প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

আতশবাজীও এ ধরনেরই একটা অশুভ প্রথা। এতেও অনেক অপকারিতা রয়েছে।

এক. অর্থের অপচয়-যা কোরআন মজীদের স্পষ্ট নির্দেশ মোতাবেক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

দুই. এতে করে নিজের, সন্তান-সন্তুতির ও পাড়া-পড়শীর জীবন বিপণন্ন হয়ে পড়ে অনেক সময়। আতশবাজী করে হাত নষ্ট হওয়া, মুখ পোড়া, পোশাকে আগুন লাগা ইত্যাদি কত শত ঘটনা ঘটেছে। এ ধরণের আত্মধ্বংসী ক্রিয়াকলাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা কোরআন মজীদে বলেন-তোমরা নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। এই কারণেই বিনা প্রয়োজনে আগুন নাড়াচাড়া করা এবং আগুনের নিকট গমন করা হাদীস অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তেমনিভাবে, উন্মুক্ত আগুন আর জ্বলন্ত বাতি কাছে রেখে ঘুমাতে নিষেধ করা হয়েছে।

তিন. আতশবাজীর একটা অন্যতম উপাদান হিসেবে কাগজ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিদ্যাশিক্ষার উপকরণাদির সাথে অসদাচরণ করা যে অত্যন্ত মন্দ কাজ তা আমরা পূর্বেই বর্ণনা করেছি। আরো তাজ্জব ব্যাপার হচ্ছে, লেখা কাগজ এমনকি কোরআন-হাদীসের পাতা পর্যন্ত এ কাজে ব্যবহার করতে তারা মোটেও দ্বিধাবোধ করে না। জনৈক বিশ্বস্ত ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন, আমি কোরআন শরীফের পাতা দিয়ে প্রস্তুতকৃত খেলনা দেখেছি।

চার. এতে করে শিশুদেরকে জীবনের প্রারম্ভ থেকে পাপ কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, অথচ আল্লাহ রসূলের আইন শিশুদেরকে শৈশবেই ইলম ও আমলের প্রশিক্ষণদানের নির্দেশ দিয়েছে। এ যেন খোদায়ী বিধানের সাথে বিদ্রোহ। বিশেষ করে শবেবরাতের ন্যায় বরকতময় রাতে আতশবাজীকে যেন পুণ্য-তালিকার শীর্ষে স্থান দেওয়া হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুণ্যময় মুহূর্তগুলোতে ইবাদত-বন্দেগী করা যেমন অত্যধিক পুণ্য লাভের উপায়, সেইক্ষণে পাপ কাজ করলে গুনাহও তেমনি বেশি হয়ে থাকে।

পাঁচ. আতশবাজীর অংশ হিসেবে অনেক সময় বেল, ডালিম, জাম্বুরা ও ইত্যাদি নানা প্রকার বস্তু উপরের দিকে নিক্ষেপ করা হয়। এসব বস্তু লোকজনের মাথায় ও শরীরে পতিত হয়ে অনেককে আহত করে। ইয়াজুজ-মাজুজ যেমন করে আকাশের পানে তীর নিক্ষেপ করবে এরাও তা-ই করে। অথচ কাফেরদের অনুকরণ করা হারাম। অনেকে বলেন, হজ্বের মওসুম মক্কা মোআযযামায় তোপধ্বনি করা হয়, আতশবাজী বৈধ না হলে সেখানে এ কাজ হয় কেন? এর জবাবে বলবো, প্রথমতঃ সাধারণ সৈনিকোচিত ক্রিয়াকলাপ শরীয়তের দলিল নয়, বরং দ্বীনদার তাত্ত্বিক আলেমের বক্তব্য যখন শরীয়তের নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তখনই তা দলিল হওয়ার যোগ্যতা রাখে। বলাবাহুল্য, তোপধ্বনি করা সৈনিকদের কাজ, কোন আলেমের ফতওয়া নয়।

দ্বিতীয়ত তোপধ্বনিতে কিছুটা ভালো দিকও রয়েছে, যেমন-ইসলামের শৌর্য-বীর্যের বহিঃপ্রকাশ, হজ্বের বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কার্য সম্পাদনের ঘোষণা ইত্যাদি। অপরপক্ষে, আতশবাজী তো ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধির সহায়ক নয়। হ্যাঁ, কোন স্থানে যদি আতশবাজীর মাধ্যমে জরুরি সংবাদ প্রচারের নিয়ম প্রচলিত থাকে তাহলে প্রয়োজন মাফিক আতশবাজী করা জায়েয হবে। যেমন, কোন কোন স্থানে ইফতার ও সেহরীর সময় ঘোষণার উদ্দেশ্যে যে দুএক গোলা আতশবাজী করা হয় তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত করা হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে অবৈধ হবে।

চতুর্থ অনুচ্ছেদ

দাড়ি কামানো, এক মুঠোর কম রাখা, গোঁফ লম্বা করা ইত্যাদি ক্রিয়া-কর্মকে অধিকাংশ যুবকগণই শোভনীয় ও প্রশংসনীয় কাজ বলে ধারণা করে থাকেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাড়ি লম্বা হতে দাও আর গোঁফ ছোট করে রাখ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নির্দেশ দুটিতে আদেশসূচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। কোন নির্দেশকে ওয়াজিবরূপে পালনীয় বুঝানোর জন্যই আদেশসূচক শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাজেই বুঝা গেল, এ দুই হুকুমের তামিল করাও ওয়াজিব এবং ওয়াজিব তরক করা হারাম। সুতরাং দাড়ি ছোট করা গোঁফ লম্বা রাখা উভয়টি হারাম কাজ। আহমদ, নাসায়ী ও তিরমিযীতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আরো বেশি গুরুত্ব প্রদান করে এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি গোঁফ ছোট করে না সে আমার দলভুক্ত নয়।

দাড়ি ছোট করা এবং গোঁফ লম্বা করা গোনাহের কাজ জেনেও যারা সে অভ্যাস ত্যাগ করে না, বরং তাতে আনন্দ অনুভব করে, লম্বা দাড়ি রাখাকে নিন্দনীয় মনে করে, শ্মশ্রুধারীদের নিয়ে ঠাট্টা-বিরূপ করে এবং দাড়ি রাখার কারণে কাউকে হীন ও অসামাজিক ভাবে; তাদের ঈমানের নিষ্কলুষতায় যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এমতাবস্থায় স্বীয় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা, ঈমান ও বিবাহ নবায়ন করা এবং আকৃতি-প্রকৃতিতে আল্লাহ ও তার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধানবালী অনুসরণের দৃঢ় শপথ করা তাদের ওপর ওয়াজিব হয়ে যায়। বিবেকও তো বলে, নারীর মাথায় কেশরাজীর ন্যায় পুরুষের মুখের দাড়িও আল্লাহ প্রদত্ত সৌন্দর্যের এক অতুলনীয় প্রতীক। মুণ্ডিত মস্তক নারী যেখানে সবার কাছেই দৃষ্টিকটু বলে মনে হয়, পুরুষের মুখের দাড়ি মুণ্ডনে সেখানে কোন সৌন্দর্যের সন্ধান মিলে? ওসব কিছু নয়, আসলে প্রচলিত ফ্যাশন মন-মগজে পর্দা ফেলে দিয়েছে, তাইতো সুু বুদ্ধির চর্চা অনভিপ্রেত ঠেকে। অনেকে বলেন, আমরা তো শ্মশ্রুবিহীন তুর্কী খলিফার অনুকরণ করছি। এর জবাব একটাই, শরয়ী আইনে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের শরীয়ত পরিপন্থী কার্যকলাপ কোন কিছুর বৈধতা প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। যে দাড়ি মুণ্ডন করে সে যে দেশের বাসিন্দাই হোকনা কেন, সে পাপী।

অনেকে নিজেকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক দেখানোর জন্য দাড়ি কামিয়ে আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে। সামাজিক আচার-আচরণে পূর্ণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরও তারা অত্যন্ত নম্র-ভদ্র স্বরে বলে থাকনে- নিজেকে এত অল্পবয়সে মুরুব্বীদের কাতারে দাঁড় করাতে চাইনে। এটাও এক প্রকারবক্র চিন্তার ফসল। বয়স তো আল্লাহর দান, বয়স যতই বৃদ্ধি পায় বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের পরিমাণও ততই বৃদ্ধি পায়। কাজেই একে গোপন রাখার প্রবণতা নিয়ামতের না-শোকরী করারই শামিল। বয়সের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করাও শুভবুদ্ধির পরিচায়ক। জ্ঞান-বুদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বোকাদের কাছে তা লজ্জার ব্যাপার হতে পারে-অনেক নাস্তিকের কাছে তো মুসলমান হওয়াটাও একটা লজ্জার ব্যাপার। আল্লাহ না করুক, অদ্ভূত লজ্জাবোধের এ বিকৃত মানসিকতার ফলস্বরূপ এসব ঈমানদারদের পক্ষে কোনদিন আল্লাহর ইসলামকে সানন্দে বিদায় জানানো বিচিত্র কিছু নয়। নাস্তিকদের কাছে ঘৃণিত হওয়ার ভয়ে ইসলাম ত্যাগ করা যেমন সুস্থ বৃদ্ধির পরিপন্থী কিছুসংখ্যক ফাসিকের কাছে নিন্দনীয় হওয়ার ভয়ে ইসলামের অন্যতম প্রতীককে পরিহার করাও তেমনি ঈমানের দাবির বিপরীত। এসব চিন্তাধারার উদ্ভাবক ও প্রচারকগণ শয়তানের কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী বিশেষ।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আরবী শিক্ষার্থীদের মাঝেও এ লেবাছের প্রভাব দিন দিন বেড়ে চলেছে। এসব শিক্ষার্থীদেরকে গাধার পিঠে কিতাবের বোঝার সাথে তুলনা করাই শ্রেয় মনে হয়। এ সমাজে ইসলামের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করার জন্য এরাই সবচেয়ে বেশি দায়ী। তারা অনেকের চাইতে বেশি জ্ঞানী। সাধারণ মানুষ তাদের কাছে উপদেশ আশা করে, মাসআলা জানতে চায়, অথচ তারা নিজেরাই বে-আমল। কুরআন-হাদীসে বেআমল আলেমের কঠোর শাস্তির কথা বর্ণিত রয়েছে। বেআমল আলেমদের দেখে সাধারণ লোকেরা বিভ্রন্তিতে পতিত হয়। যে কোন পাপের শাস্তিতে ঐ পাপের উদ্ভাবক, উদ্যোগ ও প্রচারকও সমভাগী হবে-উপরোল্লিখিত এ সাধারণ নিয়মের ভিত্তিতে বলা যায়, বিভ্রান্ত জনসমষ্টির পাপের সমপরিমাণ শাস্তি ঐ বিভ্রান্তকারী আলেমগণও ভোগ করবে। আমার মতে, ইসলামী শিক্ষায়তনগুলোর শিক্ষক ও পরিচালকমণ্ডলীর উচিত, যে ছাত্র এ ধরণের পাপ কাজে লিপ্ত হবে বা অন্য কোন শরীয়ত বিরোধী কাজ করবে, সে তওবা না করলে তাকে প্রতিান থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া। কেননা এ ধরণের লোক উচ্চাসনে অধিতি হলে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।

কবি বলেছেনঃ

বেআদবকে জ্ঞান দান করা আর ডাকাতের হাতে স্বেচ্ছায় ছুরি উঠিয়ে দেওয়া একই কথা। এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, কারো নির্দেশে শরীয়তে নিষিদ্ধ রীতিতে দাড়ি-গোঁফ কাটা নাপিতের পক্ষেও নাজায়েয। কেননা, পাপের সাহায্যকারীও পাপী। এক্ষেত্রে নাপিতের উচিত, নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে এ কাজ থেকে বিরত থাকা।