প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭, রমজান-শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
অন্তরের ১০টি রোগের চিকিৎসা করে অন্তরের ১০টি গুণ হাসিল করার নাম তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি। যা শরীয়তের দৃষ্টিতে ফরযে আইন
অন্তরের ১০টি রোগের চিকিৎসা করে অন্তরের ১০টি গুণ হাসিল করার নাম তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি। যা শরীয়তেরদৃষ্টিতে ফরযে আইন এবং এর জন্য কোনো ইজাযতপ্রাপ্ত শাইখের সাথে ইসলাহী সম্পর্ক করাও ফরযে আইন। বাইআত হওয়া ফরয বা ওয়াজিব নয় বরং এটা মুস্তাহাব। এর ওপর আত্মশুদ্ধি নির্ভর করে না। আত্মশুদ্ধি অর্জন হলে সমস্ত জাহেরী গোনাহ বর্জন করা এবং জাহেরী ইবাদত-বন্দেগী করা সহজ হয়ে যায় এবং সেই বন্দেগীকে তাকওয়ার যিন্দেগী বা সুন্নাতী যিন্দেগী বলে এবং সে ব্যক্তি তখন আল্লাহর ওলী হয় এবং তার হায়াতে তাইয়্যিবা তথা পবিত্র জীবন নসীব হয়। আল্লাহ তা’আলা সকলকে এ দৌলত নসীব করেন, আমীন।
অন্তরের ১০টি রোগের বর্ণনা :
১. বেশি খাওয়া এবং ভালো খানার প্রতি লোভী হওয়া:
বেশি খাওয়া এবং উদর পূর্তি করে খাওয়া অসংখ্য গোনাহের মূল। এ জন্য হাদীসে পাকে ক্ষুধার্ত থাকার অনেক ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘মানুষের জন্য পূর্ণ করার ক্ষেত্রে পেটের থেকে খারাপ কোনো পাত্র নেই।’’ (বুখারী হা. নং ৪৩৪৩)
খানা কম খাওয়ার উপকারসমূহ :
(১) অন্তরে স্বচ্ছতা সৃষ্টি হয়। (২) দিল নরম হয় এবং মুনাজাতে স্বাদ অনুভূত হয়। (৩) অবাধ্য নফস অপদস্থ ও পরাজিত হয়। (৪) নফসকে শাস্তি দেওয়া হয়। (৫) কুপ্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে যায়। (৬) বেশি নিদ্রা আসে না এবং ইবাদত কষ্টকর হয় না। (৭) দুনিয়াবী চিন্তাভাবনা কমে আসে এবং জীবিকা নির্বাহের বোঝা হালকা হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, বর্তমান যামানার লোকেরা পূর্বের তুলনায় অনেক কমজোর হওয়ায় তাদের খানার মুজাহাদার ব্যাপারে হাকীমূল উম্মত হযরত থানভী (রহ:) লিখেছেন, এ যামানায় খানার মুজাহাদার অর্থ হলো পেট পূর্ণ হতে ২-৪ লোকমা বাকি থাকা অবস্থায় খানা শেষ করা এবং নফস বা শরীর দিয়ে খুব কাজ নেওয়া।
২. অধিক কথা বলা :
জবান হলো অন্তরের দূত। অন্তরের যাবতীয় নকশা ও কল্পনাকে জবানই প্রকাশ করে। এ জন্য জবানের ক্রিয়া বড় মারাত্মক হয়। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, তোমাদের প্রতিটা কথা সংরক্ষণ করা হয়। (সূরা কাফ-১৮)
হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি নিজের লজ্জাস্থান এবং জিহবার ব্যাপারে আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। (বুখারী হা. নং ৬৪৭৪)
কথা বেশি বলার ক্ষতিসমূহ :
১. মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে পড়া। ২. গীবতে জড়িয়ে পড়া। ৩. অনর্থক ঝগড়া করা। ৪. অতিরিক্ত হাসাহাসি করা, যদ্দরুন দিল মরে যায়। ৫. অন্যের অযাচিত প্রশংসা করা।
চুপ থাকার উপকারিতা :
১. হেনতবিহীন ইবাদত। ২. সাম্রাজ্যবিহীন দাপট। ৩. দেয়ালবিহীন দুর্গ। ৪. অস্ত্রবিহীন বিজয়। ৫. কিরামান-কাতিবীনের শান্তি। ৬. আল্লাহভীরুদের অভ্যাস। ৭. হেকমতের গুপ্তধন। ৮. মূর্খদের উত্তর। ৯. দোষসমূহ আবৃতকারী। ১০. গোনাহসমূহ আচ্ছাদনকারী।
৩. অহেতুক গোস্বা করা :
এটি অত্যন্ত খারাপ একটি আত্মিক ব্যাধি। রাগ দোযখের আগুনের একটি টুকরা। এ জন্য রাগান্বিত ব্যক্তির চেহারা লাল হয়ে যায়। এর কারণে মারামারি, ঝগড়াঝাঁটি, গালাগালি, এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত সংঘটিত হয়।
এমনকি অনেকে বৃদ্ধ বয়সে এসে তুচ্ছ ঘটনায় বিবিকে তিন তালাক দিয়ে পস্তাতে থাকে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ওই ব্যক্তি বাহাদুর নয়, যে যুদ্ধের ময়দানে দুশমনকে নিচে ফেলে দেয় বরং ওই ব্যক্তি বাহাদুর, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। (বুখারী হাদীস নং ৬১১৪)
গোস্বার চিকিৎসা :
দুভাবে গোস্বার চিকিৎসা করা হয়। ১. ইলমী চিকিৎসা হলো, গোস্বার সময় চিন্তা করতে হবে গোস্বা কেন আসে? গোস্বা আসার কারণ তো এটাই যে, যে কাজটি আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে সে কাজটি আমার মনের মোতাবেক কেন হয়নি? কেন এটা আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হলো? তার মানে আমি আল্লাহর ইচ্ছাকে আমার ইচ্ছার অনুগত বানাতে চাই? নাউযুবিল্লাহ! এভাবে চিন্তা করলে গোস্বার বদ অভ্যাস দূর হয়ে যাবে। আর আমলী চিকিৎসা হলো:
গোস্বা আসলে ১. আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজিম পড়বে, ২. নিজ অবস্থা পরিবর্তন করবে। অর্থাৎ দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়বে, বসে থাকলে শুয়ে পড়বে। ৩. যার প্রতি গোস্বার উদ্রেক হয় তার সামনে থেকে সরে পড়বে। ৪. তারপরও গোস্বা ঠাণ্ডা না হলে ওজু করবে, নিজ গালকে মাটিতে লাগিয়ে দেবে। এভাবে আমল করলে গোস্বা দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
৪. হিংসা করা :
হিসার সংজ্ঞা : কোনো ব্যক্তিকে আরাম-আয়েশ বা প্রাচুর্যপূর্ণ অবস্থায় দেখে তার সে নিয়ামত দূরীভূত হয়ে নিজের জন্য হাসিল হওয়ার আকাক্সক্ষা করা। হিংসা অত্যন্ত জঘন্য একটি ব্যাধি।
আল্লাহ তা’আলা হাদীসে কুদসীতে বলেন, আমার বান্দার ওপর নিয়ামত দেখে হিংসাকারী কেমন যেন আমার ওই বন্টনের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট, যা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে করেছি। নাউযুবিল্লাহ। (এহয়াউ উলুমুদ্দীন- ৩/২৯২)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘হিংসা নেকীসমূহকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দেয়, যেমন আগুন শুকনো লাকড়িসমূহকে জ্বালিয়ে দেয়।” অবশ্য অন্যের কোনো নিয়ামত দেখে সেটা তার মধ্যে বহাল থেকে নিজের জন্য হাসিল হওয়ার আকাক্সক্ষা করা যাবে ‘‘গিবতা’’ বলে সেটা জায়েয। (আবু দাউদ হাদীস নং- ৪৯০৩)
৫. কৃপণতা ও সম্পদের মোহ :
সম্পদের মোহই মূলত কৃপণতার মূল আর সম্পদের মুহব্বত মানুষকে দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট করে। যে কারণে আল্লাহ তা’আলার প্রতি মুহব্বত দুর্বল হয়ে যায়। এ কারণেই কোরআনে কারীমে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, যার ভাবার্থ হলো: আল্লাহর দেওয়া সম্পদে কৃপণতাকারীদের জন্য পরকালে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে। (সূরা আলে-ইমরান আয়াত ১৮০)
হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, তোমরা লোভকে নিয়ন্ত্রণ করো। কারণ এটা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধবংস করেছে। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৫৭৮)
বাস্তবিক পক্ষে সম্পদের মোহ মানুষকে আল্লাহ পাক থেকে উদাসীন করে দেয়। এই সম্পদ মুসলমানদের জন্য ভয়াবহ এক ফেতনা। অবশ্য শুধু সম্পদ কোনো নিন্দনীয় ব্যাপার নয়। বিশেষত যদি সে সম্পদ দ্বীনি কাজে ব্যয় করা হয়। নতুবা জরুরত পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোনো অসুবিধা নেই, যাতে কারো নিকট ভিক্ষার হাত বাড়াতে না হয় এবং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা যায়।
৬. খ্যাতি ও পদের মোহ :
খ্যাতি ও পদের মোহ অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি আত্মিক ব্যাধি। এর দ্বারা অন্তরে নিফাক সৃষ্টি হয়। এ জন্য নিজেকে সব সময় লুকিয়ে রাখা চাই, খ্যাতির পেছনে পড়া অনুচিত। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, এই পরকাল আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না। (সূরা কিসাস- ৮৩)
হাদীসে পাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘যদি কোনো বকরির পালের মধ্যে দুটি নেকড়ে প্রবেশ করে তাহলেও সেটা এত ক্ষতি করে না, যতটা সম্পদ ও পদের মুহব্বত দ্বীনদার মুসলমানদের দ্বীনের ক্ষতি করে।’’ (তিরমিযী হা. নং ২৩৮১, মু. আহমদ হা. ১৫৯০)
অবশ্য যদি কামনা-বাসনা ছাড়াই আল্লাহ তা’আলা কাউকে সুখ্যাতি দান করেন তবে সেটা দোষণীয় নয়। যেমন নবীগণ (আ:) সাহাবীগণ (রাযি:) তাবেঈ ও তাবতাবেঈগণ (রহ:) তাঁদের প্রত্যেকেরই দুনিয়াতে খ্যাতি ছিল কিন্তু তাঁরা কেউ দুনিয়াতে খ্যাতি কামনা করেননি।
৭. দুনিয়াপ্রীতি :
দুনিয়াপ্রীতি শুধু সম্পদ ও পদের মুহব্বতকেই বলে না। বরং ইহজীবনে যেকোনো অবৈধ কামনাকে পূর্ণ করার প্রচেষ্টা ও খাহেশকেই দুনিয়াপ্রীতি বলে। অবশ্য দ্বীনি ইলম, মারিফাতে ইলাহী এবং সৎকর্ম যেগুলোর ফলাফল মৃত্যুর পর পাওয়া যাবে, সেগুলো যদিও দুনিয়াতেই সংঘটিত হয় কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এসবের মুহব্বতকে দুনিয়ার মুহব্বত বলে না বরং এগুলো হলো আখেরাতের মুহব্বত। দুনিয়ার জীবনের নিন্দাবাদ করে মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, ‘‘দুনিয়ার জীবনের সব কিছুই ধোঁকায় সামান।” (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৮৫)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘‘দুনিয়ার সামানপত্র, রং-তামাশা ও খেলাধুলা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরায়ে হাদীদ, আয়াত ২০) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুনিয়া হলো একটি মরা জন্তু, যারা এটাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে তারা হলো কুকুরের দল। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে উদ্দেশ্য না করে দুনিয়াকে আখেরাতের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তাহলে কামিয়াব হওয়া যাবে।
৮. অহংকার করা :
তাকাব্বুর বা অহংকারের অর্থ হলো, প্রশংসনীয় গুণাবলির মধ্যে নিজেকে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, হক্ব ও সত্যকে অস্বীকার করা। বলাবাহুল্য, যখন মানুষ নিজের ব্যাপারে এরূপ ধারণা পোষণ করে এবং আল্লাহর দেওয়া গুণসমূহকে নিজের কৃতিত্ব মনে করে তখন তার নফস ফুলে ওঠে, অতঃপর কাজকর্মে এর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ: রাস্তায় চলার সময় সাথীদের আগে আগে চলা, মজলিসে সদরের মাকামে বা সম্মানিত স্থানে বসা। অন্যদের তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা বা আচরণ করা অথবা কেউ আগে সালাম না দিলে তার ওপর গোস্বা হওয়া, কেউ সম্মান না করলে তার ওপর অসন্তুষ্ট হওয়া, কেউ সঠিক উপদেশ দিলেও নিজের মর্জির খেলাফ হওয়ায় সেটাকে অবজ্ঞা করা। হক্ব কথা জানা সত্ত্বেও সেটাকে না মানা। সাধারণ মানুষকে এমন দৃষ্টিতে দেখা, যেমন গাধাকে দেখা হয় ইত্যাদি। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের অনেক আয়াতে ‘অহংকার’- এর নিন্দাবাদ করা হয়েছে। অহংকারের কারণেই ইবলিশ বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়েছে। অহংকারের কারণেই আবু জাহাল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য জেনেও অস্বীকার করেছে।
৯. আত্মতুষ্টি :
আত্মতুষ্টি বা নিজেকে নিজে সঠিক মনে করা মূলত এটা অহংকারেরই ভূমিকা বা প্রাথমিক রূপ। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে অহংকারের ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় নিজের নফসকে বড় মনে করা হয় আর আত্মতুষ্টির মধ্যে অন্যদের সাথে তুলনা করা ছাড়াই স্বীয় নফসকে নিজ খেয়ালে কামেল মনে করা হয়। এবং আল্লাহ প্রদত্ত নেয়মতসমূহকে নিজের হক্ব মনে করা হয়। অর্থাৎ এটাকে আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ মনে করা হয় না এবং সেটা যেকোনো মুহূর্তে ছিনিয়ে নেওয়া হতে পারে- সে ব্যাপারে শঙ্কাহীন হয়ে পড়া। এটাকেই তাসাওউফের পরিভাষায় ‘‘উজুব’’ বা ‘‘খোদপছন্দী’’ বলে। এটার চিকিৎসা করা না হলে এটাই কিছুদিন পর অহংকারে পরিণত হয়ে বান্দাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।
১০. লোক দেখানো (রিয়া বা প্রদর্শনী) :
রিয়া বলা হয় নিজ ইবাদত ও ভালো আমলের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে বড়ত্ব ও মর্যাদার আকাক্সক্ষা করা। এটা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরিত ব্যাপার। কেননা ইবাদতের দ্বারা মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এখন যেহেতু এই আমলের উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্য শরীকও চলে এসেছে, বিধায় একে ‘‘শিরকে আসগার’’ বা ছোট শিরক বলা হয়।
কোরআনে কারীমে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, মানুষকে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদত করার হুকুম করা হয়েছে। (সূরায়ে বানিয়্যনাহ আয়াত-৫)
হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, ‘‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে অধোঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তারা সবাই হবে রিয়াকার।” তারা সারা জীবন দ্বীনের পথে থেকেও অন্তরের একটি রোগের কারণে সকলের পূর্বে জাহান্নামে যাবে। রিয়াকে ‘‘শিরকে খফী” বা গোপন শিরকও বলা হয়।
রিয়ার সূরতসমূহ :
মোট ছয়ভাবে রিয়া হতে পারে। ১. শরীরের দ্বারা, ২. অঙ্গভঙ্গির দ্বারা, ৩. আকৃতি অবলম্বনের দ্বারা, ৪. কথাবার্তার দ্বারা, ৫. আমলের দ্বারা, ৬. নিজ মুরীদ ও ভক্তের আধিক্য ও নিজের ইবাদত-বন্দেগীর বর্ণনার দ্বারা।
প্রশংসনীয় দশটি গুণের বর্ণনা :
১. তাওবা :
‘তাওবা শব্দের অর্থ হলো, ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। আর পরিভাষায় ‘‘তাওবা’’ বলা হয় অতীত গোনাহের ওপর লজ্জিত হওয়া, বর্তমানে সে গোনাহ বর্জন করা এবং ভবিষ্যতেও না করার ব্যাপারে দৃঢ় ইরাদা করা। এবং উক্ত কাজের কোনো কাযা বা কাফফারা থাকলে তা করে নেওয়া। এ তিনটি বিষয়ের সমষ্টিকেই ‘‘তাওবায়ে নাসূহা’’ বা পরিপূর্ণ তাওবা বলে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- হে মুমিনগন! তোমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করো। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হবে। (তাহরীম-৮)
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘গোনাহ থেকে তাওবাকারী ওই ব্যক্তির ন্যায় হয়ে যায়, যার কোনো গোনাহ থাকে না।”
তাওবার ফজীলতে কোরআন শরীফের অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে এবং অনেক হাদীসেও এর ফজীলত এসেছে। যেমন- সূরা নূর ৩১, সূরা হুদ ৩, সূরা তাহরীম ৮, বুখারী হা. ৬৩০৭, ৬৩০৯, মুসলিম হা. ২৭৪৭, ২৭০২।
২. আল্লাহর ভয় :
‘খাওফ’ বা ভয়ের প্রকৃত অর্থ হলো, আসন্ন কোনো কষ্টের আশঙ্কা করা, অন্তরে বিষন্নতা ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলার সিফাতে জালালীর পরিচয় অর্জিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর ভয় অন্তরে সৃষ্টি হবে না। আর এ কথাটা মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল করতে হবে যে মহান আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক ছোট-বড় বস্তুর ওপর এমনভাবে ক্ষমতাবান যে মুহূর্তের মধ্যেই তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই করে ফেলতে পারেন। কোনো মাখলূকের কোনো প্রকার আপত্তি করারও কোনো অধিকার নেই। এভাবে চিন্তা-ফিকির করলে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে। ইনশাআল্লাহ।
৩. যুহদ বা কৃচছতা:
‘যুহদ’-এর হাকীকত হলো, দুনিয়ার মাল-সামানের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা এবং সেটা অর্জন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সেদিকে মনোযোগ না দেওয়া। কোটিপতিও যাহেদ হতে পারে, যদি তার মাল-দৌলতের প্রতি কোনো আকর্ষণ না থাকে। আবার ফকিরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাহেদ নাও হতে পারে।
‘যুহদ’- এর মূল হলো ওই নূর এবং ইলম, যা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার অন্তরে ঢালা হয়। যদ্দরুন বান্দার সিনা খুলে যায় এবং এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে দুনিয়ার সমস্ত সাজসজ্জা মাছির পাখার (ডানার) চেয়েও মূল্যহীন। আর আখিরাতের জীবনই আসল জীবন। যখন এই নূর হাসিল হয় তখন আখিরাতের মোকাবিলায় দুনিয়ার কোনো মূল্যই থাকে না।
যুহদের ফলাফল হলো: প্রয়োজন পরিমাণ দুনিয়ার ওপর তুষ্ট হওয়া। যে পরিমাণ পাথেয় মুসাফির ব্যক্তির সফরের সময় প্রয়োজন হয় তার চেয়ে বেশির পেছনে না পড়া।
৪. সবর বা ধৈর্য :
‘সবর’-এর আসল অর্থ হলো, কুপ্রবৃত্তির মোকাবিলায় আল্লাহ পাকের নির্দেশের ওপর দৃঢ়তার সাথে জমে থাকা।
সবরের তিনটি স্তর –
১। উন্নত পর্যায়ের সবর হলো, মনের খারাপ কামনা-বাসনা এবং কুপ্রবৃত্তিকে সমূলে উৎপাটিত করে এর ওপর স্থায়িত্ব নসীব হওয়া।
২। সবরের নিকৃষ্ট স্তর হলো, কুপ্রবৃত্তির প্রাবল্য থাকে আর কলব শয়তানি বাহিনীর কাঁধে ন্যস্ত হয়ে পড়ে।
৩। মধ্যম পর্যায়ের সবর হলো, আল্লাহর বাহিনী ও শয়তানি বাহিনীর মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। কখনো এদের পাল্লা ভারী হয় আবার কখনো তাদের পাল্লা। কারো একতরফা জয়-পরাজয় হয় না। কোরআনে কারীমের ৭০ টিরও বেশি স্থানে সবরের কথা বলা হয়েছে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘সবর ঈমানের অর্ধেক এবং জান্নাতের খাযানাসমূহের মধ্যে একটি খাযানা। যে ব্যক্তি এ গুণে গুণান্বিত হয় সে অনেক বড় সৌভাগ্যবান। রাত্রি জাগরণকারী এবং স্থায়ী রোযাদারের চেয়েও তার মর্যাদা বেশি।”
৫. শোকর বা কৃতজ্ঞতা :
শোকরের হাকীকত বুঝতে হলে প্রথমে সেটাকে তিনটি অংশে বিভক্ত করতে হবে।
১। ইলম অর্থাৎ, নিয়ামত এবং নিয়ামত প্রদানকারী (আল্লাহ তা’আলা) – কে চেনা।
২। নিয়ামত প্রদানকারীর ওই নিয়ামতের ওপর এ জন্য সন্তুষ্ট হওয়া যে, এটা আল্লাহ তা’আলার দান।
৩। এবং আল্লাহ তা’আলা কর্তৃত্ব প্রদত্ত সমস্ত নিয়ামতকে তার সন্তুষ্টি কাজে ব্যবহার করা।
শোকরের ফজীলত বয়ান করে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘‘যদি তোমরা (আমার নিয়ামতের) শোকর আদায় করো তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য নিয়ামত বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা নিয়ামত পেয়ে অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (জেনে রেখো) আমার আজাব বড়ই কঠিন।” (সূরা ইবরাহীম-৭)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘খাদ্য ভক্ষণকারী কৃতজ্ঞ বান্দা ধৈর্যশীল রোযাদারের সমান।” (মুসনাদে আহমদ হা. -১৯০৩৮)
৬. ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা:
ইখলাসের অর্থ হলো, মুসলমান ব্যক্তির নিয়্যাতের মধ্যে অন্য কিছুর মিশ্রণ না থাকা। ইখলাসের দুটি রুকন আছে। প্রথমত, নিয়্যাত অর্থাৎ, একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য আমল করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘সকল কাজের ভালো-মন্দ নিয়্যাতের ওপর নির্ভর করে।” (বুখারী হাদীস নং ১)
দ্বিতীয়ত, সততা, আর এটাই ইখলাসের পূর্ণতা। আল্লাহ পাক বলেন, তারাই প্রকৃত মুমিন বান্দা, যারা তাদের অঙ্গীকারে সত্যবাদী। (সূরা আহযাব- ২৩)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘যখন মানুষ সত্য কথা বলে এবং সত্যের অনুসন্ধানে থাকে তখন মহান আল্লাহর নিকট তার নাম সিদ্দীক লেখা হয়।” (বুখারী হাদীস নং-৬০৯৪)
৭. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা:
তাওয়াক্কুল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ওই বিশেষ হালত বা অবস্থা, যা আল্লাহ তা’আলাকে এককভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সমস্ত গুণের মধ্যে স্বতন্ত্র ও লা-শরীক মনে করার দ্বারা সৃষ্টি হয়। এরপর এই বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার পর এমন কাজ করা, যার দ্বারা আল্লাহর প্রতি আস্থা প্রকাশ পায়। অতএব তাওয়াক্কুলের মোট ৩টি অংশ হলো-
১। মারেফাত বা পরিচয়
২। হালাত বা বিশেষ অবস্থা
৩। আমল বা বিশেষ কার্যকলাপ।
তাওয়াক্কুলের ফজীলত বয়ান করে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘‘তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে মুমিন হও তাহলে এক আল্লাহর ওপরই ভরসা করো। (সূরা মাইয়িদাহ-২৩)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি তোমরা আল্লাহ তা’আলার ওপর যথার্থ তাওয়াক্কুল করো তাহলে এমনভাবে রিযিক প্রদান করা হবে, যেমন পাখিদের পৌঁছানো হয়। সকালে খালি পেটে বের হয়। বিকেলে ভরা পেটে ফিরে আসে। (তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৩৯৪, মুসনাদে আহমদ-৩৭২)
৮. আল্লাহপ্রীতি :
মুহব্বতের হাকীকত হলো যেমন প্রতিটি সুস্বাদু জিনিস মানুষের প্রিয় হয়ে থাকে। আর প্রিয় হওয়ার অর্থ হলো মন সেদিকে আকৃষ্ট হয়। মনের এ আকর্ষণ যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে তখন তাকে “ইশক” বলে।
অতএব আল্লাহ তাআলার মুহব্বত প্রতিটি ঈমানদার ব্যক্তির কাম্য হওয়া উচিত। যেহেতু মুহব্বত করা হয় তিনটি কারণে – ১। “জামাল” (সৌন্দর্য) ২। কামাল (গুণ) ৩। নাওয়াল (দান)। আর বলাবাহুল্য, এ তিনটি বিষয় আল্লাহর মধ্যেই পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : আর যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তাআলার ওপর ঈমান আনে তারা তো তাঁকেই সর্বাধিক পরিমাণে ভালোবাসে। (বাকারা : ১৬৫) অন্যত্র বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক বান্দাদেরকে ভালোবাসেন আর তাঁর নেক বান্দারাও আল্লাহকে ভালোবাসে। (সূরা মায়েদা, আয়তা নং ৫৪)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর মুহব্বত সমস্ত জিনিস অপেক্ষা বেশি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ঈমান পরিপূর্ণ হবে না। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ১৪)
৯. রেযা বিল কাযা বা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ঠ থাকা :
মুসলমানদের শানে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। (সূরায়ে বাইয়্যিনাহ, আয়াত-৮)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তাকে কোনো মুসীবতে লিপ্ত করেন।” (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৪০১, মুসনাদে আহমদ-৫/২৩৬৯৭)
তখন যদি সে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে তবে তাকে নির্বাচিত করেন। এ মাকাম হাসিল হওয়ার পর বান্দার দুনিয়াবী কোনো পেরেশানি থাকে না। এক হাদীসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, মুমিনের ব্যাপারটি বড় আশ্চর্যজনক। কেননা তার সকল কাজই মঙ্গলময়। যদি কোনো মুসীবতে নিপতিত হয় তাহলে ধৈর্যধারণ করে, যা তার জন্য মঙ্গলজনক। আর যদি কোনো নিয়ামতপ্রাপ্ত হয় তাহলে সপ্রশংস শোকর আদায় করে। (মুসলিম, হাদীস নং-২৯৯৯)
১০. মৃত্যু চিন্তা, যা তার জন্য মঙ্গলজনক :
মৃত্যু বড় ভয়ানক জিনিস। আর মৃত্যুর পরের ঘটনাবলি তার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। এ জন্য বেশি বেশি মৃত্যুর স্মরণ করা উচিত। কেননা এর দ্বারা দুনিয়ার মুহব্বত বিদুরিত হয় এবং আখেরাতের ফিকির ও মুহব্বত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, প্রতিটি জীবকেই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। (আনকাবূত : ৫৭)
অন্যত্র বলেছেন, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু এসে তোমাদের নাগাল পাইবে। এমনকি তোমরা যদি কোনো মজবুত দুর্গেও থাকে। (সেখানেও মৃত্যু এসে হাজির হবে) (নিসা-৭৮)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা সমস্ত স্বাদ নিঃশেষকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-২/৭৯৪৪, তিরমিযী শরীফ-২৩১২)
অহংকার বর্জন ও বিনয় অর্জনের উপায় : নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অবস্থা ও সুযোগ অনুযায়ী লৌকিকতাবশত হলেও অবলম্বন করবে।
১। চিকিৎসার প্রাথমিক অবস্থায প্রত্যহ নির্ধারিত সমযে আধাঘন্টা বা তার কম সময় একাগ্রচিত্তে কোনো নির্জন স্থানে বসে নিজের সৃষ্টি, বর্তমান ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ – এ তিন বিষয়ে চিন্তা করবে যে আমার আসল অবস্থা হলো –
* নাপাক পানির ফোঁটা থেকে আমার সৃষ্টি।
* এবং বর্তমানের সারা শরীর নাপাকিতে পরিপূর্ণ। কারণ শরীরের মধ্যে রক্ত, প্রস্রাব ও পায়খানা আছে।
* পেটের নাপাকি তো আরো দুর্গন্ধযুক্ত। সর্বদা এ নিয়েই তো বিচরণ করছি। এর থেকে সামান্য বায়ু বের হলে পার্শ্ববর্তী লোকদের তো কষ্ট ও ঘৃণা হয়ই; নিজেরও কষ্ট ও লজ্জিত হতে হয়।
আল্লাহ তাআলা নিজগুণে এগুলোকে গোপন রেখেছেন যে পেটের ওই নাপাকি দৃষ্টিতেও আসে না এবং সর্বদা প্রকাশও হয় না।
* পেট পূর্ণ হওয়ার পর তা ময়লা আকারে সহজভাবে নির্জন স্থানে বের করার ব্যবস্থা করেছেন। যদি তা বন্ধ হয়ে যেত তাহলে কতই না মুসীবত হতো।
* এমনিভাবে মৃত্যুর পর এ নাপাক শরীরকেও গোসল দিয়ে আতর-খোশবু লাগিয়ে আল্লাহ তাআলা নিজগুণে মাটিতে গোপন করার হুকুম দিয়েছেন।
* অন্যথায় যদিও মৃত শরীর দু-তিন দিন মাটির ওপর থাকত তাহলে দুর্গন্ধে মানুষকে ঘরবাড়ি ও এলাকা ছাড়তে হতো। সকলে পেরেশান হতো।
অতঃপর কবরের মধ্যে এ সুন্দর চেহারা-নাক-কান-চক্ষু-গোস্ত পচেগলে পোকামাকড়ের খাদ্য হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়, দুনিয়াবাসীর জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। এগুলো আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই না।
(২) শাসকবর্গ ও ধনাঢ্য লোকদের সাথে উঠাবসা এবং তাদের সাহচর্য ত্যাগ করা। চাই এতে দ্বীনের দাওয়াত এবং অভাবগ্রস্ত লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি কল্যাণজনক কাজ হাতছাড়া হোক না কেন।
(৩) গরিব লোকদের সাথে থাকা, তাদের দাওয়াত কবুল করা। তাদের কাজকর্ম করে দেওয়া। সাধারণ লোকদের খেদমত করা।
(৪) চাকর, নওকর, সন্তানাদি থাকা সত্ত্বেও ঘরের কাজকর্ম।
যেমন- বাজারসদাই, শাকসবজি, আটা-ময়দা ইত্যাদি নিজেই শক্তি অনুযায়ী বহন করতে চেষ্টা করা। অপারগতা ছাড়া মজদুর তালাশ না করা বরং যে পয়সা মজদুরকে দেওয়া হয়, সেটা গোপনে দান করে দেওয়া।
(৫) সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যে কেউ হোক না কেন প্রথমে নিজে তাকে সালাম দেওয়া। কখনো অন্যের সালামের আশা বা অপেক্ষা না করা। অন্যথায় এটা অহংকারের আলামত।
এ ব্যাপারে বিনয়ী এবং সাধারণ লোকদের খেদমতই বেশি উপকারী। মাশায়েখে কেরামের খেদমত তো গর্ব ও বড়ত্বের জিনিস।
(৬) নিজের ব্যাপারে গীবত, কুৎসা রটনা, অপবাদ ইত্যাদি শুনে প্রতিবাদ ও নিজের সাফাইয়ের ফিকির না করা। বরং নিজের আত্মিক দোষ-ত্রুটিকে সামনে রেখে শুকরিয়া আদায় করা যে, আমার অসংখ্য দোষ-ত্রুটির মধ্য থেকে অনেক অল্পই বর্ণনা করা হযেছে। আর এর মধ্যে আমরাই ফায়দা হয়েছে যে, গোনাহ সমূহের কিছু কাফফারা হয়ে গেছে এবং গীবতকারী তার নেকগিুলো আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। সুতরাং তার ওপর রাগ করা অনর্থক কাজ, কারণ নেকীর হাদিয়া তো আপনজনও দেবে না।
(৭) কখনো যদি গোস্বা প্রকাশ পেয়ে যায় তাহলে ছোটদের থেকেও ক্ষমা চেয়ে নেবে। এ ব্যাপারে লজ্জা-শরমকে প্রশ্রয় দেবে না। কারণ জুলুম হয়ে থাকলে হাশরের ময়দানের আজাব দুনিয়ার সামান্য লজ্জা থেকে অনেক কঠিন হবে।
(৮) কেউ যদি তোমার হক্ব নষ্ট করে অথবা তোমার ওপর বাড়াবাড়ি করে তাহলে নিজ হক্ব উসূল করার বৈধ চেষ্টারে দোষ নেই। তবে প্রতিশোধ দেওয়ার চেষ্টা করবে না।
(৯) সকলের সহীহ ও সঠিক উপদেশ এবং রায় মানার জন্য তৈরি থাকবে। তবে শর্ত হলো, এ নসীহত তবীয়তের খেলাপ হতে পারে। কিন্তু শরীয়তের খেলাপ না হতে হবে। যদি কোনো বিষয় একেবারে বুঝে না আসে তাহলে যোগ্য কারো সাথে মাশওয়ারা করে নেবে।
(১০) যদি সদকা, যাকাত ইত্যাদি গ্রহণের উপযুক্ত হওয়া এবং গ্রহণও করো তাহলে গোপনে নেওয়ার পরিবর্তে প্রকাশ্যে অন্যদের সামনে নেবে। সাধারণ সদকার তুলনায় যাকাত বেশি নেবে। কেননা এতে বিনয় বেশি প্রকাশ পায়। তারপর নিজের প্রয়োজন না হলে তা সদকা করে দেবে। কেননা দান-সদকা কারও কিবিরের এক বড় চিকিৎসা।
(১১) মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করবে এবং যেখানেই সুযোগ হয় পূর্ণ চেষ্টা করে ইহতেমামের সাথে মৃতের দাফন-কাফনের মধ্যে শরীক হবে। বিশেষ করে নিজ হাতে গোসল দেবে, কবরে রাখবে। যদি গোসল দেওয়া অভিজ্ঞতা না থাকে তাহলে কমপক্ষে মৃতের শরীরের পানি ঢেলে দেবে অথবা অন্য কোনো কেদমত আঞ্জাম দেবে।
(১২) নির্জনে উপরোল্লিখিত বিষয়ের মোরাকাবা করবে। সাথে সাথে অহংকারী ও বিনয়ী লোকদের ঘটনাবলিও পড়তে থাকবে। এর জন্য ‘আকাবির কা তাকওয়া’ ‘আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দ’ ইত্যাদি কিতাবসমূহ অনেক উপকারী।
অহংকারের চিকিৎসার ব্যাপারে মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব (রহ.)-এর অমূল্য বাণী। তিনি বলেন, এক হাদীস শরীফে এসেছে-
অর্থাৎ সাদাসিধা খাওয়াদাওয়া করো, মোটা কাপড় পরিধান করো, কখনো কখনো জুতা ছাড়া চলাফেরা করো। এ ছাড়া অহংকারের চিকিৎসা এটাও যে, জামা-পায়জামা সুন্নাত তরীকায় পায়ের গোছার মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিধান করবে। জামাকাপড় তালি লাগানো ছাড়া পরিত্যক্ত করো না। কখনো কখনো সাধারণ খাবার যেমন : সিরকা, নিম্নমানের খেজুর ইত্যাদি খাও। কখনো কখনো সাধারণ বাহনেও যেমন রিকশায আরোহণ করো। এসব আমল অহংকারের চিকিৎসার নিয়্যাতে করো।
(শায়খুল হাদীস কুতবুল আলম হযরত মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)-এর রচিত উ¤মূল আমরায কিতাব অবলম্বনে)
