প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
পঞ্চম অনুচ্ছেদ
দাড়িতে কালো রঙের খেযাব ব্যবহার করাও মন্দপ্রথাসমূহের একটি। আবু দাউদ ও নাসায়ী শরীফে হযরত ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েতকৃত হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে-আখেরী যমানায় কিছু লোক কবুতরের বুকের ন্যায় কালো খেযাব ব্যবহার করবে, তারা বেহেশতের খুশবু থেকে বঞ্চিত থাকবে। এ কাজের নিন্দনীয় হওয়ার পক্ষে সাধারণ যক্তিও সায় দেয়-কালো খেযাব ব্যবহার করে অবশ্য প্রকাশমান বার্ধক্যকে গোপন রাখার অপচেষ্টা করা হয়, স্বাভাবিক খোদায়ী রীতির পরিবর্তন সাধন করতে চায়-এ সবকছিুই খারাপ। আবু দাউদে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাকা চুল উপড়ে ফেলতে নিষেধ করেছেন। এ চুল নিঃসন্দেহে মুসলমানদের জন্য আলোকস্বরূপ। অন্য এক হাদীসে যেমন খুশী সাজতে গিয়ে যেসব নারী আল্লাহর প্রদত্ত প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে ফেলে তাদের উপর অভিশাপ ঘোষিত হয়েছে। পাকা চুল উপড়াতে নিষেধ করে বার্ধক্য গোপন করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদীসে আল্লাহপ্রদত্ত আকৃতি পরিবর্তন করার মন্দ পরিণতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ উভয় অপকারিতা বিদ্যমান থাকায় কালো খেযাবের ব্যবহার সাধারণ বিবেকবান মানুষের কাছেও একটা দোষণীয় কাজ।
অনেকে দাবি করেন, তিল দিয়ে প্রস্তুত কালো খেযাব ব্যবহার করা জায়েয। কারণস্বরূপ তারা বলেন-হাদীসে মেহেদী ও নীলের খেযাব ব্যবহার বৈধ বলা হয়েছে, আর মেহেদী ও নীল মিলে কালো রঙ ধারণ করে। কিন্তু মেহেদী ও নীল মিশ্রিত হয়ে সবসময় যে কালো রঙ হয় তা বলা যায় না। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মেহদী ও নীল একত্রে মিশ্রিত করে ব্যবহার করলে কালো রঙ হয়, আবার পৃথক পৃথকভাবে ব্যবহার করলে লাল রঙ ধারণ করে। অধিকন্তু, একত্রে মিশিয়ে দিলেও সবসময় কালো রঙ হয় না। সে যাই হোক, হাদীসে যখন কালো খেযাব ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে, তখন মেহেদী ও নীল মিশে কালো রঙ ধারণ করলে তা ব্যবহারও নিষিদ্ধ হবে। আর কালো খেযাব ব্যবহার যে কারণে নিষিদ্ধ সে কারণ তো তিলের খেযাবেও বিদ্যমান। কারণের সমতা হেতু উভয়ের একই বিধান হবে।
অনেকে বলেন, কালো নয় বরং নীলচে রঙের খেযাব ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। কেননা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেযাবের রঙকে কবুতরের বুকের সাথে তুলনা করেছেন, আর কবুতরের বুকতো কিছুটা নীলচে হয়ে থাকে। কাজেই সম্পূর্ণ কালো রঙের খেযাব ব্যবহার জায়েয আছে। তাদের এ দাবি বড়ই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তারা তুলনাকে প্রমাণস্বরূপ পেশ করেন, অথচ তুলনা প্রকাশের জন্য তুল্য ও তুলনীয়ের মাঝে সামান্যতম মিল থাকাই যথেষ্ট। হাদীসে হয়তো রঙের গাঢ়ত্বের সাথে তুলনা করা হয়েছে, অথবা দুয়ের মধ্যে কিছুটা গুণগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ কালো রঙের সাথে তুলনা দেখানো হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়ও প্রায়ই এ ধরণের উপমা-তুলনার ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। হাদীসে ব্যবহৃত কালো শব্দের অদ্ব্যর্থ উপস্থিতি সত্ত্বেও এ দিকে লক্ষ্য না করে অযথা আন্দায-অনুমানের ভিত্তিতে হাদীসের ব্যাখ্যা দান সঙ্গত নয়। ফলকথা হচ্ছে, বিজ্ঞ আলেমদের নিকট এ মত সুবিদিত যে, কালো শব্দের বিকল্প মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা না করে বরং তুলনাকে এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখাটাই অধিকতর শ্রেয়।
উপরে বর্ণিত নিষিদ্ধতার দ্বিতীয় কারণ কালো রঙেই বেশি পাওয়া যায়, নীল রঙের কম। ভাবতে অবাক লাগে যা তে নিষেধাজ্ঞার কারণ অস্পষ্ট তাকে নিষিদ্ধ রেখে, যা তে সুস্পষ্ট কারণ বিদ্যমান তাকে জায়েয করার এ অপচেষ্টা কেন? উপরন্তু, সকল কবুতরের বুকের রঙ যে নীলচেই এরও কোন বাস্তবতা নেই। অনেক কবুতরের বুক গাঢ় কালো রঙেরও হয়ে থাকে। মোটকথা, কালো খেযাব ব্যবহার বৈধ হওয়ার পক্ষে কোন শক্ত প্রমাণ এখনো মিলেনি। কারো যদি এ ব্যাপারে আরো অনুসন্ধান করার সুযোগ হয় এবং আমার এ সিদ্ধান্তের বিপরীত কিছু তার কাছে সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে আমার অনুরোধ রইল, তিনি যেন প্রাপ্ত সঠিক তথ্যাটি এ নিবন্ধের পাদটীকায় লিখে দেন। তবে, জিহাদের ময়দানে শত্রু সৈন্যের মনে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে দাড়িতে কালো খেযাব ব্যবহার করাকে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ জায়েয বলেছেন। তারা সম্ভবত : কোরআন মজীদের আয়াত-
এ দিয়ে আল্লাহর ও তোমাদের শত্রুদেরকে ভয় প্রদর্শন কর আর হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
যুদ্ধ তো একটা চালাকীর ব্যাপার-এতদুভয়ের অর্থের ব্যাপকতার সুযোগকে এভাবে ব্যবহার করার প্রয়াস পেয়েছেন।
অনেকে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-র অভিমতের উপর ভিত্তি করে কালো খেযাবের ব্যবহার বৈধ বলতে চান। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) যদি সত্যিই এ ধরণের মত প্রকাশ করে থাকেন এবং পরবর্তীতে সে মত পরিবর্তন না করে থাকেন, তাহলে তাদেরকে বলবো-রাসমূল মুফতী নামক গ্রন্থে এ মূলনীতি স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে যে, কোন ব্যাপারে ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) পরস্পর দ্বিমত পোষণ করলে যার মত ইমাম আবু হানিফার মতের সাথে মিলবে তার মতের উপর ফতওয়া হবে। বিশেষ করে কোন সুস্পষ্ট বিশুদ্ধ দলিল যখন এ মতের সহায়ক হয়। সুতরাং বুঝা গেল, এস্থলে ইমাম আবু ইউসুফের মতামত গ্রহণ করা হানাফী মাযহাবের স্বীকৃত মূলনীতির পরিপন্থী হবে। সেই সাথে সুস্পষ্ট বিশুদ্ধ দলিল বিদ্যমান থাকায় তার মত গ্রহণ বিশ্বস্ততারও খেলাফ বটে।
প্রকাশ থাকা আবশ্যক যে, অন্যান্য রঙ দিয়ে যেহেতু বার্ধক্যের গোপনীয়তা রক্ষা সম্ভব হয় না, তাই সেগুলো ব্যবহার করা বৈধ। পরিশেষে, ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.) সুস্পষ্ট প্রমাণের বিরোধিতা করেছেন বলে যাতে সন্দেহ না হয় তজ্জন্য আমরা তার বক্তব্যের একটা বিকল্প অর্থ এ ধরে নিতে পারি যে, তিনি কালো শব্দ দ্বারা গাঢ় লাল রং বুঝাতে চেয়েছেন। কেননা, গাঢ় লাল রঙে কালচে এসে যায়।
৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদ
দাড়ি উপর দিকে উঠিয়ে রাখা হারাম। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়িকে স্বাভাবিক গতিতে বাড়তে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আসলে কোন নির্দেশকে ওয়াজিব বুঝানোর উদ্দেশ্যেই আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। অতএব দাড়ি নীচের দিকে লম্বা হতে দেওয়া ওয়াজিব এবং উপরের দিকে উঠিয়ে বেঁধে রাখা তার পরিপন্থী হওয়ায় হারাম হবে। আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে হযরত রোয়ইফা (রা.) কে সম্বোধন করে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার পরে তুমি হয়তো অনেক দিন জীবিত থাকবে, তখন তুমি মানব জাতিকে জানিয়ে দিও, যারা দাড়িতে গাঁট বাঁধে ও অমুক অমুক কাজ করে, তাদের জন্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন দায়িত্ব ও সহানুভূতি নেই। গাঁট বাঁধার ফলে দাড়ির আসল রূপ বিকৃত হয় এবং তাতে এক ধরণের বক্রতা সৃষ্টি হয়। এ কারণ যেখানেই পাওয়া যাবে, এ সতর্কবাণীও সেখানেই প্রযোজ্য হবে। দাড়িকে উপরে উঠিয়ে বেঁধে রাখলেও রূপ বিকৃত হওয়া এবং বক্রতা সৃষ্টি হওয়াএ উভয় কারণ পাওয়া যায়। সুতরাং এ ক্ষেত্রেও উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত সতর্কবাণী প্রযোজ্য হবে। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে, দাড়ির এ বিকৃত রূপে অহংকার প্রকাশ পায়। অহংকার করা আর অহংকারীর বেশ ধারণ করা উভয়ই কোরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে হারাম। ফলকথা, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে এ কার্য অত্যন্ত দূষণীয়।। এ অভ্যাস থাকলে আজই তওবা করে নেওয়া কর্তব্য।
সপ্তম অনুচ্ছেদ
চতুর্দিক লম্বা রেখে মাথার মধ্যভাগের চুল মুণ্ডন করা, চতুর্দিক ছোট করে মধ্যে লম্বা চুল রাখা, পিছনের তুলনায় সামনের দিকে লম্বা বা ছোট চুল রাখা ইত্যাদিও দূষণীয় স্বভাবসমূহের অন্তর্ভুক্ত। হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুযা (অর্থাৎ, মাথার কিছু অংশ মুণ্ডন করে বাকী অংশে চুল রাখা) থেকে নিষেধ প্রদান করতে শুনেছি। অনেকের ধারণা, এ ধরণের চুল রাখা কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অবৈধ; অপ্রাপ্ত বয়স্কগণ যেহেতু শরয়ী নির্দেশের গণ্ডী বহির্ভূত তাই তাদের পক্ষে এ ধরণের চুল রাখা অবেধ হবে না। এ ধারণা সম্পূর্ণ অমুলক। গায়র মুকাল্লাফ হওয়ার দরুন বাচ্চাদের গোনাহ না হতে পারে, তবে তার অভিভাবকগণ তো আর গায়র মুকাল্লাফ নন। তারা কেন বাচ্চাদের এভাবে চুল কাটতে দিলেন তজ্জন্য তাদের গোনাহ হবে। আবু দাউদে এই মর্মে এক হাদীস বর্ণিত আছে যে, এক বালকের মাথায় কিছু অংশ মুণ্ডিত এবং কিছু অংশ অমুণ্ডিত চুল দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার অভিভাবককে এ থেকে নিষেধ করে বললেন, হয় পুরো মাথার চুল ফেলে দিবে নতুবা পুরো মাথায় চুল রাখবে। এ হাদীস থেকে দুইটি বিষয় পরিস্কার হয়ে গেল, এক. এ কাজের দূষণীয় হওয়া, দুই. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাকে দেখে নিশ্চুপ থাকলেন না, বরং তার অভিভাবককে নিষেধ করেছেন। এতে প্রমাণিত হলো যে, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও এ প্রকার চুল রাখার অনুমতি নেই।
