প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

কেউ কেউ এমনও বলে যে, আমি জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত মেয়ের সমস্ত খরচ বহন করেছি। তাই এখন তা নিয়ে নিয়েছি। এটাও মুর্খতাসূলভ উত্তর/আচরণ। কারণ শরীয়ত অনুযায়ী তার প্রতিপালনের দায়িত্ব আপনার উপর ওয়াজিব ছিল। সুতরাং আপনি সে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্ব নিজের সম্পদ থেকে করা ওয়াজিব ছিল। এর বিনিময় গ্রহণ করা শরীয়ত পরিপন্থী; এমনকি স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসারও পরিপন্থী। আপনি তার পিছনে প্রতিপালনে যে সম্পদ খরচ করেছেন তা একটি হিসাব বিহীন সওদা। এর কোন হিসাব-নিকাশ নেই। লিখিত নেই। ১৫/২০ বছর খরচ করে তার টাকা থেকে উঠিয়ে নিবেন। এদিকে খরচ করে অপর দিকে নিয়ে নিলেন এতে তো তাকে ভিন্ন করে দিলেন। সুতরাং আপনি আপনার সন্তানের প্রতি কেমন আচরণ করলেন ?

আবার কোন কোন লোক কখনও কখনও ঠাট্টা-উপহাসের মাঝে মালিকের কোন জিনিস নিয়ে চলে যায়। পরে চোখ-কান বন্ধ করে তা বিনানুমতিতে রেখে দেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মালিক তা সন্তুষ্টচিত্তে দিতে রাজি নয়। অতএব এমনভাবে কোন কিছু গ্রহণ করাও হারাম; যদিও মালিক শিষ্টাচারের খাতিরে নীরব থাকে। সচরাচর এ প্রথা প্রচলিত আছে যে, কোন ব্যক্তি ইন্তেকাল করলে তার সম্পদ থেকে কতিপয় ইয়াতীম ও ফকীর-মিসকীনকে দাওয়াত করে খাওয়ান হয়। মরহুমের কাপড়-চোপড়ও সওয়াবের নিয়্যতে অন্যদের দিয়ে দেওয়া হয় (দান করা হয়)। বাস্তবিক পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টনের পূর্বে এরূপ করা ও দান করা বৈধ নয়। কারণ প্রথমত সকল উত্তরাধিকারী বালেগ (উপযুক্ত ও প্রাপ্ত বয়স্ক) নয়। আবার সকলে উপযুক্ত হলেও সকলের উপস্থিত থাকা জরুরী নয়। কেননা কেউ সফরে বা চাকরীতে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে কর্মব্যস্ত থাকে। সুতরাং যৌথ সম্পদ সকলের সম্মতি ব্যতীত ব্যবহার বা খরচ করা বৈধ নয় এবং প্রচলিত পন্থায় প্রচলিত (কৌশলী) অনুমতি ধর্তব্য ও গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বপ্রথম সম্পদ বণ্টন করে ওয়ারীসদের অংশ তাদেরকে বুঝে দিন। তারপর ঈসালে সওয়াবের জন্য পরশ্রীকাতরতা ব্যতীত শরীয়ত অনুযায়ী খরচ করুন। একথাও খুব মনোযোগের সাথে স্মরণ রাখবেন যে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক/বালিকার অনুমতি শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও সে মনের সন্তুষ্টিতে প্রদান করুক না কেন ?

আমাদের এক শিক্ষক একজন তহশিলদারের ঘটনা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর নিকট মুরীদ হয়েছিলেন। এরপর থেকে স্বীয় ধর্মীয় জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করার চেষ্টা শুরু করেন। একদিন পরকালে অন্যদের অধিকার আদায়ের জবাবদিহিতা সম্পর্কে চিন্তায় পড়ে যান। কী করবেন, কিভাবে দায়মুক্তি হবে ইত্যাদি। তিনি চাকরী জীবনে যেসব ঘুষ নিয়েছিলেন সে সম্পর্কে চিন্তা করেন। এরপর হিসাব শুরু করেন। অখন্ড পাঞ্জাবে চাকরী জীবনে তিনি তহশীল অফিসে গিয়ে মামলার ফাইল বের করেন। তন্মধ্যে খোঁজ করে মামলাকারীদের নাম-ঠিকানা উদ্ধার করেন। এরপর সে অনুযায়ী গ্রামে-গঞ্জে প্রত্যেকের বাড়িতে বাড়িতে চলে যান। কারো কারো কাছ থেকে তিনি ক্ষমা চেয়ে নেন এবং কাউকে কাউকে কিছু কিছু টাকা ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে দোষ ও দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেন। উক্ত তহশীলদারের সাথে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সরাসরি আলাপ হয়েছিল। তিনি স্বয়ং উক্ত ঘটনা তার নিকট বর্ণনা করেন। এমন হতে পারে কিছু লোক প্রশ্ন করতে পারে তারা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করেছে, যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে। এখন তো তাদের কাছে টাকা-পয়সা নেই। সুতরাং অন্যদের অধিকার কিভাবে ফিরিয়ে দিবে? আবার কারো কারো কাছে টাকা তো আছে কিন্তু প্রাপকদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের পাওয়ার কোন উপায় অবশিষ্ট নেই। সুতরাং এমতাবস্থায় দায়মুক্তির জন্য কী করতে হবে ?

এ ব্যাপারে আমি বলব যে, এ বিষয়েও শরীয়তে যথাযথ সমাধান আছে। তা হলো যে সব ক্ষমা চেয়ে নিন। তাদেরকে এমনভাবে খুশি করে দিবেন যেন কিছুটা অনুমান করা যায় যে, তারা অধিকার ও প্রাপ্য পেয়ে ক্ষমা করে দিয়েছে। যদি পাওনা টাকা বা বস্তু তার প্রাপকদের নিকট পৌছে দিন। প্রাপকদের মধ্যে কেউ যদি জীবিত থাকে অথচ ঠিকানা পাওয়া না যায় তবে তাদের পক্ষে প্রাপ্য অনুযায়ী গরীব-মিসকিনদের মধ্যে দান-সদকা করে দিন। সমস্ত পাওনা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সদকা করতে থাকেন। সকল প্রাপক ও অধিকারী টাকা-পয়সার হোক বা মান-সম্মানের সর্বদা তাদের জন্য কল্যাণের দুআ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন।

হযরত শায়খুল হাদীস র. স্বলিখিত আপবীতী গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভীর পিতার দুজন স্ত্রী ছিল। স্বীয় পিতার ইন্তেকালের পর স্মরণ হয় যে, উক্ত স্ত্রীদ্বয়ের মোহর আদায় করা হয়নি। ইতিমধ্যে স্ত্রীদ্বয়ও ইন্তেকাল করেন। এমতাবস্থায় হযরত থানভী (রহ.) তাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁকে বের করেন এবং তাদের মধ্যে মীরাস (উত্তরাধিকার সম্পদ) যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে তা পৌঁছে দেন। তাদের মধ্যে কান্ধালার এক মহিলা ছিল। তার কোন এক আত্মীয়ের ভাগে দুই পয়সা প্রাপ্য হয়। তখন তিনি আমাকে (হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়াকে) প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন যেন আমি তার প্রাপ্য অধিকার তার নিকট পৌঁছে দেই।

আসল কথা হলো, সচরাচর পরকালের প্রতি আমাদের কোন চিন্তা ফিকির নেই বললেই চলে। আমাদের মননশীলতা কলুষিত হয়ে গেছে। যদি মানুষের মধ্যে চিন্তার উদ্রেক হতো (যাকে সত্যিকারের চিন্তা বলা হয়) এবং দোযখের আগুনের প্রতি দৃঢ় ইয়াকীন থাকতো তবে মানুষের অধিকার না আদায় করা পর্যন্ত নিদ্রা আসতো না।
পরকালের প্রতি ফিকির তো দূরের কথা, মানুষের ইয়াকীন এত অপরিপক্ক যে একে ইয়াকীন বলার অনুপযুক্ত; এ জন্য অধিকার আদায়, ফরয-ওয়াজিব আদায় ও হারাম কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকার প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আল্লাহ আমাদের উক্ত বিষয়ে তাওফীক দিন। (আমীন)