প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৮৯. বড় বড় অট্রালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা

১. নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত ,কিয়ামাতের ঘটিত নিদর্শনাবলীর অন্যতম হচ্ছে নগ্নপদ নগ্নদেহ রাখাল (আরব)দের বাড়িঘর সুউচ্চকরণ প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে উঁচু করে বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারে.. কে কার চেয়ে বেশি ডিজাইন/স্টাইল করে বাংলো বানাতে পারে..। অথচ এইতো কিছুদিন পূর্বেই তারা ছিল মেষপালের রাখাল। গায়ে ছিল না বস্ত্র, পায়ে ছিল না জুতো।

২. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ যখন রাখালরা বড়ো অট্রালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা করবে তখনই তা কিয়ামাতের একটি আলামত। (মুসলিম ৯)

৩. উমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাতের আলামত এটাও যে, তখন তুমি কাপড়-জুতোবিহীন গরিব ছাগল রাখালকে দেখবে অট্রালিকা নির্মাণে জোর প্রতিযোগিতা করতে। (মুসলিম ৮)

৪. অপর হাদীসে- দুঃখ কষ্ঠে জর্জরিত অভাবী লোকদেরকে নেতৃত্বের পদে দেখতে পেলে সেটাই হবে কিয়ামাতের নিদর্শন। দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত অভাবী নগ্নপদ ও নগ্নদেহ রাখাল বলতে আপনি কাদের বুঝাচ্ছেন? প্রশ্নের উত্তরে নবীজী বলেন- আরব জাতি। (মুসনাদে আহমদ)

৫. মানুষের উপকার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কল-কারখানা, কোম্পানির টাওয়ার বা কোন বিল্ডিং উঁচু করে নির্মাণ দোষের কিছু নেই। তবে যদি তা পরস্পর অহংকার প্রকাশ, বা বহির্বিশ্বের সামনে দেশীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে অবশ্যই তা বৈধতার গন্ডিতে পড়বে না।

৬. হাদীসে বাড়িঘর উঁচু বলতে উপরের দিকে বিল্ডিংয়ের স্তর বা তলা বৃদ্ধি করা, নিত্য নতুন কারুকার্যে সুশোভিত করা, মাত্র এক/দুই জনের জন্য বিশাল বাংলো নির্মাণ করে আসবাবপত্র বৃদ্ধি করা ইত্যাদি উদ্দেশ্য। এ সব কিছুই ধন সম্পদ ও বিলাসিতার বর্তমান জমানায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে।

৭. হাদীসে উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাহাড় পর্বত এবং সুদূর মরু প্রান্তরের রাখালেরা ছাগলের রাখালি ছেড়ে দিয়ে উঁচু উঁচু টাওয়ার নির্মাণে মত্ত হয়ে উঠবে । সকলেই চাইবে আমার-টা সবার চেয়ে উচুতে থাকুক।

৮. বর্তমান আরব দেশগুলোতে এটা ব্যাপক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। প্রত্যেকটি দেশই চাইছে, বিশ্বের সবচে দীর্ঘতম টাওয়ারটি তার দেশে হোক! এর জন্য যত টাকা দরকার হয়, খরচ করতে রাজী।

সম্প্রতি নির্মিত ১৬০ তলা বিশিষ্ট সর্বোচ্চ বুরজ আল খলিফা টাওয়ারটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই-তে অবস্থিত। এদিকে সৌদি সরকার বিশ্বের সর্বোচ্চ ৩০০ তলা বিশিষ্ট টাওয়ার নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে ইতিমধ্যেই নির্মাণ কাজ শুরু করে দিয়েছে।

৯০. মক্কায় পাহাড় সম উঁচু ভবন নির্মাণ

নবীযুগে মক্কা নগরীতে বসতি সংখ্যা খুবই স্বল্প ছিল । বাড়িঘর ছিল বিক্ষিপ্ত। কিয়ামাতের পূর্বমৃহূর্তে মক্কার ভবনগুলো পাহাড়-সম উঁচু করে নির্মিত হবে।
ইবনে আবী শাইবার বর্ণনায় ইয়-লা বিন আতা আপন পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন- আমি আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) এর বাহনের লাগাম ধরে দাড়িয়ে ছিলাম। তিনি বলতে লাগলেন ঐ সময় তোমাদের কি হবে, যখন তোমরা কাবা ঘর ধ্বংস করে দেবে, একটি প্রস্তব খন্ড-ও অবশিষ্ট রাখবে না!!তারা বলল- সেদিন কি আমরা ইসলাম ধর্মে থাকব? বললেন-হ্যাঁ…তোমরা মুসলমান থাকবে। অতঃপর আরো সুন্দর করে নির্মাণ করা হবে। যখন দেখতে পাবে,মক্কা নগরীতে মাটি চিরে পার্শ্বকুপ (নলকুপ/পানি চলাচলের আধুনিক পাইপ লাইন ব্যবস্থা) নির্মিত হচ্ছে এবং ভবনগুলো পাহাড়-সম উঁচু হয়ে গেছে, (মনে রেখো!) তখন মহা বিপদাপদ কাছিয়ে গেছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ) বর্তমানে জমজমের পানি সরবরাহ সহজ করণে মাটি খুুরে সেখানে অসংখ্য পানির পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়েছে।

৯১. পুরুষদের সংখ্যা হ্রাস মহিলাদের সংখ্যা বৃদ্ধি

১. কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে পুরুষ হ্রাস পাওয়া এবং নারী জাতির সংখ্যাবৃদ্ধি পাওয়া।

২. কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে অধিক সংঘাত ও হত্যাযজ্ঞের দরুন পুরুষ নিঃশেষ হতে থাকবে।কেউ কেউ বলেছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে অধিক হারে মুসলমানদের বিজয় উদ্দেশ্য। বন্দী হিসেবে তখন প্রচুর দাসী তাদের হস্তগত হবে।

৩. ইবনে হাজার (রহ.) বলেন- হাদীসের বাহ্যিক অর্থে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে,অন্য কোন কারণে নয়; কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে এমনিতেই আল্লাহ পুত্র-সন্তান জন্মের হার কমিয়ে কন্যা-সন্তান বাড়িয়ে দিবেন।

৪. আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন কিয়ামাতের নিদর্শনাবলীর মধ্যেঃ-
১। (দ্বীনের) জ্ঞান উত্তোলন, ২। (দ্বীনের ব্যাপারে) ব্যাপক মূর্খতা প্রকাশ, ৩। মদ্য-পান, ৪। (যিনা) ব্যভিচার ব্যাপকতা লাভ, ৫। পুরুষ হ্রাস, ৬। এবং মহিলার সংখ্যা বৃদ্ধি। এক পর্যায়ে পঞ্চাশ জন মহিলার দায়ভার একজন পুরুষ গ্রহণ করবে। (বুখারী ৮০,৮১ ৬৮০৮;মুসলিম ২৬৭১)
উপরোক্ত হাদীসে পঞ্চাশ জন মহিলা বলতে সুনির্দিষ্ট পঞ্চাশ সংখ্যাই বুঝানো হয়নি। বরং তাতে মহিলাদের সংখাধিক্যের কথাই বুঝানো হয়েছে। কারণ, অন্য হাদীসে চল্লিশ জনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. আবূ মুসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ এমন এক সময় আসবে যখন জনৈক ব্যক্তি স্বর্ণের যাকাত নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুবে বেড়াবে ; অথচ সে এমন কোন লোক খুজে পাবে না যে তার যাকাতটুকু গ্রহণ করবে এবং যখন দেখা যাবে যে, একজন পুরুষের অধীনে রয়েছে চল্লিশ জন মহিলা যারা ভরণ- পোষণের দিক দিয়ে একমাত্র তার উপরই নির্ভরশল। কারণ,তখন পুরুষ কমে যাবে এবং মহিলা বেড়ে যাবে। (মুসলিম ১০১২)

৬. বর্তমান বিশ্বে কন্যা সন্তান জন্মের হার বিষয়ক আন্তর্জাতিক জরিপগুলো যাচাই করলেই বুঝতে পারবেন যে, নিদর্শনটি সূচনা হয়ে গেছে এবং দ্রুত সামনের দিকে এগুচ্ছে। একশত বছর আগেও যেখানে প্রায় সকল দেশেই পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল সেখানে গত প্রায় একশ বছরের ব্যবধানে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে । জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১০ সনের হিসাব মতে ১৮৬ টি দেশের মধ্যে ১০৮টি দেশে মহিলাদের সংখ্যা পুরুষের চাইতে বেশি,২১টি দেশে মহিলা ও পুরুষের সংখ্যা সমান এবং ৫৭টি দেশে মহিলাদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা সামান্য বেশি।

৯২. হঠাৎ বা আকষ্মিক মৃত্যুর হার বদ্ধি

১. সম্প্রতি ঘটিত কিয়ামাতের আলামাতগুলোর মধ্যে আকষ্মিক মৃত্যু অন্যতম হার্ড এ্যাটাক, হাই পেশার এবং ব্যাপক সড়ক দুর্ঘটনার ফলে অধিক হারে আকষ্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

২. আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ নিশ্চয়ই কিয়ামাতের অন্যতম আলামত হচ্ছে হঠাৎ মৃত্যু বেশি বেশি প্রকাশ পাওয়া। ( মাজ্মা‘উয্ যাওয়ায়িদ ৭/৩২৫ সহীহুল জামি, হাদীস ৫৭৭৫)

৩. আগে মানুষ দুই-তিন দিন পূর্বে থেকেই মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে টের পেত। কিছুদিন বিছানায় অসুস্থ পড়ে থাকত। মরণ কাছিয়ে গেছে বুঝে -অসিয়ত লিখে রাখত্ পরিবারের কাছে দোয়া ও বিদায় চাইত। সারা জীবনের পাপ থেকে আল্লাহর দরবারে তওবার সুযোগ পেত। বেশি বেশি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করত কিন্তু এখন…!! শুনে থাকবেন যে, সুস্থ সবল পূর্ণ আরোগ্য ব্যক্তিটি হার্ট এ্যাটাক করে গত রাতে মারা গেছে…। অমুক মন্ত্রীর ছেলে পাঁচ বন্ধু সহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে….। সুতরাং জ্ঞানী মাত্র-ই সদা নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখা চাই। গুনাহ হওয়ার সাথে সাথে তওবা করে নেয়া চাই।