প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ ۙ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
সূরা নাহল আয়াত নং ৬৪

অর্থ : আমি আপনার উপর কুরআন নাযিল করিয়াছি এই হেতু যে, আপনি লোকদের নিকট প্রকাশ করিবেন যাহা তাহাদের উপর নাযিল করা হইয়াছে এবং এই হেতু যে, তাহারা চিন্তা করিবে।

তফসির বয়জাবী, ৪৪৬-পৃ. আল্লাহ তায়ালা বলিতেছেন যে, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের আদেশ, নিষেধ বা অস্পষ্ট বিষয়গুলো প্রকাশ করিবেন এবং লোকেরা উহার প্রকৃত মর্ম অবগতির জন্য চিন্তা করিবে। হযরত কতক স্থলে উহা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করিয়াছেন, অবশিষ্ট কতক কেয়াছ ও জ্ঞান দ্বারা মর্ম অবগতির জন্য উপদেশ দিয়াছেন।
তফসির কবির, ৫ম খন্ডে

কুরআনের কতকাংশের মর্ম অস্পষ্ট, সেই হেতু হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহার মর্ম প্রকাশ করিয়া দিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন। ইহাতে প্রমাণিত হইল যে, কুরআন শরীফের আয়াতের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট দুই প্রকার অর্থ আছে। যদি উহা না থাকিত, তবে হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন উহা প্রকাশ করিতে এবং লোকেরা কেয়াছ বা জ্ঞান দ্বারা উহা আবিষ্কার করিতে আদিষ্ট হইলেন?
কুরআন, সূরা তাহা
হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার এলম বেশি করুন।
তফসির মনির, দ্বিতীয় খ-, ২৮ পৃষ্ঠা

আয়াতের মর্ম এই যে, আল্লাহ তায়ালা বলিতেছেন, হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি কুরআন শরীফের নিগুঢ় মর্মসমূহ বুঝিতে সক্ষম হইবার জন্য আমার নিকট প্রার্থনা করুন, কেননা উহা অসীম।
মেশকাত, ৩৫ পৃষ্ঠা

জনাব হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, কুরআন শরীফ সপ্ত অক্ষরে (কেরাতে) অবতীর্ণ হইয়াছে। প্রত্যেক আয়াতের দুই প্রকার অর্থ আছে, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট। প্রত্যেকের এক একটি সীমা (হদ) ও বুঝিবার স্থল আছে। ইমাম বাগাবি এই হাদীসটি শরহোছ ছুন্নাহ গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন। আল্লামা তীবী মেশকাতের টীকায় লিখিয়াছেন

সৈয়দ জামালুদ্দিন বলিয়াছেন, হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক অক্ষরকে একবার জাহিরী ও বাতিনী দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। দ্বিতীয়বার প্রত্যেকের হদ ও এত্তেলাস্থল নির্ধারণ করিয়াছেন। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ কর্তৃক যে তফসীর বর্ণিত হইয়াছে, উহাকে জাহর বলে। আর সূক্ষ্ম জ্ঞান দ্বারা যে নিগুঢ়তত্ত্ব অবগত হওয়া যায়, উহাকে বাতন বলে। হদ ও এত্তেলাস্থলের সীমা নাই, কেননা, উভয়ের শেষ সীমা মারেফাত-তত্ত্বজ্ঞ পীরদের পথ। আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁহার মনোনীত নবীগণ ও অলিউল্লাহগণের মধ্যে নিহিত তত্ত্বজ্ঞান আরবী ব্যাকরণ ও অভিধান শিক্ষা করিলে এবং উহাতে পারদর্শিতা লাভ করিলে এবং জাহেরি মর্ম জানা যায়, তাহার হাদীস এ সাহাবীগণের মতের অনুসরণ করিলে, উহার জাহিরী মর্ম অবগত হওয়া যায় এবং কঠোর সাধ্য সাধনা দ্বারা আত্মশুদ্ধি করিতে পারিলে, উহার বাতিনী মর্ম অবগত হওয়া যায়।

তফসীর মায়ালেমে বর্ণিত আছে, কুরআন শরীফের শব্দকে (শব্দার্থকে) জাহর বলে এবঙ নিগুঢ় তত্ত্ব জ্ঞানকে বাতন বলে। উহার বুঝিবার শক্তিকে মাতলা বলে। আল্লাহ তায়ালা গবেষণাকারীদের উপর এরূপ নিগুঢ় তত্ত্বজ্ঞান প্রকাশ করেন যাহা অন্য কাহারও উপর প্রকাশ করেন না।
ইমাম রাজি তফসীর কবীরের তৃতীয় খন (১২২ পৃষ্ঠায়) লিখিয়াছেন

সূক্ষ্মতত্ত্বজ্ঞ টীকাকার প্রত্যেক আয়াতে বহু আশ্চর্যজনক গুপ্ত ভেদ ও সূক্ষ্মতত্ত্বজ্ঞান অবগত হইয়া থাকেন। আরও তিনি উক্ত তফসিরের নবম খন্ডে (২৪০ পৃষ্ঠায়) লিখিয়াছেন

যে আল্লাহর প্রত্যেক কথায় এক একটি গুপ্ত ভেদ নিহিত আছে, আমি তাঁহার পবিত্রতা প্রকাশ করিতেছি। এই আয়াতের এইরূপ মর্ম লিখিত হইল, কিন্তু এখনও উক্ত আয়াতের অধোদেশে বহু অব্যক্ত তত্ত্বজ্ঞান নিহিত আছে। যদি জমির সমস্ত বৃক্ষ লেখনী হয় এবং ক্রমান্বয়ে সপ্ত সমুদ্রের পানি মসীরূপে ব্যবহৃত হয় তবুও আল্লাহ তায়ালার বাক্য সকল শেষ হইবে না।
আকায়েদ নাছাফি, ১১৯-১২০ পৃষ্ঠা

কুরআনের আয়াত ও হাদীস সকলের স্পষ্ট ও প্রকাশ্য মর্ম গ্রহণীয় হইবে, অবশ্য কতক স্থলে অকাট্য দলীল অনুযায়ী অস্পষ্ট মর্ম গ্রাহ্য হইবে। কাফের বাতিনিয়া দল যেরূপ স্পষ্ট মর্ম ত্যাগ করিয়া যে যে মর্মের দাবী করে, উহা কাফেরী কার্য। কতক বিচক্ষণ বিদ্বানের মত এই যে, কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহের স্পষ্ট মর্মই গ্রহণীয় হইবে, তবে তৎসমুদয়ের এইরূপ সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞানের অস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে যাহা তরীকতপন্থী পীরগণের উপর প্রকাশ হইয়া থাকে, কিন্তু উক্ত তত্ত্বজ্ঞান গ্রহণ স্পষ্ট মর্মের বিপরীত নহে। তাঁহাদের এই মতকে পূর্ণ ঈমান ও বিশুদ্ধ মা’রেফাত বুঝিতে হইবে।
আল্লামা জামি নাফহাতোল উনছ; কেতাবে লিখিয়াছেন, প্রকৃত কামেল ও ছালেক আট শ্রেণী। আর সাত শ্রেণী লোক কামেল ও ছালেক নহেন, কিন্তু তাঁহাদের তুল্য হইবার চেষ্টা করেন। আর সাত শ্রেণীর লোক কামেল ও ছালেক হইবার দাবী করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাহারা কতক কাফের ও কতক রিয়াকার ফাছেক। ইহাদের মধ্যে একদল বাতিনিয়া ও মোবাইয়া নামে অভিহিত হইয়া থাকে, তাহারাই কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট মর্মসমূহ অস্বীকার করে। তাহারা শরীয়ত অমান্য করতঃ কাফের হইয়াছে।

ইমাম গাজ্জালি এহইয়াউল-উলুম কেতাবে উক্ত বাতিনিয়া দলের প্রতিবাদ করিয়াছেন। আওয়ারেফ কেতাবে বর্ণিত আছে, পীর জোনায়েদ বাগদাদী (রহ.) বলিয়াছেন যে, আমাদের এই তরিকতের ভিত্তি কুরআন ও হাদীস দ্বারা দৃঢ় করা হইয়াছে। ইমাম আহমদ ছারহান্দি (রহ.) মকতুবাতে লিখিয়াছেন, তরীকত শরীয়ত ভিন্ন আর কিছু নহে। তরীকতের আদি আবিষ্কারক হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবিয়ি ও তাবা-তাবিয়ি ছিলেন। হযরত সালমান ফার্সি (রাঃ), ইমাম হাসান বাসারি, ইমাম জাফর ছাদেক, ইমাম মোহাম্মদ বাকের, ইমাম মুছা কাজেম, ইমাম আলি রেজা, পীর মা’রুফ কারখী, পীর ছার্রি ছাতকী, পীর জোনায়েদ বাগদাদী, পীর শেষ শিবলী, হযরত সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী, পীর শেষ ফরিদউদ্দিন, হযরত খাজা মঈনদ্দীন চিশতী, হযরত খাজা নেজামউদ্দীন, খাজা বাহাউদ্দীন রহমতুল্লাহে আলায়হিম প্রভৃতি এইরূপ বহু সহস্রাধিক পীর তরীকতপন্থী ছিলেন। তাঁহারা শরীয়ত অমান্য করেন নাই, তাঁহারা কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট মর্ম অস্বীকার করেন নাই।