প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭, রমজান-শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
ঋণ প্রদান নিছক কোনো লেনদেনই নয় বরং তা একটি মহৎ ইবাদত। মানবজীবনের পথচলায় ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম এ বিষয়ে সর্বোত্তম পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে একে অপরের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করার অনুমতি প্রদান করেছে ইসলাম। সাথে সাথে সঠিক সময়ে পরিশোধ করার প্রতিও কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে এই মানবীয় সুপ্রথাটি আজ মানবসমাজে অনেক সময় কুমতলবীর চক্রান্তে বিদ্বেষ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ এমনকি শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেকে দরিদ্র শ্রেণীকে ঋণের জাতায় পিষ্ট করে একে পুঁজি জমা করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এসবের জন্য একমাত্র দায়ী হলো ইসলামী অনুশাসন ও বিধিবিধান মেনে না চলা। ইসলামে রয়েছে ঋণদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের অধিকার সংরক্ষণে বিস্তর বিধিবিধান। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা ইসলামে ঋণের বিধিবিধান সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
ঋণের মৌলিক বিধান :
পবিত্র কোরআনে কারীমের সর্ববৃহৎ আয়াত নাজিল হয়েছে ঋণের বিধান নিয়ে। সুরা বাকারার ২৮২ নং আয়াতে এ আলোচনা রয়েছে। কোরআন-হাদীসে বর্ণিত ঋণের বিধানের মৌলিক উদ্দেশ্যই হলো প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণ এবং এ নিয়ে কোনো ধরনের বিবাদ যেন না হয় তার প্রতি জোর দেওয়া।
মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। আর তোমাদের মধ্যে একজন লেখক যেন ইনসাফের সাথে লিখে রাখে এবং কোন লেখক আল্লাহ তাকে যেরূপ শিক্ষা দিয়েছেন, তা লিখতে অস্বীকার করবে না। সুতরাং সে যেন লিখে রাখে এবং যার ওপর পাওনা সে (ঋণগ্রহীতা) যেন তা লিখিয়ে রাখে। আর সে যেন তার পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করে এবং পাওনা থেকে যেন সামান্যও কম না দেয়। অতঃপর যার ওপর পাওনা রয়েছে সে (ঋণগ্রহীতা) যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু বলতে না পারে, তাহলে যেন তার অভিভাবক ন্যায়ের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়। আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দুজন সাক্ষী রাখো। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুজন নারী-যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ করো। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৮২)
আলোচ্য আয়াতে মৌলিক তিনটি বিধান বর্ণিত হয়েছে :
১. ঋণের লেনদেনের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করা, তা যত ছোট লেনদেনই হোক না কেন।
২. ঋণ আদায়ের মেয়াদ নির্ধারণ করা, প্রয়োজনে ঋণদাতার সম্মতিতে মেয়াদ বৃদ্ধিও করতে পারে।
৩. লেনদেনের মধ্যে দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষী রাখা।
ঋণ যথারীতি আদায় করাই শরীয়তের নির্দেশ :
ঋণ যথারীতি পরিশোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণদাতা যখন কারো উপকারার্তে ঋণ প্রদান করে, তখন ঋণগ্রহীতার দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব হলো যথাসম্ভব নির্দিষ্ট সময়ে তা ফিরিয়ে দেওয়া। নচেৎ যদি টালবাহানা শুরু করে, মিথ্যা ওজর-আপত্তি করে, এতে পরস্পর সম্পর্ক নষ্ট হয়, শত্রুতা বৃদ্ধি পায় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। যদি ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ করার পূর্বে মারা যায়, তাহলে কাফন-দাফনের পর প্রথমেই তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করে দিতে হবে। ঋণ পরিশোধের পর যদি অতিরিক্ত কিছু থাকে, তাহলেই কেবল তা ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করা হবে এবং তার অসিয়ত কার্যকর হবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৬/৪৪৭)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে, সে তিনটি জিনিস থেকে মুক্ত ছিল, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অহংকার, গনীমতের সম্পদ হতে চুরি এবং ঋণ।” (সুনানে ইবনে মাহাজ, হা, ২৪১২)
অপর হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “মুমিন ব্যক্তির রূহকে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে স্থগিত করে রাখা হয়, যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধিত হয়। (সুনানে তিরমিযী, হা. ১০৭৮)
মানুষের পাওনা আদায়ের পূর্বে মৃত্যুবরণ একটি কঠিন বিষয়। এ ধরনের ব্যক্তির জানাযা পড়তে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অস্বীকার করেছেন।
হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মারা গেলে আমরা তার গোসল দিলাম। তারপর কাফন পরিয়ে রাসূল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এলাম যেন তিনি তার জানাযা পড়েন। আমরা যখন জানাযা পড়াতে অনুরোধ করলাম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক কদম আগে বাড়লেন এবং বললেন, তার ওপর কি কোনো ঋণ আছে? আমরা বললাম, দুই দিনার ঋণ আছে। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে গেলেন। তখন আবু কাতাদা (রা.) বললেন, আমি তা পরিশোধ করে দেব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঋণের হক্ব আদায় করে তুমি মৃতকে ঋণমুক্ত করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়লেন। এর এক দিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ঋণ কি আদায় হয়েছে? আবু কাতাদা বললেন তিনি তো গতকাল মারা গেছেন। এর একদিন পর আবার জিজ্ঞেস করলেন। তখন জবাবে বলা হলো, আদায় করা হয়েছে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, এখন উক্ত ব্যক্তির আত্মাকে শান্ত করেছো। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৪৫৩৬]
হযরত ইবনে উমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা গেল যে, তার ওপর স্বর্ণ-মুদ্রা টাকা পয়সা ঋণ রয়েছে, হাশরের দিন তার নেক আমল দ্বারা তা পরিশোধ করা হবে। কেননা সেখানে দুনিয়ার মুদ্রা থাকবে না।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ২৪১৪]
ঋণ আদায়ে টালবাহানা করা অন্যায় :
অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে থাকে। এটি সুস্পষ্ট অন্যায়। ঋণগ্রহীতার মনে রাখা উচিত-ঋণদাতা তার ওপর অনুগ্রহ করেছে, এ অনুগ্রহের পরিবর্তে তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করাই কর্তব্য। সময়মতো যদি ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য তার না থাকে, তাহলে সে সৌজন্য রক্ষা করে ঋণদাতাকে জানাতে পারে, তার কাছ থেকে আরও কয়েক দিন সময় চেয়ে নিতে পারে। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ যথাসময়ে আদায়ে টালবাহানা করা-হাদীসে একে সরাসরি জুলুম ও অন্যায় বলা হয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ধনী ব্যক্তির টালবাহানা করা জুলম।” [সহীহ বুখারী, হা. ২০০]
আজকাল সমাজে আরো এক শ্রেণীর লোক দেখা যায়, যারা পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়। অর্থাৎ আসলে তার অন্তরে থাকে অন্যের অর্থ কৌশলে আত্মসাৎ করা। হাদীসে এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী রয়েছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়, সে আল্লাহ তা’আলার সামনে চোর হিসেবে উপস্থিত হবে।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ২৪১০]
তাই এ রকম জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ মানুষের হক্ব পৃথিবীতে আদায় না করা হলেও আখেরাতে আল্লাহর দরবারে তা অবশ্যই আদায় করতে হবে।
ঋণ আদায় সহজ হওয়ার উপায় :
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আর ঋণগ্রহীতার ঋণ আদায়ের দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে আল্লাহ তা’আলা তার জন্য পথ খুলে দেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি অন্যের মাল পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তা’আলা তাকে ঋণ পরিশোধ করতে সাহায্য করেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তা নষ্ট করে দেন। [বুখারী, হা. ২৩৮৭]
ঋণগ্রহীতা যেন এ দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারে সে জন্য হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের কিছু দু’আও শিখিয়েছেন। একটি দু’আ হলো- ঋণগ্রহীতা যেন এ দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারে সে জন্য হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের কিছু দু’আও শিখিয়েছেন।
একটি দু’আ হলো- আল্লাহুম্মাক ফিনি বিহালালিকা আন হারমিকা ওয়ানিনি বি ফাদলিকা আম্মান সিওয়াক
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার হালাল জিনিসের মাধ্যমে হারাম থেকে বাঁচান এবং আপনার দয়া ও করুণা দিয়ে অন্যদের থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন। [জামে তিরমিযী, হা. ৩৫৬৩]
এ ছাড়া আরো একটি দু’আ বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করে আবু উমামা (রা.)- কে দেখতে পান। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন- হে আবু উমামা! আমি তোমাকে নামাযের সময় ব্যতীত মসজিদে উপবিষ্ট কেন দেখছি? তিনি বলেন, সীমাহীন দুশ্চিন্তা ও ঋণভারে জর্জরিত হওয়ার কারণে, হে আল্লাহর রাসূল?! আমি সেই অসময়ে মসজিদে উপনীত হয়ে তা থেকে আল্লাহর নিকট মুক্তি কামনা করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কি তোমাকে এমন বাক্য শিক্ষা দেব না তুমি তা উচ্চারণ করলে আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূরীভুত করবেন এবং তোমার কর্জ পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। এতদশ্রবণে আমি বলি-হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সকাল ও সন্ধ্যায় এটি পড়বে:
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট যাবতীয় দুশ্চিন্তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি তোমার নিকট দুর্বলতা ও অলসতা হতে আশ্রয় কামনা করছি, তোমার নিকট কাপুরুষতা ও কৃপণতা হতে নাজাত কামনা করছি এবং আমি তোমার নিকট ঋণভাবের ও মানুষের দুই প্রভাব হতে পরিত্রাণ চাচ্ছি।”
আবু উমামা (রা.) বলেন, অতঃপর আমি এ আমল করি। ফলে আল্লাহ তা’আলা আমার চিন্তা বিদূরিত করেন এবং ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। [সুনানে আবী দাউদ, হা. ১৫৫৫]
উত্তম পদ্ধতিতে ঋণ আদায় :
ঋণ পরিশোধের সময় ঋণগ্রহীতা ইচ্ছা করলে ঋণদাতার অনুগ্রহের বদলাস্বরূপ তাকে কিছু বাড়িয়েও দিতে পারে, কিংবা যে মানের সম্পদ ঋণ নিয়েছিল তাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের জিনিস ফেরত দিতে পারে। যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো পূর্বশর্ত বা প্রথা না থাকে, তাহলে এটা সুদের অন্তর্ভুক্তও হবে না। বরং তা অনুগ্রহের বিনিময়ে অনুগ্রহ। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ থেকেও আমরা এ অনুগ্রহের শিক্ষা পাই।
হযরত জাবের (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছ থেকে একবার ঋণ নিয়েছিলেন। পরে যখন তিনি তা আমাকে পরিশোধ করলেন, তখন আমার পাওনার চেয়েও বাড়িয়ে দিলেন। [সুনানে আবী দাউদ, হা. ৩৩৪৯]
সাথে সাথে পাওনা পরিশোধকালে পাওনাদারের কৃতজ্ঞতা জানানো এবং তার জন্য কল্যাণের দু’আ করাও ইসলামের অনন্য শিক্ষা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আবদুল্লাহ ইবনে আবী রবীআ (রা.) থেকে চার হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। যখন তা পরিশোধ করলেন, তখন তিনি তার জন্য এ দু’আ করলেন, আল্লাহ তা’আলা তোমার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদে বরকত দান করুন। [সুনানে নাসাঈ, হা. ৪৬৮৩]
ঋণ প্রদানের ফজীলত :
ঋণ প্রদান একটি মহৎ নেকির কাজ, এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করে। এর মাধ্যমে লোকদের সাহায্য-সহানুভূতি ও তাদের প্রতি দয়া করা হয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দুনিয়াবী বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তা’আলা তার আখেরাতের বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ তা’আলা তার দুনিয়া ও আখেরাতের সব কিছু সহজ করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করবে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন। আল্লাহ বান্দাকে সাহায্য করেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করে।” [সহীহ মুসলিম, হা. ২৬৯৯]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “কেউ যদি কোনো মুসলিমকে দুবার ঋণ দেয়, তা সেই অনুযায়ী একবার সদকা করার মতো।” [সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ২৪৩০]
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মেরাজের রাতে আমি জান্নাতের একটি দরজায় লেখা দেখলাম, দান-খয়রাতে দশ গুণ সাওয়াব এবং ঋণ প্রদানে আঠারো গুণ! আমি বললাম- হে জিবরাইল! ঋণ প্রদান দান-খয়রাতের চেয়ে উত্তম হওয়ার কারণ কী? তিনি বলেন, ভিক্ষুক নিজের কাছে কিছু সম্পদ থাকতেও ভিক্ষা চায়, কিন্তু ঋণগ্রহীতা প্রয়োজনের তাগিদেই ঋণ চায়। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ২৪৩১]
অভাবী ঋণীকে অবকাশ দেওয়া :
সমাজে কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা সক্ষমতা সত্ত্বেও ঋণ শোধ করতে গড়িমসি করে, তেমনি সত্যিকারের এমন লোকও রয়েছে, যারা নির্ধারিত সময়ে ঋণ প্ররিশোধে অক্ষম। এ রকম ব্যক্তিকে ইসলাম অতিরিক্ত সময় দিতে উদ্ধুদ্ধ করে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “যদি ঋণী দরিদ্র হয়, তবে সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দেবে আর মাফ করে দেওয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম যদি তোমরা জানতে!” [সূরা বাকারা, আয়াত : ২৮০]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে আল্লাহ তাকে কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে নি®কৃতি দেবে, সে যেন অভাবী ঋণীকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণের বোঝা লাঘব করে।” [সহীহ মুসলিম, হা, ৪০০০]
সুদি ঋণের ভয়াবহতা :
ইসলামে ঋণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা, তাদের প্রতি দয়া করা। তবে এ সহযোগিতার আড়ালে সুবিধা অর্জন ঠিক নয়। কেননা ঋণ প্রদান একটি ইবাদত। আর ইবাদতের বিনিময় একমাত্র আল্লাহ তা’আলা থেকেই প্রাপ্য। তাই ঋণের উদ্দেশ্য হবে আধ্যাত্মিক বৃদ্ধি তথা আল্লাহর সন্তষ্টি ও নেকি অর্জন, বাহ্যিক বৃদ্ধি নয়। এ কারণে ঋণগ্রহীতা ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় যা নিয়েছে অনুরূপ ফেরত দিতে আদিষ্ট, অতিরিক্ত নয়। কেননা অতিরিক্ত অংশটি স্পষ্ট সুদ।
একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “প্রত্যেক ঋণ, যার মাধ্যমে লাভ উপার্জিত হয়, তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।” [আসসুনানুল কোবরা, বাহাকি, হা. ১০৯৩৩]
এটি শরীয়তের একটি মূলনীতি। অতএব ঋণদাতা ঋণের অতিরিক্ত নিলে কিংবা ঋণগ্রহীতা অতিরিক্ত ফেরত দিলে তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে।
সুদের ভয়াবহতা কোরআন-হাদীসের অসংখ্য জায়গায় উল্লেখ রয়েছে, যার বিস্তারিত বিবরণ এ স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। সুদের ভয়াবহতা বোঝার জন্য শুধু এটুকুই যথেষ্ট যে সুদ গ্রহণকে আল্লাহ তা’আলা আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা বলে অভিহিত করেছেন। কোরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না করো।
তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। আর যদি তোমরা তাওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৮, ২৭৯)
হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদদাতা-গ্রহীতা, সুদি লেনদেনের লেখক-সাক্ষী সকলের ওপর অভিশাপ করেছেন। [সহীহ মুসরিম, হা. ১৫৯৭]
একটি সংশয়ের নিরসন :
ইসলাম ঋণ দেওয়াকে যেমন মানুষের সহানুভূতি হিসেবে স্বীকার করে, তেমন ঋণ প্ররিশোধে উত্তম দৃষ্টান্ত পেশ করে। তাই ঋণগ্রহীতা ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় অতিরিক্ত ফেরত দিতে পারে। অনেকে ইসলামের এই সুন্দর বিধান বুঝতে ভুল করে। তারা সুদ এবং উত্তম পন্থায় ঋণ পরিশোধে পার্থক্য করতে পারে না। তাদের ধারণা, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় বেশি দিয়েছেন, তেমন আমরা ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় যদি বেশি দিই এবং তারা সেটা গ্রহণ করে তো অবৈধতার কিছু নেই।
আসলে মূল বিষয়টি হলো, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঋণ ফেরতে বেশি দেওয়া এবং সুদি প্রথায় অতিরিক্ত লাভ প্রদানে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে।
প্রথমত : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঋণদাতা ঋণ প্রদানের সময় কোনো শর্ত নেয়নি যে ঋণ ফেরতকালে বেশি ফেরত দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত : সমাজে এটার প্রচলন ছিল না যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঋণ দিলে তিনি অতিরিক্ত ফেরত দেন। এ কারণে ইসলামী ফকীহগণের ঐকমত্য রয়েছে যে, যেকোনো ঋণে যদি বেশি ফেরতের শর্ত থাকে, তাহলে সেটা হারাম ও সুদের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ দুই শর্তে ঋণ ফেরতকালে বেশি ফেরত দিলে সুদ হবে না।
ক. ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার সাথে অতিরিক্ত নেওয়ার শর্ত দেয়নি।
খ. সমাজে এ রকম বেশি দেওয়ার প্রথা প্রচলিতও নয়।
তবে যদি শর্ত দেওয়া হয় কিংবা এটা সমাজে প্রচলিত থাকে, তাহলে বেশি আদান-প্রদান সুদ হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৭/৩৯৫)
আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে ইসলামী শরীয়ত বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন।
