প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আলে-ইমরান : ১০২)

‘সকল ক্ষেত্রেই তুমি আল্লাহকে ভয় করো। দীর্ঘ হিসাব দিবসে এর ফলাফল তুমি পাবে। দীর্ঘ জীবন আর বেঁচে থাকায় কোনো কল্যাণ নেই যদি না তুমি তাকওয়া নিয়ে বিদায় হতে পারো। হে মুসলিম জাতি! আল্লাহ তা’আলা মানুষকে পৃথিবীতে খলীফা বানিয়ে এবং তাঁর প্রতিনিধি করে সম্মানিত করেছেন, মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করব।’ (সূরা বাকারা : ৩০)
আর এই প্রতিনিধিত্ব মানুষের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ এবং সার্বিক শান্তি স্থাপনের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই মহান দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে এবং মানুষের ওপর প্রমাণ স্থাপনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা ক্রমান্বয়ে রাসূল পাঠিয়েছেন।

‘সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।’ (সূরা নিসা: ১৬৫)
তাঁদের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে তাঁদের শক্তিশালী করেছেন।

‘অবশ্যই আমি আমার রাসূলদের পাঠিয়েছি প্রমাণসহ।’ (সূরা হাদীদ : ২৫)
অতঃপর মানব জাতির নিকট শ্রেষ্ঠ আদম সন্তান, নবীদের ইমাম ও শেষ রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাঠিয়েছেন।

‘হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। (সূরা আহযাব : ৪৬)
তিনি ইসলাম নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন , যা মানুষের চলার পথকে আলোকিত করেছে। স্বচ্ছ তাওহীদের পথ দেখিয়েছে এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা তাদের শিরকের ছোবলও অন্ধকার থেকে, সৃষ্টির দাসত্ব থেকে ¯্রষ্টার দাসত্ব দিয়ে মুক্ত করেছেন। তাদের জন্য হেদায়েত ও সততার পথ উন্মুক্ত করেছেন। যেন তারা তাদের ¯্রষ্টার দিকে ফিরে আসে। তাদের সৃষ্টির প্রধান লক্ষ্য এবং মহান হিকমতের বাস্তবায়ন করে।

‘আর আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৬)

আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এই আদেশ দিয়েই প্রেরণ করেছি যে আমি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত করো।’ (সূরা আম্বিয়া : ২৫)
আর এটিই তাওহীদের গুরুত্বের প্রমাণ। এবং বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার। এ জন্যই সকল রাসূলকে প্রেরণ করা হয়েছে। কিতাবসমূহ নাজিল করা হয়েছে।

‘অতএব তুমি একের জন্য একের মাঝেই এক হয়ে যাও।
অর্থাৎ ঈমান ও সত্যের পথ গ্রহণ করো।’
ইসলাম এসেছে সত্য ধর্ম নিয়ে। কোনো মুসলমানেরই এতে সন্দেহ পোষণ করা বৈধ নয়। এটা এমন দ্বীন, যে দ্বীন ব্যতীত আল্লাহ তা’তালা অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করবেন না।

‘আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না।’ (আলে-ইমরান : ৮৫)
এই দ্বীন এসেছে মানুষকে সফলতা, মুক্তি, কল্যাণ ও সততায় উদ্বুদ্ধ করতে।
বায়তুল্লাহর হাজীসাহেবগণ!
আপনাদের নবী এই মহান স্থানে দাঁড়িয়ে এক মহান খুতবা দিয়েছেন। ইসলামের মূলনীতি স্থির করেছেন। জাহেলিয়াতের ভিত্তিসমূহকে ভেঙে দিয়েছেন। মুসলমানদের সম্মানকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। দ্বীন ও নিয়ামতের পূর্ণতা এবং সমস্ত মানবতার জন্য এই ইসলামকে দ্বীন হিসেবে সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। শরীয়ত স্থিতিশীল ও পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সকলকে বিদায় জানিয়েছেন।

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (সূরা মায়েদা: ৩)
এমন মোবারক দিনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্ষিপ্ত অথচ বহুমুখী ও সর্বব্যাপী কিছু কথা উপস্থাপন করেছেন, যা এই দিনের মূল বিষয়গুলো ও ভিত্তিগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তিনি ধর্মের মূলনীতিগুলো, শরীয়তের ভিত্তিগুলোর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করতে অনেক চেষ্টা করেছেন। যেন স্পষ্ট লক্ষ্য আর উন্নত ভিত্তি নিয়ে এক নতুন জাতি ভূমিষ্ঠ হয়।
অতএব ভ্রষ্টতা থেকে তাদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। বিভক্তির পর তাদের কে একত্রিত করেছেন।মূর্খতার পর তাদের জ্ঞান শিখিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় ভাষণে মানবাধিকারের ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক নির্ধারণ করেছেন। মানব সন্তানের জন্য মানবতার সম্মানের মূলনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বলেন,

‘তোমাদের রক্ত সম্পদ, ইজ্জত তোমাদের জন্য সম্মানিত, আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহরের সম্মানের মতো।’
ইসলাম মানুষের জন্য তার পঞ্চ-প্রয়োজনীয়তা, যা ব্যতীত জীবন চলে না তা সংরক্ষণ ও হেফাজত করেছে। অতএব

সাথে সাথে ইসলাম আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও মূলনীতি স্থাপন করেছে, যা সততা, নিষ্ঠা ও দয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা জুলুম-অত্যাচার, মূর্খতা, ধোঁকা, ঝুঁকি ও প্রতারণামুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

ক্রেতা-বিক্রেতা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাদের স্বাধীনতা রয়েছে, যদি তারা এ ক্ষেত্রে সত্যবাদী হয় এবং পণ্যের সব দিক সঠিকভাবে বর্ণনা করে তাহলে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত দেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

‘যে আমাদের ধোঁকা দেবে সে আমাদের ধর্মের অন্তর্ভুক্ত নয়।’
তেমনিভাবে তিনি সুদকে হারাম করেছেন। অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন।
মুসলিম সমাজে একে-অন্যের দায়িত্ব গ্রহণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। এটা শুধু আর্থিক উপকারের ভিত্তিতে নয়। বরং সমাজের ব্যক্তি ও সম্মিলিত সার্বিক প্রয়োজন বিবেচনায় করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘তাকওয়া ও কল্যাণের কাজে তোমরা একে-অন্যকে সাহায্য করো, গোনাহ ও শত্রুতায় কেউ কাউকে সাহায্য করো না।’ (সূরা আল-মায়েদা : ২)
তিনি আরো বলেন, ‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে-অপরের সহায়ক।’ (সূরা তাওবা : ৭১)
এই সাহায্য-সহযোগিতা ও তাকাফুল ব্যাপক, তাই সকল মানব সন্তানকেই অন্তর্ভুক্ত করে।

‘হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেজগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব কিছুর খবর রাখেন।’ (সূরা হুজরাত : ১৩)
তেমনিভাবে ইসলাম সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গলকে অন্তর্ভুক্ত করে।
ইসলাম মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ ও দয়া করতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

‘আর আপনার রব আদেশ করেছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।’ (সূরা ইসরা : ২৩)
ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে নিষেধ করেছে। এ ব্যাপারে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে :

‘ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন।” (সূরা মুহাম্মদ : ২২-২৩)
ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারের ক্ষেত্রেও উৎসাহ প্রদান করেছে।

‘এবং নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশীর সাথেও সৎ ও সদয় ব্যবহার করো।’ (সূরা নিসা : ৩৬)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ঈমান আনে সে যেন প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’
ইসলাম ব্যক্তি, তার রক্ত ও খুনের সংরক্ষণ করে। এ বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে। আর সে কারণে ইসলাম বিদ্রোহকে হারাম করেছে। এ জাতীয় বিষয়গুলোর সমাধানকল্পে বিভিন্ন নির্দেশনা ও স্পষ্ট হুকুম জারি করেছে। অপরাধীকে নিবারণ করতে এবং ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতিহত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দান করেছে, যা জমিনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। সকলকে এ সকল হুকুম ও নির্দেশনা মানতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

‘এ কারণেই বনী ইসরাঈলের ওপর এ বিধান দিলাম যে, নরহত্যা বা জমিনে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সূরা মায়েদা : ৩২)
মুসলিম ভায়েরা! ইসলাম মধ্যম পন্থা দিয়ে এসেছে, যা বিশৃঙ্খলা দূর করে এবং ভালো ও কল্যাণ কাজকে সংরক্ষণ করে। নির্মাণ ও উন্নয়নের কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আধুনিক ও মৌলিক সকল উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য সব ধরনের মাধ্যম গ্রহণের প্রতি আহ্বান করে। বিশৃঙ্খলা ও ফ্যাসাদ সৃষ্টির সকল ধরনের পথকে নিষিদ্ধ করে। উম্মতের স্বার্থ ও কল্যাণের বিষয়টিকে সবার উপরে স্থান দিয়েছে। আর যে এই স্বার্থ ও কল্যাণের বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করবে অথবা উম্মতের নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে খেলবে তাদের ক্ষেত্রে দুনিয়া ও আখেরাতের কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে।
হে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনগণ!
বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। আমাদের প্রত্যেককেই আন্তরিকভাবে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের চিন্তা-চেতনায় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পরিপূরক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষত, ফিলিস্তিন ও মসজিদে আকসার ব্যাপারে এবং সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন এলাকার আমাদের ভাইদের কষ্ট ও দুর্দশার ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিজেদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের ভ্রাতৃত্বকে শক্তিশালী করতে আপসে কল্যাণের উপদেশ প্রদান করতে হবে।

‘প্রত্যেক মুমিন ভাই।’ (সূরা হুজরাাত : ১০)
এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করতে হবে যে আমাদের সমাজ সংস্কার, ঐক্য ও নিরাপত্তা সংরক্ষণ, ভাগ্য ও নিয়তির হেফাজত জনগণের পক্ষ থেকে তাদের নেতৃবৃন্দকে সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। এদিকে মুসলিম নেতৃবৃন্দের উচিত তাদের মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুধাবন করা। অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে, এমন সকল বিষয়ের ইনসাফের সাথে এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিকার করা। অত্যাচারিতের উপর থেকে অত্যাচার দূরীভূত করা।
হে মুসলিম জাতি !
শরীয়তের মূলনীতি হচ্ছে, আদল ও ইনসাফ। এটি সঠিক পরিমাপ যন্ত্র। সকল রাসূলের বার্তাও এটি। সর্বোপরি এটি বিশ্ব জাহানের পালনকর্তার নির্দেশ।

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও দয়ার নির্দেশ দেন’। (সূরা নাহল : ৯০)

‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সংগত সাক্ষ্যদান করবে, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের যদি ক্ষতি হয়, তবুও।’ (সূরা নিসা : ১৩৫)

‘আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা আল-হাদীদ : ২৫)
ইসলাম তার শরীয়তের প্রতিটি নীতিমালায় ইনসাফের বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটা মূলত এর গুরুত্ব ও এর সুন্দর লক্ষ্যের কারণেই। ন্যায় ও ইনসাফের মাঝেই মানবতার ভিত্তি, সফলতা এবং কল্যাণ। ন্যায় ও ইনসাফের দ্বারা কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। উন্নতি-অগ্রগতি ব্যাপক হয়। মানুষের হৃদয় প্রশান্ত হয়। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল হয়। তেমনিভাবে ইসলাম সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়।

‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য যাদের বের করা হয়েছে, তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দেবে, অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।’ (আলে-ইমরান : ১১০)
প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!
দ্বীন ইসলাম হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্কের ধর্ম। দয়া ও ন্যায়ের ধর্ম। সুন্দর ব্যবহার ও আচরণের ধর্ম। সুন্দর ব্যবহার আর আচরণের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। সৎ ও উত্তম আদর্শ ইসলামী চরিত্র গঠনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এসব গুণে গুণান্বিত দেখেছে, যা এ সকল জীবন্ত মূলনীতিকে সত্যায়ন করে। এর মাধ্যমে তিনি তাদের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর জন্য তাদের অনুভূতি আলোড়িত হয়েছে। তিনি ছিলেন উত্তম আদর্শ, শিক্ষক ও মুরব্বি।

‘আল্লাহর রাসূলের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব : ২১)
‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)
হে মুসলিম তরুণ!
বর্তমান যুগে বিশ্ব যে সমস্যায় জর্জরিত তা হচ্ছে, সন্ত্রাসের নামে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন এলাকায় এবং বিভিন্ন পথে যার অনিষ্টতা ব্যাপকতা লাভ করেছে। এ ছাড়া মুসলিম জাতির কিছু সন্তান ও তরুণ, যাদেরকে শয়তান পথভ্রষ্ট করেছে, সরল পথ বিচ্যুত করেছে এবং ইসলামী মানহাজ ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে তাদের দ্বারাও সমস্যায় জর্জরিত। অতএব তারা অন্যকে দ্রুত কাফের ঘোষণা করেছে, যার পরিণাম ভয়াবহ। যার দ্বারা মুমিনের হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে। মুসলিম অন্তর ঘাবড়ে যাচ্ছে, আতঙ্কিত হচ্ছে। তারা মুসলিমদের কাফের বলছে। নিরাপরাধ ব্যক্তিকে হত্যার বৈধতা দিচ্ছে। বোমা বিস্ফোরণ ও ধ্বংসের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। নিরাপরাধ মানুষের হত্যা করছে। মুসলিম-অমুসলিম মানুষদের ভীতি প্রদর্শন করছে। কোরআন ও সুন্নাহ এবং উম্মতের সর্বসম্মতি সিদ্ধান্ত যা এ সকল গর্হিত ও অসৎ কাজকে হারাম ঘোষণা করে, সে ধরনের কথা শোনা থেকে তারা বধির হয়ে আছে।
হে যুবক!
তোমার দায়িত্ব অনেক বড়। তোমরা জাতির ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ। অতএব যে পথ ঐক্য বিনষ্ট করে, বিভেদ সৃষ্টি করে এবং ব্যাপকতাকে বিনষ্ট করে তা থেকে বেঁচে থাকো। আর জেনে রোখো, উম্মতের ভ্রষ্টতা এবং গোমরাহীর প্রধান কারণ হচ্ছে কিবলাধারী ব্যক্তিকে কাফের বলায় তাড়াহুড়া করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অনেক কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ বিরাট অপরাধের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ নসীহত করেছেন। অতএব, তোমরা সর্বাবস্থায় তাকওয়া অর্জন করো। ইলম ও জ্ঞানের অস্ত্রে সজ্জিত হও। উম্মতের উলামায়ে কেরামের নিকট যাও। স্পষ্ট প্রমাণ ও দলিলাদির মাধ্যমে তাদের নিকট থেকে ইলম অর্জন করো। তোমাদের নিকট প্রত্যাশা অনেক বড়। অতএব বিশ্বজগতের সামনে তোমাদের ধর্মের সৌন্দর্য, দয়া এবং চরিত্র প্রকাশ করো। তোমরা হও উত্তম আদর্শ। তোমরা তোমাদের সময়কে কাজে লাগাও। উম্মতের কল্যাণ, ইসলামের সম্মান এবং তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের লাভ যে পথে, তাতে তোমাদের সর্বশক্তি ব্যয় করো।
প্রিয় অভিভাবকৃন্দ!
উত্তম ও অনুপম চরিত্রই হচ্ছে আসমানী বার্তার মূল। আমাদের নবী প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ও এটি। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

‘তিনিই নিরক্ষরকদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন।’ (সূরা জুমআহ : ২)
কোরআনে আল্লাহ তা’য়াালা তাঁর নবীর প্রশংসা করে বলেছেন,

‘এবং নিশ্চয় আপনি অনুপম আদর্শের অধিকারী।’ (সূরা আল-কলম : ৪)
আত্মশুদ্ধি ও পরিচর্যাকে ইসলাম তার প্রথম সারিতে রেখেছে। তাই উত্তম চরিত্র দ্বারা ব্যক্তিকে লালন-পালন করা ইসলামের অন্যতম মানহাজ। শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম উপায়।

‘সেই সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পবিত্র করেছে। আর সেই ব্যর্থ, যে নিজেকে কলুষিত করেছে।’ (সূরা শামস : ৯-১০)
অন্যদিকে উত্তম চরিত্র গঠন কল্যাণ প্রাপ্তি ও উত্তম হওয়ার কারণ

‘সুন্দর চরিত্রের অধিকারী তোমাদের মধ্যে উত্তম।’
কিছু মুসলিম সমাজ আজ তাদের মূল্যবোধ, চরিত্র এবং আচরণের শিথিলতায় ভুগছে। এ কারণে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। অতএব আপনাদের ওপর কিশোর-তরুণদের সঠিকভাবে উন্নত ও উত্তম চরিত্রের ওপর লালন-পালন করার এক মহান দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষত বর্তমান সময়ে যখন ফেতনা ও অকল্যাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যে সময়ে চরিত্র, মূল্যবোধ ও মর্যাদার যুদ্ধ চলছে।
হে উলামায়ে কেরাম!
আপনারা হচ্ছেন নবীদের উত্তরসুরি, তাদের বার্তাবাহক। আপনাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অতএব উম্মতকে বিভক্ত করায় আপনারা কারণ হবেন না। তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সত্য ও হক্বের কথা বলুন, মিথ্যা ও বাতিল পরিত্যাগ করুন। বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িমুক্তভাবে মানুষকে শরিয়তের ফাতওয়া প্রদান করুন। আল্লাহর দ্বীন হচ্ছে মধ্যম।

‘আর তেমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যম জাতি বানিয়েছি।’ (সূরা বাকারা : ১৪৩)
মানুষকে সহজভাবে গ্রহণ করুন এবং তাদের সমস্যা দূর করুন।

‘তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।’ (সূরা হজ : ৭৮)

‘কোনো কাজ বেছে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোনাহ না হলে সহজটি গ্রহণ করতেন।’
হে ইসলামি দায়ীবৃন্দ!
দাওয়াত ইলাল্লাহ নবী ও রাসূলদের কাজ। অতএব আপনাদের দাওয়াত যেন হয় এখলাছ, ইলম ও দূরদর্শিতার সাথে সঠিক পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী।

‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।’ (সূরা নাহল : ১২৫)

‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৫৯)
আপনারা উত্তম আদর্শে আদর্শবান হোন, আহ্বানকৃত ব্যক্তির ওপর দয়া ও মায়া করুন। হিকমত ও সুন্দর পর্যালোচনাই হোক আপনাদের দাওয়াতের মাধ্যম। আপনাদের অস্ত্র হোক জ্ঞান ও ইলম। মানুষকে সত্য পথ দেখান। তাদের উপকার-কল্যাণ হোক আপনাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
দলাদলি ও বিভক্ত করা থেকে বিরত থাকুন। বিভেদ সৃষ্টি করা ও মানুষকে ভাগ করা থেকে মুক্ত থাকুন।

‘আর তোমরা সকলেই আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না।’ (সূরা আলে-ইমরান : ১০৩)

‘তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা করো, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।’ (সূরা আনফাল : ৪৬)
হে মিডিয়া ও যোগাযোগ মাধ্যমের কর্ণধারবৃন্দ!
মিডিয়া ও যোগাযোগ মধ্যমগুলোকে দ্বীনের সাহায্যে ব্যবহার করুন। ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা ও এর প্রতিরক্ষায় কাজ করুন। কথায় আমানত, সত্যবাদিতা ও বাস্তবতাকে গ্রহণ করুন। উসকানি, গুজব ও হট্টগোল সৃষ্টি করা থেকে দূরে থাকুন। মিডিয়াকে সৃজনশীল ও গঠনমূলক করুন; বিধ্বংসীকারী বানাবেন না। ঐক্য তৈরি করুন; বিভক্ত করবেন না। শক্তিশালী করুন; দুর্বল করবেন না।
প্রিয় হাজী সাহেবান!
আপনারা হারামে আছেন। অতএব এর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সচেতন থাকুন। আল্লাহ তা’আলা বালাদুল হারামকে অনেক বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা অন্য কোনো শহরকে দেননি। এটি কিয়ামত পর্যন্ত নিরাপদ। যে এখানে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ। এটি ইবরাহীম (আ.)-এর দু’আ।

‘হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্তুতিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।’ (সূরা ইবরাহীম : ৩৫)
এই তো আপনারা নিরাপদ শহরে এসে পৌঁছেছেন। আপনাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দেওয়া হয়েছে। সকল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। সুতরাং এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন। তাঁর নিকট আরো বেশি প্রত্যাশা করুন। এই শহর আল্লাহর নির্দেশেই নিরাপদ ও সম্মানিত। অতএব এর নিরাপত্তায় বিঘœ ঘটানো থেকে বিরত থাকুন। এর বিভিন্ন শাআয়েরকে সম্মান করুন। হারামাইনের ও হাজীদের নিরাপত্তায় রাজনৈতিক ও দলীয় শ্লোগান দিয়ে বিঘœ ঘটানো কোনোভাবেই উচিত নয়।
আল্লাহর অনুগ্রহে এ দেশের রক্ষণাবেক্ষণে এবং হারামাইনের খেদমতে সঠিক নেতৃত্ব রয়েছে। সকল ক্ষেত্রে সহজীকরণ ও খেদমতে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। হারামাইনে আগতদের শান্তি নিরাপত্তা বিধানে এবং সহজে ও প্রশান্তিতে হজ আদায়করণে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রিয় হাজী সাবেদান!
কথায়, কাজে ও আচরণে আল্লাহকে ভয় করুন। ধৈর্যের সাথে সুসংবাদ, কল্যাণ ও উত্তমের দু’আ করুন। নৈরাশ্য, হতাশা ও ব্যর্থতা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহর দ্বীন সাহায্যপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা’আলা তাঁর দ্বীন, শহর ও বান্দাদের হেফাজত করবেন। সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের জন্য।

‘আর আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ (সূরা ইউসুফ : ২১)