প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৪৩ : গত একটি সংখ্যায় স্বাস্থ্য অটুট রাখার জন্য যে পাঁচটি কাজ সকল মানুষের করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অটুট রাখার জন্য এ পাঁচটি কাজ ছাড়া আরো কোনো কাজ আছে কি? যা সকল দেশের সকল এলাকার মানুষের জন্যই মেনে চলা কল্যাণকর এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা জেনে আমাদের দর্শকবৃন্দ উপকৃত হবেন?
উত্তর : হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্থতা ও পবিত্রতার দশটি নীতি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এই দশটি বিষয়ক স্বভাবসুলভ সুন্নাহ বা দ্বীনে হানিফের অংশ বলেছেন। এগুলো সকল পুরুষ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। এসবের কতিপয় মহিলাদের জন্যও প্রযোজ্য। এসব কাজ পূর্বের নবী আলাইহিমুস সালামের উম্মতের জন্যও পালনীয় ছিলো। এই দশটি নীতির ভেতর একটি নীতি হাদীস বর্ণনাকারী মুসয়াবের মনে ছিলোনা। নীতিসমূহ হচ্ছে, ১. গোঁফ ছাঁটা, ২. দাড়ি লম্বা করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দেয়া, ৫. নখকাটা, ৬. আঙ্গুলের জোড়াগুলো ধোয়া, ৭. বগলের পশম উঠিয়ে ফেলা, ৮. নাভির নিচের পশম মুন্ডানো এবং ৯. ইস্তেঞ্জা (প্রস্রাব-পায়খানা হতে নিশ্চিতরূপে পবিত্রতা অর্জন) করা। হাদীসটি বর্ণনাকারী মুসয়াব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, দশমটি আমি ভুলে গেছি, সম্ভবত সেটা হবে কুলি করা। (সহীহ মুসলিম ও আত-তিরমিযী)
এ নীতিগুলোর একটিও যদি কেউ উপেক্ষা করেন, তাহলে আমি বলবো তিনি স্বাস্থ্য সচেতন নন। এই সুন্দর অভ্যাসগত কাজগুলো আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান পুরোপুরি সমর্থন করে। এসব good natural acts নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক সময় বর্ণনা করেছেন যখন মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধ করা তথা রোগ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিলো না। তাই আমরা যদি এই কাজগুলোকে প্রাত্যহিক জীবনে নিয়মিত মেনে চলার অভ্যাস করি তাহলে আমরা অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে দূরে থাকতে পারব।
প্রশ্ন-৪৪ : আঙ্গুলের নখ কাটার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে কি ?
উত্তর : হ্যাঁ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হচ্ছে, আঙ্গুলের নখ কাটা এবং কর্তিত অংশ মাটিতে পুঁতে ফেলা। তিনি বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার নখের মাথা কেটে ফেলো বা ছোট রাখো, নাভির নিচের লোম কামিয়ে ফেলো এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলো। আর প্রত্যেক শুক্রবারে গোসল করো আর পরিষ্কার ও পবিত্র পোশাক পরো ও সুগন্ধি ব্যবহার করো। (আস-সুয়ূতী)
শুক্রবারে গোসল করা অনেক সময় বেশ প্রয়োজন। আবার অনেক সময় তা উত্তম, তবে অত্যাবশ্যক নয়। এই শুক্রবারে গোসল করা সম্পর্কে আরেকটি হাদীস আছে, যা বর্ণনা করেন হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র আব্দুর রহমান। তিনি তার পিতার বরাত দিয়ে বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উচিত শুক্রবার গোসল করা, মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য থাকলে সুগন্ধি ব্যবহার করা। (সহীহ মুসলিম)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, যে ব্যক্তি যে হাতের আঙ্গুলের নখ কাটে তার অপর দিকের চোখে কোনো অসুখ হবেনা। (আস-সুয়ূতী)
অর্থাৎ বাম হাতের আঙ্গুলের নখ কাটলে ডান চোখে ড়ঢ়ঃযঃযধষসরধ রোগ হবেনা। তিনি আরো বলেছেন, আঙ্গুলের নখ কেটে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। (আন-নাসাঈ)
প্রশ্ন-৪৫ : গোঁফ ছোট রাখার বিষয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য আছে কি ?
উত্তর : হ্যাঁ আছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আঙ্গুলের নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা এবং নাভির নিম্নাংশের লোম পরিষ্কার করা মানুষের স্বভাবধর্মের কাজ। (সহীহ আল বুখারী)
এর আগে যে হাদীসটি নিয়ে আলোচনা করেছি, তা হযরত আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত। সেখানে পাঁচটি স্বভাবজাত বিষয়ে কথা বলা হয়েছে যা মানুষের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। এগুলো হচ্ছে- খৎনা করা, নখ কাটা বা পরিষ্কার রাখা, নাভির নিচের পশম বা লোম পরিষ্কার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা ও গোঁফ ছাঁটা।
হযরত আবূ আব্দুল্লাহ আল-আগার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমুআর সালাতে যাওয়ার আগে নিজের গোঁফ ছোট করতেন ও তাদের নখ কাটতেন। (মুসনাদে আল বায্যার)
আত-তাবারানী ও বাযযার গ্রন্থে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুক্রবার মসজিদে জুমুআর সালাতে গমনের পূর্বে নিজের গোঁফ ও নখ কেটে নিতেন। (মুজামুল আওসাত ও আখলাকুন্নবী)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুও একই হাদীস বর্ণনা করেন। হযরত যায়দ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি গোঁফ ছোট রাখেনা, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। অর্থাৎ সে আমার উম্মত নয়। (আত-তিরমিযী ও আন-নাসাঈ)১২৭
গোঁফ সম্পর্কে আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা গোঁফ কামিয়ে ফেলো, আর দাড়ি বড় হতে দাও। (সহীহ আল বুখারী, মুসলিম ও আত-তিরমিযী)
এই হাদীস দুটোর বিষয়বস্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রথম হাদীসটির তাৎপর্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই হাদীস অনুযায়ী যারা মাত্রাতিরিক্ত বড় গোঁফ রাখেন তারা নবীর উম্মত নন। বস্তুত হাদীস দুটোতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন বাস্তবে আমরা করছি তার উল্টো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি রাখতে আর গোঁফ ছাঁটতে নির্দেশ দিয়েছেন, আর আমরা হুবহু এর বিপরীত কাজটিই করছি। অর্থাৎ আমরা গোঁফ বড় রাখি আর দাড়ি কামিয়ে ফেলি এবং দলচ্যুত হই। এটি কাম্য নয়।
