প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ ۚ

হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পর একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না, তবে পারস্পারিক সন্তুষ্টিক্রমে কোন ব্যবসা করা হলে (তা জায়েয)। (সূরা নিসা: আয়াত ২৯)

সূচনাপর্ব:

যে আয়াত আমি আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি, তা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। তাহল লেনদেনে পরিশুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতা। অর্থাৎ মানুষের লেনদেন ভাল ও পরিচ্ছন্ন হওয়া। এটা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল- এটা দ্বীনের যত বড় গুরুত্বপূর্ণ অংশ ততই আমরা একে আমাদের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি, চরম অবহেলা করছি।

আমার ধারণা করে বসে আছি যে, দ্বীন মানে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত- নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, ওমরা ইত্যাদির মাঝেই দ্বীন সীমাবদ্ধ। কিন্তু লেনদেনের যে একটি বিষয় দ্বীনের মাঝে আছে তাকে আমরা এমনভাবে ছেড়ে দিয়েছি যেন তার সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই। অথচ ইসলামের বিধিবিধানে গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, ইবাদত সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো ইসলামের এক চতুথাংশ। অবশিষ্ট তিন অংশ লেনদেন ও জীবন যাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

লেনদেন দ্বীনের তিন-চতুর্থাংশ

হিদায়া ফিকাহ গ্রন্থের প্রসিদ্ধ একটি কিতাব, যা আমাদের সব মাদরাসাতেই পড়ানো হয়। সব আলেমই এটি পড়ে থাকেন। এই কিতাবের মাঝে তাহারাত থেকে নিয়ে মিরাছ পর্যন্ত সব আহকামকে একত্রিত করা হয়েছে। এটি মোট চার খন্ডে সমাপ্ত।

লেনদেনে অস্বচ্ছতা ইবাদতে প্রভাব ফেলে

আল্লাহ তাআলা লেনদেনকে এমন উচ্চ মাকাম দিয়েছেন, যদি মানুষ লেনদেন পরিশুদ্ধ না রাখে, হালাল-হারাম, জায়েজ নাজায়েয কোন তোয়াক্কা না করে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া ইবাদতেই পড়ে। ইবাদত আদায় হলেও তার সওয়াব ও কবুল হওয়া মওকুফ (ঝুলন্ত) থাকে, দুআও কুবল হয় না।
এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, অনেকে এমন রয়েছে যারা আল্লাহর সামনে বিনয়ী হয়ে অবনত হৃদয়ে কান্নাকাটি করে। তাদের চুলগুলো এলোমেলো, হাইমাউ করে কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডাকে, হে আল্লাহ! আমার উদ্দেশ্য পূরণ করুন। অথচ তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম। পানাহার হারাম। শরীরের গোশত চর্বি হারাম খাদ্য থেকে তৈরি।

আল্লাহ তাদের দুআ কীভাবে কবুল করবেন?

লেনদেনের ক্ষতিপূরণ বেশ জটিল বিষয়

অন্যান্য যত ইবাদত আছে সেগুলোর মাঝে অবহেলা হলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা খুব সহজ। যেমন নামায ছুটে গেলে পরবর্তীতে জীবনের কোন সময় তা কাযা করে নেয়া যায়। যদি জীবনে কোন সময় আদায় করতে না পেরে মারা গেল তার অসিয়ত অনুযায়ী তার মাল থেকে ফিদইয়া আদায় করা যায় এবং তাওবা করলেও ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা এর ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন। কিন্তু অসৎ উপায়ে যদি কেউ অন্যের সম্পদ খেয়ে ফেলে, তাহলে তার ক্ষতিপূরণ হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদের মালিক তাকে মাফ না করবে। অন্যথায় হাজার বার তাওবা করেও হাজার রাকাত নফল নামায পড়লেও এর ক্ষতিপূরণ হবে না। এই জন্যই স্বচ্ছ লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বের দাবি রাখে।

হযরত থানভী (রহ.) এবং তার লেনদেন

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) আত্মশুদ্ধির শিক্ষার পাশাপাশি লেনদেনও শিক্ষা দিতেন ও শুদ্ধতার অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, যখন আমার কোন মুরীদের ব্যাপারে জানতে পারি যে, সে তার প্রতিদিনকার আমল যথা যিকির, নফল নামায ও অন্যান্য আমলের ব্যাপারে অবহেলা করে তাহলে অন্তরে ব্যথা পাই এবং ওই মুরীদকে বলে দেই যে, আমলগুলো পূর্ণ করে নাও। আর যে মুরীদের ব্যাপারে জানতে পারি যে, সে লেনদেনে উল্টো-পাল্টা করে তখন তার প্রতি আমার অন্তরে ঘৃণা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

হযরত থানভী (রহ.) এর একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর মুরীদ ছিল, যাকে হযরত খেলাফত, বায়আত ও তালকীনের অনুমতি প্রদান করেছিলেন। একবার তিনি তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাত করার উদ্দেশ্যে আসেন। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর বললেন, এ আমার সন্তান।
ছেলেটির পরিচয় করিয়ে তিনি হযরতের কাছে ছেলের জন্য দুআ চাইলেন। হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলেটির বয়স কত।
খলীফা বললেন, ছেলের বয়স ১৩ বছর।
হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি তো রেলযোগে সফর করে এসেছেন, তখন এর জন্য হাফ টিকেট নিয়েছেন নাকি ফুল টিকেট নিয়েছেন?
খলীফা উত্তর দিলেন, হাফ টিকেট নিয়েছি।
হযরত বললেন, ১২ বছরের চেয়ে বেশি বয়সের বাচ্চার জন্য ফুল টিকেট লাগে। তাহলে আপনি কীভাবে এর জন্য হাফ টিকেট নিলেন?
খলীফা উত্তর দিলেন, আইন তো আছে ১২ বছরের পর পূর্ণ টিকেট কাটতে হয়। কিন্তু আমার এই ছেলের বয়স যদিও ১৩ বছর কিন্তু দেখতে ১২ বছরের মত লাগে। তাই হাফ টিকেট কেটেছি।
সঙ্গে সঙ্গে হযরত থানভী (রহ.) বললেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মনে হয় আপনার শরীরে তাসাওউফ ও তরিকতের বাতাস মোটেও লাগেনি! আপনার এতটুকু ইহসাস ও অনুভূতি হয়নি যে, ছেলেটার সফর আপনি হারাম পন্থায় করিয়েছেন। যখন আইন আছে ১২ বছরের চেয়ে বেশি বয়সের বাচ্চার জন্য পূর্ণ টিকেট লাগবে অথচ আপনি অর্ধেক টিকেট নিয়েছেন। আর অর্ধেক টিকেটের টাকা আপনি আত্মসাত করেছেন এবং চুরি করেছেন। আর যে ব্যক্তি চুরি ও আত্মসাত করে এমন ব্যক্তির জন্য তাসাওউফ ও তরিকতে কোন মযার্দা থাকতে পারে না। সুতরাং আজ থেকে আমি আপনার থেকে আমার খেলাফত ও বায়আতের অনুমতি পত্যাহার করে নিলাম। যদিও ওই লোক অন্যান্য অযিফা, ইবাদত, নাওয়ফেল, তাহাজ্জুদ ইশরাক ইত্যাদি সবকিছুই পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ছেলের টিকেট অর্ধেক কাটার অপরাধে অর্থাৎ লেনদেন অস্বচ্ছতার কারণে তিনি তার খেলাফত কেটে নিলেন।

হযরত থানভী (রহ.) এর আরো একটি ঘটনা

হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর পক্ষ থেকে তার সব মুরীদ ও মুতাআল্লিকীনদের প্রতি এই হেদায়েত ছিল যখন তোমরা রেলযোগে সফর করবে তখন এই পরিমাণ মালামাল গাড়িতে বহন করবে, যেই পরিমাণ বিনা ভাড়ায় নেয়ার অনুমতি আছে। এর চেয়ে বেশি হলে ওজন করে তার ভাড়া আদায় করবে।
হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) এর নিজের ঘটনা। একবার তিনি রেলে সফর করার উদ্দেশ্যে স্টেশনে পৌছলেন। ট্রেন আসার সময়ও প্রায় হয়ে গেছে। আর হযরত থানভী (রহ.) নিজের মালামাল ওজন করার উদ্দেশ্যে লাইনে দাঁড়ালেন। ঘটনাক্রমে হযরত থানভী (রহ.) কে চিনে গাড়ির এমন কতকজন গার্ড এসে উপস্থিত ছিল। সে বলে উঠল, হযরত! এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন ? হযরত থানভী (রহ.) উত্তর দিলেন, মালপত্র ওজন করার জন্য।
তখন গার্ড বলল, আপনার সমান ওজন করার কোন প্রয়োজন নেই। আপনাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করবে না। আর এ গাড়িতে আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি। সুতরাং আপনার অতিরিক্ত মালের ভাড়া দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার সাথে কতটুকু যাবেন? গার্ড বলল, অমুক স্টেশন পর্যন্ত।হযরত থানভী (রহ.) বললেন, এরপর কী হবে ? গার্ড বলল, ওই স্টেশনে অন্য গার্ড আসবে। আমি তাকে আপনার মাল সম্পর্কে বলে দেব। হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন, সে গার্ড আমার সঙ্গে কোন পর্যন্ত যাবে?
গার্ড বলল, সে যে স্টেশন পর্যন্ত যাবে তার আগেই আপনার স্টেশন শেষ।
হযরত থানভী (রহ.) বললেন, আমি আরো আগে যাব। অর্থাৎ আখেরাতের দিকে যাব এবং নিজ কবরের দিকে যাব। সেখানে কোন গার্ড আমার সঙ্গে যাবে? যখন আখেরাত আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে এক সরকারি রেলগাড়িতে করে মালের ভাড়া ছাড়া সফর করেছ এবং চুরি করেছ তার হিসাব দাও, তখন সেখানেও কি কোন গার্ড আমাকে সাহায্য করবে ? কোন ব্যক্তি রেলস্টেশনে মালপত্র ওজন করতে গেলে মানুষ মনে করতো লোকটি থানা ভবনের যাত্রী এবং হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) এর অনেক বিষয়ের মত এ বিষয়টিও সেখানে প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু এই নীতি যে একটি টাকাও যেন অসৎ উপায়ে আমাদের কাছে না আসে এই নীতির কথা মানুষ ভুলে গেছে। ফলে বর্তমান কত লোক এই ধরনের লেনদেনে লিপ্ত অথচ তাদের এই চিন্তা ও খেয়ালও আসে না যে, তারা শরীয়তের খেলাফ নাজায়েজ কাজে লিপ্ত। দেখুন, যদি আমরা অসৎ উপায়ে কিছু টাকা-পয়সা বাঁচিয়ে নেই আর ওই হারাম টাকায় আমাদের গোটা জীবন পরিচালিত হচ্ছে হারাম পথে। আমাদের অনুভূতি আজ শূন্যের কোটায়। তাই হারামের কুফল আমরা টের পাই না। এ হারাম মাল আমাদের জীবনকে কীভাবে বিষিয়ে তুলছে, তা ভেবে দেখি না। আল্লাহ তাআলা যাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন তারা এর কুফল বুঝতে পারেন অবশ্যই।

ইয়াকুব নানুতবী (রহ.)-এর সন্দেহযুক্ত খাবারের কয়েকটি লোকমা খাওয়া

হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী (রহ.) হযরত থানভী (রহ.) এর একজন মহান শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ ছিলেন এবং দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিস ছিলেন। তিনি বলেন, একবার এক দাওয়াতে গেলাম এবং সেখানে খাবারও খেলাম। পরে জানতে পারলাম, খাবার সন্দেহযুক্ত ছিল। তিনি বলেন, এক মাস পর্যন্ত ওই কয়েক লোকমা খাবারের প্রতিক্রিয়া আমি অনুভব করি এবং এক মাস পর্যন্ত আমার অন্তরে বিভিন্ন গোনাহের প্রতি আগ্রহ জাগত। স্বভাবজাতের মাঝে বার বার এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো যে, অমুক গোনাহ কর- অমুক গোনাহ কর। এটা ছিল হারাম খাবারের কুফল।

হারাম দুই প্রকার

বর্তমানে গোনাহের প্রতি ঘৃণাবোধ আমাদের অন্তর থেকে দূর হয়ে গেছে। গোনাহের অনুভূতিও আমাদের অন্তর থেকে বিদায় নিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল, আমাদের হালাল মালের সঙ্গে হারাম মালের মিশ্রণ ঘটেছে। আর এক প্রকারের হারাম তো সুস্পষ্ট, যা প্রত্যেক ব্যক্তিই জানে। যেমন সুদ, ঘুষ, জুয়া, ধোঁকা, চুরি ইত্যাদি মাল। অথচ তাও হারাম। এই দ্বিতীয় প্রকারের আলোচনাই শোনানো হল।

মালিকানা স্বত্ব সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত

লেনদেনের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা হল, লেনদেন চাই ভাইদের মাঝে হোক কিংবা পিতা-পুত্রের অথবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হোক, তা থাকতে হবে নির্ভেজাল ও ক্রটিমুক্ত। মালিকানার ক্ষেত্রে কোন অস্পষ্টতা থাকতে পারবে না। কোনটি পিতার মালিকানাধীন, কোনটি পুত্রের, কোনটি স্বামীর, কোনটি স্ত্রীর মালিকানাধীন ইত্যাদি সুস্পষ্ট থাকা চাই। এইসব বিষয় নির্ভেজাল ও সুস্পষ্ট থাকা চাই এবং এটাই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা। তিনি ইরশাদ করেছেন: ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কসহ জীবন যাপন কর। আর লেনদেন কর অপরিচিত-জনের মত। (বহু অনুসন্ধানেরও পরও এই বাক্যমালা হাদীসের কিতাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবশ্য আরবী প্রবাদবাক্যে এই বাক্য বিদ্যমান আছে। এই কারণে এটি প্রবাদবাক্য হওয়াটাই বেশ যৌক্তিক মনে হয়।) যেমন যদি ধার নিয়ে লেনদেন করলে এই কথা লিখে রাখবে যে, এটা এত দিন পরে ফিরিয়ে দিতে হবে।

পিতা-পুত্রের যৌথ কারবার

বর্তমানে আমাদের সব লেনদেনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে যে, আমাদের কোন লেনদেনই স্বচ্ছ নয়। পিতা-পুত্র যৌথ ব্যবসা করলেও তাদের মাঝে এমনটি লক্ষ্য করা যায় যে, পিতা-পুত্র ব্যবসা করছে অথচ তা কী অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে না কি কর্মচারী হিসেবে, না সহযোগিতার ভিত্তিতে। আমাদের লেনদেনে এসব বিষয় স্পষ্ট থাকে না। কিন্তু ব্যবসা চলছে, মাল উপার্জন হচ্ছে, দোকানকারী চলছে, বেচাকেনা হচ্ছে। অথচ জানা নেই কার অংশ কতটুকু ? যদি বলা হয়, লেনদেন পরিষ্কার করে নাও, তাহলে উত্তর আসে ভাই ভাইয়ে ব্যবসা অথবা পিতা-পুত্রের ব্যবসা। এতে আবার পরিষ্কারের কী প্রয়োজন। নিজেদের মাঝে আবার কিসের চুক্তি। এর কুফল প্রকাশ পায় যখন বিয়ে-শাদী করে, ছেলে-মেয়ে হয়। বিয়ে-শাদীতে কেউ বেশি খরচ করে, কেউ কম খরচ করে এবং একজন বাড়ি নির্মাণ করে আর অন্যজন এখনও বাড়ি নির্মাণ করতে পারেনি, তখনই একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ শুরু করে যে, অমুকে বেশি টাকা খরচ করেছে আর আমি কম খরচ করেছি। আর যদি এর মাঝে পিতা ইন্তেকাল করেন তাহলে ভাই ভাইয়ে ঝগড়া-বিবাদের সীমা থাকে না এবং সমাধানের জন্য কোন রাস্তাও পাওয়া যায় না।

পিতার ইন্তেকালের পরপরই ত্যাজ্য সম্পদ বণ্টন হওয়া চাই

শরীয়তের হুকুম হলো পিতার ইন্তেকালের পরপরই বণ্টন করে নেয়া। বণ্টনে বিলম্ব করা অবাঞ্ছনীয়। কিন্তু বর্তমান সমাজে পিতার ইন্তেকালের পর সম্পত্তি বণ্টন করা হয় না। বরং পিতার মৃত্যুর পর বড় ছেলে একচ্ছত্র অধিপতি সেজে বসে। আর অন্য সন্তানরা চুপ করে বসে থাকে, যেন তার কোন অধিকারই নেই। এভাবে দশ বিশ বছরও অতিক্রম হয়ে যায়। ফলে এ দীর্ঘ সময়ের মাঝে কোন ভাইয়ের ইন্তেকালও হয়ে যায় অথবা কোন ভাই পিতার ব্যবসার সঙ্গে নিজের ব্যবসার অংশ একত্রিত করে ফেলে। অতঃপর অন্য ভাইয়ের সন্তানরা বড় হয়ে এর প্রতিবাদ জানায়। এক পর্যায়ে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। আর এ ঝগড়া-বিবাদ যখন তুঙ্গে পৌঁছে যায় তখন সবাই মিলে মুফতী সাহেবের কাছে যায় এবং বলে, আপনি বলুন, এখন আমরা কী করব? কিন্তু মুফতী সাহেবের জন্য তখন এর সমাধান দেয়া কঠিন হয়ে যায়। যেহেতু ছেলে পিতার সাথে কোন হিসাবে অংশীদার ছিল তা জানার কোন পথ পাওয়া যায় না।

যৌথ বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে অংশীদারের অংশ

যৌথ একটি বাড়ি নির্মাণ করা হলো। আর এতে পিতারও কিছু টাকা, এক পুত্রের কিছু টাকা, দ্বিতীয় পুত্রের কিছু টাকা, তৃতীয় পুত্রেরও ব্যয় হলো। কিন্তু এটা জানা যায়নি যে, কোন পুত্র কীভাবে টাকা ব্যয় করেছিল এবং এটাও জানা যায়নি যে, তা কী ঋণ হিসাবে ব্যয় করেছিল যে, পরে তা ফিরিয়ে নেবে, নাকি বাড়ির অংশীদারের ভিত্তিতে, নাকি সাহায্য-সহায়তার জন্য দিয়েছিল? এর কোন কিছুই জানা যায়নি। বাড়ি বানানোর পর বসবাস শুরু হলো। এক সময় পিতার ইন্তেকাল হয়ে গেল। তখন দেখা দিল বাড়ি নিয়ে পরস্পরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও ঝগড়া। অবশেষে সবাই মুফতী সাহেবের কাছে গেল।
এক ভাই দাবি করল আমি এ বাড়ি নির্মাণে অর্থ ব্যয় করেছি। সুতরাং আমি এত অংশের মালিক। অন্যজনও অনুরূপ দাবি করে বসল। যখন তাদের জিজ্ঞেস করা হলো, আপনারা বাড়ি নির্মাণের সময় যে টাকা খরচ করেছেন, তখন আপনাদের নিয়ত কী ছিল? ঋণ হিসাবে দিয়েছিলেন, না অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, না সহযোগিতা হিসাবে, নাকি অন্য কোন কথা হয়েছিল?
তখন এই উত্তর দেয় পিতা আমাদের টাকা খরচ করার সময় কিছুই জিজ্ঞেস করেননি। না সহযোগিতা, না অংশীদারত্ব? এখন বলুন, মুফতী সাহেব কীভাবে সমাধান দেবেন।
এতসব সমস্যার মূল কারণ হলো, লেনদেনের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার প্রতি অমনোযোগিতা। নফল, তাহাজ্জুদ ও ইশরাকের নামায হচ্ছে অথচ লেনদেনের ব্যাপারে সবাই উদাসীন। এই সবকিছু হারাম হয়ে যাবে যদি একথা জানা না যায় যে, নিজের হক কোনটা, অন্যের হক কোনটা। তাহলে এই অবস্থায় যা কিছু তোমরা তার থেকে খাবে তার মাঝেও হালাল হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টি হবে। ফলে খাওয়া জায়েয হবে না।

হযরত মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর মালিকানায় স্বচ্ছতা

আমার সম্মানিত পিতা হযরত মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) [আল্লাহ তায়ালা তার মর্যাদাকে আরো বৃদ্ধি করুন]কে দেখছি যে, তার কামড়ায় একটি খাট ছিল। যেখানে তিনি বিশ্রাম নিতেন। লেখাপড়ার কাজও করতেন এবং সেখানে লোকেরা দেখা-সাক্ষাতও করত। যখন বাইরে থেকে কোন জিনিস তার কামরায় আসত পরক্ষণেই তা ফিরিয়ে দিতেন। যেমন তিনি পানি চাইলেন, আমি গ্লাসে করে পানি আনলাম। তিনি পান শেষে সঙ্গে সঙ্গে বলতেন। দিয়ে এস, যেখানে থেকে এনেছ। গ্লাস ফেরত দিতে দেরি করলে খুব রাগ করতেন। যদি থালা-বাটি আসত তাহলে তা সাথে সাথেই বাবুর্চিখানায় ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিতেন। একদিন বললাম, হযরত! আসবাবপত্র পৌঁছাতে সামান্য বিলম্ব হলে ক্ষমা করবেন। তখন তিনি বললেন, বিষয়টি তুমি বুঝনি।
আসল ব্যাপার হলো, আমি আমার অসিয়তনামায় লিখেছি, এ কামরার মাঝে যত সামান আছে সেগুলো তোমার মায়ের মালিকানায়। এজন্য আমার ভয় হয় অন্য কামরার কোন জিনিস আমার কামরায় এল আর ওই মুহূর্তে আমার মৃত্যু চলে আসল, তখন তোমরা অসিয়ত অনুযায়ী মনে করবে এগুলো আমার মালিকানায়। অথচ তা আমার মালিকানায় নয়। এই জন্য অন্যের কোন জিনিস আমার কামরায় রাখি না। তাই সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠিয়ে দেই।

হযরত ডা. আবদুল হাই (রহ.)-এর সতর্কতা

যখন আমার পিতা ইন্তেকাল করলেন, তখন আমার শায়খ ডা. আবদুল হাই (রহ.) সমবেদনা প্রকাশের জন্য আসলেন। আমার পিতার সঙ্গে আমার শায়খের সম্পর্ক কী পরিমাণ ছিল তার কল্পনাও আমি করতে পারি না। যেহেতু হযরত খুব দুর্বল ছিলেন এই কারণে ওই সময় হযরতের উপর তার দুর্বলতা ও চিন্তিত হওয়ার আছর প্রকাশ পাচ্ছিল। তাই আমি ভেতর থেকে আব্বাজানের সালশা নিয়ে আসলাম এবং হযরতের সামনে পেশ করে বললাম, হযরত! এখান থেকে একটু পান করে নিন, তাহলে দুর্বলতা কেটে যাবে।
হযরত এই খামিরা দেখামাত্রই বললেন, তুমি এই খামিরা কেন এনেছ? এটাতো উত্তরাধিকারী সম্পদের অংশ। সুতরাং এই অবস্থায় তোমার জন্য জায়েয নেই যে, সেখান থেকে যাকে ইচ্ছা তুমি তাকে দেবে। যদিও তা এক চামচ পরিমাণই হোক না কেন? আমি বললাম, হযরত! আব্বার যত ওয়ারিশ আছেন তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং তারা সবাই এখানে উপস্থিত আছেন। আপনি পান করলে সবাই খুশি হবেন। তখন হযরত ওই খামিরাটি পান করলেন।

হিসাব সেই দিনই করে নাও

অতঃপর হযরত বললেন, এই বিষয়টি এমন বিষয় নয় যে, মানুষ খুব হালকাভাবেই তা শেষ করবে এবং ফরয হলো যদি সব ওয়ারিশের মাঝে একজন ওয়ারিশও নাবালেগ থাকে বা উপস্থিত না থাকে অথবা অসন্তুষ্ট থাকে তাহলে ওই খামিরার এক চামচও হারাম হবে। এই জন্য শরীয়তের হুকুম হলো, কারো ইন্তেকাল হলে যত দ্রুত সম্ভব তার হিসাব করে রাখা। এটা এজন্য যে, অনেক সময় বণ্টন করতে সময় লাগে, জিনিসপত্রের মূল্য ঠিক করার প্রয়োজন হয়। কিছু জিনিস বিক্রি করতে হয়। কিন্তু হিসাব ওই দিনই হওয়া চাই। বর্তমানে আমাদের মাঝে অধিকাংশ ঝগড়া-বিবাদ হয় হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার না থাকার কারণে।

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ও তাসাওউফ সম্পর্কিত গ্রন্থ

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) যিনি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ছাত্র ছিলেন। এই বুযুর্গের বরকত ও লেখনীর মাধ্যমে আমরা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহশাস্ত্রের সব আহকাম পেয়েছি। তার এ কর্মের প্রতিদান আমরা কিছুতেই দিতে পারব না। তার লিখিত কিতাবগুলো কয়েক উটের বোঝা হতো। একবার এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হযরত! আপনি অনেক কিতাব লিখেছেন কিন্তু তাসাওউফের উপরে কোন কিতাব লিখলেন না কেন?

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বললেন, তুমি কীভাবে বললে যে, আমি তাসাওউফের উপর কোন কিতাব লিখিনি। আমি যে কিতাবুল বুয়ু অর্থাৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অধ্যায় লিখেছি সেটাই তাসাওউফের কিতাব। কেননা বেচাকেনা পরিশুদ্ধ হওয়া আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম। আর শরীয়তের বিধিবিধান যথাযথভাবে আদায় করার নামই তো আত্মশুদ্ধি।

অপরের জিনিস ব্যবহার করার নিয়ম

অনুমতি ছাড়া অন্যের জিনিসপত্র ব্যবহার করা জায়েয নেই। যেমন কোন বন্ধু অথবা ভাইয়ের জিনিস তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হলো, তাহলে তা জায়েয হবে না বরং হারাম হবে। আর যদি এ বিশ্বাস থাকে যে, আমি ব্যবহার করলে সে অসন্তুষ্ট হবে না, বরং খুশি হবে তাহলে ব্যবহারের অবকাশ আছে। কিন্তু যদি কারো ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা থাকে যে, অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন, তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েয হবে না। চাই নিজের ভাই হোক, ছেলে হোক, পিতা হোক অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হবে যে, তিনি খুশির সাথে অনুমতি দেবেন বা আমার ব্যবহারের দ্বারা তিনি খুশি হবেন। ততক্ষণ পর্যন্ত অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা জায়েয হবে না।

হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোন মুসলমানের মালপত্র তার স্বতস্ফূর্ত অনুমতি ছাড়া তোমার জন্য ব্যবহার করা বৈধ নয়। (কানযুল উম্মাল: খণ্ড-১, পৃ. ৯১, হাদীস নং ৩৯৭; মুসনাদে আহমদ: হাদীস নং-১৯৭৭৪; জামিউল আহাদীস: খণ্ড-১৭, পৃ. ৮০, হাদীস নং-১৭৬১৫; কাশফুল খাফা: খণ্ড-২, পৃ. ৩৭০, হাদীস নং-৩১০৩)
উল্লেখিত হাদীসে অনুমতির কথা বলা হয়নি বরং খুশির ও আনন্দের কথা বলা হয়েছে। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শুধু অনুমতি দিলেই হবে না বরং অনুমতির পাশাপাশি সন্তুষ্টিও লাগবে। তাহলে তা জায়েয হবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় বর্তমানে আমরা এ বিষয়টির প্রতি কোন তোয়াক্কা করছি না। অপরের জিনিসপত্র যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করছি অথচ এটা হারাম।

এ জাতীয় চাঁদা বৈধ নয়

হাকীমূল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) মাদরাসা ও কোন সংগঠনের চাঁদা ওঠানোর ব্যাপারে বলেন, এমন কৌশলে চাঁদা ওঠানো জায়েয হবে না যে, অন্য ব্যক্তি লজ্জিত হয়ে বা সম্মান রক্ষার্থে চাঁদা দেয়। যেমনÑ কোন সমাবেশে চাঁদা ওঠানো হচ্ছে। তখন এক ব্যক্তির মনে এ ধারণা হলো যে, এত লোক চাঁদা দিচ্ছে আমি চাঁদা না দিলে আমার নাক কাটা যাবে। অথচ তার মনে চাঁদা দেয়ার কোন আগ্রহই ছিল না। এ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে চাঁদা দিতে হলো। তাই এ চাঁদা উত্তোলনকারীর জন্য জায়েয হবে না।

প্রত্যেকের মালিকানা সুস্পষ্ট হওয়া চাই

শরীয়তের একটি উসূল হলো, অন্যের জিনিসপত্র তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা জায়েয নেই। চাই সেই ব্যক্তি ছেলে, ভাই, পিতা, বন্ধু-বান্ধব যেই হোক, তার অনুমতি লাগবেই। এই মূলনীতির প্রতি অচৈতন্যতার কারণে আমাদের হালাল মালের সঙ্গে হারাম মাল মিশ্রণ হয়ে যাচ্ছে। যদি কোন ব্যক্তি বলে, আমি অবৈধ কোন কাজ করি না। সুতরাং আমার মাল হালাল। কিন্তু তার একথা জানা নেই যে, এই মূলনীতির প্রতি লক্ষ্য না রাখার কারণে মাল হারামের সঙ্গে মিশ্রণ হয়ে যায়। ফলে মালের বরকত নষ্ট হয়ে যায় এবং এ সম্পদ খাওয়ার কারণে পাপের প্রতি তার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। ইবাদতের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়। সুতরাং প্রত্যেকের মালিকানা সুস্পষ্ট থাকা চাই। যে এ জিনিসটি আমার মালিকানায়, ওই জিনিসটি অমুকের মালিকানায়, যাতে কোন ধরনের অস্পষ্ট না থাকে। আর পারস্পরিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে হবে।

মসজিদে নববীর জন্য বিনামূল্যে ভূমি গ্রহণ করেননি

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে আসার পর সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তাহলো মসজিদে নববী। যে মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব পঞ্চাশ হাজার ওয়াক্তের নামাযের সমান। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি খোলামেলা স্থান পছন্দ করে তার মালিকানা অনুসন্ধান করলেন। অতঃপর জানতে পারলেন, এই স্থানের মালিক হলো বনু নাজ্জার গোত্রের লোকদের। যখন বনু নাজ্জার গোত্রের লোকেরা জানতে পারলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করার জন্য এই স্থানটি পছন্দ করেছেন, তখন তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে জায়গাটি বিনামূল্যে দান করে দিতে চাইলেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের ও খুশির বিষয় যে, আপনি আমাদের জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করতে চাচ্ছেন।

কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বিনামূল্যে আমি জায়গা গ্রহণ করব না। তোমরা এর মূল্য নির্ধারণ করে দাও। মূল্যের মাধ্যমে আমি তা নেব। (সহীহ বুখারী: হাদীস নং ৪১০; সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ৮১৬; সুনানে নাসায়ী: হাদীস নং ৬৯৫; মুসনাদে আহমদ: হাদীস নং ১১৮৮৫)

বাহ্যত তারা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করে চাচ্ছিলেন যে, তাদের জায়গাটি মসজিদ নির্মাণের জন্য ব্যবহার হয়ে যাক। কিন্তু তারা স্বতস্ফূর্তভাবে জায়গাটি দান করতে চাইলেও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করেননি।

মসজিদ নির্মাণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম লিখেছেন যখন বনু নাজ্জারের লোকেরা তাদের এ জায়গাটি মসজিদ নির্মাণের জন্য বিনামূল্যে দিতে চেয়েছিল তখন এ যমীন নেয়া বৈধ ছিল, তার মাঝে কোন ক্ষতি ছিল না। কিন্তু এটা যেহেতু ইসলামের ইতিহাসে মদীনায় প্রথম মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে এবং কাবা শরীফের পরে এর স্থান দেয়া হবে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনামূল্যে দানকৃত যমীন গ্রহণ করাটা পছন্দ করছিলেন না। কারণ এতে ভবিষ্যতে লোকেরা মনে করবে যমীন ক্রয় না করে বরং বিনামূল্যে গ্রহণ করে মসজিদ নির্মাণ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। এই জন্য এই যমীন বিনামূল্যে গ্রহণ করেননি অথবা অন্যের মালিকানার প্রতি যেন লক্ষ্য রাখা হয়, যার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমীন ক্রয় করে মসজিদ নির্মাণ করেন এবং লেনদেন পরিষ্কার রাখেন।

সারা বছরের খোরপোষ দেয়া

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রা স্ত্রীগণ প্রকৃতপক্ষেই তাঁর স্ত্রী হওয়ার যোগ্য ছিলেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের অন্তর থেকে দুনিয়ার মহব্বত-ভালোবাসা দূর করে আখেরাতের ভালোবাসা বন্ধমূল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বছরের শুরুতেই সারা বছরের খরচ তাদের কাছে দিয়ে বলতেন, এটা তোমাদের নফকা (খোরপোষ); তোমাদের যা ইচ্ছা তাতে তা করতে পার। (সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ২৮৯৮) ফলে তাঁর স্ত্রীগণ নিজের প্রয়োজনটুকু রেখে বাকি সব আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উপমা কায়েম করেছেন যে, পূর্ণ বছরের খরচ এক সঙ্গে দিয়ে দিতেন। পুন্যাত্মা স্ত্রীদের সঙ্গে সম-অধিকার রক্ষা করে চলা আল্লাহ তায়ালা হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অধিকার দিয়েছিলেন স্ত্রীদের ব্যাপারে কম-বেশি করার। ফলে সকল স্ত্রীদের মাঝে সম-অধিকার রক্ষা করে চলা তাঁর জন্য অপরিহার্য ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলে যাকে ইচ্ছা বেশি, যাকে ইচ্ছা কম দিতে পারতেন। এতে তাকে কোন ধরনের কারণ দর্শাতে হত না। পক্ষান্তরে উম্মতের জন্য অপরিহার্য হলো একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রত্যেকের ব্যাপারে সমতা রক্ষা করে চলা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অধিকার পাওয়া সত্ত্বেও আজীবন তিনি তার স্ত্রীদের সঙ্গে সমতা রক্ষা করে চলেছেন এবং প্রত্যেকের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সমান দৃষ্টি রেখেছেন।

সারকথা

আলোচ্য আয়াত ও হাদীসের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ উসুল বর্ণনা করা হয়েছে। যা আমরা ভুলে যাচ্ছি। তাহলো লেনদেন স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট রাখতে হবে। কোন ধরনের অস্বচ্ছতা থাকা যাবে না। চাই পুরুষ হোক বা মহিলা। প্রত্যেকেই নিজ লেনদেন পরিষ্কার ও স্বচ্ছ রাখবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এর হাকীকত ও হুকুম বোঝার তাওফীক দান করুন। আমিন!