প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ফাতেমা জামাতের মাহফিল
যুক্তির আলোকে পর্দা
১. পজিটিভ নেগেটিভ
ইলেকট্রিক লাইনের দুটো করে তার থাকে, একটি ‘পজিটিভ’ আর অপরটি ‘নেগেটিভ’। এ দুটোই অপরিহার্য, একটি ছাড়া অপরটি অর্থহীন। কিন্তু এ দুটো থেকে সত্যিকার আলো জ্বলা বা পাখা চলার কাজ পাওয়া যেতে পারে তখন, যখন উভয় তারকে বিশেষ এক ব্যবস্থাধীনে পরস্পরের সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু দুটো পাশাপাশি চলতে গিয়ে চলাবস্থাতেই যদি পারস্পরিক ব্যবচ্ছেদ ছিন্ন করে দিয়ে মিলিত হয়ে পড়ে তাহলে তাতে আলো জ্বলবে না, পাখা চলবে না, বরং এমন আগুন জ্বলে উঠবে, তার ফলে গোটা ঘর-সংসার জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
নারী-পুরুষও নেগেটিভ-পজিটিভ দুই বিপরীতমুখী, বিপরীত গুণ-সম্পন্ন শক্তি। এ দুয়ের সমন্বয়ে যদি মানবতার কল্যাণ লাভ করতে হয় তাহলে অবশ্যই এক নির্দিষ্ট নিয়মে উভয়ের মিলন সম্পন্ন করতে হবে। ঘাটে-পথে, হাটে-মাঠে, পার্কে-ক্লাবে আর হোটেল-রেস্তোরায় যদি এদের অবাধ মেলামেশা সম্ভব করে দেয়া হয়, তাহলে নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের অপমৃত্যু অনিবার্য; দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা আর পারিবারিক সুস্থতা ও শান্তি-তৃপ্তি নিঃশেষে ফুরিয়ে যাবে।
২. খাদ্যের ঢাকনা
আবরণ বা ঢাকনার সাহায্যে যেমন ময়লা থেকে খাদ্য সংরক্ষণ করা যায়, তেমনি পর্দার সাহায্যে মহিলাদের মান-সম্ভ্রম অন্য পুরুষের কুদৃষ্টি, কুৎসিত কামনা এবং অশ্লীলতার হাত থেকে রক্ষা করা যায়।
পাকা কলা একটি ফল, তা কিন্তু ঢেকে রাখার প্রয়োজন হয় না। কারণ তার আবরণটাই এমন যে, মশা মাছি তাতে বসে না, বসেও কোন লাভ করতে পারে না। কিন্তু পাকা খেজুর ঢেকে রাখতে হয়। তা না হলে পিঁপড়া থেকে শুরু করে মশা মাছি কীট পতঙ্গ তাতে বসার জন্যে উড়ে আসে, ভীড় জমায় ও একটু একটু করে খেয়ে ফেলে। তদ্রুপ মহিলা যখন ঘরের বাইরে বের হয়, তখন যাতে গায়ে ময়লা না লাগে কিংবা মাছি না বসে, কিংবা কীট-পতঙ্গ যাতে তাকে উপদ্রব করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ ধরণের বাড়তি পোশাক পরে, সাজগোজ না করে, অলঙ্কারের রিন ঝিন শব্দে পায়ে চলার পথ মুখরিত না করে, পারফিউমের গন্ধ না বিলিয়ে বাইরে বের হতে বলেছেন। মহিলাদেরকে পূতঃপবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন রাখাই পর্দার উদ্দেশ্য।
৩. চুম্বক আর লোহা
নারী চুম্বক আর পুরুষ লোহার মত। চুম্বক আর লোহা পাশাপাশি অবস্থান করলে যেমন একে অপরকে আকর্ষণ করে, ঠিক তেমনি নারী-পুরুষ পাশাপাশি থাকলে একে অপরকে আকর্ষণ করে। নারী-পুরুষের অবৈধ আকর্ষণ দূর করতে হলে একটি প্রতিবন্ধকতার প্রয়োজন। আর এ প্রতিবন্ধকতাই হল পর্দা ব্যবস্থা।
৪. পেট্রোল ও আগুন
নারী ও পুরুষ যেন পেট্রোল ও আগুনের মত দু’টি পৃথক শক্তি। পেট্রোল ও আগুন একত্রিত হলে যেমন সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়, তেমনি বেপর্দা নারী-পুরুষেরা যদি কোথাও বা কোনো সমাজে একত্র হয়, তবে সমাজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।
৫. মোড়ক বিহীন চকলেট
এক গার্লস স্কুলের তরুনীদের মাঝে পর্দা নিয়ে যুক্তিতর্ক চলছিল। দ্বীনি বিষয়ক শিক্ষিকা ক্লাশরুমে এলে ছাত্রীরা তাঁর কাছে জানতে চাইল ‘পর্দার যৌক্তিকতা কী?’ শিক্ষিকা বললেন, ‘ইনশা-আল্লাহ, আগামীকাল এর উত্তর দেব।’ পরের দিন তিনি ছাত্রীদের দ্বিগুণ সংখ্যক চকলেট সাথে এনে একটি পাত্রে রাখলেন। চকলেটগুলোর মধ্যে অর্ধেক ছিল সুন্দর করে মোড়া, আর অর্ধেক ছিল মোড়কবিহীন খোলা। সকলকে নিজ হাতে একটি করে চকলেট তুলে নিতে বলা হল। সকলেই একটি করে মোড়া চকলেটই তুলে নিল। সবশেষে শিক্ষিকা পাত্রটিকে টেবিলে রেখে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন করলেন: ‘বলতো, তোমরা খোলাগুলো না নিয়ে মোড়াগুলো তুলে নিলে কেন?’ সকলেই একবাক্যে বললো: ‘খোলাগুলোতে ময়লা বা জীবাণু থাকতে পারে তাই।’ শিক্ষিকা বললেন: ‘এটাই হল তোমাদের গতকালের প্রশ্নের উত্তর। পর্দা না করলে রুচিবানরা তাকে পছন্দ করে না।’
৬. খোলা জিনিসের মূল্য কম
চা কিনতে গিয়ে দেখা গেল, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির প্যাকিং করা চায়ের মূল্য খোলা চায়ের তুলনায় অনেক বেশি। খোলা তৈল, আটা, পাউডার দুধের মূল্য প্যাকেট করা তৈল, আটা বা দুধের তুলনায় অনেক কম। এভাবে প্রতিটি খোলা জিনিসের দামই তুলনা মূলকভাবে কম থাকে। আর প্যাকেট যত উন্নত মানের হয়, জিনিসের দামও তত বেশি হয়।
যুক্তির আলোকে পর্দা
অনুরূপভাবে মেয়েরা যখন খোলামেলা বেপর্দা চলে, তখন তাদের মান-মূল্য কমে যায়। আর পর্দার সাথে চললে তাদের মান-মূল্য বেড়ে যায়।
৭. মূল্যবান জিনিস হিফাজতে রাখতে হয়
জিনিস যত দামি বা মূল্যবান হয়, ততই তার হিফাজতের ব্যাপারে যত্নশীল হতে হয়। স্বর্ণের বা হীরা জহরতের অলঙ্কার দামি বলেই অর্নামেন্ট বক্সের ভেতরে যত্ন করে রেখে সিন্দুক বা আলমারিতে রাখা হয়। তারপর তাতে তালা লাগানো হয়। যে রুমে থাকে, সে রুমকেও তালাবদ্ধ করা হয়।
মূল্যবান মুক্তা ঝিনুকের ভেতরে সংরক্ষিত থাকে। টাকা পয়সা মানি ব্যাগে, মূলবান দলিলপত্র আলমারী বা ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়। সার্টিফিকেট ও মূল্যবান কাগজপত্র যাতে নষ্ট না হয় এজন্যে লেমিনেশন করা হয়। মুল্যবান জিনিসপত্র সুটকেস, ট্রাংক বা আলমারীতে রাখা হয়। বই সংরক্ষণের জন্য রেগজিন বা চামড়ার বাধাই করা হয়। মূল্যবান গিফট র্যাাপিং পেপার দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। যে জিনিস যত মূল্যবান বা সংবেদনশীল হয়, তার প্যাকেজিং বা মোড়ক সামগ্রীও ততই প্রটেকটিভ হয়, তত যতেœর সাথে তার হিফাজত করা হয় এবং তার নিরাপত্তা বিধানে তৎপর হতে হয়। নারীরা অমূল্য এবং তাদের ইজ্জত, আব্রু, মান-সম্ভ্রম মহামূল্যবান বলেই তাদেরকে হিফাজত করার জন্যে পরপুরুষের সামনে তাদেরকে আপদমস্তক ঢেকে পর্দা করতে হয়।
৮. ফুলের কুঁড়ি ও ফলের আবরণ
নারী ব্যক্তিত্বের মৌল উপাদান হল তার নারীত্ব। পর্দা হল সে নারীত্বের একমাত্র প্রমাণ, সংরক্ষণ-ব্যবস্থা ও উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যম। নারীত্ব ও পর্দা পানি ও মাছের মত। পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচতে পারে না, পর্দা ছাড়াও নারীর নারীত্ব থাকে না। ফুলের কুঁড়ি প্রকৃতির এক সুন্দর পর্দায় ঢাকা থাকে বলেই ফুল সহস্র পাপড়ি মেলে দুনিয়ার মানুষের পেটের ক্ষুধা ও অন্তরের সৌন্দর্য পিপাসা মেটাতে পারে। পৃথিবীর যে কোনো ফলের দিকে দৃষ্টি দিলে প্রথমেই নজরে পড়ে তার খোসা বা বাকলের উপরে -যা ফলকে ব্যবহার যোগ্য হতে ও পাকতে সাহায্য করে। ঠিক অনুরূপ ভাবেই নারীর নারীত্ব পর্দার অন্তরালে সুস্মিত ফুলের মত, সুস্বাদু ফলের মত পূর্ণতা লাভ করে তাকে ধণ্য করে, সমাজকে করে সুন্দর, সুখ ও শান্তিময়। বেপর্দা নারীত্বকে ধ্বংস করে।
