প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ঈদ আরবী শব্দ। ঈদ অর্থ খুশি, আনন্দ, উৎসব, Festivel ইত্যাদি। আর ইসলামী পরিভাষায় ও শরিয়ত মতে ঈদ-উল-ফিতর Eid al- Fitra অর্থ: রোজা ভাঙ্গার উৎসব। Fest of Breaking the Fast. ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমানদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে। (১) ঈদ-উল-ফিতর এবং (২) ঈদ-উল-আজহা। প্রতি আরবী দশম মাসের পহেলা শাওয়াল পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর এবং দ্বাদশতম মাসের ১০ই জিলহজ্জ তারিখে পবিত্র ঈদ উল আজহা। শরীয়তের পরিভাষায় ঈদ দিবসকে বলা হয় পুরস্কার দিবস। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক নিজেই ঘোষণা করেছেনঃ সিয়াম (রোজা) আমারই জন্য, আমিই নিজেই এর পুরস্কার দিব। (হাদিসে কুদসী)
ঈদের চাঁদ দেখা প্রসঙ্গে
রোজা, শবেক্বদর, ঈদ উল ফিতর, ঈদ উল আজহা, হজ্ব, কুরবাণী, আশুরা ইত্যাদি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমলের দিনক্ষণ আরবী মাসের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সুতরাং, আরবী মাসের হিসাব রাখা এবং সেই উদ্দেশ্যে চাঁদ দেখা মুসলমানদের ইসলামী জিন্দেগীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। হিজরী বর্ষপঞ্জী অনুসারে রমজান মাসের ২৯ কিংবা ৩০ তারিখ শেষে সন্ধ্যায় বিশ্বের যেকোন দিক-প্রান্ত থেকে (বাংলাদেশে পশ্চিম দিগন্তে) উদিত শাওয়াল মাসে স্পষ্ট বা ক্ষীণ শাওয়ালের যে বাঁকা চাঁদ (ঈৎবংবহঃ) দেখা যায় তাকে সাধারণত: আমরা “ঈদের চাঁদ” এবং যে রাতে এই চাঁদ উদিত হয় সে রাতকে আমরা চাঁন রাত বলে থাকি। উল্লেখ্য, সৌদী আরব, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ মুসলিম দেশে হেলাল কমিটি বা জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ইত্যাদি নামে সরকারীভাবে চাঁদ দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে এই কমিটি সরাসরি পরিচালিত হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম, ঢাকায় অবস্থিত ধর্মমন্ত্রণালয়ের অধিদপ্তর ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মাধ্যমে। হেলাল কমিটি বাংলাদেশের জেলায় জেলায় প্রশাসনের মাধ্যমে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে নিবিড়ভাবে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে চাঁদ দেখা সংক্রান্ত প্রাপ্ত তথ্যসমূহের উপর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে একাধিক সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি বছরে অন্তত ১২ বার চাঁদ পর্যালোচনা সভা করে থাকে। এই কমিটি চাঁদ দেখা সম্বন্ধে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবাদির দিন তারিখ ভিত্তিতে সরকারী ছুটি নির্ধারণ করে থাকে।
ঈদের ইসলামী ইতিহাস
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতৃভূমি মাক্কাতুল মুয়াজ্জেমা ছেড়ে ইয়াসরীবে (বর্তমান মদিনাতুল মুনওয়ারা) এসে দেখলেন নতুন পরিবেশে নতুন ঈদ উৎসব, নতুন কৃষ্টি-সংস্কৃতি। মদীনাবাসীরা তখনও ২টি ঈদ পালন করতো তবে ঈদের ছিল ভিন্ন রীতি ও ভিন্ন আমেজ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমাদের এই ঈদ দুটি কেমন? মদীনাবাসী জানালো: আমরা জাহেলী জীবনে এ দুটি দিন খেল্-তামাশা ও আনন্দ-উৎসব করতাম। শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ আল্লাহ তাআলা সেই দুটি দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন তোমাদের জন্য দান করেছেন। একটি হলো ঈদুল ফিতরের দিন এবং অন্যটি ঈদুল আযহার দিন। (আল হাদিস- আবু দাউদ)
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পালনীয় সুন্নাত
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শবে কদরে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম ফেরেশতাদের একটি জামাতের সহিত অবতরণ করেন। যে ব্যক্তি দাঁড়াইয়া বা বসিয়া আল্লাহর যিকির করিতে থাকে বা এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকে, তাহার জন্য রহমতের দোয়া করেন। অতঃপর যখন ঈদুল ফিতরের দিন হয় তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সামনে বান্দাদের এবাদত-বন্দেগী লইয়া গর্ব করেন। কেননা, ফেরেশতারা মানুষকে দোষারোপ করিয়াছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞাসা করেন, হে ফেরেশতারা! যে মজদুর দায়িত্ব পুরাপুরি আদায় করিয়া দেয় তাহার বদলা কি হইতে পারে? ফেরেশতারা আরজ করেন, হে আমাদের রব! তাহার বদলা এই যে, তাহাকে পুরা পারিশ্রমিক দেওয়া হউক। অত:পর আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, হে ফেরেশতারা, আমার বান্দা ও বান্দীগণ আমার দেওয়া ফরয হুকুমকে পরিপূর্ণরূপে পালন করিয়াছে, এখন উচ্চস্বরে দোয়া করিতে করিতে ঈদগাদের দিকে যাইতেছে। আমার ইযযতের কসম, আমার প্রতাপের কসম, আমার বখশিশের কসম, আমার সুমহান শাসনের কসম, আমার সুউচ্চ মর্যাদার কসম, আমি তাহাদের দোয়া অবশ্যই কবুল করিব। তারপর বান্দাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলেন, যাও আমি তোমাদের গোনাহসমূহ মাফ করিয়া এবং তোমাদের গোনাহগুলিকে নেকীর দ্বারা বদলাইয়া দিলাম। অতঃপর তাহারা ঈদগাহ হইতে নিস্পাপ হইয়া ফিরিয়া আসে। (মিশকাত : বায়হাকী; শুয়াব, ফাযায়েল রমযান, প্রথম সংস্কারণ; দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ,পৃঃ ৬৪-৬৫)
পবিত্র ঈদুল ফিতরের পালনীয় সুন্নাত
১. নিজ নিজ সামর্থ্য- সাধ্য মতে ঈদের সাজ-পোশাকের ব্যবস্থা।
২. আতর- সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৩. খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা।
৪. সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া।
৫. মিসওয়াস করা।
৬. নতুন বা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা।
৭. ফজরের নামাযের পর ঈদের নামাযের জন্য গোসল করা।
ঈদগাহের সুন্নাত
১. ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা।
২. ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু মিষ্টি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া।
৩. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া।
৪. সম্ভব হলে ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে ফিরে আসা।
৫. ঈদগাহে ঈদের নামায আদায় করা।
৬. ঈদগাহে যাওয়ার সময় নিম্নোক্ত তাববির বলা সুন্নাত।
আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা-ইল্লালাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
ঈদুল ফিতরের সালাতের নিয়মাবলী
১. ঈদুল ফিতরের সালাতের জন্য আযান ও ইকামত দিতে হয় না।
২. ঈদুল ফিতরের সালাত ২ রাকাত।
৩. এই নামায ওয়াজিব।
ঈদের নামাজ
উভয় ঈদের সূচনা হয় ২ রাকায়াত ওয়াজিব ঈদের স্বলাত বা নামাজ আদায়ের মাধ্যমে। এই নামাজ আদায়ের সর্বোত্তম স্থান হলো ঈদগাহ ময়দান। এই নামাজের ওয়াক্ত ঈদের দিনের ফজর নামাজ শেষে সূর্যোদয়ের পর হতে ইশরাক/দোহা বা চাশত নামাজের শেষ সময় কাল পর্যন্ত।
পবিত্র ঈদের কতিপয় আনুষ্ঠানিকতা
ইমাম সাহেব জনার্কীণ ঈদগাহ মাঠে কিছু ওয়াজ নসিহত করে ২ রাকায়াত সালাতুল ঈদুল ফিতর/ আজহার নামাজ পড়িয়া অতঃপর খুতবা পাঠ করবেন। নামাজ ও খুতবা শেষে মুসল্লিরা ঈদগাহ হতে ফেরার সুন্নাত পদ্ধতি হচ্ছেঃ যে পথে ঈদগাহে আসা হলো তার বিকল্প পথে ফিরে আসা।
ঈদ সম্ভাষণঃ তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা
সাধারণভাবে নিত্যদিন একজন মুসলামান অপর মুসলমানের সাথে দেখামাত্র শরীয়ত সম্মত যে সম্ভাষণটি দেয়া সুন্নাত তা হচ্ছে সরাসরি সাক্ষাত আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ বলা। আমাদের বাংলাদেশে সাধারণত ঈদের দিনে একে অন্যকে ঈদ সম্ভাষণের সহীহ ইসলামী ত্বরিক্বাহটি হচ্ছে নিম্নরূপঃ
হযরত জুবাইর ইবনুল নুফাইর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীগণ ঈদের দিনে একে অপরকে বলতেন তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের আমল কবুল করুন। (ইবনু হাজার আসকালীন, ফাতাহুল বারী ২/৪৪৬, নেদায়ে ইসলামঃ রমজান- শাওয়াল ১৪৩১ হিজরী বর্ষ ৭০, সংখ্যা-০৩, পৃঃ ০১)
ফিতরা ঈদুল ফিতরের ধর্মীয় উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ফিতরা আদায় করা। স্থানীয় বাজার দর অনুসারে শরীয়ত নির্ধারিত সের/কেজি যব, কিসমিস, আটা ইত্যাদি বালেগ/ নাবালেগ নির্বিশেষে সকল সাহেবে নিবাস এর অধিকারীদের জন্য আদায় করা ওয়াজিব। আমাদের দেশে সাধারণত ফিতরার পাশপাশি যাকাতও পবিত্র রমজান মাসে আদায় করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, যে সব সাহেবে নিসাবের সম্পদ বিগত বছরের রমজান মাসে অর্জিত হয়েছে এবছরের রমজান মাসে কার্যত তাঁদের যাকাত আদায়ের মাস গণ্য। অবশ্য এর আগে ওয়াজিব হলেও রমজান মাসে আদায় করা যাবে।
ঈদুল ফিতরের প্রধান শরীয়তী কর্তব্য
১. ঈদুল ফিতরের নামায আদায়।
২. ফিতরা আদায়
৩. ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম।
ঈদ কার জন্য ?
ঈদ কার জন্য? রোজাদারের জন্য। যে রোজা রাখলো না তার জন্য ঈদ নয়।” (নায়েবে মুজাদ্দেদ হযরত মাওলানা আবুল আনসার মুহাম্মদ আবদুল কাহহার সিদ্দকী আল কুরাইশী রাহেমোহুমুল্লাহ)। বাস্তবে কিন্তু তার উলটো। চাই রোজা রাখি বা নাইবা রাখি ঈদ যেন সবার এই চিন্তাধারা আমাদেরকে আজ ভীষণভাবে পেয়ে বসেছে। সিয়াম বা রোজা আসে মানুষকে ১১ মাস সংযমের সাথে জীবন যাপনের জন্য। যত সংযম ধৈর্য্য যেন রোজার ২৯/৩০ দিনের জন্য। রোজা শেষ, সংযম ধৈর্য্যও যেন শেষ। ঈদের চাঁদ উঠামানে যেন ধৈর্য্যরে বাঁধ ভাঙ্গা। যত সব অধৈর্য্যরে কাজকেই ঈদ উদযাপনের ঐতিহ্য বানানো হয়েছে। চাঁন রাত থেকেই শুরু হয় অশ্লীন গাবাদ্যের যতসব মহড়া। ঈদের মাসে সাত সকালে হাজির হন এমন জনেরাও যারা সারা রোজার মাসে বেপেরোয়াভাবে খেয়ে দেয়ে কাটিয়ে দেয়। রাতে যোগ দেয় যতসব যাত্রা থিয়েটারর মেলায়। প্রতিবছর ঈদ আসে ঈদ যায়। প্রশ্ন থেকে যায়: ঈদ কার জন্য? রোজা যার ঈদ তার” এই অনুভূতিটুকু যেন আল্লাহপাক আমাদেরকে দান করুন। (ওয়ামা তৌফিকী ইল্লাবিল্লাহ)
ঈদ উৎসব
ঈদের ধর্মীয় দায়িত্ব সালাতুল ঈদ বা ঈদের নামাজ আদায়, মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ, অনাদায়ী ফিতরা আদায় করে দেয়া। যে কোনো হালাল মিষ্টি বিশেষ করে খোরমা খেজুর খাওয়া সুন্নাত। ঈদের পরিস্কার জামা কাপড় পড়া, আতর, সুরমা দেয়া সুন্নাত। এর অতিরিক্ত কিছু আচার অনুানাদি শরীয়তের গন্ডির ভিতরে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্য, রীতি নীতি অনুসারে করা হয়ে থাকে। যেমন বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরের দিন সেমাই, হালুয়া, পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানী ইত্যাদির প্রচলন আছে। নিকতাত্মীয় বন্ধু বান্ধবের কাছে বেড়াতে যাওয়া বা বেড়াতে আসা ঈদের একটি অনন্য ঐতিহ্য। এ কারণে ঈদের আগে স্থল, নৌ ও বিমান পথে স্বাভাবিকভাবে যাত্রী সাধারণের ভিড় থাকে। ঈদ উল ফিতর ও আযহা উভয় ঈদের সরকারী/ বেসরকারী ছুটির ব্যবস্থা থাকে।
বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
ঈদে রেডিও টিভিতে বিশেষ ধর্মীয় অনুান এবং পত্র পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ মুসলিম বিশ্বে অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কবিরা কবিতায়, লেখকরা রচনায় ফুটিয়ে তোলেন শিশু-কিশোরদের জন্য ঈদের কত নানান আনন্দ- খুশির আবেগ অনুভূতি।
এক ঈদে মদিনার ঈদগাতে
সে অনেক দিন আগের কথা। মদিনায় ঈদের দিন। ঘরে ঘরে আনন্দ, পথে পথে ছেলেমেয়েদের কলবরব। ঈদগাহের এক কোণে বসে কাঁদছিল এক অনাথ অবুঝ শিশু। তার কান্না শুনে শিশুটির কাছে এগিয়ে গেলেন এক মহান জ্যেতির্ময় পুরুষ শিশুটিকে গায়ে বুলিয়ে দিলেন স্নেহমাখা পবিত্র হাতখানা এবং জিজ্ঞেস করলেন: কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন? কান্না কান্না কণ্ঠে একে একে সব খুলে বলে অনাথ শিশুটি। শিশুটিকে সান্তনা দিয়ে বলেন: আমিও ছোট বেলায় মাকে হারিয়েছি, বাবাকে তো দেখিইনি। অত:পর এতীম শিশুটিকে নিয়ে তিনি বাড়ি রওয়ানা দিলেন। শিশুটিকে সুন্দর করে গোসল করিয়ে, জামা কাপড় পড়িয়ে খাওয়ানো হলো। এভাবে শিশুটি সেদিন পেল ঈদের সত্যিকার অনাবিল জান্নাতি খুশি- আনন্দ। ঈদগাহে কান্নারত এতীম শিশুকে যে এতীম মহাপুরুষ সত্যিকার ঈদের আনন্দ আনন্দিত করেছিলেন তিনি কি জানো? তিনি আর কেহ নন, আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় নবী ও রসূল, আশরাফুল আম্বিয়া সাইয়্যেদুল মুরসালিন, আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যাঁকে একদিন স্বজনহারা অবস্থায় আজকের এই মদিনাতুল মুনওয়ারায় অন্তরাত্মা দিয়ে এই বলে বরণ করে নিয়েছিলেন এই
মদিনারই শিশু সমাজ
তালায়াল বাদরু আলাইনা মিন সানিয়াতিল উদদাইয়া ওয়াযাবাশ শুকরু আলাইনা মাদাআ লিল্লাহ দাঈ।
অবিভক্ত ভারতের মুসলিম উম্মাহের একটি স্মরণীয় ঈদুল ফিতরের কথা
১৯৪১ সালের ঈদুল ফিতরের দিনটি ছিল অবিভক্ত ভারতের মুসলিম উম্মাহের এক স্মরণীয় ঘটনা। সাধারণত অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কেবল শারদীয় দূর্গোৎসব, দোলোৎসব উপলক্ষে থাকতো বিশেষ বিশেষ ভজন, শ্যাম্য সঙ্গীত, কীর্তন ইত্যাদি অনুানমালা বেতারের শুনতে, শুনতে মুসলমান শ্রোতারা অভ্যস্ত হয়ে যায়। এমনি এক সাংস্কৃতিক পরিবেশে বর্ষ পরিক্রমায় ১৯৪১ সালের ২৩ শে অক্টোবর অবিভক্ত ভারবতর্ষে ফিরে আসে প্রতি বছরের ন্যায় পবিত্র ঈদুল ফিতর। এদিন অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে প্রচারিত হচ্ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী অনুানমালা। প্রথমে রেডিওতে শোনা যায়ঃ
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার
আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু
আশহাুদ আননা মুহাম্মাদার রসূ-লুল্লাহু………..আজান ধ্বনী।
এর পর সমুধুর কণ্ঠে ভেঁসে এলো তেলাওয়াত-ই-কুরআন। চমকে উঠলো বাংলার মুসলমান। ভাবলেন, কে তিনি? জানাচ্ছেন জান্নাতের আহবান? এতদিন বাংলা সাহিত্যের বাঘা বাঘা লেখক/ লেখিকারা তো শুনিয়েছেন দূর্গোৎসব, কালী আর শিবলিঙ্গের মহাত্ম্য। বাজিয়েছেন দূর্গোৎসবের ঢাকের বাদ্য-বাজনা। কিন্তু আজ অল ইন্ডিয়া রেডিও তে একি শোনা গেল! একি গায়েবী কোন আওয়াজ? না তা নয়। আল্লাহু আকবার ও সমুধুর কণ্ঠে তেলাওয়াত ই কুরআন শোনাচ্ছিলেন তিনি আর কেহ নন ইসলামী পুনজাগরণবাদী আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। উল্লেখ্য, এক দশক পূর্বে ১৯৩১ সালে উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদের কণ্ঠে এবং হিজ মাষ্টার্স ভয়েসে রেকর্ডকৃত নজরুল ইসলামের সর্বপ্রথম জনপ্রিয় ইসলামী গানটি ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর কেন্দ্রিক নিন্মোক্ত ঐতিহাসিক গানটিঃ
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানে তাকিদ
তোর সোনা দানা বালা খানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত মুর্দা মুসলিমের এই ভাঙ্গাইতে নিদ।”
কবির আরেকটি গান নিম্নরূপ :
নাই হলো মা জেওর- লেবাস এই ঈদে আমার
আল্লাহ আমার মাথার মুকুট রসূল গলার হার।
কবি নজরুলের ঈদের কবিতা
১৯৪১ সালে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক আজাদ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় আজাদ শীর্ষক কবিতায় নজরুলের প্রাতঃস্মরণীয় কবিতাঃ
(১) আজাদ আত্মা, আজাদ আত্মা, সাড়া দাও, সাড়া দাও সাড়া
এই গোলামির জিনজির ধরে ভীম বেড়ে দাও নাড়া
ঘরে ঘরে তব লাঞ্চিতা মাতা ভগ্নিরা চেয়ে আছে,
ওদের লজ্জা বারণ শক্তি আছে তোমাদেরই কাছে।
আজ মুখ ফুটে, দল বেঁধে চল, চল ধনীদের কাছে
ওদের বিত্তে এই দরিদ্র দীনের হিস্যা আছে।
ক্ষুধার অন্নে নাই অধিকার সঞ্চিত যার রয়
সেই সম্পদে ক্ষুধিতের অধিকার আছে নিশ্চয়।
মানুষের দিতে তাহার ন্যায্য প্রাপ্য ও অধিকার।
ইসলাম এসেছিল দুনিয়ার……………………..
(২) ভেবো না ভিক্ষা চাহি, নহে শিক্ষা ও আল্লাহর,
মেরা প্রতিা করিতে এসেছি আল্লাহর অধিকার।
বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি আয়োজিত ঈদপ্রীতি সম্মেলনে জাগরণের কবি নজরুলের ঈদ অভিভাষণঃ
সম্মেলনে নজরুল ইসলাম বলেনঃ
ঈদের উৎসব আনন্দের উৎসব, ত্যাগের উৎসব। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর নামে সকল ঐশ্বর্য, সকল সম্পদ কোরবানী করতে হবে। সকল ঐশ্বর্য, সকল বিভূতি আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দিতে হবে। ধনীর দৌলতে, জ্ঞানীর জ্ঞান ভান্ডারে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। এই নীতি স্বীকার করেই ইসলাম জগতের সর্বশ্রে ধর্ম সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।
এলো খুশির চাঁদ
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে
এলো খুশীর চাঁদ,
সেই খুশীতে মুমিন-মুসলীম
কাটে সারা রাত।
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে……
খুশী, খুশী সবাই খুশী
খুঁজে পেয়ে ঈদের চাঁদ,
সেই খুশীর আবেগ বানে,
ভেঙ্গে পড়ে দুঃখের বাঁধ।
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে…….
খুশী, খুশী সবাই খুশী।
খুশী সারা জাহান,
আমির খুশী, ফকির খুশী,
খুশী সবার মন-প্রাণ।
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে……..
দে আল্লাহর রাহে মাল- দৌলত
দে জাকাত-ফিতরা, দান-খয়রাত
সেই দানেরি জাযা হয়ে
কাটে যাবে দুঃখের রাত।
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে……….
তুই পাবি ফেরৎ আখেরাত
জান্নাত হবে হাতে ডান
তুই পাবি সেথায় খোশ-খবরী
সালামান ক্বওলাম মির রব্বির রহীম ও রহমান।
ওমন রমজানের ওই রোজার শেষে………
