প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

ওলি আল্লাহগণের মাযারে ওরস ও ফাতেহা পাঠের নামে যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে তাও এক প্রকার কুংস্কার। যা এক সময় বুযুর্গানে দ্বীনের রূহের প্রতি সওয়াব পৌঁছানোর এবং নেককারগণের সংস্পর্শে এসে উপকৃত হবার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এতে নানা ধরনের কুপ্রথা বাসা বেঁধে ফেলেছে।

এক. কোন কোন স্থানে ওরস উপলক্ষে বেহায়া নারীরা নাচ-গান করে থাকে। যে কবরের কাছে গেলে মৃত্যু ও পরকাল সম্পর্কে শংকিত হবার কথা, সেই কবরের কাছে গিয়ে নাচ-গান করা কত বড় ধৃষ্টতা! উপরন্তু, কবরও যেই সেই কবর নয়, বরং আওলিয়ায়ে কেরামের কবর, যে আওলিয়াগণ অতিরিক্ত কথাবার্তাকে পর্যন্ত পছন্দ করতেন না। এ সমস্ত ওরসে যোগদান করা যে ফাসেকী ও গুনাহের কাজ তা বলাই বাহুল্য। কেউ হয়তো বলবেন, আমরা তো যিয়ারতের নিয়তে সেখানে গিয়ে থাকি, সেখানে নাচ-গান হলে আমাদের কি ক্ষতি হবে? জবাবে বলবো, প্রথমতঃ ফাসেকী সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তার অপকারিতা থেকে আত্মরক্ষা করা কোন মতেই সম্ভব নয়। গোনাহের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টি হয়ে যায়। দ্বিতীয়তঃ যিয়ারতের উদ্দেশ্য থাকলে তা তো অন্য সময়ও করা যায়। ওরসের দিন যিয়ারত করা তো জরুরি নয়। তৃতীয়ঃ যিয়ারত কোন ফরয-ওয়াজিব নয় যে, গোনাহের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে তা পালন করতে হবে। মুবাহ ও মুস্তাহাব পালনে যদি গোনাহয় জড়িত হবার সম্ভাবনা থাকে তা হলে সেই মুবাহ বা মুস্তাহাবকে পরিত্যাগ করাই ওয়াজিব। প্রথম অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় নীতি থেকে এ বক্তব্যের পক্ষে সায় পাওয়া যায়। এছাড়া ওরসের দিন যিয়ারত করতে গেলে অন্যান্যদেরকে বিভ্রান্ত করা হবে এবং নাচ-গানের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তা করা হয়। এই কারণেও ওরসের দিন যিয়ারত করতে যাওয়া অনুচিত।

দুই. কোন কোন ওরসে নর্তকীদের বদলে কাওয়ালগণ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান করে থাকে। এ সম্পর্কে আমি ‘হক্কুস সামা’ নামক পুস্তিকায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। উক্ত পুস্তিকায় ‘সামা’র নিয়মাবলী ও শর্তাবলী এবং বর্তমানে এতে যে সমস্ত অপকারিতা সৃষ্টি হয়েছে সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, বর্তমানকালে প্রচলিত সামার অনুষ্ঠানসমূহ তাসাউফের ইমামগণের মতানুসারে মোটেও জায়েয নয়।

তিন. কোন কোন স্থানে নির্দিষ্ট দিন লোকজন সমবেত হয়ে কোরআন খানি এবং শিরনী বিতরণ করা হয়। বর্তমানে অনেকেই এ ধরনের ওরসকে শরীয়তসম্মত বলে ধারণা করেন। কিন্তু এতেও যে সর্বদা পালন করা, অনির্দিষ্টকে নির্দিষ্টকরণ এবং অনাবশ্যককে আবশ্যক করে নেওয়ার মতো অশুভ কার্যা বলী নিশ্চিতরূপে বিদ্যমান তা তারা চিন্তা করে দেখেননি। যদ্দরুন সাধারণ লোকজন আক্বীদাগত ভ্রান্তিতে পতিত হয়। অনেক সময় সুদে ঋণ গ্রহণ করে ওরস উদযাপন করতে দেখা যায়। অর্থলোভ তাদেরকে এই কাজে প্রলুব্ধ করে। শরীয়ত ও যুক্তি উভয় বিবেচনায়ই এ সমস্ত ক্রিয়াকলাপ অত্যন্ত নিন্দনীয়। কবরবাসীদেরকে উপকৃত করা ও নিজে উপকৃত হওয়ার শরীয়তসম্মত উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, মাঝে মাঝে বুযুর্গানে দ্বীনের মাযার যিয়ারত করা, তাদেরকে সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে সাধ্যানুযায়ী দান-খয়রাত করা এবং নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। তাদের রূহকে সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে দান-খয়রাত করার ইচ্ছা থাকলে নিজের বাড়িতে গোপনে গরীব-মিসকীনদেরকে নগদ অর্থ দিয়ে দিবে বা আহার করিয়ে দিবে। নির্দিষ্ট তারিখে বা প্রচার করে দান করার কোন প্রয়োজন নেই।

ওরসের সময় বা অন্য সময় ওলি আল্লাহগণের মাজারের উপর চাঁদোয়া বিছানো বা টানানো মাকরূহ ও অপব্যয়। এ সম্পর্কিত সাধারণ লোকদের আক্বীদা-বিশ্বাস শিরকের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আওলিয়াগণের মাযারের উদ্দেশ্যে ‘নযর-মানত’ মানা আরো বিস্ময়কর ব্যাপার। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এখানে এসে বাচ্চাদের চল্লিশা, শর্টি ইত্যাদি করে থাকে এবং নিজেদের মানত পূরা করে থাকে। কেউ কেউ জ্বিন ছাড়ানোর জন্য মাযারে আসে। কেউ বা মাযারে বাতি জ্বালিয়ে দেয়, কবরকে পাকা করে দেয়। কোরআন-হাদীস সুস্পষ্ট ভাষায় এ সমস্ত প্রকার কুসংস্কার থেকে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা আমাকে কবরে কাপড় বিছিয়ে দিতে হুকুম করেননি।’ এ হাদীস থেকে কবরে গিলাফ বিছানোর অবৈধতা প্রমাণিত হয়। আল্লামা শামী (রহ.) লিখেছেন, ‘কবরের উপর চাঁদোয়া লাগানো মাকরূহ’। অনেকে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, মহিলাদের দাফন কার্যে কবরের উপর কাপড় টানিয়ে দেওয়া হয়, যুক্তি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। প্রথমতঃ কিতাবী দলিলের বিপরীতে কিয়াসের অবতারণা করা বৈধ নয়। দ্বিতীয়তঃ সেই কিয়াসও ঠিক হয়নি। কেননা, কবরে মাটি দিয়ে দেওয়ার পর সে পর্দার কোন প্রয়োজন থাকে না। আসলে কবরকে সুসজ্জিত করা হয়। আর অপব্যয় তো আছেই। এই ধরনের তো আরো বেশি গোনাহের কাজ। মাজারে চাঁদোয়া টানানোই যখন নাজায়েয তখন চাঁদোয়া দানের মানত করা কিভাবে জায়েয হবে? যে মানত পুরা করা নাজায়েয তা করাও নাজায়েয। এ ধরনের মানত পুরা করার জন্য মাযারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়াও নাজায়েয। বিশেষ করে সেই সফরে স্ত্রীলোকদের সাথে নিয়ে গেলে ফরয পর্দা লঙ্ঘিত হয়ে থাকে। তাছাড়া, আক্বীদার বিবৃতি তো অবশ্যম্ভাবী।

হাদিসে আছে, ‘কবর যিয়াতকারিণী স্ত্রীলোকদেরকে আল্লাহ অভিশপ্ত করবেন।’
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নবীদের কবরকে ইবাদতগাহ বানিয়ে নেওয়ার অপরাধে আল্লাহ তা’আলা ইহুদী-নাসারাদের অভিশপ্ত করিবেন।’ আমাদের বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ এই হাদীসখানাই যথেষ্ট। এই হাদীস দ্বারা কবরকে সিজদা করাও নিষিদ্ধ প্রমাণিত হলো। অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এক সাহাবী একদিন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চেয়ে বললেন, আমরা আপনাকে সিজদা করবো।’ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ প্রশ্নকারী সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা কি আমার কবরে সিজদা করবে? সাহাবী (রা.) আরজ করলেন, ‘তখন সিজদা করবো না’। এ উত্তর শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কাউকে যদি সিজদা করার অনুমতি থাকতো আমি স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার অনুমতি প্রদান করতাম।’ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার সারমর্ম হচ্ছে, মৃত্যুর পর কেউ সিজদা পাওয়ার উপযুক্ত থাকে না, এ কথা যখন স্বীকার করে নিয়েছ তখন বুঝতে হবে চিরঞ্জীব আল্লাহই সিজদা পাওয়ার একমাত্র অধিকারী। এ হাদীস দ্বারা জীবিত মৃত সবাইকে সিজদা করা হারাম ঘোষিত হলো। এ থেকে বুঝা গেল, যিন্দাপীরদেরকে সিজদা করাও হারাম। অন্য এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে বাতি জ্বালাতে নিষেধ করেছেন। হযরত জাবির (রা.) থেকে তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর পাকা করতে, কবরের গায়ে লিখতে এবং কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।’

অনেকে মাযারে শিরনী রান্না করে বিতরণ করে থাকে। এ কাজে আওলিয়ার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের ইচ্ছা থাকে এবং তাকে প্রয়োজন পূরণকারী মনে করে শিরনী খাওয়াও জায়েয হবে না। কোরআন শরীফের নিষেধাজ্ঞা- ‘আল্লাহ ভিন্ন অন্য নামে যবেহকৃত জন্তু খাওয়া হারাম’-এর অর্থের ব্যাপকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। উপায়ন্তর না দেখে অনেকে মনগড়া কথার আশ্রয় নিয়ে বলেন, আমাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে মিসকীনদের দান করা, মাযার এলাকায় অনেক মিসকীন জড়ো থাকে, তাই সেখানে শিরনী নিয়ে যাই।’ এটা একটা হীলা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, ঐ মিসকীনরাই যদি আসার সময় রাস্তায় তার কাছে শিরনী চায় তাহলে মাযারের উদ্দেশ্যে আনীত শিরনীর সামান্যতম অংশও তখন তাদেরকে দেবেন না। বরং তাদেরকে বলবেন, ‘যেখানে নিয়ে চলেছি সেখানে পৌঁছে যাই আগে, তার পর বিতরণ করবো। সুতরাং বুঝা গেল মিসকীন উদ্দেশ্য নয় বরং মাযারই উদ্দেশ্য। তাছাড়া, মাযার এলাকায় পৌঁছেই তো মিসকীনদের মধ্যে শিরনী বিতরণ করে দেয়া যায়, তার আবার মাজারের উপর রাখতে হয় কেন?

অনেকেই ফুলে ভর্তি চাদর ও ফুলের মালা বানিয়ে কবরে রাখেন। এ কাজের প্রমাণ স্বরূপ তারা বলেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খেজুরের ডালকে দুই টুকরা করে দুইটি কবরে গেড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ডাল দুটি শুষ্ক না হওয়া পর্যন্ত কবরস্থিত লাশের কবরের আযাব হ্রাসপ্রাপ্ত হবে আশা করি।’ তাদের দাবির জবাবে বলবো, প্রথমতঃ অনেক মুহাদ্দিসীনে কেরাম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কাজকে তার বৈশিষ্ট্য বলেছেন। তাদের মতে, অন্য কারো পক্ষে এ কাজ বৈধ হবে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য মনে না করে যদি সকলের পক্ষেই একাজ করা বৈধ বলে ধরে নেওয়া যায়, তবুও খেজুরের ডালের উপর ফুলের চাদর বা মালাকে কিয়াস করা মোটেও যথাযথ হয় না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল কাঁচা ডাল মুর্দার জন্য দোয়া করবে আর এখানে ফুল দেওয়ার উদ্দেশ্য তো কবরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। আর কবরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা নিষিদ্ধ, তা আগেই বলেছি। দ্বিতীয়ঃ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের আযাব লাঘবের জন্য একাজ করেছিলেন, এখানে ফুলের মালা দেওয়াতে যদি একই উদ্দেশ্য থাকে তাহলে যে সমস্ত কামেল বুযুর্গের কবরের আযাব হওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদের কবরে ফুল দেওয়া হতো না। কিন্তু বাস্তবতা যে তার বিপরীত তা বলাই বাহুল্য। অতএব বুঝা গেল, কবরের আযাব লাঘবের উদ্দেশ্যে ফুল দেওয়া হয় না। বরং ওলী আল্লাহগণের নেকট্য এবং সন্তুষ্টি অর্জনই এর মুখ্য উদ্দেশ্য, যার কোন প্রমাণ তাদের হাতে নেই। আর না ওলী-আল্লাহগণ তাদের এ আচরণে সন্তুষ্ট হন। এ সমস্ত সাজ-সজ্জায় তাদের কোন লাভ হয় না, তাদের রূহকে যখন সওয়াব পৌঁছানো হয় কেবল তখনই তারা খুশী হন।

বর্তমানে প্রচলিত ফাতেহা পাঠে নি¤েœাক্ত ত্রুটিসমূহ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে :

এক. অধিকাংশ লোকজন আওলিয়ায়ে কেরামকে মানুষের চাহিদা পূরণকারী ও বিপদ থেকে উদ্ধারকারী মনে করে তাদের মাজারসমূহে এই উদ্দেশ্যে ফাতেহা পাঠ ও নিয়ায বিতরণ করে থাকে যে, এতে তাদের ব্যবসায়ের উন্নতি হবে, সম্পত্তি ও সন্তান লাভ হবে, রিযিক বাড়বে এবং সন্তানাদির হায়াত বৃদ্ধি পাবে। এ জাতীয় আক্বীদা-বিশ্বাসকে প্রতিটি মুসলমান নির্ভেজাল শিরক বলেই জানে। এ ধরনের বিশ্বাসের বাতিল হওয়া সম্পর্কিত বর্ণনায় সারা কোরআন শরীফ পরিপূর্ণ।

অনেকে বলেন, ‘আমরা আল্লাহ তাআলাকেই যাবতীয় ব্যাপারে ক্ষমতাবান বলে বিশ্বাস করি, তবে আওলিয়াগণের ওছিলা (মাধ্যম) ধরা তো নাজায়েয নয়, তাই তাদেরকে ওছিলা মনে করি।’ তাদের কথার উত্তরে বলবো, ওছিলা ধরার অর্থ এই নয় যে, সৃষ্টির কারখানায় সেই ওছিলার কোন দখল রয়েছে। যাতে করে, আল্লাহ তাদের হাতে সৃষ্টি কারখানা সোপর্দ করে দিয়েছেন মনে আপনারা স্বয়ং ওছিলাকেই প্রকৃত কর্তা বলে বিশ্বাস করে ও ওছিলার অনুনয়-বিনয়ের ফলে আল্লাহ কোন কাজ করতে বাধ্য বলে বিশ্বাস করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ জাতীয় বিশ্বাস সুস্পষ্ট শিরক। আরবের মুশরিকগণও এ জাতীয় বিশ্বাস পোষণ করতো। তারাও দেব-দেবীদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মনে করে আল্লাহর কাজে তাদের একটা বিশেষ অধিকার রয়েছে বলে বিশ্বাস করতো। অথচ আল্লাহকে যাবতীয় ক্ষমতার আধার মনে করতো। যেমন, কোরআন বলে- ‘মুশরিকদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এই আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।’

অন্য আয়াত আছে- (মুশরিকগণ বলে,) ‘আমরা কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় দেব-দেবীর পূজা করে থাকি।’ এ আয়াতদ্বয়ের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমাদের উপরোক্ত বক্তব্য সত্য বলে প্রমাণিত হয়। একটি কথা ভালো করে বুঝে নিতে হবে যে, যখন দাতা প্রার্থীর প্রয়োজন সম্পর্কে অবহিত হন, দাতার কাছে সে জিনিস মওজুদ থাকে, দাতার দান করার ক্ষমতা থাকে, দাতাকে দান করতে বাধা দেওয়ার মতো বড় কোন শক্তি না থাকে এবং প্রার্থীকে প্রার্থিতবস্তু পৌঁছিয়ে দেবার মাধ্যমে দাতার কাছে থাকে, তখনই কেবল কারো কাছ থেকে কোন বস্তু পাওয়ার আশা করা যায়।

এবার লক্ষ্য করুন, যে ব্যক্তি মাযারে শায়িত বুযুর্গের কাছ থেকে স্থান ও সম্পদ পাওয়ার আশা রাখে তাকে প্রশ্ন করা যায়-তোমার প্রয়োজনের কথা ওলী আল্লাহগণ কিভাবে জানবেন? সে যদি বলে, তারা তো আপনি-আপনিই সবকিছু অবগত, তাহলে শিরক করবে। আর যদি বলে আল্লাহ তাদের জানিয়ে দেন, তাহলে তা অবশ্য অসম্ভব নয়, তবে আল্লাহ যে কোন সম্ভাব্য বিষয়কে অবশ্যম্ভাবী বলে বিশ্বাস করা গোনাহ ও আত্মপ্রতারণা বৈ নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-‘নিশ্চিত না হয়ে কোন বদ্ধমূল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ো না।’ ঐ ব্যক্তিকে আরো জিজ্ঞেস করা যায়, আওলিয়াগণের কাছে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির কোন ভাণ্ডার মওজুদ আর অর্থের গোদাম তাদের নাগালের বাইরে। সন্তান ও অর্থ দানের ব্যাপারে তাদের সত্তাগত ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করলে শিরক হবে। নতুবা এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ অমূলক ও মনগড়া বলে বিবেচিত হবে। কোরআন হাদীসে নবীগণের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমি নিজের কোন উপকার বা অপকার করতে সক্ষম নই।’ এ সুস্পষ্ট বর্ণনায় আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো সত্তাগত ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। তাকে আরো প্রশ্ন করা যায়, আল্লাহ আহকামুল হাকিমীন যে তাদের এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বাধা দেবেন না-এটাই বা কিভাবে জানতে পেলে/ কিভাবে নিশ্চিত হলে যে, তারা যা চাইবেন তা-ই হবে? এ বিশ্বাস থাকলে সম্পূর্ণ কোরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হবে। সর্বশেষে আওলিয়াগণ কর্তৃক সম্পদ ও সন্তান পৌঁছিয়ে দেওয়ার মাধ্যম সম্পর্কে ঐ ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা যেতে পারে।

উপরে বির্ণত সকল প্রশ্নের জবাবে কেউ যদি বলে, ‘আওলিয়ায়ে কেরাম দোয়া করেন, আর আল্লাহ তা’আলা তাদের দোয়া কবুল করে নিয়ে তদনুযায়ী কাজ সম্পাদন করে দেন।’ তাহলে বলবো, আপনার প্রয়োজন সম্পর্কে জ্ঞাত না হয়ে তো তারা দোয়া করতে পারবেন না। তারা যে দোয়া করবেন তারও তো কোন প্রমাণ নেই। আর দোয়া করলেই যে কবুল হবে, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? আসল কথা হচ্ছে, ওসিলার যে অর্থ ধরেছেন তা মোটেও সঠিক নয়। হাদীসে ওসিলার যে অর্থ বিবৃত হয়েছে তা হলো, আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করা- ‘হে প্রভু! তোমার অমুক নেক বান্দার বরকতে আমার অমুক প্রয়োজনটা মিটিয়ে দাও।’ যেমনভাবে হযরত ওমর (রা.) হযরত আব্বাস (রা.) এর ওসিলায় বৃষ্টির জন্য দোয়া করেছিলেন। এ ধরনের ওসিলা ধরা নিঃসন্দেহে জায়েয। তবে ওসিলা সম্পর্কে জাহেলদের ধারণা বা বিশ্বাস শিরকের শ্রেণীভুক্ত। স্মর্তব্য যে, শাস্ত্রগত ও বুদ্ধিগত জ্ঞানে যে সমস্ত পূর্ণতা কল্পনা করা আক্বীদাগত শিরক। আর যে সমস্ত কাজ বা ব্যবহার একমাত্র আল্লাহর শানেই প্রযোজ্য হয়, অন্যের সাথে সেই সমস্ত ব্যবহার করা কার্যগত শিরক। এ মূলনীতিকে মেনে চললে ভ্রান্তিতে পতিত হবার আশংকা থাকবে না ইনশাআল্লাহ।

দুই. এ ক্ষেত্রে মাকরূহ প্রথাসমূহ পালন করাকে অত্যাবশ্যক মনে করা হয়।

তিন. অনেক জাহেল ব্যক্তি শিরনীর সামান্য অংশ একটা পাত্রে করে মাযারের পাশে রেখে ফাতেহা পড়ে থাকে। তাদের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় তোমাদের প্রস্তুতকৃত সকল খাদ্যের সওয়াব পৌঁছাতে চাও নাকি মৃদু এই পাত্রে আনীত খাদ্যের সওয়াব? তারা অবশ্যই বলবে, সকল খাদ্যের সওয়াব পৌঁছানোই আমাদের উদ্দেশ্য।’ অতঃপর যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সওয়াব পৌঁছানোর জন্য কি খাদ্য সামনে রেখে ফাতেহা পাঠ করা জরুরি? তাই যদি হয় তাহলে তো তোমাদের বক্তব্য অনুযায়ীই কেবল পাত্রে আনীত খাদ্যের সওয়াব পৌঁছবে।’ আর যদি বল, ‘খাদ্য সামনে রাখা জরুরি না বরং নিয়তই যথেষ্ট, কাজেই সকল খাদ্যের সওয়াব পৌঁছবে।’ মনে করতে অসুবিধা হয়? না কি আল্লাহর কাছে নমুনা পেশ করে বলতে হয় যে, ‘হাড়িতে এই বিশেষ রীতি অনুসরণ না করলে যেন সওয়াব উদিষ্ট মুর্দার রুহ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হবে না।’

চার. যে বস্তুর সওয়াব পৌঁছানো উদ্দেশ্য সে বস্তুকে যিয়ারতের সময় সামনে রাখা যদি জরুরি হয়, তাহলে নগদ টাকা, কাপড়, গম-চাউল ইত্যাদির বেলায় সে নিয়ম পালন করা হয় না কেন? আর যদি সে বস্তু সামনে রাখা জরুরি না হয়ে থাকে, তাহলে খাদ্য বস্তুতে এ নিয়ম কেন পালন করা হয়? নাকি এ ব্যাপারে খাদ্য বস্তু ও অন্যান্য বস্তুর মধ্যে তারা কোন পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন? দুনিয়া কিয়ামত হলেও তাদের বক্তব্যের সমর্থনে কোন শরীয় দলিল পেশ করা সম্ভব হবে না।

পাঁচ. খাদ্য খাওয়ানো বা বিতরণের আগে একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সওয়াব বখশে দেওয়ার রীতি সাধারণ্যে প্রচলিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দুুটি বিষয় ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার। প্রথমতঃ কাউকে সওয়াব পৌঁছানোর অর্থ হচ্ছে, ‘কোন ব্যক্তি কোন সৎ কাজ করার ফলে যে সওয়াব পাওয়ার আশা রাখে, সেই সওয়াবটুকু নিজের পক্ষ থেকে অন্যকে প্রদান করা।’ দ্বিতীয়তঃ কিসের সওয়াব হয়? খাদ্যের না খাদ্য বিতরণের? এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খোদ খাদ্য কোন সওয়াবের জিনিস নয়। যেমন, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, কোরবানীর জন্তুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছে না বরং তোমাদের তাকওয়া তার নিকট পৌঁছে থাকে।’ এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, জিনিসের সওয়াব নয় বরং আমলের সওয়াবই পৌঁছে। অতএব, স্বয়ং খাদ্যের নয় বরং খাদ্য খাওয়ানো সওয়াবের কাজ। এ বিষয় দুটি উপলব্ধি করার পর প্রশ্ন আসে-শিরনী তৈরি করে কাউকে দান করার আগেই কি সওয়াব মিলে যায়? না মিললে মৃত ব্যক্তিকে কি পৌঁছাবেন? আর যদি বলেন, সওয়াব আগেই মিলে যায়? তাহলে, কোন কাজ করার আগে সওয়াব কিসের পাবেন-সেটাও তো দেখার বিষয়।

মোটকথা, এ কাজটাও একটা অনর্থক বাজে কাজ। জাহেলদের কোন কোন কর্মকাণ্ড দেখে বুঝা যায়, সে যেন স্বয়ং খাদ্যকেই সওয়াব লাভের উপায় মনে করে। প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়, কোন কোন নযর-নিয়াজ নিজেরাই খেয়ে ফেলে, বড় জোর কিছু বন্ধু-বান্ধবকে খাওয়ায়। অথচ নিজে খাওয়া বা ধনী বন্ধু-বান্ধবদেরকে খাওয়ানো যে সওয়াবের কাজ নয় তা সকলেরই জানা। এ থেকে বুঝা গেল, খাওয়ানো বা খাদ্য বিতরণকে তারা সওয়াবের কাজ বলে মনে করে না, নতুবা যাদেরকে খাওয়ালে সওয়াব হয় তাদেরই খাওয়াতো। এ ধরনের বিশ্বাস কোরআন-হাদীসের পরিপন্থী ভ্রান্ত বিশ্বাস, যা থেকে তওবা করা ওয়াজিব।
কেউ হয়তো বলতে পারে, নিয়ত করাও তো একটা কাজ। এ কাজের সওয়াব মৃতকে পৌঁছানো অনর্থক হবে না। আমি বলি, মানলাম, নিয়তও একটা কাজ।

কিন্তু কথা হচ্ছে, খাদ্য খাওয়ানোর সওয়াব সম্পূর্ণ ভিন্ন, আপনি মৃতকে কোনটার সওয়াব পৌঁছাতে চান। তাছাড়া, খাদ্য প্রস্তুতের আগেই তো নিয়তের সওয়াব পেয়ে গিয়েছিলেন, সে সওয়াব তখনই বখশে দিতে পারতেন। আসলে এ রেওয়াজেরও কোন বুদ্ধিভিত্তিক কারণ নেই, এ শুধু প্রথা পালন ছাড়া কিছুই নয়। তবে শরীয়তসম্মত পন্থায় ইছালে সওয়াব করা অত্যন্ত ভাল কাজ। কোন প্রকার প্রথা পালনের উদ্দেশ্যে না করে, নিজের সামর্থানুযায়ী উপযুক্ত পাত্রে কিছু দান করে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে পৌঁছিয়ে দেওয়াকে ইসলামী শরীয়ত উৎসাহিত করেছে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের সমাজে প্রচলিত সকল প্রকার প্রথার হুকুম জানতে পারা যায়। ভ্রান্ত আকীদা বা নিয়ম-কানুনের বশবর্তী না হয়ে বছরের যে কোন দিন ইছালে সওয়াব করা নির্ভেজাল জায়েয। অপর পক্ষে মাকরূহ রীতি-প্রথার বশবর্তী হয়ে ইছালে সওয়াব করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। তবে যে সকল নিয়ম-কানুন পালন করলে নিজের বা অন্য কারো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন মুবাহ কাজ গোপনে করার অনুমতি আছে। এ ক্ষেত্রেও পালিত নিয়ম-কানুন মাঝে-মধ্যে পরিবর্তন করা উচিত, যাতে করে নিজের বা অন্যের মনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হতে না পারে। এতদসত্ত্বেও রীতি-নীতি থেকে মুক্ত হয়ে ইছালে সওয়াব করাই সর্বোত্তম। কেননা, অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, যে কোন প্রথা প্রথমে খালিস নিয়তে শুরু হলেও পরে এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যাকে নিষেধ করা ছাড়া মানুষের ভ্রান্তি দূর করার কোন গত্যন্তর থাকে না।