প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
নাম সাদ, ডাক নাম আবু সাঈদ। কুদরাহ বংশের সন্তান হওয়ার কারণে খুদারী বা খুদরী বলা হয়। তার পিতা মালিক ইবন সিনান উহুদের অন্যতম শহীদ। এ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হলে তিনি রাসূলের পবিত্র খুন চুষে গিলে ফেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মন্তব্য করেনঃ আমার রক্ত যার রক্তে মিশছে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবেনা। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৮০, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৪) তার মা উনায়সা বিনতু আবী হারিসা বনু আদী ইবন নাজ্জারের কন্যা। দাদা সিনান ছিলেন মহল্লার রয়িস। তিনি ছিলেন একটি কিল্লার অধিপতি ও ইসলাম পূর্ব যুগের একজন বিচারক।
তার মার প্রথম স্বামী ছিল আউস গোত্রের আম্মান নামক এক ব্যক্তি। সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি মালিক ইবন সিনানকে দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদেরই সন্তান আবু সাইদ হিজরতের দশ বছর পূর্বে ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-ইসাবা-৪/৮৮, আল-আলাম-৩/১৩৮) প্রখ্যাত বদরী সাহাবী কাতাদাহ ইবন নুমান (রা.)-উহুদ যুদ্ধে যার চোখ আহত হয় এবং রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুআর বরকতে আবার ভালো হয়ে যায়-আবু সাঈদের বৈপিত্রীয় ভাই। হিজরী ২৩ সনে এই কাতাদাহ মারা গেলে আবু সাঈদ তাকে কবরে নামিয়ে দাফন করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৪২, উসুদুল পাবা-৫/২১১)
বাইয়াতে আকাবা থেকেই মোটামুটি মদীনায় ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু হয়। মদীনাবাসীদের অনেকেই তখন ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই সময় মালিক ইবন সিনান ইসলাম বকুল করেন। স্বামীর সাথে স্ত্রীও মুসলমান হন। সুতরাং আবু সাঈদ মুসলিম মা-বাবার কোলেই বেড়ে ওঠেন। হিজরতের প্রথম বছরেই মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আবু সাঈদ এই নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মোট বারোটি যুদ্ধে যোগ দেন। (তাহজীবুল আসমা-২/২৩৭, আল-আলাম-৩/১৩৮) অল্প বয়সের কারণে বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। উহুদ যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। যুদ্ধের পূর্বে পিতার সাথে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করেন এবং এখনও যুদ্ধের বয়স হয়নি-এই বলে ফিরিয়ে দেন। পিতা মালিক তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ধরে বলেন, ছেলের বযস কম হলে কি হবে, তার হাত দুটি পুরুষের মত সবল। তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেননা। (আল-ইসাবা-২/৩৫; আনসাবুল আশরাফ-১/৩৩০)
এই উহুদ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখমণ্ডল আহত হয়ে রক্ত রঞ্জিত হয়। মালিক ইবন সিনান সেই রক্ত পান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করেনঃ যদি কারও এমন ব্যক্তিকে দেখার ইচ্ছা হয় যায় রক্ত আমার রক্তের সাথে মিশেছে, সে যেন মালিক ইবন সিনানকে দেখে। এরপর বীরের মত যুদ্ধ করে মালিক শাহদাত বরণ করেন।
আবু সাঈদের পিতা কোন সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন না। এ কারণে পিতার মৃত্যুতে তিনি পর্বত পরিমাণ বিপদের সম্মুখীন হলেন। দারিদ্র্য ও অনাহারে সময় পেটে পাথর বেঁধে কাটাতেন। একদিন তিনি প্রচন্ড ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে আছেন। তখন তার স্ত্রী (মমতান্তরে মা অথবা দাসী) তাকে বললেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও, তার কাছে কিছু চাও। অমুক এসে সাহায্য চেয়েছিল, তাকে তিনি দিয়েছেন। আবু সাঈদ বলেনঃ আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলাম তিনি তখন ভাষণ দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ যে ব্যক্তি কোন কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকবে, আল্লাহও তাকে চাওয়া থেকে বিরত রাখবেন। আর যে নিজেকে গনী বা ধনী মনে করে আল্লাহও তাকে ধনবান করে দেন। আর যে আমার কাছে কোন কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকে সে ঐ ব্যক্তির থেকেও আমার বেশি প্রিয় যে আমার কাছে চায়। একথা শুনে আমি আর কিছু চাইলাম না। আমি বাড়ি ফিরে এলাম। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আমাদের রিযকে বরকত বা সমৃদ্ধি দান করতে লাগলেন। অবশেষে, আনসারদের মধ্যে কোন বাড়ি আমাদের চেয়ে বেশি বিত্তশালী ছিল বলে আমি জানতাম না। (মুসনাদ৩/৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা-২/২৫৭)
খন্দক ও বনী মুসালিকের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তবে উসুদুল গাবা গ্রন্থের একটি বর্ণনায় এসেছেঃ আবু সাঈদ বলেনঃ খন্দকের দিন আমার পিতা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে নিয়ে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর হাড় খুব শক্ত। এরপরও তিনি আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে ফিরিয়ে দেন। তিনি আরও বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বনী মুসতালিক যুদ্ধে যোগ দিই। ওয়াকিদী বলেনঃ তখন আবু সাঈদের বয়স পনেরো বছর। (উসুদুল গাবা-৫/২১১, আনসাবুল আশরাফ-১/৩৪৪)
ইমাম আহমাদ আবু সাঈদ খুদারী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা খন্দকের দিন বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের প্রাণ তো গলায় এসে ঠেকেছে। এমন কোন দুআ কি আছে যা আমরা পাঠ করতে পারি? বললেনঃ হ্যাঁ বলঃ আল্লাহুম্মা ইসতুর আওরাতিনা ওয়া আমিন রাওয়াতিনা-হে আল্লাহ আমাদের গোপন বিষয় গোপন রাখ এবং আমাদের ভীতিকে নিরাপত্তা দান কর। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪৮৮)
তিনি বাইয়াতুশ শাজারা বা বাইয়াতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেন। (শাজারাতুজ জাহাব-১/৮১; তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৪) হিজরী ৮ম সনের সফর মাসে আবদুল্লাহ ইবন গালিব লায়সীর নেতৃত্বে একদল সৈন্য ফিদাক যায়। তিনিও এই বাহিনীতে ছিলেন। আবদুল্লাহ সৈন্যদের তাকীদ দেন, তারা যেন বিচ্ছিন্ন না হয়। এই উদ্দেশ্যে তিনি বাহিনীর সদস্যদের পরস্পরের সাথে মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃত্ব প্রতিা করে দেন। তাকেও একজন বিশিষ্ট সাহাবীর সাথে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে দেন।
হিজরী ৯ম সনের রাবী উস সানী মাসে আরকামা ইবন মুখাররকে ছোট একটি বাহিনীসহ একটি অভিযানে পাঠানো হয়। আবু সাঈদ ছিলেন এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য। (মুসনাদ-৩/২৭০; হায়াতুস সাহাবা-২/৬৭)
উপরোক্ত যুদ্ধগুলো ছাড়াও মক্কা বিজয়, হুনাইন, তাবুক, আওতাস প্রভৃতি অভিযানে তার অংশগ্রহণের কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত মোট ১২টি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের চরম অভাব ও দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হুনাইন যুদ্ধে লব্ধ গনীমতের বেশির ভাগ যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসী নওমুসিলমদের খুশী (তালীফে কুলুব) করার জন্য দান করেন তখন মদীনার আনসারদের অনেকেই একটু ক্ষুণœ হন। এ সম্পর্কিত ঘটনা আবু সাদ বর্ণনা করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৯৭-৩৯৮; ৩/৬২৫) তার থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমরা রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যুদ্ধে গিয়েছি রমজান মাসে। আমাদের কেউ সাওম পালন করতো, আবার কেউ করতো না। তবে একে অপরকে কোন রকম হিংসা করতো না। তারা প্রত্যেকেই জানতো যে, যে ব্যক্তি নিজেকে সক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবে, আর এটাই তার জন্য উত্তম। আর যে নিজেকে দুর্বল ও অক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবেনা। আর এটাই তার জন্য উত্তম। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪৭৯)
একবার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একটি ছোটখাট অভিযানে পাঠালেন। বাহিনীর সর্বমোট সদস্য তিরিশজন এবং নেতা আবু সাঈদ। যাত্রা পথে তারা একটি স্থানে তাঁবু স্থাপন করে যাত্রা বিরতি করেন। নিকটেই ছিল একটি জনপদ। তারা সেই জনপদের লোকদের বললেন, আমরা আপনাদের অতিথি। কিন্তু তারা অতিথিদের সেবা করতে পরিষ্কার অস্বীকার করলো। ঘটনাক্রমে সেইদিন উক্ত জনপদের প্রধানকে বিচ্ছুতে কামড়ায়। নানা জনে নানারকম চিকিৎসা চালালো; কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তাদেরকে কেউ পরামর্শ দিল, তোমরা এই অতিথিদের কাছে যাও, তাদের মধ্যে কারও হয়তো কোন চিকিৎসা জানা থাকতে পারে। পরামর্শমত তারা এসে বিষয়টি জানালো। আবু সাঈদ বলরেন, আমি ঝাড়-ফুঁক জানি, তবে পারিশ্রমিক হিসেবে তিরিশটি ছাগল দিতে হবে। তারা রাজি হয়ে গেল। আবু সাঈদ তাদের সাথে গেলেন এবং সূরা মুহাম্মাদ পাঠ করে দংশিত স্থানে একটু থুথু লাগিয়ে দিলেন। তাতেই লোকটি সমপূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। সাহাবায়ে কিরাম তিরিশটি ছাগল নিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। তাদের মনে দ্বিধা ও সংশয় ছিল, এভাবে ছাগলগুলো নেওয়া ঠিক কিনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হবে। মদীনায় পৌঁছেই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘটনাটি খুলে বলেন। সবকিছু শুনে তিনি একটু মুচকি হাসি দেন। তারপর বলেন, তোমরা কিভাবে জানলে যে, এই সূরা ঝাড়-ফুঁকের কাজ দেয়? তোমরা ঠিকই করেছ। বকরীগুলো তোমরা ভাগ করে নেবে এবং আমাকেও একটি অংশ দিতে ভুল করবে না। (সহীহুল বুখারী-১/২৫১)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর তিনি মদীনাতেই অবস্থান করেন। খলিফা হযরত উমার ও হযরত উসমানের (রা.) যুগে ফাতওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। যিয়াদ ইবন মীনার সূত্রে ইবন সাদ বর্ণনা করেছেনঃ ইবন আব্বাস, ইবন উমার, আবু সাঈদ খুদারী, আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ আমর ইবনুল আস, জাবির ইবন আবদিল্লাহ প্রমুখ আসহাবে রাসূল উসমানের মৃত্যুর সময় থেকে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত মদীনায় ফতোয়া দিতেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করতেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২৫৫)
হযরত আলীর (রা.) যুগে খারেজীদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তখন তিনি বলতেন, তুর্কীদের চেয়ে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমি বেশি প্রয়োজন মনে করি। (মুসনাদ-৩/৩৩, ৫৬) হযরত ইমাম হুসাইন যখন মদীনা ছেড়ে কুফায় যাওয়া স্থির করেন, তখন আরও অনেক সাহাবীর মত আবু সাঈদও তাকে এই সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। (সুয়ুতী : তারীখুল খুলাফা)
হিজরী ৫৯ সনে হযরত উম্মু সালামা (রা.) ইন্তিকাল করলে আবু সাঈদ তার জানাযায় শরীক ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪৩২) হিজরী ৬১ সনে হিজাযবাসীরা ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের ইবনুল আওয়ামের (রা.) হাতে বাইয়াত করে। এই বাইয়াতকারীদের মধ্যে হযরত আবু সাঈদ ছিলেন।
হিজরী ৬৩ সনে দারুল হিজরাহ মদীনার অধিবাসীরা ইয়াযীদের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে গাসীলুল মালায়িকা হযরত হানজালার ছেলে হযরত আবদুল্লাহর হাতে বাইয়াত করে তাকে নিজেদের আমীর বলে ঘোষণা দেয়। ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে মদীনাবাসীদের পরাভুত করে। হযরত আবদুল্লাহ ইয়াযীদ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। বিজয়ী ইয়াযীদ বাহিনী সেই সময় মদীনায় হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হারাম বা সম্মানিত শহর মদীনার এমন অসম্মান ও অবমাননা সেই সময় জীবিত সাহাবীরা দেখে দারুন মর্মাহত হন। আবু সাঈদও এমন দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে পাহাড়ের এক গুহায় আত্মগোপন করেন কিন্তু সেখানেও তার খোঁজে একজন পৌঁছে যায় এবং তাকে হত্যার জন্য তরবারি উঠায়। তিনি প্রথমতঃ তাকে ভয় দেখানোর জন্য তরবারি তুলে ধরেন। কিন্তু সৈন্যটি আরও এগিয়ে এলে তিনি তরবারি মাটিতে রেখে দিয়ে সূরা আল-মায়িদার ২৮ নং আয়াতটি পাঠ করেনঃ
যদি তুমি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তোমার হাত বাড়াও তবুও আমি তোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার হাত বাড়াবো না। কারন, আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে ভয় করি।
সৈনিকটি থেমে যায়। সে প্রশ্ন করে, আল্লাহর ওয়াসতে বলুন তো আপনি কে? বললেনঃ
আমি আবু সাঈদ আল খুদারী। আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী? বললেন! হ্যাঁ। সৈনিকটি গুহা ছেড়ে চলে গেল। (আল-ইসাবা-৩/৫৫) আবু সাঈদ গুহা থেকে বাড়ি আসলেন। নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ চললো এবং বন্দী করা হলো। অবশেষে প্রচণ্ড চাপের মুখে ইয়াযীদের প্রতি বাইয়াত করতে বাধ্য হলেন।
একথা হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা.) অবগত হয়ে তার কাছে যান এবং বলেন: শুনেছি আপনি নাকি দুই আমীরের বাইয়াত বা আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছেন? বললেনঃ হ্যাঁ। প্রথমে আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়ের এবং বন্দী হওয়ার পরে ইয়াযীদের প্রতি বাইয়াত করেছি। ইবন উমার বললেনঃ আমি এমনই আশংকা করেছিলাম। আবু সাঈদ বললেনঃ কিন্তু আমার করার কি ছিল? কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মানুষের প্রতিটি সকাল ও সন্ধ্যা কোন না কোন আমীরের অধীনে অতিবাহিত হওয়া উচিত। একথা শুনে ইবন উমার বললেন, যা হোক না কেন, আমি দুই আমীরের প্রতি বাইয়াত পছন্দ করিনে। (মুসনাদ-৩/২৯, ৩০)
বেশি সংখ্যক বর্ণনা মতে তিনি হিজরী ৭৪ সনে (খ্রিঃ ৬৯৩) শুক্রবার মদীনায় মারা যান এবং তাকে মদীনার বাকী গোরস্থানে দাফন করা হয়। অপর একটি বর্ণনা মতে তার মৃত্যু সন হিজরী ৬৪। মৃত্যুকালে অনেক বয়স হয়েছিল। বার্ধক্যের দরুন হাত-পা কাঁপতো। অনেক সীরাত বিশেষজ্ঞের ধারণা, তিনি ৭৪ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। তবে আল্লামা জাহাবী লিখেছেন, তিনি ৮৬ বছর বয়সে মারা যান এবং এটাই সঠিক। (দ্রঃ তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৩৭, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-২/২৩৭, আল-আলাম-৩/১৩৮, শাজারাতুজ জাহাব-১/৮১, উসুদুল গাবা-৫/২১১)
হযরত আবু সাঈদের ছিল দুস্ত্রী। একজনের নাম যয়নাব বিনতু কাব ইবন আজযাহ। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। দ্বিতীয়জন উম্মু আবদিল্লাহ বিনতু আবদিল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ। তার সন্তানদের নাম : আবদুর রহমান, হামযাহ ও সাঈদ।
হযরত আবু সাঈদ ছিলেন আহলুস সুফফার অন্যতম সদস্য। তিনি ছিলেন তার সময়ের একজন শ্রে ফকীহ। কোন ক্বারীর নিকট কুরআন তিলাওয়াত শিখেছিলেন। তার শিক্ষা জীবনে আনসারদের কয়েকটি হালকায়ে দারস ছিল। সেখানে আনসারদের আলিম ব্যক্তিরা দারস দিতেন। আবু সাঈদের ছাত্র জীবনের যুগটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগ। সেই সময় মানুষ ঠিক মত শরীর ঢাকার মত কাপড়ও সংগ্রহ করতে পারতো না। হালকায়ে দারসে একজন আর একজনের আড়ালে আবডালে চুপে চুপে বসে যেত। একদিন এমন একটি হালকায়ে দারসে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত হলেন। তাকে দেখে ক্বারীর কিরাত থেমে গেল। তিনি সবাইকে গোল হয়ে বসতে বলে নিজেও তাদের সাথে বসে গেলেন। সেই হালকায় সে দিন যারা উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে একমাত্র আবু সাঈদকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিনতেন। (মুসনাদ-৩/৬৩, হায়াতুস সাহাবা-৩/২০৪)
হাদীস ও ফিকাহর জ্ঞান তিনি সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্য সাহাবীদের নিকট থেকে অর্জন করেন। চার খলীফা ও যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট থেকে তিনি হাদীস শোনেন। অসংখ্য হাদীস তার মুখস্ত ছিল। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১১৭০টি। যারা বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন তিনি এমন একজন হাফেজে হাদীস। তার বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ৪৩টি মতান্তরে ৪৬টি মুত্তাফিক আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম সম্মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন) এবং বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকেই এককভাবে যথাক্রমে ১৬টি ও ৫২টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে সকল বিখ্যাত সাহাবী ও তাবেঈ তার নিকট থেকে হাদীস শোনেন ও বর্ণনা করেন তাদের কয়েকজনের নাম নিম্নে দেওয়া হল:
যায়িদ ইবন সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস, আনাস ইবন মালিক, ইবন উমার, ইবন যুবাইর, জাবির, আবু কাতাদাহ, ইবন আমর, মাহমুদ ইবন লাবীদ, আবুত তুফায়েল, আবু উমামা ইবন সাহর, সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব, তারিক ইবন শিহাব, আতা, মুজাহিদ, আবু উসমান আন-নাহদী, উবায়দ ইবন উমায়র, আয়্যাদ ইবন আবী সারাহ, বসুর ইবন সাঈদ, আবু নুদবাহ, ইবন সীরীন প্রমুখ। (দ্রঃ আল০ইসাবা-২/৩৫, তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৪, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-২/২৩৭, আল-আলাম-৩/১৩৮)
তার হালকায়ে দারস সব সময় ছাত্রে পরিপূর্ণ থাকতো। কেউ কোন প্রশ্ন করতে চাইলে অনেক প্রতীক্ষার পর সুযোগ পেত। (মুসনাদ-৩/৩৫) দারসের সময় ছাড়াও যে কোন সময় লোকে তার কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা জানতে পারতো। প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিতেন। একবার ইবন আব্বাস ছেলে আলী ও দাস আকরামকে বললেন, যাও তো আবু সাঈদের নিকট থেকে হাদীস শুনে এস। তারা যখন পৌঁছলেন, আবু সাঈদ তখন বাগিচায়, তিনি তাদের সাথে বসেন এবং হাদীস শোনান। (মুসনাদ-৩/৯০, ৯১)
হাদীস বর্ণনার সাথে সাথে কিভাবে তিনি সে হাদীস শুনেছিলেন সে অবস্থারও বর্ণনা দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ বইন উমার (রা.) কোন এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি হাদীস শোনেন। এই লোকটি আবু সাঈদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করে। ইবন উমার ঐ লোকটিকে সঙ্গে করে আবু সাঈদের নিকট যান এবং প্রশ্ন করেনঃ এই ব্যক্তি কি অমুক হাদীসটি আপনার নিকট থেকে শুনেছেঃ আর আপনি কি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন : আমার দুচোখ দেখেছে এবঙ দুকান শুনেছে। (মুসনাদ-৩/৪)
একবার কুযয়া নামক একজন ছাত্রের নিকট একটি হাদীস খুব ভালো লাগে। তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, হাদীসটি কি আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনেছেন? এমন প্রশ্নে তিনি একটু ক্ষুব্ধ হলেন। বললেনঃ তাহলে কি না শুনেই আমি বর্ণনা করছি? হ্যাঁ, আমি শুনেছি। (মুসনাদ-৩/৯১)
যে সকল হাদীস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শোনা শব্দাবলীর ওপর আস্থা না হতো সেগুলো বর্ণনার ব্যাপারে দারুন সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যেমন একবার একটি হাদীস বর্ণনা করলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামটি উচ্চারণ করলেন না। এক ব্যক্তি প্রশ্ন করে বসলো, এটা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত? বললেনঃ আমিও জানি।
আবু সাঈদ হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপদেশ মত তার ছাত্রদের আন্তরিকভাবে স্বাগতম জানাতেন। ইমাম তিরমিযী আবু হারুন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমরা আবু সাঈদের কাছে গেলে বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীয়াতের (উপদেশ) প্রতি স্বাগতম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মানুষ তোমাদের অনুসরণ করবে। কিছু লোক নানা স্থান থেকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে আসবে। তারা যখন তোমাদের কাছে আসবে তোমরা তাদের ভালো উপদেশ দেবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাদেরকে শিক্ষা দেবে এবং বলবে মারহাবা, মারহাবা, নিকটে এস। *(হায়াতুস সাহাবা-৩/২০২, কানযুল উম্মাল-৫/২৪৩)
আবু সাঈদ আরও বর্ণনা করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন তাদের (ছাত্রদের) মজলিসে বসার স্থান করে দিই, তাদের হাদীস শিখাই। কারণ, তোমরাই তো আমাদের পরবর্তী প্রতিনিধি, আমাদের পরবর্তী মুহাদ্দিস। তিনি তার ছাত্রদের আরও বলতেনঃ তুমি কোন বিষয় না বুঝলে তা বুঝার জন্য বার বার প্রশ্ন করবে। কারণ, তুমি বুঝে আমার মজলিস থেকে উঠে যাও-এটা তোমার না বুঝে উঠে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২০৩, কানযুল উম্মাল-৫/২৪৩)
তিনি ছাত্রদের হাদীস লিখে দিতেন না। তাবরানী আবু নাদরাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : আমি আবু সাঈদকে বললাম, আপনি আমাদেরকে হাদীস লিখে দিন। তিনি বললেনঃ আমরা কক্ষণও লিখে দেব না এবং কক্ষণও হাদীসকে কুরআন বানাবো না। তোমরা বরং আমাদের নিকট থেকে এমনভাবে গ্রহণ করো যেমন আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে গ্রহণ করেছি। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২১৭)
হানজালা ইবন আবী সুফইয়ান আল-জুমাহী তার শায়খদের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন! আবু সাঈদ আল-খুদারী অপেক্ষা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘটনাবলীর অধিকতর সমঝদার ব্যক্তি আর কেউ নেই। (তানজীবুল আসমাওয়াল লুগাত-২/২৩৭)
অত্যন্ত সত্যভাষী ছিলেন তিনি। বলতেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্য ভাষণের প্রতি জোর তাকীদ দিতে শুনেছি। হায়, যদি তা না শুনতাম! (মুসনাদ-৩/৫) একবার সত্য ভাষণের হাদীসটির আলোচনা উঠলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তারপর বলেনঃ হাদীসটি তো অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তার ওপর আমল মোটেও হচ্ছে না। (মুসনাদ-৩/৬১, ৭১)
হযরত আমীর মুয়াবিয়ার (রা.) শাসনকালে অনেক বিদয়াতের প্রচলন হতে থাকে। তিনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুয়াবিয়ার (রা.) কাছে যান এবং এক এক করে বিদয়াতের কথা তার কর্ণগোচর করেন। (মুসনাদ-৩/৮৪) একবার আমীর মুয়াবিয়ার সাথে তার আনসারদের সম্পর্কে কথা হয়। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কষ্টে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন আমীর মুয়াবিয়া বললেনঃ তাহলে তোমরা ধৈর্য ধর। (মুসনাদ-৩/৮৯)
একবার উমাইয়্যা খলিফা মারওয়ানের দরবারে বসে সাহাবীদের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শোনালেন। মারওয়ান বিশ্বাস করতে চাইলেন না। উক্ত বৈঠকে হযরত যায়িদ ইবন সাবিত ও রাফে ইবন খাদীজও উপস্থিত ছিলেন। আবু সাঈদ প্রথমে তাদের দুইজনকে স্বাক্ষী মানলেন। তারপর বললেনঃ তারাই বা কেন বলবে? একজনের তো সাদাকার দায়িত্ব থেকে অপসারণের ভয় আছে, আর অন্যজনের আপনার একটু ইশারাতেই গোত্রের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার ভয়। এমন স্পষ্ট কথা শুনে মারওয়ান তাকে কোড়া দিয়ে মারার জন্য উদ্যত হয়। তখন ঐ ব্যক্তিদ্বয় তার কথার সত্যতা স্বীকার করেন। (মুসনাদ-৩/২৩)
এমনিভাবে এক ঈদের দিনে মারওয়ান মিম্বার বের করেন এবং নামাযের পূর্বে খুতবা দেন। এক ব্যক্তি উঠে প্রতিবাদ করে বলে, এ দুটি কাজই সুন্নাতের পরিপন্থী বিদয়াত। মারওয়ান বললেনঃ পূর্বের পদ্ধতি পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, যা কিছুই হোক না কেন, লোকটি তার দায়িত্ব পালন করেছে। আমি হযরত রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করতে দেখে তাহলে তার উচিত শক্তি প্রয়োগে তা প্রতিরোধ করা। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে উচিত মুখে প্রতিবাদ করা, আর তাও সম্ভব না হলে কমপক্ষে অন্তরে তা ঘৃণা করা উচিত। (মুসনাদ-৩/১০)
আমার বিল মারূফ বা সৎকাজের আদেশ। আবেগ এত তীব্র ছিল যে, একবার মারওয়ান হযরত আবু হুরাইরার (রা.) সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে একটি লাশ অতিক্রম করলো। এই লাশের সাথে আবু সাঈদও ছিলেন। মারওয়ান লাশ দেখেও উঠলেন না। তখন আবু সাঈদ তাকে বললেনঃ আমীর, জানাযার জন্য ওঠো। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠতেন। একথা শুনে মারওয়ান দাঁড়িয়ে যান। (মুসনাদ-৩/৪৭, ৯৭) ইবন সাদের মতে এই জানাযাটি ছিল উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার (রা.)। (আনসাবুল আশরাফ-১/৪২৮)
হযরত মুসয়াব ইবন উমাইর যখন মদীনার গভর্নর তখন একবার ঈদুল ফিতরের দিন জিজ্ঞেস করলেন, নামায এবং খুতবার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মপন্থা কি ছিল? আবু সাঈদ বললেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার আগে নামায পড়াতেন। মুসয়াব তার কথামত কাজ করেন। (মুসনাদ-৩/৪)
একবার শাহর ইবন হাওশাব তুর পাহাড় ভ্রমণের ইচ্ছা করেন। তিনি আবু সাঈদের সাথে দেখা করতে আসেন। আবু সাইদ তাকে বলেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন পবিত্র ভূমির প্রতি সফর নিষেধ করা হয়েছে।
ইবন আবী সাসার জঙ্গল খুব পছন্দ ছিল। আবু সাঈদ তাকে বললেনঃ তুমি সেখানে এমন জোরে আযান দেবে যেন গোটা জঙ্গলে তাকবীরের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। (মুসনাদ-৩/৯৫, ৪/৯৩)
তার বোন কোন কিছু পানাহার ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের সাওম পালনে নিষেধ করতেন। আবু সাঈদও সব সময় তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন।
তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসারী। হযরত আবু হুরাইরাহ এক মসজিদে নামায পড়াতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বা কোন কারণে আসতে পারলেন না। তার পরিবর্তে আবু সাঈদ নামায পড়ালেন। তার নামাযের পদ্ধতির সাথে লোকেরা কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলো। তিনি মিম্বারের কাছে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আমি যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নামায আদায় করতে দেখেছি ঠিক সেইভাবে পড়িয়েছি। এখন তোমরা আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করলে তাতে আমার কিছু যায় আসেনা।
তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। একবার তার পায়ে ব্যথা হলো। তিনি পায়ের ওপর পা রেখে শুয়ে ছিলেন। তার ভাই এসে হঠাৎ সেই পায়ে হাত দিয়ে একটি থাবা মারেন। তাতে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। তিনি অত্যন্ত নরমভাবে বললেন, আমাকে ব্যথা দিলে? তুমি তো জানতে আমার পায়ে ব্যথা। ভাই বললেন : হ্যাঁ জানতাম। তবে এভাবে শুতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন।
সরলতা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একবার একটি জানাযার নামাযের জন্য তাকে ডাকা হয়। সবার শেষে একটু দেরিতে তিনি পৌঁছলেন। লোকেরা তার অপেক্ষায় বসে ছিল। তাকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তার জন্য স্থান খালি করে দেয়। তিনি বললেনঃ এ উচিত নয়। মানষের উচিত ফাঁকা জায়গায় বসা। একথা বলে তিনি একটি ফাঁকা স্থানে বসে পড়েন।
আবু সালামা নামে তার এক ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন তাবেঈ। তার সাথে ছিল চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একবার আবু সালামা তাকে ডাক দিলেন। তিনি গায়ে চাদর জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। আবু সালামা বললেন, একটু বাগিচা পর্যন্ত চলুন। আপনার সাথে কিছু কথা আছে। তিনি আবু সালামার সাথে চললেন।
তিনি ইয়াতীমদের প্রতিপালন করতেন। লায়স ও সুলায়মান ইবন আমর তারই পালিত। তিনি হাতে একটি ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন। হালকা-পাতলা ছড়ি তার পছন্দ ছিল। খেজুরের ডাল সোজা করে তিনি ছড়ি বানাতেন। এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী। (মুসনাদ-৩/৬৫)
আনাস বলেন : আনসারদের ২০ জন যুবক সর্বক্ষণ রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবায় নিয়োজিত থাকতো। যে কোন প্রয়োজনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাউকে পাঠাতেন। আবদুর রহমান ইবন আউফ বলেন, চার অথবা পাঁচজন সাহাবী তো কক্ষণও রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ির দরযা থেকে উঠতো না। আবু সাঈদ বলেন, আমরা পালাক্রমে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থাকতাম। (হায়াতুস সাহাবা-২/৬৮৭)
একবার এক ওয়ালিমার অনুানে তাকে দাওয়াত করা হয়। তিনি উপস্থিত হয়ে দেখেন, নানা পদের খাবার প্রস্তুত। বাড়ির লোকদের বললেন, তোমরা কি জাননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দিন দুপুরে খেতেন সে দিন রাতে উপোস যেতেন এবং সকালে নাস্তা করলে দুপুরে খেতেন না? (হায়াতুস সাহাবা-২/৩০৮)
সিফফীন যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমার ইবনুল আস পিতা আমর ইবনুল আসের সাথে হযরত আলীর (রা.) বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে যান। এ কারণে হযরত হাসান ইবন আলী বহুদিন যাবত তার সাথে কথা বলা বন্ধ রাখেন। হযরত আবু সাঈদ (রা.) এ কথা জানতে পেরে আবদুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে হাসানের নিকট যান এবং তাদের দুজনের মনোমালিন্য দূর করে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ পূনঃপ্রতিা করে দেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৩৪
