প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৮-৩৯ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
বর্তমান তিন প্রকৃতির মিলাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রত্যেকটি হুকুম ভিন্ন ভিন্ন।
প্রথম প্রকার : এই প্রকার মিলাদ মাহফিলে কোন ধরনের নিয়মাবলী বা শর্তাবলী অনুসরণ করা হয় না। অর্থাৎ, এ মিলাদ মাহফিলে কোন্টা করা যাবে বা কোন্টা করা যাবে না এ ধরনের কোন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বিত হয় না। উদাহরণত মিলাদের উদ্দেশ্যে আমন্ত্রণ ছাড়াই কিছু লোক আকস্মিকভাবে কোন স্থানে একত্রিত হয়ে সেখানে কোন কিতাব পাঠ করে বা বক্তৃতার মাধ্যমে নবীকুল শিরোমণি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম, জীবন, আদর্শ, দৈনন্দিন চাল-চলন, মু’জেযা ও কৃতিত্ব ইত্যাদি সম্পর্কিত বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহ আলোচনা করা। আলোচনা প্রসঙ্গে সৎ কাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ ইত্যাদি হুকুম-আহকাম ব্যক্ত করার প্রয়োজন দেখা দিলে তা বলতে কুণ্ঠিত না হওয়া অথবা শরীয়তের বিধি-বিধান শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে আয়োজিত মাহফিলে নবী করীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী আলোচনা করা। এই প্রকারের মিলাদ মাহফিল নির্ভেজাল জায়েয বরং মুস্তাহাব ও সুন্নাত। এই ভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জীবন ও মর্যাদার আলোচনা করে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে মিলাদের এই পদ্ধতির বর্ণনা পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসীনে কেরাম একে আজ পর্যন্ত যথারীতি প্রচলিত রেখেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এ বিশুদ্ধ নিয়ম অনুসৃত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় প্রকার: এই প্রকার মিলাদে এমন শরীয়ত বিরোধী নিয়মাবলী মেনে চলা হয় যে, সেগুলো স্বয়ং দূষণীয় ও পাপ কাজ। যেমন-অবাস্তব মনগড়া হাদীস আলোচনা করা, সুরেলা কণ্ঠে গজল আবৃত্তি করা, সুদ-ঘুষের হারাম অর্থ ব্যয়ে মাহফিলের আয়োজন করা, প্রয়োজনাতিরিক্ত আলো ও জায়গার ব্যবস্থা করা, নামায বা জামাতের উপর যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয় তার চেয়ে অধিক গুরুত্ব সহকারে এসব মাহফিলের প্রচার কার্য চালানো, গল্পে ও কবিতায় প্রকাশ্যে বা ইশারা-ইঙ্গিতে আঁহযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) এর শানে অশালীন শব্দাবলী ব্যবহার করা, মাহফিলে যোগদানের উদ্দেশ্যে নামায জামাত ত্যাগ করা, অসময়ে নামায পড়া, মাহফিলের উদ্যোক্তার মনে সুখ্যাতি অর্জনের তীব্র বাসনা উদয় হওয়া, উক্ত মাহফিলে রসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত আছেন বলে বিশ্বাস করা বা এই ধরনের শরীয়ত বিরোধী অন্যান্য কার্যকলাপ। সাধারণ মূর্খ মুসলমান সমাজে প্রচলিত এই প্রকারের মিলাদ মাহফিল শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ।
সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে রসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে জেনে-শুনে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করলো সে যেন দোযখে তার আবাস খুঁজে নেয়।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন কিছু শুনে না বুঝেই তা বর্ণনা করতে শুরু করে দেয় তাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করার জন্য তার এ কাজটুকুই যথেষ্ট।’
এ হাদীস দু’টি থেকে জানা গেল যে, হাদীস বর্ণনায় অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। পুরাপুরি ভাবে তাহকীক না করে হাদীস বর্ণনা করলে গোনাহ হবে। বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে কোন ভুল তথ্য পরিবেশন করা অত্যন্ত শান্তিযোগ্য অপরাধ। বায়হাকী হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-‘পানি যেমন করে শষ্যক্ষেতকে ফসলে পরিপূর্ণ করে, গান তেমনি করে মানুষের মনকে মুনাফেকীতে পরিপূর্ণ করে।’ এই হাদীসে গানের অপকারিতা বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন ফিতানার সম্ভাবনা থাকে, যেমন সুকণ্ঠি নারীর গান, তখন তো তার অপকারিতার মাত্রা অত্যধিক হয়ে যায়।
মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রেওয়ায়াত করেছেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল মালকেই শুধু কবুল করে থাকেন।’ অপর এক বর্ণনায় হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘যার খাদ্য পানীয়, ঘর-বাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ সবকিছু হারাম উপায়ে অর্জিত, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে তার চুল-দাড়ি ও পোশাক আশাক জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে গেলে এবং আকাশের দিকে হাত তুলে সারাদিন ইয়া রব, ইয়া রব বলে মোনাজাত করলেও তাতে কোন ফলোদয় হবে না। তার মোনাজাত কবুল হবে না। এ হাদীস থেকে বুঝা গেল, কোন লোক যতই একনিষ্ঠতার সাথে ইবাদত-বন্দেগী করুক না কেন, হারাম উপার্জন সবকিছুকেই বিনষ্ট করে দেয়।
আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন- ‘তোমরা অপচয় করো না।’ আরো এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই আর শয়তান তার প্রভুর অকৃতজ্ঞ।’ শরীয়ত অননুমোদিত খাতে সকল প্রকার ব্যয়ই এর অন্তর্ভুক্ত। তা’ সে আলোকসজ্জা হোক আর অন্যান্য সাজ-সরঞ্জামেই হোক-নিষিদ্ধ। প্রথম অধ্যায়ে বেশ-ভূষায় ভিন্ন জাতির অনুকরণের অবৈধতা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছি তা এ ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য।
তিরমিযী শরীফে হযরত হুযায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা ছেড়েদিলে অতিসত্বর আল্লাহ তোমাদের উপর আযাব প্রেরণ করবেন, অতঃপর তোমরা অভিশপ্ত হয়ে যাবে, তখন তোমরা দোয়া করবে তোমাদের দোয়া কবুল হবে না।’
সুনানে আহমদে হযরত হাসান (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত উসমান ইবনে আবিল আস (রা.)-কে কোন এক খৎনার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় আমরা খৎনা অনুষ্ঠানে যেতাম না এবং এ সময় কেউ দাওয়াতও দিত না।’ এ থেকে বুঝা গেল, যে কাজে লোকজনকে দাওয়াত দেওয়া সুন্নত নয় সে কাজে আমন্ত্রণ দান ও গ্রহণ করাকে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অপছন্দ করেছেন। শরীয়ত যে কাজকে যতটুকু গুরুত্ব প্রদান করেছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়। এই কারণেই চাশত নামায আদায় করার জন্য মসজিদে লোক সমাগম হতে দেখে হযরত ইবনে উমর (রা.) এই পদ্ধতি অস্বীকার করে একে বিদআত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এরই ভিত্তিতে ফিকাহবিদগণ নফল নামাযের জামাতকে মাকরূহ বলেছেন। আল্লাহ তা’আলা, আম্বিয়ায়ে কেরাম ও ফিরেশতাদের সাথে বেয়াদবি করা যে অবিশ্বাসেরই নামান্তর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন মুসলমান তা অস্বীকার করতে পারে না। অনেক জাহেল কবির রচনায় এই ধরনের বেয়াদবি পরিলক্ষিত হয়। এই জাতীয় কবিতাদি রচনা করা যেমন নাজায়েয, তা পাঠ করা এবং শুনাও তেমনি নাজায়েয। সময় মতো নামায আদায় না করাও হারাম। আর পাপের কারণ ঘটানোও পাপ। এই কারণেই হাদীসে এরশাদ পরে আলাপ-আলোচনা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ বলেছেন, তাহাজ্জুদ বা ফজরের নামায নষ্ট হয়ে যাবার আশংকায় এ পরামর্শ প্রদত্ত হয়েছে।
লোক দেখানো ও অহংকার করা যে হারাম-তা সবাই জানেন। হারাম কাজের উপায় অবলম্বনও হারাম। হাদীসে আছে, ‘যে ব্যক্তি খ্যাতির উদ্দেশ্যে কোন কাজ করবে, আল্লাহ কিয়ামতে তাকে কুখ্যাত করবেন।’ হাদীসে আরো আছে, সামান্যতম রিয়াও শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কারো পক্ষে হাযির নাযির হওয়া তার জ্ঞান ও শক্তির উপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলার জ্ঞান ও শক্তি দুটোই পূর্ণ মাত্রায় রয়েছে, কাজেই তিনি সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান। কোন নবী বা রসূলকে সত্তাগতভাবে পূর্ণমাত্রায় জ্ঞানী ও শক্তিবান বলে বিশ্বাস করা শিরক হবে। এমনকি আল্লাহর শক্তি ও জ্ঞান থেকে কিছু কম বলে বিশ্বাস করলেও তা শিরক। কেননা, একমাত্র আল্লাহই সকল জ্ঞান ও শক্তির আধার, অন্য কেউ নয়।
আরববাসীগণ নিজেদের দেব-দেবীকে আল্লাহর চাইতে কম ক্ষমতাবান মনে করতো, তা সত্ত্বেও কোরআন শরীফে তাদেরকে মুশরিক বলে অভিহিত করা হয়েছে। বিশ্বাস যদি এই হয় যে, নবী-রাসূল ও আওলিয়া কেরামকে আল্লাহ তাআলাই সবকিছু জানিয়ে থাকেন এবং সর্বত্র বিরাজ করার শক্তি দেন তাহলে শিরক হবে না, তবে কোন শরয়ী প্রমাণ ব্যতিরেকে এ জাতীয় বিশ্বাসেও গোনাহ হবে। কেননা, অবাস্তবকে বিশ্বাস করা আত্মপ্রতারণা, আর প্রতারণাকে সবাই হারাম বলেই জানেন।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অমূলক ধারণা করা গুনাহর কাজ।’
হাদীসে আছে, ‘অমূলক ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা।’
মোট কথা, এতসব নাজায়েয ক্রিয়াকলাপের দরুন মূল মাহফিলই নাজায়েয হয়ে যায়। অতএব, এ সকল মাহফিলে যোগদান করা জায়েয় নয়। আজকাল অনুষ্টিত মিলাদ মাহফিলগুলোর অধিকাংশতেই এ সকল ধ্যান-ধারণা অন্তত দু’একটি হলেও থাকে। একটা নাজায়েয বিশ্বাস বা কাজই একটা মাহফিল নাজায়েয হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
তৃতীয় প্রকার :এই প্রকারের মিলাদ মাহফিল প্রথম প্রকারের ন্যায় শর্তবিহীন বা দ্বিতীয় প্রকারের মতো হারাম শর্ত সম্বলিত নয়, বরং এতে এমনসব নীতি-পদ্ধতি অনুসৃত হয় যা মূলতঃ মুবাহ ও হালাল। অর্থাৎ, এতে নির্ভরযোগ্য ও দ্বীনদার বর্ণনাকারীগণ সহীহ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহ ব্যক্ত করে থাকেন, এতে যে অর্থ ব্যয় করা হয় তাও হালাল পন্থায় অর্জিত, লোকজনের পরনে শরীয়তসম্মত পোশাক-আশাক থাকে, কারো কাছ থেকে শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ প্রকাশ পেলে বক্তা নির্দ্বিধায় তা সংশোধন করতে প্রয়াসী হন, বক্তাগণ যথাপ্রয়োজনীয় হুকুম-আহকাম বর্ণনা করতে কুণ্ঠিত হন না, এতে গানের সুরে কবিতা আবৃত্তি করা হয় না, বক্তার আলোচ্য বিষয় শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে না, মাহফিলের প্রচারকার্যে অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা হয় না, মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার কারণে অন্য জরুরি এবাদত আদায়ে অসুবিধা হয় না, সওয়াব লাভের আশা এবং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতের উদ্দেশ্য নিয়ে এ মাহফিল আয়োজিত হয়, শ্রোতাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাযির-নাযির বলে বিশ্বাস করে না-একথা নিশ্চিতভাবে জানা থাকা অবস্থায়ই কেবল রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে আহ্বান বোধক শব্দ ব্যবহার করা হয় এবং অন্যান্য যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে এ মাহফিল সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। সাথে সাথে আদতে শরীয়ত-বিরোধী নয় এমন এমন সব কার্যকলাপ, যেমন- শিরণী বিতরণ, আতর ব্যবহার, বসার জন্য বিছানা বিছানো ইত্যাদিও পালন করা হয়। এ জাতীয় মাহফিল খুব কমই দৃষ্টিগোচর হয়। এ জাতীয় মাহফিলে যোগদান করা প্রথম প্রকারের মতো নির্ভেজাল জায়েয অথবা দ্বিতীয় প্রকারের মতো একেবারে নাজায়েযও নয়। এ প্রকারের জায়েয হওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রথমে নি¤েœাক্ত নীতিমালা অনুধাবন করে নিলে সেই বিস্তৃত ব্যাখ্যা হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে।
প্রথম নীতিঃ কোন অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে জরুরি বা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা অথবা ফরয ওয়াজিবের মতো গুরুত্ব সহকারে তা পালন করা এবং একে পরিহার করা দূষণীয় ও ত্যাগকারীকে দোষারোপের যোগ্য বলে মনে করা সবই নিষিদ্ধ। কেননা, এতে শরীয়তের সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়। কোন শর্তহীন বিষয়ে শর্তারোপ করা, অনির্দিষ্ট বিষয়কে নির্দিষ্টকরণ, ব্যাপকতাকে সংকোচিতকরণ, অনাবশ্যককে আবশ্যকরণ, অসীমকে সীমায়িতকরণ ইত্যাদি এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। কোরআন মজীদে আছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করবে যে অনাচারী।’
বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, ‘নামাযের পর ডান দিকে ফিরে বসাকে অত্যাবশ্যক মনে করে তোমাদের নামাযে শয়তানকে ভাগ বসাতে দিও না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোন কোন সময় বামদিকে ফিরে বসতে দেখেছি।’ মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যাতা কুত্ববী (রহ.) বলেন, এ হাদীস থেকে এ মূলনীতিই প্রমাণিত হয়-যে কেউ মুস্তাহাব বিষয়ের উপর সর্বদা আমল করে, এর উপর আমল করাকে জরুরি মনে করে এবং কখনও এর বিপরীত আঁকড়ে ধরবে তাকে তো শয়তান আগেই গোমরাহ করে ফেলেছে। মুজমা গ্রন্থকার বলেন, ‘এই হাদীস থেকে বুঝা গেল যে, মানদূব (জায়েয) বিষয়ের মর্যাদা বৃদ্ধির আশংকা থাকলে তা মাকরূহ হয়ে যায়।’ এরই ভিত্তিতে হানাফী ফেকাহবিদগণ নামাযের কেরাআতের জন্য সূরা নির্দিষ্ট করাকে মাকরূহ বলেছেন। ফতহুল কাদীরে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মুসলিম শরীফে আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সপ্তাহের অন্যান্য রাত্রির মধ্যে জুম’আর রাত্রিকে জাগ্রত থাকার জন্য নির্দিষ্ট করে নিও না এবং সকল দিনের মধ্যে জুমআর দিনকে রোযা রাখার জন্য নির্দিষ্ট করো না, তবে কারো নিয়মমাফিক রোযা যদি কোন শুক্রবারে রাখতে হয় তাহলে ভিন্ন কথা।’
দ্বিতীয় নীতি ঃ মুবাহ ও মুস্তাহাব কাজসমূহও অনেক সময় শরীয়ত বিরোধী কাজের সাথে মিশ্রিত হয়ে নিষেধের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়। যেমন দাওয়াতে যাওয়া মুস্তাহাব বরং সুন্নাত, কিন্তু সেখানে যদি শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে দাওয়াতে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস ও ফেকাহর কিতাবসমূহে এ মর্মে বর্ণনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। ঠিক তেমনি ভাবে, নফল নামায পড়া সওয়াবের কাজ কিন্তু তা মাকরূহ ওয়াক্তে পড়া গুণাহর কাজ। এ থেকে বুঝা যায়, শরীয়ত বিরোধী বিষয়ের সাথে মিশ্রিত হওয়ার কারণে শরীয়ত সম্মত বিষয়াদিও শরীয়ত বিরোধী হয়ে যায়।
তৃতীয় নীতি ঃ অন্য মুসলমানদেরকে ক্ষতি থেকে বাঁচানো ফরয। কাজেই ব্যক্তি বিশেষের কোন অনাবশ্যক কাজের দরুন যদি সাধারণ মুসলমানদের আক্বিদা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে ঐ ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে তা করা মাকরূহ ও নিষিদ্ধ হবে। ব্যক্তি বিশেষের এ জাতীয় কাজ পরিহার করা উচিত। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, হুয়ুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতীমকে কাবা ঘরের ভিতরে ঢুকাতে চেয়েছিলেন কিন্তু এই কাজ করলে যেহেতু নও-মুসলিমদের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত সংশয় সৃষ্টি হতে পারে এবং যেহেতু কাজটিও তেমন জরুরি ছিল না তাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ইচ্ছা বাস্তবায়িত করেননি। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোলাখুলিভাবে এই কারণ ব্যক্ত করেছিলেন। অথচ হাতীমকে কাবার ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়াটাই উত্তম ছিল, কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের আক্বিদাগত ক্ষতির সম্ভাবনা এড়ানোর জন্যই তা বাস্তবায়িত না করাকে উত্তম মনে করা হয়েছে।
ইবনে মাজা হতে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজনকে প্রথম দিন আহার করানো সুন্নাত ছিল। কিন্তু সবাই যখন একে অবশ্য পালনীয় প্রথা হিসেবে মনে করতে লাগলো তখন তা বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ হয়ে গেল। দেখুন সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনের হেফাযতের জন্য বিশেষ ব্যক্তিবর্গ কি-না করে গেছেন?
হাদীসে শোকরানা সিজদাকে মুবাহ বলা হয়েছে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মত গ্রহণ করে হানাফী ফেকাহবিদগণ একে এজন্য মাকরূপহ বলেছেন যে, সাধারণ মুসলমানগণ একে স্বতন্ত্র সুন্নাত হিসেবে পালন করতে শুর করে দেবে। আলমগীরী কিতাবে বলা হয়েছে, নামায আদায়ের পর শোকরানা সিজদা করা মাকরূহ। কেননা, সাধারণ লোক একে সুন্নাত ও ওয়াজিব মনে করবে। আর যে মুবাহ কাজ সাধারণ্যে সুন্নাত বা ওয়াজিবের পর্যায়ে উন্নীত হবার আশংকা দেখা দেয় তা মাকরূহ হয়ে যায়। তবে কাজটি পালন করা যদি শরীয়তানুযায়ী জরুরি হয় তাহলে তা পরিত্যাগ না করে বরং মিশ্রিত বাজে বিষয়গুলো াঅপসারণ করে তা সংশোধন করে নিতে হবে। যেমন, কোন আহাজারিকারিণী মহিলা সাথে যাওয়া থেকে বিরত থাকা টিক হবে না, কেননা লাশ দাফন করা জরুরি কাজ। এক্ষেত্রে বরং সে মহিলাকে সাথে যেতে নিষেধ করতে হবে। অপরপক্ষে, দাওয়াতে যাওয়া যেহেতু জরুরি কোন কাজ নয় সেহেতু নিষিদ্ধ বিষয়ের কারণে তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। আল্লামা শামী (রহ.) এই জাতীয় মাসআলাসমূহকে পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণনা করেছেন।
চতুর্থ নীতি ঃ যে সকল বিষয় সাময়িকভাবে ‘মাকরূহ হওয়ার কারণ’ সম্পৃক্ত হয় সময়, স্থান ও বিজ্ঞ আলেমগণের অভিজ্ঞতার বিভিন্নতা হেতু সে সকল বিষয়ের হুকুমও বিভিন্ন হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এ জাতীয় বিষয়কে ‘মাকরূহ হবার কারণ’ সম্পৃক্ত না থাকার দরুন এক সময় জায়েয বলা হয়, আবার অন্য সময় ‘মাকরূহ হবার কারণ’ সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে একই বিষয়কে নাজায়েয বলা হয়। অথবা, একই বিষয়কে একস্থানে জায়েয এবং অন্যস্থানে নাজায়েয বলা হয়। কোন ব্যাপারে সাধারণ লোকজন কি কি আকিদাগত ও কার্যগত ভ্রান্তি সৃষ্টি করে নিয়েছে তা অজানা থাকার ফলে এবং উপরোক্ত বিভিন্নতার কারণে, কোন স্থানের মুফতী সাহেব কোন সময় জায়েয বলে থাকেন, সেই একই বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি সম্পর্কে জ্ঞাত কোন মুফতী সাহেব নাজায়েয বলে ফতওয়া দিয়ে থাকেন। স্থান, সময় ও মানুষভেদে ফতওয়ার এই বৈপরিত্ব একটা বাহ্যিক মতভেদ, এতে মৌলিক কোন মতভেদ নেই। হাদীস ও ফিকাহ গ্রন্থস মূহ থেকে এই জাতীয় বিষয়ের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পেশ করা সম্ভব।
পঞ্চম নীতি ঃ শরীয়ত বিরোধী কোন কাজ করলে যদি এমন কোন উপকার অর্জিত হয় যা অর্জন করা শরীয়ত মতো আবশ্যক নয়, অথবা যা অর্জনের অন্যান্য পন্থাও বিদ্যমান, তাহলে ঐ উপকার লাভের উদ্দেশ্যে উক্ত শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়া বা সে কাজে লিপ্ত দেখে জনগণকে তা থেকে বিরত না করা জায়েয হবে না। সৎ উদ্দেশ্যে মুবাহ কাজ করলে তা এবাদতে পরিণত হয়, কিন্তু হাজারো উপকারিতা বিদ্যমান থাকলেও গুনাহের কাজ মুবাহ (জায়েয) হবে না।
উপরোক্ত নীতিমালাকে ভালো করে উপলব্ধি করে নেওয়ার পর এখন মৌলুদ শরীফের তৃতীয় প্রকার জায়েয কি নাজায়েয সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় মনোনিবেশ করা যাক। এই প্রকার মৌলুদ শরীফের নিয়ম-রীতি মূলত মুবাহ, কাজেই মৌলিক দিক থেকে এতে কোন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি নেই। অতএব, এই ধরনের মিলাদ নিষিদ্ধও নয়। কিন্তু তা পালন করতে গিয়ে যদি আক্বীদাগত বা কার্যগত কোন ভ্রান্তি সম্পৃক্ত হয়ে যায় তাহলে তখন তাকে নাজায়েয আখ্যা দেওয়া হবে। আর যদি কোন প্রকার অনিষ্টতা সম্পৃক্ত না হয় তাহলে বহাল তবিয়তে জায়েয থাকবে। দ্বিতীয় নীতি থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
এখন লক্ষণীয় ব্যাপারে হচ্ছে, বর্তমান যামানায় এসব মুবাহ পালনে কোন ধরনের ভ্রান্তি সৃষ্টি হয় কিনা। ভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া অবশ্যম্ভাবী হলে তা নিষিদ্ধ বুঝতে হবে। এ ভ্রান্তি প্রমাণ করার জন্য কোন তর্ক-বিতর্কের প্রয়োজন নেই, বরং একটু তলিয়ে দেখলেই তা ধরা পড়ে যায়। গত বছর কয়েকের অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতরূপে বলতে পারি যে, সাধারণ লোকেরা প্রায় সবাই এসব রীতি-নীতিকে ধর্মীয় জরুরি বিষয়াদির চেয়েও বেশি গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। তারা জুমআ বা জামাতের উপর এর এক-দশমাংশ গুরুত্বও প্রদান করে না, তারা এ রীতিনীতি পালন না করাকে ফরয ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার চেয়েও অধিক নিন্দনীয় ও দূষণীয় মনে করে। কেউ এ রীতি প্রথাকে অস্বীকার করলে তো কথাই নেই, এমনকি কেবল না করার কারনেই তাকে সীমাতিরিক্ত গাল-মন্দ করা হয়। তার সাথে যে আচরণ করা হয় কাফের বিদ’আত পন্থী বা ফাসিক লোকের সাথেও তা করা শোভা পায় না। জনগণ যখন এ প্রথাকে ফরয-ওয়াজিবের চেয়েও উচ্চ মর্যাদার সমাসীন করে নিয়েছে তখন একে মাকরূহ ও নিষিদ্ধ বলা নিঃসন্দেহে অত্যাবশ্যক হয়ে গেছে।
উপরে বর্ণিত প্রথম নীতি থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। নিষিদ্ধ প্রথাসমূহ মিশ্রিত হয়ে খোদ মাহফিলই নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এটাই হচ্ছে দ্বিতীয় নীতির প্রতিজ্ঞা। কোন বিজ্ঞ আলেম যদি সাধারণ জনগণের আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে এসব প্রথা পালন করেন তাহলেও তিনি গুনাহ থেকে বাঁচতে পারবেন না। কারণ, তার দেখাদেখি সাধারণ লোকেরা ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে এসব প্রথা পালন করেন তাহলেও তিনি গুনাহ থেকে বাঁচতে পারবেন না। কারণ, তার দেখাদেখি সাধারণ লোকেরা ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাস নিয়ে এসব প্রথা পালন করবে, ফলে একটা নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রচার ও প্রসারে ঐ বিজ্ঞ আলেমও জড়িয়ে পড়বেন। বাস্তব অবস্থার নিরিখে অসম্ভব হলেও কোথাও যদি এসব প্রথাকে নিষ্কলুষ অবস্থায় পাওয়া যায় তাহলে ওসবকে জায়েয বলা যাবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত আক্বীদায় বা কার্যে ভ্রান্তি প্রকাশ না পাবে ততক্ষণ অনুমতি বহাল থাকবে।
অনেকে প্রশ্ন করেন, মৌলুদ শরীফ স্বয়ং রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত না হলে তা আমরা কিভাবে পেলাম? এর জবাবে বলবো, এখানে তো তৃতীয় প্রকারের মৌলুদের আলোচনা হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে মৌলুদের যে রীতি প্রচলিত হয়েছে তা প্রথম প্রকারের অন্তর্বুক্ত। কেউ কেউ বলেন, সুয়ূতী, ইবনে হাজার ও মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.)-এর মতো বড় বড় ওলামায়ে কেরাম মৌলুদকে জায়েয বলে গেছেন। এ কথার জবাবে বলতে হয়, তাদের সাথেও অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম দ্বিমত পোষণ করেছেন। অধিকন্তু, সে সময় সাধারণ মানুষ মৌলুদ সম্পর্কে আক্বীদাগত ও কার্যগত ভ্রান্তিতে না থাকায় তারা এর অনুমতি প্রদান করেছিলেন। বর্তমানে যুগের অবস্থা দেখলে তারাও একে নিষেধ করতেন। তাই চতুর্থ নীতি অনুসারে এটাকে নিষেধ করা হয়।
অনেকে দাবি করেন, এই ওসলিায় গরীব-মিসকীনদেরকে কিছু আহার্য বা অর্থ-কড়ি দান করা হয়, এতে ইসলামের শান-শওকত বৃদ্ধি পায়, জাহেলদের কানে শরীয়তি বিধি-বিধানের আলোচনা প্রবেশ করে। তাদের এসব দাবিকে সর্বোতভাবে মেনে নেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই ধনীদেরকে শিরনী দেওয়া হয় আর গরীবদেরকে গলাধাক্কা দিয়ে বিদায় দেওয়া হয়। এসব মাহফিলে হুকুম-আহকামের আলোচনা খুব কমই হয়ে থাকে। গরীবদেরকে দান করা, ইসলামের শান-শওকত পন্থা থাকা সত্ত্বেও শরীয়ত বিরোধী পন্থা অবলম্বন করা যে জায়েয হবে না তা উপরোল্লিখিত পঞ্চম নীতিতে বর্ণিত হয়েছে। এতসব সন্দেহের জবাব দানের পর আশা করি কারো মনে এ ব্যাপারে সংশয়ের উদ্রেক হবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ বুদ্ধি ও বিশুদ্ধ আমল করার শক্তিদান করুন।
‘হে আল্লাহ! আমাদের মনে তোমার ও তোমার রসূলের প্রকৃত মহব্বত সৃষ্টি করে দাও এবং তোমার নবীর সুন্নাতের অনুসরণ করার তৌফিক দাও।’
