প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

এগার. বর এলাকার কোন প্রসিদ্ধ মাজার যিয়ারত করে নিয়ে বরযাত্রীদের সাথে পথে মিলিত হয়ে থাকেন। এ প্রথার ব্যাপারে জাহেলদের বিশ্বাস তো শিরক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী কোন লোক যদি এ প্রথা পালন করে তাহলে ভ্রান্তপন্থীদের কাজে সহায়তা ও ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করার অপরাধে পাপী হবে।

বার. কিছু মেহদী কনেকে লাগিয়ে দিয়ে বাকীটুকু অন্যান্যদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়। এ প্রথাও অনাবশ্যককে আবশ্যক করা এবং একে অমান্য করাকে দূষণীয় মনে করা শরীয়তি বিধানের সীমালঙ্ঘন।

তের. ঘরের লোকজন যে যে কাজ করুক তাকেই সে কাজের এনাম দিতে হবে। কেউ চুলা তৈরি করে এসে এনাম চাইলে তাকে একটা পাত্রে গুড়-নারিকেল ইত্যাদি খেতে দেওয়া হয়। এমনিভাবে প্রতিটি ছোট বড় কাজের জন্য জরিমানা দিতে হয়। কাজের মানুষকে দেওয়া তো খারাপ কিছু নয়। তবে এভাবে দেওয়ার কি প্রয়োজন। আসলে সুনামের আকাক্সক্ষাই এ প্রথা পালনে অনুপ্রাণিত করে থাকে। এ ধরনের এনামকে পারিশ্রমিক বলে গণ্য করাও অবান্তর। কেননা, নির্দিষ্ট কাজে পারিশ্রমিক না বলে বরং এনাম বলা যায়। আর এনাম বা দান জোর করে আদায় করা হারাম। যে জিনিস গ্রহণ করা হারাম তা প্রদান করাও হারাম। একে পারিশ্রমিক মনে করলে অনির্দিষ্টতার কারণে হারাম হবে।

চৌদ্দ. বরযাত্রীগণ কনের বাড়িতে পৌঁছলে উভয় পক্ষের সামনে বরী খোলা হয়। বরী প্রদানের মূলে যে অহংকার ক্রিয়া করে তা-ই এখানে এসে আত্মপ্রকাশ করে।

পনের. বরীর জিনিসপত্র কনেপক্ষের কাজের লোকজন এক-একজন এক-একটা করে মাথায় তুলে ভিতরবাড়িতে নিয়ে যায়। এইভাবে রিয়াকে আরো প্রকাশ্যভাবে পালন করা হয়। বরীর সমস্ত জিনিসপত্র একজন একই সাথে বহন করতে পারলেও অনেক লোককে এ কাজে লাগিয়ে এটাই বুঝানো হয় যে, বরপক্ষ অঢেল বরী নিয়ে এসেছেন। এতে বর কনে উভয় পক্ষের সুনাম উদ্দেশ্য থাকে।

ষোল. বরের পেছনে পেছনে বিয়ে বাড়ির অনেক পুরুষ সদস্যও নারী মহলে প্রবেশ করেন। এ দিনে সকল প্রকার পাপ ও লজ্জাহীনতার কাজ করাকে হালাল এমনকি ভদ্রতা মনে করার কারণ খুঁজে পাই না।

সতের. বরের জিনিসপত্রের মধ্য থেকে উপস্থিত সময় ব্যবহার্য কিছু জিনিস রেখে দিয়ে বাকীগুলো বরপক্ষের নিকট ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। যে বস্তু ফেরত আসবেই এমন বস্তু দেওয়ার কি মানে? আসলে লোক দেখানো ও আত্মপ্রশংসার জন্যই এ দান, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অনেক বিয়েতে এমনও হয় যে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কনেপক্ষের অনুরোধ বা বিনা অনুরোধে বরপক্ষ অন্যের অলংকারাদি ধার করে পরে তা আবার আসল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ জাতীয় কার্যকলাপ শরীয়ত ও বিবেক সব কিছুরই পরিপন্থী; অথচ লোকজন এতেই আনন্দ অনুভব করে।

আঠার. অনেক সময় বিয়ের এ সকল প্রথা-রীতি আঞ্জাম দিতে গিয়ে রাতভর সজাগ কাটাতে হয়। রাতের শেষভাগে নিদ্রায় ঢলে পড়ে অনেকেরই নামায কাযা হয়। বদহজমের কারণে অনেকের অবস্থা নাজেহাল হতে দেখা যায়। এ দুর্গতি থেকে আল্লাহ্ সবাইকে রহম করুন।

ঊনিশ. কনে বাড়ির ফটকে ফিতা বেঁধে বরের নিকট থেকে অর্থ আদায় করা এবং বরকে শরবত পরিবেশন করে অর্থ আদায় করা ইত্যাদিকে যদিও অনেকে দান হিসাবে চালিয়ে দিতে চান, কিন্তু আসলে অনিচ্ছা সত্ত্বে এসব অর্থ প্রদান করাকে যাকাতের চেয়েও বড় ফযর কর্তব্য মনে করা হয়। বড়ই তাজ্জব ব্যাপার! কাউকে দান করতে বাধ্য করা কি হারাম নয়? শুধু কি লাঠি-ডা-ার ভয় দেখিয়ে আদায় করাও তো যুলুম। উপরন্তু এসব ব্যাপারে অর্থের দাবীদারগণ যেন অনেক দিন পর অর্থ আত্মসাৎকারী খাতকে হাতে নাতে ধরতে পেরে তার সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও নিজেদের পাওনাটা আদায় করে নিতে চায়। বর বেচারাও বড়ই অপারগ হয়ে লজ্জা-শরমে পড়ে তা দিয়ে দেয়। এ ছাড়াও, বিজাতীয়দের রীতি প্রথা অনুসরণ করা মুসলমানদের পক্ষে মোটেও বৈধ হবে না। অতএব, এ প্রথাগুলি সর্বের পরিহার্য্য।

কুড়ি. বিয়ের অনুষ্ঠানাদিতে যে সকল রীতি-নীতি সচরাচর পালিত হয়ে আসছে তন্মধ্যে একমাত্র শরীয়তসম্মত রীতি হচ্ছে, কাজী সাহেবকে আনিয়ে বিয়ে পড়ানো। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও শরীয়তী বিধি-বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ কাজী সাহেবানদের অভাব নেই। তারা মাঝে মাঝে এমন সব বিয়ে শাদীও পড়িয়ে থাকেন যার অবৈধতা সম্পর্কে খুব কম লোকই অনবহিত। এতে করে বর-কনে সারাজীবন অবৈধ সম্পর্ক রক্ষার পাপ তথা ব্যভিচার করে। অনেক লোভী পেশাদারী মৌলভী অর্থের লোভে পড়ে বিয়ে জায়েয কি নাজায়েয সেদিকে লক্ষ্য না করেই ফরমায়েশী আক্দ পড়িয়ে দেন। বিয়ের শুদ্ধাশুদ্ধ সম্বন্ধে নিজেদের পূর্ণ জ্ঞান না থাকলে ভালো আলেম ব্যক্তিকে দিয়ে বিয়ে পড়ানো উচিত।

একুশ. যিনি বিয়ে পড়ান তাঁকে হাদিয়াস্বরূপ কিছু দান করা হয়। অনেকে এ দানকে অবশ্য আদায়যোগ্য হক্ব মনে করেন, এমন কি যদি কেউ না দেয় অথবা প্রচলিত নির্ধারিত পরিমাণের কম দেয় তাহলে এ নিয়ে তাকে গালমন্দ করা হয় এবং দিতে বাধ্য করা হয়। মাঝে মাঝে ভদ্রতা দেখিয়ে মুখে কিছু বলেন না, তবে মনে মনে অসন্তুষ্টির ভাব দেখান। ফেরাহে মুসলিমীন শরহে মাসায়েলে আরবাঈন কিতাবে বিভিন্ন রেওয়ায়েতের বরাত দিয়ে এ ধরনের আচরণকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। অনেক অঞ্চলে দেখা যায়, বড় সাহেব বিয়ে পড়ানোর জন্য তার প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। প্রতিনিধি হাদিয়াস্বরূপ যা পান, তার বেশার্ধ সাহেব এবং বাকীটুকু প্রতিনিধি ভাগ করে নেন। সাহেবের এ দাবী অযৌক্তিক, প্রতিনিধির প্রাপ্ত হাদিয়ায় অংশ দাবী করা জায়েয হবে না। মনে রাখা উচিত, সন্তুষ্টচিত্তে দান করলে তা গ্রহণ করা জায়েয। আর দান যাকে করা হয় সেই তার অধিকারী; অন্য কেউ নয়। যেমন, প্রতিনিধিকে যে দান করা হয় তা সম্পূর্ণটাই প্রতিনিধির। সাহেব প্রতিনিধিকে নিয়োগ দিয়েছেন বলে এতে ভাগ বসানো ঘুষ গ্রহণ করার নামান্তর। ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই পাপী-হারামকারী।

বাইশ. কনেপক্ষের খাদেম বরের হাত ধুইয়ে দিলে তাকে ধোলাই বাবদ কিছু টাকা দেওয়া হয়। এ এনাম আসলে তো ভদ্রতা ও এহসান। কিন্তু দাতা যদি একে ওয়াজিব কর্তব্য এবং না দেওয়া দূষণীয় মনে করে তাহলে এ দান লওয়া দেওয়া দুটোই নাজায়েয হবে। কেননা আগেই বলেছি, কাউকে দান করতে বাধ্য করা হারাম। একে কাজের পারিশ্রমিকও বলা যায় না। কেননা, লোকটি তো কনেপক্ষের, কাজেই কনেপক্ষের নিকটই সে পারিশ্রমিক দাবী করবে। বরপক্ষের নিকট চাওয়ার কি অর্থ তারা তো মেহমান। তাদের কাছ থেকে চাকর টাকা গ্রহণ করবে, এটা কি ভদ্রতা?

তেইশ. বরের জন্য শোকরানা প্রস্তুত করে পরিবেশন করা হয় এবং প্রত্যেক বরযাত্রীর পাত্রে তা থেকে কিছু দেওয়া হয়। এখানেও একটা অনর্থক রীতিকে আবশ্যক করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শোকরানা প্রস্তুত না করলে অমঙ্গলের আশঙ্কা করা হয়। প্রায় প্রতিটি কুপ্রথা পালনে এ জাতীয় মনোভাব জন্ম নিয়ে থাকে। এ মনোভাব এক ধরনের শিরক। হাদীসে এসেছে, কুলক্ষণ ও অমঙ্গলের কোন ভিত্তি নেই। শরীয়ত যার ভিত্তিকে অস্বীকার করেছে মানুষ তার উপর নির্ভর করে পুল বানিয়ে নিয়েছে। একি শরীয়তের স্পষ্ট বিরোধিতা নয়?

চব্বিশ. খাওয়া-দাওয়া শেষে মেহমানগণ বাড়িতে রওয়ানা হয়ে গেলে পর বরকে যখন শোবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন রাত্রি প্রায় শেষ। বর হিসাবে হলেও একজন আমন্ত্রিত মেহমান হিসাবে অন্ততঃ তাকে এত দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসিয়ে রাখা নিশ্চয়ই ভদ্রতা নয়। মেহমানের সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ শরীয়ত ও বিবেকের নির্দেশ। বরযাত্রীগণ কি মেহমানের পর্যায়ভুক্ত নন?

পঁচিশ. সকালে কনের বাড়িতে বরযাত্রীদের নিয়ে আসার সময় দফ বাজানো হয়। সাধারণ্যে প্রচার করার উদ্দেশ্যে বিয়েতে দফ বাজানো শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয। কিন্তু বর্তমানে একথা নিশ্চিত যে, কেবল শান-শওকত ও অহমিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই দফ বাজানো হয়। ইসলামী বিধানের রীতি হচ্ছে, যখন কোন মুবাহ কার্য অন্য কোন পাপের সহায়ক হয়, তখন সে মুবাহটিও পাপ হয়ে যায়। কাজেই বিয়েতে দফ বাজানোও একটি বর্জনীয় মুবাহ কর্ম। প্রচারের অনেক পন্থা রয়েছে, আর আজকাল তো বিয়ের সকল অনুষ্ঠানাদিতেই অনেক লোকের সমাগম হয়। বিয়ের আগে পরে অনেক দিন পর্যন্ত এলাকার সকলের মুখে এক পর্যালোচনা চলে। দফের সাথে সানাই বাজানো কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়। হাদীসে একে তিরস্কার করা হয়েছে।

ছাব্বিশ. বরকে ঘরে নিয়ে গিয়ে মহিলাগণ জড়ো হয়ে নির্লজ্জ আলাপচারিতায় লিপ্ত হন। তাদের কথাবার্তায় চরম বেহায়াপনা পরিলক্ষিত হয়। এ ধরনের কাজ যে নিতান্ত গোনাহ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

সাতাশ. ভদ্রতাসুলভ আচরণ বড়জোর এতটুকু করা হয় যে, বরের রুমাল চেয়ে নিয়ে সালামতীর টাকা সংগ্রহ করে তাকে দিয়ে দেওয়া হয়। বিয়েতে কয়েক ক্ষেত্রে উপহার ও সালামতীর টাকা প্রদান করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। প্রথম যুগে মনে হয়, কোন দরিদ্র লোকের বিয়ে শাদীতে তার আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক এ ধরনের উপহারাদি প্রদান করার রীতি ছিল। এতে করে অসচ্ছল ব্যক্তির পক্ষে বিয়ের ব্যয়ভার বহন করা তেমন কষ্টকর হতো না এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কারো একজনের উপর বেশি করে দান করার চাপ পড়ত না। দানস্বরূপ প্রদান করলে তার বিনিময় চাওয়া হতো না, তবে দাতার প্রয়োজনের সময় দরিদ্র ব্যক্তির সামর্থ্য থাকলে এহসানের বদলে এহসান করার মানসিকতা নিয়ে তাকে সাহায্য করা হতো। এতে দাতার দানের পরিমাণ কত ছিল সেদিকে লক্ষ্য করা হতো না। আর ঋণ হিসাবে প্রদান করলে তা কিস্তিতে পরিশোধ করে দেওয়া সহজ হতো। সত্যি বলতে কি, সে সময়কার সেই রীতি গরীব জনসাধারণের জন্যে অত্যন্ত ফলদায়ক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ রীতির কোন উপকারিতা তো পরিলক্ষিত হয়ই না বরং অপকারিতাই বেশি। যে উপহার সংগৃহীত হয় তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশই বর বা কনের পক্ষের হাতে পৌঁছায় না। যেখানে সেখানে ব্যয়িত হয়ে যায়। ঋণের টাকা হাতে না পেয়েই বরকে ঋণগ্রস্ত হতে হয়। এই কি সভ্যতার বিচার? এ নিয়ে আবার ঝগড়া-ফ্যাসাদ কত কিছু হয়। বিনা প্রয়োজনে ঋণগ্রস্তই বা হতে যাবে কেন কেউ? বিনা প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করে নাজেহাল হওয়ার কার এত শখ? সে ঋণ আবার সচ্ছলতা এলেই পরিশোধ করা যাবে না, কেবল অন্য অনুষ্ঠানে দান করেই তা পরিশোধ করতে হবে। তখন হাতে না থাকলে অনেক সময় সুদে ঋণ নিয়ে হলেও তা আদায় করতে হয়। যে রেওয়াজ পালন করতে গিয়ে গোনাহর পাহাড় কাঁধে নিতে হয় সে রেওয়াজ কি অবশ্য বর্জনীয় নয় ?

আটাশ. বিয়ের অনুষ্ঠানে গীতানুষ্ঠান করা জায়েয মনে করে অনেকেই গায়িকাদের নিমন্ত্রণ করে এনে গানের আসর করেন। অথচ কোন ধরনের গীত যে জায়েয ছিল আর বর্তমানে যে কোন ধরনের গান চলে তা চিন্তা করা হয় না। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা চলে, এক ব্যক্তি অন্যের রুটি লুট করে এনে মুফতী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, রুটি হালাল না হারাম? মুফতী সাহেবের কাছ থেকে বৈধতার ফতওয়া পেয়ে লোকটি আরো বেশি করে রুটি লুট করতে শুরু করে দেয়। এই ধরনের ফতওয়ায় কোন কাজ হবে না। লুট করে সংগ্রহ করা রুটি হালাল কি না, প্রশ্ন করে দেখুন মুফতী সাহেব কি জনাব দেন। এ উদাহরণ থেকে একথাই বুঝানো উদ্দেশ্য যে, গায়িকাদের আনিয়ে বর্তমানে যে ধরনের গীত গাওয়ানোর রীতি প্রচলিত, তাতে কত যে দূষণীয় ও ক্ষতিকারক দিক রয়েছে সে দিকে লক্ষ্য দেয়া উচিত।

ইমাম আবু হানিফার মাযহাব অনুযায়ী গান যে হারাম একথা কোন আলেমই অস্বীকার করতে পারবেন না। কারো মনে হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে; ঈদের দিনে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দুই বালিকার গান গাওয়া কি এর বৈধতা প্রমাণ করে না? এর উত্তরে বলা যায়, সেই নায়িকাদ্বয় অপ্রাপ্ত বয়স্কা ছিলেন এবং তারা উচ্চেঃস্বরে গান করেন নি। হাদীসে ব্যবহৃত জারিয়াতাইনে মুগ নিয়াতাইনে শব্দ দুটি এই অর্থই প্রমাণ করে। বর্তমানে প্রচলিত গানে গায়র মুহাররম নারীর কণ্ঠ পুরুষের কানে পৌঁছে তার রিপুতে শক্তি যোগায় যা সুস্পষ্ট হারাম। এ ছাড়াও সারারাত ধরে ঢোলক আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দে আশপাশের বিশেষতঃ উপস্থিত লোকজনের ঘুম হয় না, রাতের শেষভাগে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে সকাল পর্যন্ত মরার মতো পড়ে থাকে, এভাবে ফজরের নামায কাযা হয়। গান শুনে রাত জাগা আর নামায কাযা করা দুটোই তো হারাম। এখন চিন্তা করুন, নিজে গান করা, অন্যকে দিয়ে গান করানো এবং গানের পারিশ্রমিক প্রদান করা কতটুকু জায়েয হতে পারে। তাও আবার শুধু বিয়ের বাড়ির লোকজন নয় বরং অনুষ্ঠানে সমবেত সকলেই তা প্রদান করতে হবে, না দিলে গালমন্দ ও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হবে। ঐচ্ছিক দানের ক্ষেত্রে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করাও গানের আসর হারাম হওয়ার আরেকটি কারণ।

ঊনত্রিশ. খাওয়া দাওয়ার শেষে জেহেযের যাবতীয় সামগ্রী সকলের সামনে এনে দেখানো হয়, অলংকারাদির তালিকা পাঠ করে শুনানো হয়, এসব কি রিয়া নয়? তাছাড়া নারীর কাপড়-চোপড় পুরুষদের দেখানো কি নির্লজ্জ কাজ নয় ?

ত্রিশ. কন্যা বিদায়ের কালে পালকী বা গাড়ি যখন বাড়ির দরজার কাছে আসে তখন পিতা ও ভাইকে ডেকে নিয়ে কনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে বলা হয়। এই সময় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক জায়গায় সমবেত হওয়া ন্যাকারজনক কাজ।

একত্রিশ. মেয়েকে পালকীতে তুলে দিয়ে সবাই অবিবেচকসুলভ কান্না জুড়ে দেন। বিদায়বেলা কিছু লোকের মনে আঘাত লাগাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু তাই বলে সবাই মিলে হাউমাউ শুরু করে দেওয়া তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অনেকে তো রুসুম পালনের উদ্দেশ্যে কেঁদে থাকে। মনে করে, না কাঁদলে লোকে ভাববে মেয়েটি তাদের বোঝা ছিল, তাকে বিদায় করে দিয়ে তারা দায়সারা হতে চাচ্ছে। আর এ অযথা কান্না ধোঁকা দেওয়ার শামিল যা শরীয়ত ও বিবেকের মতে পাপ।

বত্রিশ. শ্বশুর বাড়িতে বধূ উঠানোর সময় বরকে দরজার কাছে এনে দাঁড় করানো বাধ্যতামূলক কাজ। এটা এক ধরনের কুসংস্কার যা বিকৃত আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত। এই সময় অনেক পর্দাশীল মহিলাও বেপর্দা হয়ে তামাশা দেখতে উপস্থিত হন।

তেত্রিশ. বধূকে ঘরে তুলে ক্বিবলামুখী অবস্থায় খাটে বসিয়ে রেখে সাতজন অভ্যর্থনাকারিনী একত্রিত হয়ে তার ডান হাতে সামান্য মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য দিয়ে থাকে। অতঃপর তাদেরই একজন তা খেয়ে ফেলে। এই ধরনের কুসংস্কার আসলে বিকৃত আক্বীদা-বিশ্বাসের অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি। সাধারণ মানুষ এ কুপ্রথাকেই শুভাশুভের নিয়ামক মনে করে যা সম্পূর্ণ কেশকী মন-মানসিকতা প্রসূত। কিবলারুখ হওয়ার কাজটা তো মন্দ কিছু নয় বরং ভালো, কিন্তু একে যদি ফরযের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় তাহলে তাতে শরীয়তের নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনের পাপ হবে।

চৌত্রিশ. অতঃপর মণ দুমণ মিষ্টি বিতরণ করার পর নববধূর মুখ দেখানো শুরু হয়। সর্বপ্রথম শ্বাশুড়ী বা পরিবারের সর্বাধিক বয়স্কা মহিলা নববধূর মুখ দেখে কিছু দর্শনী দিয়ে থাকেন। বধূর পাশে উপবিষ্টা মহিলাগণ দর্শনী জমা করে রাখেন। এই মুখদর্শন এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, যাকে তখন মুখ দেখানো হয় না অতঃপর আর কোনদিন তিনি সেই বধূর মুখ দেখতে পারবেন না। এটাও তো শরীয়তী বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শাড়ী বা হাত দিয়ে নববধূর চেহারা ঢেকে রাখাকে এতবড় ফরয কর্তব্য মনে করার কারণ খুঁজতে গিয়ে বুদ্ধি পেরেশান হয়ে যায়। এটা কি ইসলামী পর্দা? নাকি তার বিকৃতি? লজ্জা-শরমের পাহাড় ভেঙ্গে নববধূরা নামায পর্যন্ত পড়তে সাহসী হয় না। নামায আদায় করা তখন তাদের কাছে একটা লজ্জার ব্যাপারে পরিণত হয়। সঙ্গিনীগণ যদি না বলতেই নামাযের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে হয়তো নামায পড়া হতে পারে, নতুবা স্ত্রীজাতির ধর্মে এ অনুমতি নেই যে, নববধূ নিজেই উঠে গিয়ে বা কাউকে বলে কয়ে নামায পড়ে ফেলবে। নতুন বৌ-এর পক্ষে নড়াচড়া করা, কথা বলা, পানাহার, শরীর চুলকানো, হাঁচি দেওয়া, হাই তোলা, ঘুমের ঘোরে শুয়ে পড়া, পেশাব-পায়খানায় গমনের ইচ্ছা প্রকাশ করা ইত্যাদি যে কোন ধরনের সামান্যতম ঊনিশ-বিশ করা স্ত্রীজাতির ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বরং কুফুরের পর্যায়ভুক্ত! অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দিনী এই নির্যাতিতা মহিলা কি যে অপরাধ করেছিল তা আল্লাহই জানেন। মানুষের কাছে মানুষ এই নিরীহ জীবে পরিণত হয় তা কল্পনা করতেও গা শিউরে উঠে। হে মানুষ! একমাত্র সর্বশক্তিমান প্রভুর সামনেই তোর এ ভয়-ভীতি ও নম্রতা সাজে। হে প্রভু! এ অধমকে ভয় ও বিনয়ের সাথে তোমার এবাদত করার শক্তি দাও। শহুরে বিয়েতে বেগানা ভদ্রলোকেরাও নববধূর মুখ দেখে থাকেন। আল্লাহ সবাইকে এ সমস্ত পাপ থেকে রক্ষা করুন।

পঁয়ত্রিশ. মুখ দেখার পর্ব শেষ হলে একটা শিশুকে নববধূ কোলে বসিয়ে তার হাতে মিষ্টি দিয়ে শিশুটিকে আবার উঠিয়ে দেওয়া হয়। টোটকার বুঝি আর অন্ত নেই। এরপরও তো অনেকে আপন শিশুর মুখ দেখেন না, তবুও কি এ মন্দ ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগ করা যায় না।

ছত্রিশ. জেহেয যখন খোলা হয় তখন বধূর সাথে আসা মহিলাকে পরনের কাপড় দান করা হয়। জেহেযের কিছু অংশ বরের বোন-ভাগ্নিরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। কি আশ্চর্য নিয়ম মান ইয়া না মান মায়তেরা মেহমান। কেউ হয়তো দাবী করতে পারেন এ রীতি তো সবাই মানে। আমি বলি, সবাই জানে যে এ রীতির বিরোধীতা করলে কুসংকার শিকার হতে হবে, তাই সবাই মানতে বাধ্য হয়। এমন হলে নিজের ধন ডাকাতি হতে দেখেও যে প্রাণের ভয়ে মুখ খুলল না তাকেও রাজী বলে ধরে নিতে হয় এবং ডাকাতকে মাল দিয়ে দিতে হয় আপোসে।

সাইত্রিশ. বিকালে আছর ও মাগরিবের মধ্য সময় নববধূর চুল খোলা হয়। তখন গায়িকারা অকথ্য ভাষায় গান শুরু করে। গালির চোটে নতুন বৌ তাদেরকে কিছু নজরানা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রেও অনাবশ্যককে আবশ্যক করার এবং গানের পারিশ্রমিক প্রদানের পাপ হয়।

আটত্রিশ. বধূ শ্বশুরালয়ে আসার পরদিন তার বাপের বাড়ি থেকে মিষ্টি নিয়ে গাড়ি আসে। একে চৌথী বলা হয়। এটাও একটা অনাবশ্যক কুপ্রথা ছাড়া কিছুই নয়। তাছাড়া এটা আসলে এতদ্দেশীয় হিন্দুয়ানী রীতি আর বিজাতীয়দের অনুকরণ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সবাই ভালো করে অবহিত।

ঊনচল্লিশ. কনের ভাই-ভাতিজার সাথে অনেক গায়র মুহাররম পুরুষও চৌথী নিয়ে আসেন। মুহাররম কি গায়র মুহাররম সেটা বাছ-বিচার না করেই সবাইকে বধূগৃহে নিয়ে যাওয়া হয়। বধূসাজে সজ্জিত নারীকে গায়র মুহাররম পুরুষের পাশে একলা ঘরে বসতে দেওয়া কতবড় লজ্জার কথা, কত বড় বেইজ্জতি। চৌথী নিয়ে আসা আত্মীয়গণ কনেকে কিছু নগদ অর্থ দিয়ে যান এবং তাকে সামান্য মিষ্টি খাওয়ান। তৈল, আতর, কাজের লোকের খরচ ইত্যাদিসহ চৌথীর জিনিসপত্র শাশুরীর ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব অনর্থক বাজে কাজ ছাড়া কিছুই নয়।

চল্লিশ. এর পরদিন চৌথীওয়ালারা বর-কনেকে নিয়ে ফিরাযাত্রায় কনের বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। চৌথীর অনুরূপ দ্রব্যসামগ্রী তারা সাথে নিয়ে যান। যা নিয়ে গেলেন তাই আবার ফেরত নিয়ে আসার মানেটা কি? নাকি কোন বরকত লাভের আশায় মেয়ের শ্বশুরালয়ে চৌথী প্রেরণ করা হয়েছিল ? বুদ্ধি বিবেচনার মাথা খেয়ে এ ধরনের কুপ্রথা পালনে কি শান্তি? এতো পাপের বোঝা বড় করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।