প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
তুঘলকি কাণ্ড
সাধারণ চিন্তা বহির্ভুত কোনো পরিবর্তন বা অপ্রয়োজনে বিরাট অংকের অর্থ ব্যয়ের কোন কর্মকা- দেখলেই আমরা বলিতুঘলকি কাণ্ড। ইতিহাসে এই অতি মেধাবী শাসক, যার চিন্তাধারা ছিল তার যুগের অগ্রগামী, তার নাম যুক্ত করে কেন আমরা তাকে এ অপবাদ দেই? অপবাদ দেয়ার দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে বলে আমি মনে করি। এর একটি হলো তুঘলক সম্পর্কে আমাদের পড়াশোনা খুবই কম। অন্য কারণ হলো, তুঘলককে আমরা চিনেছি বা জেনেছি যাদের লেখা ইতিহাস পাঠ করে, তারা তুঘলককে কখনো ভালো চোখে দেখতেন না। যেমন তারা বাদশাহ আলমগীরকে কখনো ভালো বলেননি। হ্যাঁ, ব্যতিক্রম ইতিহাসবেত্তা আছেন, কিন্তু আমরা পাঠ করেছি তাদের ইতিহাস, যারা তুঘলককে পাগল বলতেন আর আলমগীরকে বলতেন সাম্প্রদায়িক।
বিশেষ করে মোহাম্মদ বিন তুঘলককে তারা পক্ষপাতিত্বের কারণে মারাত্মকভাবে বিদ্ধ করেছেন। কেউ কেউ তাকে বলেছেন কল্পনা বিলাসী, কেউ কেউ বলেছেন অবাস্তববাদী, পাগল, খামখেয়ালী, উচ্চভিলাষী ইত্যাদি। তাদের পক্ষপাতিত্ব এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে, যা প্রমাণ করে তারাই অন্ধ ও পাগল ছিলেন। এসব অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে মাত্র দু’জন ঐতিহাসিক পাওয়া যায়, যারা মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে তারই প্রশাসনের অধীনে চাকরি করেছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, তন্মধ্যে একজন হলেন পরিব্রাজক ও ঐতিহাসিক ইবনে বতুতা এবং অন্যজন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী। এই দু’জনই মোহাম্মদ বিন তুঘলককে যথাসাধ্য জঘন্যভাবে চিত্রিত করেছেন। পরবর্তী সময়ে যারা ইতিহাস লিখেছেন, তারা এই দু’জনেরই লিখিত রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিহাস লিখেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, পরবর্তী সব ইতিহাসবিদই ছিলেন হিন্দু এবং ইংরেজ। একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ঈশ্বরী প্রসাদ। হিন্দু এবং ইংরেজ ঐতিহাসিক কেন বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া মোহাম্মদ বিন তুঘলককে গালি-গালাজ করে তার এবং তার শাসনামলের ইতিহাস লিখেছেন? তারা কেন এ চিন্তা করে দেখেননি যে, ওরা তো মোহাম্মদ বিন তুঘলকের প্রচুর নিমক খেয়েছেন। এতদসত্ত্বেও কেন তারা নিমকদাতার বিরুদ্ধাচরণ করলেন, তার বিরুদ্ধে লিখলেন ?
প্রথমে ইবনে বতুতার কথা উল্লেখ করা যাক। গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের (১৩২০-২৫) পর মোহাম্মদ বিন তুঘলক (উলুখ খান) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর এই শাসনকালেই অর্থাৎ ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে ইবনে বতুতা ভারবর্ষে আসেন। আফ্রিকার বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন ১৩০৪ সালে। ২১ বছর বয়সে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করে বিশ্ব পরিভ্রমণে বের হন। ৮ বছর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করে ভারতে আসেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক উঁচুস্তরের একজন প-িত ব্যক্তি হওয়ার কারণে ইবনে বতুতাকে এক নজর দেখেই বুঝতে পারেন যে, এই লোকটির মধ্যে রয়েছে গুণের অমূল্য রত্ন ভাণ্ডার। তাই ইবনে বতুতাকে প্রধান কাজীর পদ প্রদান করেন। তিনিও সানন্দে এই পদ গ্রহণ করেন। ৮ বছর তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তারপর তিনি এক ঘটনায় ৮ বছর চাকরির পর সম্রাটের অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হন। শুধু বঞ্চিতই হননি, বন্দিও হন। এ জন্য ইবনে বতুতাই দায়ী, তা তিনি এক পর্যায়ে স্বীকারও করেন এবং অব্যাহতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলক তাকে মুক্তি দেন এবং আবার তাকে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেন। বন্দিদশা থেকে মুক্তির কিছু দিন পর ইবনে বতুতাকে চীন দেশে দূত হিসাবে প্রেরণ করেন। চীন থেকে প্রত্যাবর্তন করে তিনি আসেন প্রথমে চট্টগ্রামে, পরে সিলেটে। সিলেটে এসে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৩৪৯ সালে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিজ দেশেই ১৩৮৭ সালে মতান্তরে ১৩৭৭ সালে ৭৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
কাজীর চাকরি সসম্মানে এবং পূর্ণ সুযোগ-সুবিধাসহ ৮ বছর করার পর হঠাৎ একদিন মোহাম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে বন্দি হন। বন্দি হওয়ার কারণে তিনি বাদশাহর ওপর এতই ক্ষুদ্ধ হন যে, এরপর আর তিনি মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মধ্যে কোন ভাল গুণ দেখতে পাননি। এমনকি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর এবং চীনে দূত হিসাবে গমনের সৌভাগ্য অর্জন করার পরও বাদশাহর প্রতি তার ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেনি। এ জন্য প্রথম ৮ বছরের লিখিত বিবরণ এবং পরবর্তী সময়ে লিখিত বিবরণের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এমনকি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তিনি অনেক ভুল তথ্যও লিপিবদ্ধ করেন। আত্মস্বার্থে আঘাতই তার এ বিরোধিতার প্রধান কারণ, তা অনেক ঐতিহাসিক এ মত ব্যক্ত করেছেন, তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন, তারা ইবনে বতুতার এই ত্রুটি ধরেছেন, এর ওপর ইতিহাস লিখেছেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্র আট বছর পর্যন্ত দেখলেন চমৎকার, সুন্দর, তার মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা পেলেন সুগভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু কাজীর চাকরি যাওয়ার পরই তিনি দেখলেন বিপরীত চরিত্রের তুলঘককে। এ ইবনে বতুতার বিদ্বেষমূলক মনোভঙ্গির পরিচায়ক নয় কি?
এবার আলোচনা করা যাক জিয়াউদ্দিন বারানীর ওপর। বারানীর বাসস্থান ছিল দোয়াব অঞ্চলের বারানে। খোরাসান ও কারচিলের সমরাভিযানে, প্রতীক মুদ্রার বিপুলতায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং প্রচুর অর্থ অপব্যয় হলে মোহাম্মদ বিন তুঘলক দোয়াব অঞ্চলের কর বৃদ্ধি করেন। কর বৃদ্ধির কারণ ছিল বিদ্রোহী হিন্দু ভূস্বামীদের দমন করা।
ঐতিহাসিক বাদায়ুনী বলেন, সামরিক বাহিনী এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে সুসংহত ও পুনর্গঠনের জন্য কর বৃদ্ধি করতে সুলতান বাধ্য হন। জিয়াউদ্দিন বারানী যেহেতু এই এলাকার মানুষ ছিলেন, তাই তার ওপরও বর্ধিত কর আরোপিত হয়। আর এ কারণে ব্যক্তি স্বার্থে আঘাত লাগার ফলে সুলতানের রাজস্বনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। ঐতিহাসিক বারানীর সব রকমের সমালোচনা ব্যক্তিগত আঘাতের প্রতিঘাত ছাড়া আর কিছু নয়। সুলতানের প্রতি জিয়াউদ্দিন বারানীর বিক্ষুদ্ধ হওয়ার কারণ এটাই। সুতরাং বলা যায়, পরবর্তী সময়ে যারা ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকে ইবনে বতুতা এবং জিয়াউদ্দিন বারানীর বিবরণকে নকল বা অনুসরণ করেছেন।
আমাদের দেশের এক শ্রেণীর সেক্যুলার ভাবাপন্ন মন-মানসিকতার মুসলমান ইংরেজ এবং হিন্দু ঐতিহাসিকদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থ পাঠ করে মুহাম্মদ বিন তুঘলককে পাগল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এবং তুঘলক মানেই করেছেন একটা পাগল রাজার নাম, পাগলের নাম, খামখেয়ালী শাসকের নাম। বাস্তবতা বর্জিত যে কোন কর্মকান্ডকে তারা তুঘলকি কান্ড বলে থাকেন। এসব অভিধায় তাকে অভিহিত করার একমাত্র কারণ হচ্ছে, বিদ্বেষপরায়ণ মানুষের লেখা ইতিহাস পাঠ এবং তুঘলক সম্পর্কে অনুসন্ধান করে জানার আগ্রহের অভাব আর নিজেদের পূর্ব পুরুষকে গালি দেয়ার একটা বদঅভ্যাস।
মোহাম্মদ বিন তুঘলককে খামখেয়ালী কল্পনা বিলাসী রাজা বলা হয় যে সব কারণে, তন্মধ্যে একটি ছিল দিল্লি থেকে দাক্ষিণাথ্যের দেবগিরীতে রাজধানী স্থাপন। রাজধানী পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দ্বারা যাদের আঁতে তখন ঘা লাগে, তারাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এটা কোন অবাস্তব পরিকল্পনা ছিল না। তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল বর্তমানের তুলনায় অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। বিশাল সম্রাজ্যের রাজধানী এমন এক জায়গায় স্থানান্তরিক হওয়া উচিত, যেখান থেকে সহজে সাম্রাজ্যের যে কোন স্থানে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। দেবগিরী (নতুন নাম দৌলতবাদ) থেকে সাম্রাজ্যের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দূরত্ব ছিল সাতশ মাইলের মধ্যে। তিনি দৌলতবাদে রাজধানী স্থানান্তরকরণ সিদ্ধান্তের সাথে সাথে দিল্লি থেকে সাতশ’ মাইল দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করেন। পথিমধ্যে পথিকের খাদ্য বাসস্থানের ও নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করেন। যাহোক, তার এই রাজধানী স্থানান্তর নতুন কোন প্রচেষ্টা বা নতুন পরিকল্পনাও ছিল না। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বহু শাসকই নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠাও করেছেন। বর্তমানের আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বহু দেশে রাজধানী তিন চার বার পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। মোহাম্মদ বিন তুঘলক প্রায় সাড়ে ৬শ’ বছর আগে যা চিন্তা করতেন, আমরা ৬শ/সাড়ে ৬শ বছর পর চিন্তা করছি, চিন্তার বাস্তবায়ন করছি। এ জন্য ঐতিহাসিকগণ তাকে বলেছেন, মোহাম্মদ বিন তুঘলক চিন্তা, বুদ্ধি ও পান্ডীত্যের দিক থেকে তার যুগ অপেক্ষা অগ্রবর্তী ছিলেন।
প্রাচীন তাম্র মুদ্রার জন্যও মোহাম্মদ বিন তুঘলককে খেয়ালী ও অবাস্তববাদী বলা হয়। মিঃ থমাস তাকে তংকা নির্মাতাদের রাজা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার প্রবর্তিত মুদ্রা নতুনত্ব এবং গঠন বৈচিত্রের দিক দিয়ে ছিল দৃষ্টান্তস্বরূপ এবং কার্যকারিতার দিক দিয়ে এই মুদ্রার শিল্প সম্মত পরিপূর্ণতা ছিল প্রশংসনীয়। আসল মুদ্রার ও জাল মুদ্রার পার্থক্য করার মতো কোন ব্যবস্থা ছিল না তাম্র মুদ্রায়। ফলে প্রত্যেক হিন্দু গৃহ মুদ্রা তৈরির টাকশালে পরিণত হয়। বলা যায়, সুলতানের সরলতাই চক্রান্তকারীদের কাছে মার খায়। তার তাম্র মুদ্রার প্রচলন কখনো পাগলামি বা খেয়ালিপনা ছিল না।
ড. ঈশ্বরী প্রসাদ লিখেছেন, মুসলিম বিজয়ের সময় থেকে যেসব সুলতান দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাধিক বিদ্বান ও গুণসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন মোহাম্মদ বিন তুঘলক। অন্য এক ঐতিহাসিকের মন্তব্য হচ্ছে এই, মোহাম্মদ বিন তুঘলক তৎকালীন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ প-িত ছিলেন। সর্বশাস্ত্রে সুপ-িত এবং দুর্লভ কতিপয় গুণের অধিকারী তুঘলক। দিল্লীর সিংহাসনে তো দূরের কথা, কোন দেশের ক্ষমতার আসনে সর্বশাস্ত্রে এমন একজন প-িত অধিষ্ঠিত হননি। প্লেটো বা এরিস্টোটলের মতো প-িত বেঁচে থাকলে মোহাম্মদ বিন তুঘলকের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে বিস্ময়াভিভূত হতেন। তিনি ছিলেন সৃষ্টির এক অবিসংবাদিত বিস্ময়। গার্ডনার ব্রাউন, ডক্টর ঈশ্বরী প্রসাদ, আগা মেহেদী হোসেন এ মত সমর্থন করেছেন।
ইবনে বতুতা এবং জিয়াউদ্দিন বারানী তুঘলকের কট্টর বিরোধীতা করা সত্ত্বেও পা-িত্যের স্বীকৃতি উদার কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন। তর্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত ও শরীর বিজ্ঞানে মোহাম্মদ বিন তুঘলক শুধু ভালো জ্ঞান রাখতেন তাই নয়, তিনি এসব প্রত্যেক বিষয়ের বিষয়ে বিশিষজ্ঞ ছিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি বিষয়ের ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী প-িত। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও ছিলেন ঈর্ষণীয় প্রতিভার অধিকারী। প্রায়ই তিনি রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিতেন। তিনি ছিলেন হাফেজে কুরআন। সেকালের শ্রেষ্ঠ লিপিকারের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। লেখক হিসাবে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার সময়ের কোন লেখক কোন বিষয়ের ওপর তাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিযোগিতামূলক লেখার সাহস করতেন না। তিনি ছিলেন সে কালের একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও বাগ্মী। ইবনে বতুতা যদিও মোহাম্মদ বিন তুঘলককে শেষ পর্যায়ের বিবরণে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন, কিন্তু তিনি একথাও লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, তিনি (মোহাম্মদ বিন তুঘলক) নিষ্ঠা সহকারে ধর্মীয় বিধান পালন করতেন, ইবাদত বন্দেগী করতেন, নিয়মিত জামায়াতে নামায পড়তেন, নফল ইবাদতও করতেন। বেনামাজী মুসলমানকে সহ্য করতে পারতেন না। তিনি ছিলেন সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নম্র। নিরপেক্ষ বিচারে তিনি ছিলেন অনন্য বিচারক।
বংশীয় কৌলিন্য ও পদ কোন দোষীকে শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারতো না। কাজীর আদেশে তিনি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে মোটেই ইতস্তত করেননি। সকল মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বাধিক বিচার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি হিন্দুদের ঘৃণ্য সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এ জন্য কুলীন হিন্দুরা তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। অকাতরে তিনি গরীব-দুঃখীকে দান করতে ভালোবাসতেন।
ইবনে বতুতা এবং জিয়াউদ্দিন বারানীও তাকে পাগল বলেননি। মোট কথা, এতো বড় একজন গুণী ব্যক্তির পরিকল্পনা, চিন্তাধারা ও শাসন-প্রণালী যুগের অগ্রবর্তী হওয়ার কারণে যদি তা পাগলামি হয়, তাহলে প্রত্যেক বৈজ্ঞানিক ও প্রতিভাবানই পাগল। যারা মোহাম্মদ বিন তুঘলককে পাগল বলেছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে তার প্রতিভাকে, জ্ঞানকে, দূরদর্শীতাকে বুঝতে পারেননি। মোহাম্মদ বিন তুঘলকের কপাল কিন্তু শাসক তুঘলককে সমর্থন করেনি। তাঁর মুত্তাকী চরিত্র অবশ্যই সম্প্রদায় বিশেষের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল। এ জন্য তাকে নিয়ে পরবর্তীতে যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা হয়েছে পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা তাকে না বুঝেই বলি পাগল। আর তার তুঘলক উপাধিটাকেই জোর করে বানিয়েছি পাগলের সমার্থক।
দুশমনদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে যদি পাগলামি কান্ডকে তুঘলকি কান্ড বলি, তাহলে কি নিজেদের গায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছি না? আসুন, আমরা নিজেদের অতীতকে দুশমনের দেয়া চশমা ছাড়া নিজেদের ঈমান ও বিবেকের চশমা দিয়ে দেখি এবং সত্যকে আবিষ্কার করে গর্ববোধ করি।
