা তাদেরকে ওষুধ তৈরির কাজ করতে দেয়া হয় না। এটি mandatory requirements of Drug Administration Authority for the personal hygiene of the factory staff of every pharmaceutical company.
আমার বিশ্বাস, আপনারা আমার সাথে একমত হবেন যে হাতের নখ না কাটলে নখের নিচে প্রচুর ময়লা বা দূষিত পদার্থ জমা হতে থাকে যা পরিষ্কার করা কঠিন। বিশেষ করে যারা লম্বা নখ রাখেন তাদের বেলায় আরো কঠিন। তাদেরকে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় যেনো নখের অগ্রভাগ ভেঙে না যায়। এসব জায়গায় সহজেই ময়লা জমে এবং রোগ-জীবাণু লুকিয়ে থাকে। ফলে তা খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। অধিকন্তু এতে যারা দুহাত দিয়ে কাজ করে থাকেন তাদের কাজের অসুবিধা হয়। যারা লম্বা নখ রাখেন তাদেরকে অধিকতর অস্বস্তিতে কাজ করতে হয়। সর্বদা ভয়ও থাকে তখন নখটি ভেঙে বা ফেটে যায় বা কখন কার গায়ে খোঁচা লাগে। কেউ খোঁচা খেয়ে আহতও হতে পারে।
অপরদিকে লম্বা নখ বা নেইল রাখা কোনো ফ্যাশনও নয়। এটি কারো সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করেনা। এ practice একটি বিজাতীয় কালচার। এটি ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে এবং স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমার সূচীন্তিত মতামত হচ্ছে, যারা লম্বা নখ রাখেন তারা কেউই স্বাস্থ্য সচেতন নন। আর তারা জেনে হোক আর না জেনে হোক, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সুন্নাতকে অমান্য করেছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় ইস্তেনজা করার সময়। এই লম্বা নখে অনেক অপবিত্র ময়লা ঢুকে যেতে পারে, যা সত্যি অনভিপ্রেত ও অস্বাস্থ্যকর এবং সহজে পরিষ্কার করা কঠিন। অনেক সময় অসতর্কতাবশতঃ অপবিত্র জিনিস নখের ভিতরাংশে লেগে থাকা স্বাভাবিক। ফলে পবিত্রতাও অর্জন হবে না আবার স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও দেখা দিবে।
প্রকৃতিকভাবে বন্য পশুপাখির নখ বড় থাকে আহার সংগ্রহ এবং প্রতিকূল অবস্থায় নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু আশরাফুল মাখলূক হিসেবে মানুষের জন্য সেটি প্রযোজ্য নয়। আমরা সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে অতো নীচে নামতে কেনো যাবো? তাই আমি এমন ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়দের নিকট আবেদন, জানব আপনারা নিয়মিত নখ কাটুন। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে নখ পরিষ্কার করতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় লাগে। বিশেষ করে যখন পার্টিতে যান তার আগে। কারণ আপনারা কেউই চাননা যে অন্য কেউ নখের নিচের কালো ময়লা দেখুক। তাই নখ ছোট থাকলে পরিষ্কার রাখতে কোনো অতিরিক্ত সময় লাগেনা। একবার সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেললেই যথেষ্ট। এতে আপনার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। আপনাকে অস্থিরতার ভেতর কাজ করতে হবেনা।
