প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
[চলমান ]
সে তার বক্তব্য শেষ করলে আমি কিছু বলতে চাইলাম। আমি মনে মনে সময়োপযোগী কিছু কথা সাজিয়ে নিলাম। বলার আগে আবূ বকরের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করলাম। তবে আমি তাকে কিছুটা উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ দেখতে পেলাম। আবূ বকর আমার মনোভাব বুঝত পেরে আমাকে বললেন, ওমর! একটু থামঠ। আমি থেমে গেলাম। আমি তাকে আর উত্তেজিত করলাম না। এরপর তিনি বক্তব্য রাখলেন। নিঃসন্দেহে তিনি আমার চেয়ে জ্ঞানী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আমি অনেক ভেবে-চিন্তে যে কথাগুলো বলার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, তিনি সে কথাগুলো বললেন। কিংবা তার চেয়েও উত্তম ও অধিক প্রভাব সৃষ্টিকারী কথা বলে থামলেন।
আবূ বকর (রা) তার বক্তব্যে বললেন, হে আনসারী ভাইয়েরা! আপনারা আপনাদের যেসব গুণাবলি ও ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন, নিঃসন্দেহে আপনারা তার যোগ্য। তবে আরবরা জানে যে, নেতৃত্বের গুণ কোরাইশদের মাঝেই আছে। তাছাড়া আরবের গোত্রসমূহের মধ্যে বংশের বিবেচনায় কোরাইশদের সবচেয়ে কুলিন এবং তাদের আবাসস্থল আরবের কেন্দ্রভুমিতে। আমি তাদের মধ্যে থেকে দুজন ব্যক্তিকে পেশ করছি। আপনারা তাদের যে কারো হাতে বায়াত গ্রহণ করে নিন।
তিনি তখন আমার ও আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররার মাঝখানে বসা ছিলেন। কথা শেষ করেই তিনি আমাদের হাত তুলে ধরলেন। আবূ বকর (রা) এর বক্তব্যের শেষের এ কথাটি ছাড়া সবই আমার ভাল লেগেছিল। আবূ বকর (রা) জীবিত থাকা অবস্থায় খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার চেয়ে মরে যাওয়া আমার কাছে বেশি প্রিয়।
আবূ বকরের প্রস্তাবনায় পর পুরো বৈঠকে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করলো। এর মধ্যে নীরবতা ভেঙ্গে জনৈক আনসারী সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন, আমি ভারসাম্যপূর্ণ একটি মত পেশ করছি এবং এরে পেছনে আমার প্রভাবশালী গোত্র রয়েছে, যারা একে সমর্থন করে। হে কোরাইশ সম্প্রদায়! আমাদের মধ্য হতে একজন নেতা নির্ধারিত হোক আর তোমাদের মধ্যে হতে একজন নেতা নির্বাচিত হোক।
ওমর বললেন, তার এ প্রস্তাবের পর চারদিকে এত বেশি কোলাহল ও চেঁচামেচি শুরু হলো যে, আমি মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করলাম। তাই আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আবূ বকর।! আপনি হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। সর্বপ্রথম আমি তার হাতে বায়াত গ্রহণ করলাম। এরপর মুহাজিরগণ বায়াত গ্রহণ করলেন। তারপর আনসারগণও একে একে তার হাতে বায়াত গ্রহণ করলো।
মোটকথা, প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ের দরজা খোলার একটি চাবি আছে। সে চাবি দিয়ে আপনি তার হৃদয়ে প্রবেশ করে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। তুমিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ বিষয়টি লক্ষ্য করে থাকবে। তুমি নিশ্চয় অনেক সময় তোমার সহকর্মীকে বলতে শুনে থাকবে, আরে! স্যারকে বশ করার চাবি হলো অমুক। দরকার হলে তার মাধ্যমেই স্যারকে বশে আনবে। সে স্যারকে ম্যানেজ করতে পারবে।
আপনি কোনো আচরণ কৌশলের চাবি দিয়ে মানুষের হৃদয়রাজ্য জয় করেছেন না? কারো লেজুড়বৃত্তি না করে শীর্ষস্থান দখল করুন। আপনি হবেন অনন্য, আপনি হবেন স্বতন্ত্র। আপনার মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান প্রত্যেকের হৃদয়ের চাবি খুঁজে বের করুন। কর্মক্ষেত্রেও আপনার উর্দ্বতন কর্মকর্তার ও অফিস কলিগদের হৃদয়রাজ্যে প্রবেশের চাবিটি খুঁজে বের করুন। কারো হৃদয় জয়ের চাবিটি খুঁজে পেলে তাকে সঠিক ও কার্যকারী পন্থায় উপদেশ দিতে পারবেন। আর সেও নির্দ্বিধায় তা গ্রহণ করবে। কারণ নিজের ভুলের উপলব্ধি ও অন্যের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করার ক্ষেত্রে সবার রুচি ও মেজাজ একরকম নয়।
রাসূলের জীবনচরিত্র দেখুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন। হঠাৎ অপরিচিত এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলো। সে মসজিদের এক কোণায় চলে গেল এবং লুঙ্গি উঠাতে লাগল! সবাই চমকে উঠল। মসজিদের ভেতরে লোকটা কী করবে?
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা লুঙ্গির অগ্রভাগ উচু করে নিশ্চিন্তে বসে মসজিদে পেশাব করে দিল! তার এ কাণ্ড দেখে সাহাবায়ে কিরাম ক্রোধে ফেটে পড়লেন। কেউ কেউ তার দিকে দৌড়ে যেতে চাচ্ছিলেন কিন্তু রাসূল সবাইকে শান্ত করলেন। সবাইকে বললেন, তাকে বাধা দিয়ো না। তাকে বাধা দিয়ো না! তাকে তার কাজ শেষ করতে দাও! সাহাবায়ে কিরাম লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর লোকটি নিশ্চিন্তে পেশাব করে গেল। সাহাবীদের এসব প্রতিক্রিয়ার কিছুই হয়তো তার কর্ণগোচর হয়নি।
মসজিদে পেশাব করার মতো স্পর্শকাতর ও বিব্রতকর দৃশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে দেখছেন। আর সাহাবীদের শান্ত করছেন! আহ! কি চমৎকার ধৈর্যের উদাহরণ! সহনশীলতার কী উত্তম নমুনা!
বেদুঈন লোকটি পেশাব শেষ করলো। এরপর ধীরে সুস্থে লুঙ্গি ঠিক করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কোমল স্বরে ডেকে কাছে এনে বসালেন। এরপর খুব নরম স্বরে বললেন, মসজিদ এ জাতীয় কাজের জন্য তৈরি করা হয় নি। মসজিদ তো শুধু নামায ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য।
একদম সংক্ষিপ্ত নসিহত করলেন। লোকটি রাসূলের কথা বুঝল। এরপর চলে গেল। নামাযের সময় হলে লোকটি সবার সঙ্গে জামাতে শরীক হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায পড়ালেন। নামাযের মধ্যে রুকু থেকে ওঠার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ যে আল্লাহর প্রশংসা কর আল্লাহ তা শোনে) পড়লেন।
মুকতাদীগণ বললো, বাব্বানা লাকাল হামদ (হে আমাদের প্রতিপালক! সকল প্রশংসা আপনারই জন্যে) কিন্তু সে বেদুঈন সাহাবী এর সঙ্গে আরো যোগ করলো, হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতি ও মুহাম্মদের প্রতি দয়া করুন। আপনি আমাদের সঙ্গে আর কাউকে দয়া করবেন না!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কানে তার এ বাক্য পৌঁছল। নামায শেষ করে তিনি সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, এ কথা কে বলেছে? সবাই বেদুঈন সাহাবীর দিকে ইশারা করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাছে ডাকলেন। রাসূলের কোমল আচরণ তার হৃদয়ে রাসূলের প্রতি এমন ভালোবাসা সৃষ্টি করেছিল যে, সে দোয়া করছিল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া যেন কেবল সে এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা লাভ করেন। অন্য কেউ যেন তা না পায়। পাছে আবার তাদের ভাগে কম পড়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য বললেন, তুমি তো একটি বিস্তৃত বিষয়কে সীমাবদ্ধ করে ফেলছ। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার রহমত তো সবাইকে পরিবেষ্টন করে আছে। সেটাকে তুমি আমার ও তোমার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছ। এমন আর কখনো কর না। দেখুন, আল্লাহর রাসুল কীভাবে কোমল আচরণের মাধ্যমে লোকটির হৃদয় জয় করে ফেললেন। তিনি জানতেন, একজন বেদুঈনের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে। গ্রাম থেকে আসা এক সাদা-সিধে বেদুঈনের জ্ঞানের পরিধি তো আবূ বকর, ওমর কিংবা মুআয ও আম্মারদের মতো নয়। তাই তাকে অন্যদের মতো জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যাবে না।
আপনি চাইলে মুয়াবিয়া বিন হাকাম এর ঘটনা থেকেও শিক্ষা নিতে পারেন। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ সাহাবী। তিনি মদিনায় থাকতেন না বিধায় রাসূলের সার্বক্ষণিক সাহচর্যও লাভ করেন নি। তার কিছু বকরি ছিল। বকরি চরানো স্বার্থ সবুজ ঘাসের খোঁজে তিনি বিশাল মরুতে ঘুরে বেড়াতেন।
একদিন তিনি মদিনার মসজিদে উপস্থিত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের সঙ্গে হাঁচি দেয়ার বিধান সম্পর্কে আলোচনা করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে শেখালেন, কোনো মুসলামান হাঁচি দিলে সে আলহামদুলিল্লাহ বলবে। আর যে তা শুনবে সে উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে।
মুয়াবিয়া বিষয়টি মুখস্ত করে নিজ কাজে চলে গেলেন। কিছুদিন পর তিনি কোনো এক প্রয়োজনে আবার মদিনায় এলেন। মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে দেখলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে নিয়ে নামায পড়ছেন। তিনিও নামাযে শরিক হলেন। নামাযের মধ্যে মুসল্লীদের কেউ একজন হাঁচি দিল। সঙ্গে সঙ্গে মুয়াবিয়ার মনে পড়ল, তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে শিখেছিলেন, মুসলমানদের হাঁচির জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলতে হয়। হাঁচিদাতা, আলহামদু লিল্লাহ না বলতেই মুয়াবিয়া সজোরো ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে উঠল!
মুসল্লীরা চমকে উঠল। অনেকে বিরক্তিভাব নিয়ে আড়চোখে তার দিকে তাকাল। সকলের বিরক্তিভাব লক্ষ্য করে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের কী হলো? তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন?
মুসল্লীদের কেউ কেউ উরুর ওপর হাত মেরে শব্দ করে তাকে চুপ থাকার জন্য ইঙ্গিত করলো। ইঙ্গিত বুঝে মুয়াবিয়া চুপ করলেন। নামায শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসল্লীদের দিকে ফিরলেন। মুসল্লীদের শোরগোল ও একজনের কথার আওয়াজ রাসূলের কানে পৌঁছছিল। কিন্তু এ নতুন কণ্ঠের সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে থেকে পরিচিত ছিলেন না। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নামাযের মধ্যে কে কথা বললো?
সবাই মুয়াবিয়া (রা) এর দিকে ইঙ্গিত করলো। রাসূল তাকে কাছে ডাকলেন। তিনি ভয়ে এগিয়ে গেলেন। তিনি সবার নামাযে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন, নামাযের একাগ্রতায় বাধা সৃষ্টি করেছেন। রাসূল এখন তাকে কী বলবেন । এ ভয়ে সে অস্থির।
কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এমনভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি বলতে বাধ্য হলেন যে, আমার পিতা-মাতা আল্লাহর রাসূলের জন্য কোরবান হোক! আল্লাহর কসম! আমি জীবনে এর আগে বা পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেয়ে শ্রে কোমলপ্রাণের কোনো শিক্ষক দেখি নি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে প্রহার করেন নি, ভর্ৎসনাও করেন নি, এমনকি তিরস্কারও করেন নি।
রাসূল শুধু বলেছেন, মুয়াবিয়া! নামাযের মধ্যে কথা বলা যায় না। নামাযে তো কেবল তাসবিহ, তাকবির ও কুরআন তিলাওয়াত করতে হয়। শুধু এতটুকু বললেন। কত সংক্ষিপ্ত অথচ মোক্ষম উপদেশ।
মুয়াবিয়া (রা) বিষয়টি বুঝতে পারলেন। রাসূলের এতটুকু কথায় তার মন স্থির হয়ে গেল। রাসূলের উদারতার সে গলে গেল। রাসূলের প্রতি সে দুর্বল হয়ে পড়ল। তিনি রাসূলকে নিজের ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন করত লাগলেন।
তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল! কিছুদিন আগেও আমরা মুর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের আলোতে আলোকিত করেছেন। আমাদের মধ্যে অনেকে জ্যোতিষীর কাছে যায়।
তারা তাদের কাছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তাদের কাছে যেয়ো না।
তুমি একজন মুসলমান আর মুসলমান মাত্রই এ কথা বিশ্বাস করে যে, ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই তাদের কাছে যাওয়া তোমার জন্য সমীচীন নয়। এরপর মুয়াবিয়া বললেন, আমাদের মধ্যে অনেকে শুভ-অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করে। বিভিন্ন লক্ষণ দেখে শুভ অশুভ নির্ণয় করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ জাতীয় নির্ণয় ও ফাল গণনা কল্পনাবিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবে এর কোনো প্রভাব কিংবা ক্ষমতা নেই।
লাভ-ক্ষতির ক্ষেত্রে এগুলোর কোনো ভূমিকা নেই। এগুলো কারো কোনো লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না। লাভ-ক্ষতির ক্ষমতা কেবল আল্লাহর হাতে।
মসজিদে পেশাব করা এক বেদুঈন এবং নামাযে কথা বলা এক ব্যক্তির সঙ্গে এই হলো রাসূলের আচরণ। ব্যক্তি হিসেবে তাদের সাথে এ আচরণেই ছিল স্থান, কাল ও পাত্র উপযোগী। কারণ এ ধরনের অশিক্ষিত মানুষের ভুল হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।
কিন্তু মুয়াজ বিন জাবাল (রা)ছিলেন রাসূলের কাছের একজন সাহাবী এবং ইলম অন্বেষণে অনেক অগ্রসর। তাই তার সাথে রাসূলের আচরণ ও তার ভুল সংশোধনের পদ্ধতি অন্যদের তুলনায় ভিন্ন ছিল।
মুআয (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে এশার নামায পড়তেন। এরপর নিজ লোকালয়ে গিয়ে এলাকাবাসিদের এশার নামাযের ইমামত করতেন। দ্বিতীয়বারের এ নামায মুআয (রা) এর জন্য নফল এবং অন্যদর জন্য ফরয হিসেবে গণ্য হতো।
একরাতের ঘটনা। মুআয (রা) এলাকায় এসে তাকবির দিয়ে এশার নামাযের ইমামত শুরু করলেন। ইতোমধ্যে এক যুবক এসে নামাযে শরিক হলো। মুআয ফাতিহা শেষ করলেন। এরপর মুআয সূরা বাকারা শুরু করলেন!
সে সময় লোকেরা সারাদিন ক্ষেত খামারের কাজ করত, পশু চরাত, এরপর এশার নামায পড়তে না পড়তেই শুয়ে পড়ত। যুবকটি নামাযে দাঁড়িয়ে আছে, আর মুআয কিরাত পড়েই যাচ্ছেন। যুবকটি আর স্থির থাকতে পারলেন না। একপর্যায়ে সে জামাত ছেড়ে দিয়ে এক একা নামায শেষ করে বাড়ি চলে গেল। নামায শেষ হলে মুসল্লীদের একজন মুআযকে বললো, মুআয! অমুক তো আমাদের সঙ্গে নামাযে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আপনার দীর্ঘ কিরাতের কারণে নামায ছেড়ে চলে গেছে।
এ কথা শুনে মুআয (রা) বললেন, তার মধ্যে নেফাক ও কপটতা আছে। আমি অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে তার বিষয়টি জানাব।
যুবকটির কানে মুআযের এ মন্তব্য পৌঁছলে সে বললো, আমিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে যাব। মুআযের বিষয়টি রাসূলকে জানাব। উভয়ে রাসূলের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। মুআয রাযি যুবকটির আচরণ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জানালেন। যুবকটি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বললো, আল্লাহর রাসূল! তিনি দীর্ঘসময় আপনার কাছে থাকার পর আমাদের এখানে আসেন। এরপর লম্বা লম্বা কিরাত দিয়ে নামায পড়ান। আল্লাহর কসম! মুআয নামায যেভাবে দীর্ঘ করেন, তাতে তো আমরা জামাতে এশার নামায পড়তেই যাব না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআযকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নামাযে কী কিরাত পড়ে থাক? মুআয সূরা বাকারাসহ বিভিন্ন বড় বড় সূরার নাম বলতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন মুআযের লম্বা লম্বা কিরাত মানুষকে জামাত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নয়তো নামায কেন তাদের জন্য ভারী হবে!
বিষয়টি বুঝতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব রেগে গেলেন। তিনি মুআযকে লক্ষ করে বললেন, মুআয! তুমি কি মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাও? তোমার এ কাজ তো মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। আর পরিণামে তারা দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যাবে।
তুমি সূরা তারিক, সূরা বুরূজ, সূরা শামস, সূরা লাইল এর মতো সূরাগুলো পড়বে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবকটির দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে জানতে চাইলেন, বেটা! তুমি নামায কীভাবে পড়?
যুবকটি বললো, আমি সূরা ফাতিহা দিয়ে নামায শুরু করি। নামায শেষে আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করি, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাই। এ সময় যুবকটির স্মরণ হলো, সে আল্লাহর রাসূল ও মুআযকে দীর্ঘ সময় ধরে দোয়া করতে দেখে। তাই সে বললো, আমি বুঝি না, আপনি ও মুআয এতো দীর্ঘ সময় ধরে বিড়বিড় করে কী দোয়া করেন? আমি তো এত দীর্ঘ সময় ধরে দোয়া করতে পারি না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যে জান্নাত-জাহান্নামের সংক্রান্ত দোয়া কর, আমি ও মুআয সে দোয়াই করি।
মুআয নেফাকের অপবাদ দেয়ায় যুবকটি খুব ব্যথা পেয়েছিল। তাই সে বললো, যেদিন কোনো শত্র“ আক্রমণ করবে, সেদিন মুআয জানতে পারবে আমি কী করব।
জিহাদের ময়দানেই মুআযের কাছে আমার ঈমানের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। সেদিন সে বুঝতে পারবে, কাকে সে নেফাকের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।
কিছুদিন পরই এক যুদ্ধে এ যুবক বীরবিক্রমে জিহাদ করে শাহাদাতবরণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ খবর শোনার পর মুআযকে বললেন, তোমার সে বাদী যুবক যাকে তুমি মুনাফিক বলেছিলে, কী করেছে শুনেছ?
মুআয রাযি বললেন, আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ সত্য বলেছেন, আর আমি মিথ্যা বলেছি। তিনি তো আল্লাহর পথে শাহাদাতবরণ করেছেন।
বস্তুতঃ মানুষের রুচি, স্বভাব ও সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। দেখুন, ব্যক্তি বিশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আচরণে কেমন বৈচিত্রময় ছিল।
এবার দেখুন রাসূলের গৃহে লালিত আদরের পোষ্যপুত্র ওসামা বিন যায়েদের সঙ্গে রাসূলের আচরণ কেমন ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার জুহাইনা গোত্রের শাখা গোত্র আল হুরাকা এর বিরুদ্ধে সাহাবীদের একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। ওসামা বিন যায়েদও এ বাহিনীতে ছিলেন।
খুব ভোরে যুুদ্ধ শুরু হলো। মুসলমানরা বিজয় লাভ করলেন। শত্র“বাহিনীর যোদ্ধারা পালাতে লাগল। শত্র“বাহিনীর এক যোদ্ধা সহযোদ্ধাদের পরাজিত হতে দেখে অস্ত্র ফেলে পলায়নে উদ্যত হলো। ওসামা ও একজন আনসারী সাহাবী তার পিছু নিলেন। তাদেরকে দেখে লোকটি উর্দ্ধশ্বাসে দৌঁড়াতে লাগল। তারাও পিছু পিছু ধাওয়া করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে লোকটি একটি গাছের পেছনে আত্মগোপন করলো। ওসামা ও আনসারী সাহাবী তাকে ঘেরাও করতে তরবারি উচিয়ে ধরলেন। দুদিক থেকে মাথার ওপর উদ্যত চকচকে দুটি তরবারির আলোকিত রেখায় সে যেন মৃত্যুর অন্ধকার ছায়া দেখতে পেল। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেল। তারপরও গলা থেকে থুথু এনে তা দিয়ে শুষ্ক জিহ্বাকে কোনো রকমে ভিজিয়ে সে বারবার বলতে লাগল আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল।
আনসারী সাহাবী ও ওসামা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। লোকটি কি আসলেই ইসলাম গ্রহণ করছে নাকি এটি আত্মরক্ষার কৌশল?
যুদ্ধের ময়দান। জীবন মৃত্যুর খেলা। সবকিছু এলোমেলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষের ছিন্ন-ভিন্ন দেহ। কর্তিত হাত-পা। চারপাশে আহত ও নিহতদের রক্তের বন্যা। আহতদের আর্তচিৎকার। মুমূর্ষূদের গোঙ্গানি।
চোখের সামনে শত্র। উভয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে কোনো সময় গায়ে বিঁধতে পারে লক্ষ্যভেদি কিংবা লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর।
তখন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার মতো সুযোগ ছিল না। আনসারী সাহাবী আঘাত না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তরবারি গুটিয়ে নিলেন। কিন্তু ওসামা মনে করলেন, এটা শত্র“র একটা কৌশল মাত্র। তাই তরবারির আঘাত তিনি লোকটিকে হত্যা করে ফেললেন।
মুজাহিদ বাহিনী মদিনায় ফিরে এলো। সবার হৃদয়ে বইছে বিজয়ানন্দের তুমুল হিল্লোল।
ওসামা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে বিজয়বার্তা নিয়ে আসলেন। যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা তাকে শোনাতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনন্দচিত্তে মুসলমানদের যুদ্ধজয়ের কাহিনী শুনছিলেন। একসময় সে লোকটির কথা এল।
গল্পের শেষে ওসামা যখন বললেন, তারপর আমি তাকে হত্যা করলাম তখন সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের চেহারার রং পাল্টে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লোকটি কালেমা শাহাদাত পড়া সত্ত্বেও তুমি তাকে হত্যা করলে?
ওসামা (রা) বললেন, আল্লাহর রাসূল! সে তো মনে থেকে কালেমা পড়ে নি। সে তো পড়েছিল অস্ত্রের মুখে, জীবন বাঁচাতে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার বললেন, হায়! তুমি কী করলে! লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পর তুমি তাকে হত্যা করলে? তুমি কেন তার বুক ফেড়ে দেখলে না সে কি আত্মরক্ষার কালিমা পড়েছিল না বাস্তবেই কালেমা পড়েছিল?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওসামা (রা) এর দিকে তাকিয়ে বারবার বলছিলেন, লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? লোকটি কালিমা পড়া সত্ত্বেও তাকে মেরে ফেললে?! কিয়ামতের দিন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ যখন তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবে তখন তুমি কী করবে?
রাসূল বারবার ওসমাকে এ কথা বলছিলেন। ওসামা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিবর্ণ চেহারা দেখে আমি আন্তরিকতাভাবে কামনা করছিলাম যদি আমি আগে মুসলমান না হয়ে সেদিনই মুসলমান হতাম! তাহলে তো আর এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম না।
মন্তব্যঃ
আচরণের ক্ষেত্রে সবাইকে একরকম ভাববেন না।
মানুষের স্বভাব-চরিত্র আকাশের রঙ্গের চেয়েও বৈচিত্রময়।
