প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

তৃতীয় অনুচ্ছেদ

বাচ্চাদের হাতে খড়ি দানের আনুষ্ঠানিকতায় এক ধরনের কুসংস্কার। এতে নিম্নোক্ত অপকারসমূহ নিহিত:

এক. চার বৎসর চার মাস চার দিন বয়স হলে হাতে খড়ি দানে যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে তা ভিত্তিহীন। মাজমাউল বাহার কিতাবের পরিশিে শায়খ আলী মুত্তাকী তার ফতওয়ায় এই প্রথার ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছেন। জনসাধারণ একে শরয়ী বিধানের মতো অপরিহার্য মনে করে, ফলে আক্বীদাগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এভাবে শরীয়তে নতুন এক বিধান আবিষ্কার করা হয় যার অবৈধতা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

দুই. হাতে খড়ি উপলক্ষে শিরনী বিতরণ না করাকে দূষণীয় ও মানহানিকর ধারণা করা হয়। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে এ শিরনী বিতরণ করা হয় না। কেননা, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের তো আরো অনেক পন্থা আছে, সেগুলো কখনো অবলম্বন করা হয় না। মিসকীন খাওয়ানো, গরীবদের মধ্যে ভাত-কাপড় বিতরণ করা, মসজিদ-মাদ্রাসায় দান-খয়রাত করা, অভাবগ্রস্ত অবস্থায় মুখে শোকরিয়া আদায় ইত্যাদি কোন পন্থায়ই বুঝি মন ভরে না। সারাজীবন এ একই রীতির অনুসরণ কুসংস্কার বৈ নয়। লোকের নিন্দাবাদের ভয়ে করলে তাতে লোক দেখানো ও অহংকার হয়, সওয়াব হয় না।

তিন. কোন কোন ঐশ্বর্যশালী লোক রূপার দোয়াত কলম দিয়ে রূপার শ্লেটে লিখিয়ে বাচ্চার হাতে খড়ি দেন। নিজে রূপা ব্যবহার করা বা অপরকে দিয়ে ব্যবহার করানো সবই হারাম।

চার. কোন কোন পরিবারে এ সময় বাচ্চাকে রেশম বা জরি নির্মিত অথবা কুসুম বা জাফরানী রঙের কাপড় পরানো হয়, এটাও একটা স্বতন্ত্র গোনাহ।

পাঁচ. এ সময় গরীব-মিসকীনদের খাওয়ানোকে ফরযের চেয়েও অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। নিজের খাদ্য থাকুক আর নাই থাকুক তাদেরটা দিয়ে দিতে হবে। জোর করে কারো সম্পদ গ্রহণ করা বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোন কিছু দান করার অপকারিতা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

মাজমাউল বাহার, শরহে শিরআতে ইসলাম ও ইবনে সুন্নী কিতাবে বলা হয়েছে, বাচ্চা কথা বলতে শুরু করলে প্রথমেই তাকে কলেমা শিখানো উচিত। শরহে শিরআতে ইসলামে বাচ্চাদেরকে সূরা মুমিনুন এর আয়াত ১৬-১৮ পর্যন্ত অতঃপর
সূরা হাশরের ২২-২৪ আয়াত পর্যন্ত শিক্ষাদানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অপর এক রেওয়ায়েত মোতাবেক
শিক্ষাদান করতে বলা হয়েছে। ইবনে সুন্নী (রা.) হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রীতিও এটাই ছিল। কোন নির্ভরযোগ্য বুযুর্গের নিকট বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে বিসমিল্লাহ পড়ানো, এই নিয়ামতের শোকরিয়া স্বরূপ খুশী হয়ে গোপনে কিছু দান-খয়রাত করা ইত্যাদি ভালো কাজ। এছাড়া অন্যান্য যাবতীয় কুসংস্কার পরিহার্য।
** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** ** **

খৎনা সম্পর্কিত যেসব রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে সেগুলিও কুসংস্কার।

এক. এ অনুষ্ঠানের যোগদান করার জন্য চিঠি বা লোক মারফত খবর দিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জড়ো করা হয় যা সুস্পভাবে সুন্নাতের পরিপন্থী কাজ। মুসনাদে আহমদে হযরত হাসান (রা.)-কে খৎনার অনুষ্ঠানে যোগদান করতে আমন্ত্রণ করা হলে তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবৎকালেও এ ধরনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতাম। এ হাদীস থেকে একথাই প্রমাণিত হয়, যে কাজের প্রচার শরীয়তের দৃষ্টি আবশ্যক নয় সে কাজের জন্য লোকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জড়ো করা সুন্নতের খেলাফ।

দুই. কোন কোন ক্ষেত্রে বালক বয়ঃপ্রাপ্তির নিকটবর্তী হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় একমাত্র খৎনাকারী ডাক্তার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে তার গোপ্তাঙ্গ দেখা হারাম। অথচ সবাই তার দিকে চেয়ে থাকে গুনাহর প্রতি কোন লক্ষ্য থাকে না। উপস্থিত সকলের পাপের জন্য আমন্ত্রণকারীকেই দায়ী হতে হবে।

তিন. এ অনুষ্ঠানেও উপহার দানের হিড়িক পড়ে যার অপকারিতা ইতোপূর্বে বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়েছে।

চার. বালকের নানাবাড়ির পক্ষ থেকে এ সময় কিছু অর্থ-কড়ি দেওয়ার রীতি সাধারণ্যে ভাত বলে পরিচিত। ভারত উপমহাদেশীয় কাফেররা কন্যা সন্তানকে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত রাখে এরই দেখাদেখি এতদ্দেশীয় অজ্ঞ মুসলমানগণও এ রীতিকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর যদি ধরে নেওয়া হয়, এ রীতি হিন্দুদের অনুসরণ নয় বরং মুসলমানগণ একে আবিষ্কার করেছে, তথাপিও তা অশুভই থাকবে। কোন হকদারকে আল্লাহর-রসূলের নির্ধারিত হক প্রদান না করে তার অনুমতি ব্যতিরেকে সে সম্পত্তি ভোগ করা বিবেক ও শরীয়ত উভয় দৃষ্টিতে অন্যায়। আসল ব্যাপার হচ্ছে, কন্যা সন্তানদেরকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে যৎ-সামান্য দানের মাধ্যমে সেই ঋণ পরিশোধের দ্বারা কন্যাদের শিশুসুলভ সান্তনা প্রদানের চেষ্টা করা হয়। এমনিভাবে যেন কন্যাদের প্রাপ্য আদায় হয়ে যায়। এ কথা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না যে, এভাবে অনুষ্ঠানে দান করে কারো হক আদায় হয় না। কেননা, কারো হক আদায় করার শরীয়তসম্মত দুটি পন্থা রয়েছে, এক. মূল সম্পত্তি প্রদান করে, দুই. মূল সম্পত্তির বিনিময় প্রদান করে। এক্ষেত্রে দানকে মূল সম্পত্তি তো বলা যাবেই না, সম্পত্তির বিনিময়ও বলা যায় না। কারণ, ফেকাহর কিতাব অনুযায়ী কোন কিছুকে বিনিময় হিসাবে গণ্য করার জন্য যে সকল শর্তাবলী বর্তমান থাকা আবশ্যক সেগুলির অবর্তমানে তো হক আদায় হবে না। এক্ষেত্রে উভয় পন্থাই যখন পরিত্যক্ত হলো,তখন অপরের হক আদায় হবে কিভাবে ?

উদাহরণত কোন ব্যক্তির যদি কারো কাছে টাকা পাওনা থাকে এবং ঐ দেনাদার যদি পাওনাদারকে কিছু টাকার শিরনী খাওয়ায়, তাহলে শিরনীর বদলে পাওনাদারের টাকা পরিশোধ হয়ে যাবে এমন কথা কেউ বলবে না। বরং পাওনাদারের সমুদয় প্রাপ্যই যে অনাদায়ী থেকে গেল তা সকলেই স্বীকার করবেন। এ আলোচনা থেকে আশা করি পাঠক বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, ভাত মূল সম্পদও নয় আর না এতে সম্পদের বিনিময় হওয়ার শর্তাবলী রয়েছে, বরং এটা একটা মন বুঝ। মোদ্দাকথা হচ্ছে, এ রীতি হয়তোবা কাফেরদের অনুসরণে সৃষ্টি অথবা সামাজিক অনাচার থেকে উদ্ভূত-আর উভয় ক্ষেত্রে এ রীতির নিষিদ্ধতা প্রকাশ্য। সুদে অথবা সম্পত্তি বন্ধক রেখে হলেও টাকা জোগাড় করে এ সময় দিতেই হবে। সমাজের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গ এভাবে গরীব জোতদারদের সহায় সম্পত্তি দখলের সুযোগ পায়।

মোটকথা, এ সময় উপহার প্রদানকে এতই গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয় যে, সুদে ঋণ গ্রহণেও দ্বিধা হয় না। এ ধরনের একটা অপ্রয়োজনীয় বরং গর্হিত কাজকে ফরয-ওয়াজিব থেকে অধিক আড়ম্বরের সাথে পালন করা কি শরীয়তি বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন নয় ? চতুর্থ অপকারিতা হচ্ছে, এ প্রথা পালনেও সুনাম অর্জন ও অহম প্রকাশের একটা দু প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যাকে ইতোপূর্বেই হারাম বলা হয়েছে। কেউ হয়তো বলতে পারেন, ছোটদের স্নেহ-প্রীতির সত্যিই যদি ইচ্ছা হয়, তাহলে এসব আনুানিক প্রীতি দেখানো ছেড়ে বরং তারা যখন অভাবে পড়ে, তাদের যখন প্রয়োজন হয়, তখন তাদের খোঁজ-খবর নিতে চেষ্টা করুন। অভাবের সময় তো কাউকে সহানুভূতি প্রকাশ করতে দেখা যায় না। শুধু শুধু কোন কাজ করলে নাম হবে, লোকে ভালো বলবে, সমাজে সম্মান বৃদ্ধি পাবে সে ধান্ধায়ই ঘুরতে দেখা যায় সবাইকে।

পাঁচ. কোন কোন এলাকায় খৎনা-অনুষ্ঠানে বা খৎনাকৃত বালক আরোগ্য লাভের পর প্রথম গোসল করার দিন নাচ-গানের আয়োজন করা হয়। এ সবের অপকারিতার বর্ণনা আগেও এসেছে, পরবর্তীতে আরো করা হবে ইনশাআল্লাহ। এ সকল কুপ্রথা ও পাপকর্মকে পরিত্যাগ করতে হবে। বাচ্চা যখন সহ্য করতে সক্ষম হবে তখনই চুপে চুপে ডাক্তার ডেকে খৎনা করিয়ে নেবে। ভালো হয়ে গেলে গোসল করিয়ে দেবে। এ সময় দু-চারজন বন্ধু-বান্ধব বা গরীব-মিসকীনকে খাওয়ানো যেতে পারে তবে অভিভাবকের সামর্থ্য অবশ্যই থাকতে হবে এবং প্রথার অনুসরণ, প্রশংসিত হবার আকাংখা বা নিন্দনীয় হওয়ার আশঙ্কা ইত্যাদি মন্দ ইচ্ছাসমূহ অন্তর থেকে ধুয়ে মুছে একনিভাবে আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যেই তা করতে হবে।