প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

জেকের শব্দের আভিধানিক অর্থ হল অর্থাৎ-মনে মনে বা মুখে মুখে স্মরণ করা জেকের। এইরূপ ফারসী অভিধান ‘লুগাতে কোশোয়ারী’ ও আরবী অভিধান কিভাবে লিখিত আছে। এখন আমরা সহজে বুঝতে পারলাম মহান আল্লাহকে যদি কেউ মনে মনে স্মরণ করে তাহাকে জেকেরকারী বলা হইবে। আবার যদি কেহ মহান আল্লাহকে একাকী বা মজলিশে মৌখিকভাবে সশব্দে

স্মরণ করে তাহাকেও জেকেরকারী বলা হইবে।
ছহীহ বুখারী শরীফ ২য় খণ্ডে লিখিত আছে-

-হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছেন নিশ্চয়ই হযরত রাসূল মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, মহান আল্লাহ বলিয়াছেন আমার বান্দার ধারণা মতে আমি আছি। যখন বান্দা আমার জেকের করে আমি তখন তার সাথে থাকি। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমি তাহাকে মনে মনে স্মরণ করি। যদি সে আমাকে দলের মধ্যে স্মরণ করে আমি তাহাকে এমন দলের মধ্যে স্মরণ করি যা তাহার দলের চেয়ে উত্তম।

জেকের তিন প্রকার। বর্ণিত হাদীস শরীফে দু’প্রকার জেকেরের কথা উল্লেখ হইল। একটি হল জেকরে কালবী, অপরটি হলো জেকরে লেসানী। তৃতীয় প্রকার হলো জেকরুল জাওয়ারেহ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জেকের। জেকরে লেসানী হয়েছে মৌখিক জেকর, কালবী হচ্ছে আন্তরিক জেকের, জেকরুল যাওয়ারেহ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জেকের।

ব্যাখ্যাঃ- মৌখিক জেকের হচ্ছে যথা তাসবীহ তাহলীল, তাহমীদ, তাকদীস ইত্যাদি। কলবী বা আন্তরিক জেকের হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ রাজির কথা স্মরণ করা। তার মহত্ম, সর্বোনন্ত মর্যাদা এবং তার কুদরতের প্রমাণাদির ওপর চিন্তা ভাবনা করা। আলেম ও ফকীহগনের মাসয়ালা বা কোন বিষয়ের সমাধান বের করার জন্য গবেষণা করা জেকরে লেসানীর অন্তর্ভুক্ত।
জেকরুল জাওয়ারেহ বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জেকের হচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়া। যেমন হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সফর করা। নামাযে উক্ত তিন প্রকার জেকের বিদ্যমান। তাসবীহ, তাহলীল, তাকবীর, সানা ও কিরাত ইত্যাদি তা মৌখিক জেকের। অন্তরের নম্রতা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠা এখলাছ কলবী বা অন্তরের জেকের বটে। কিয়াম, কুউদ, রুকু, সুজুদ ইত্যাদি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জেকের। একদল উলামার উক্তি হইল উক্ত তিন প্রকার জেকের নামাযে নিহিত আছে। সুতরাং আমাকে স্বতন্ত্রভাবে জেকরে লেসানী কেন করতে হবে? অপর দিকে নামাযের ঐ বৈশিষ্ট্য কুরআন পাকে উল্লেখ আছে-

নিশ্চয়ই নামায বিরত রাখে নির্লজ্জ ও খারাপ কাজ থেকে। সুতরাং যিনি নিয়মিত নামায পড়েন তাহার জেকের করে অযথা সময় নষ্ট করায় কোন লাভ নেই। তদুত্তরে বলছি, যদিও নামাযের মধ্যে জেকরে লেসানী, জেকরে কলবী ও জেকরুল জাওয়ারেহ আছে। তথাপিও মহান আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে-

অর্থাৎ- ওহে মুসলমানগণ! যখনই তোমরা নামায পুরা করবে তখনই তোমরা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর জেকের কর। এখন চিন্তার বিষয় হইল নামাযান্তে জেকের করার নির্দেশ কেন দেয়া হইল। সকলে জানেন আল্লাহর বাণী হলো-

নিশ্চয়ই মুমিনগণ রোজহাশরে লাভবান হবেন, যারা নামাযের মধ্যে বিনীত ও নম্র হয়। অথচ ইমাম হউক বা মুক্তাদী নামাযে দাঁড়াইলেই বাজে কথাবার্তা স্মরণ হয়। যার ফলে মুক্তাদী ও ইমাম নামাযের রাকয়াত ও কিরাতে ভুল করে বসে। ১ম রাকয়াতে কোন সূরা পড়িল কত রাকয়াত নামায পড়া হইল ঠিক রাখতে পারেনা। যেমন সহীহ বুখারী শরীফ ১/৮৫ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে-

অর্থাৎ-হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হইতে বর্ণিত আছে। নিশ্চয়ই হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন নামাযের জন্য মুয়াজ্জিন আযান দিতে থাকে শয়তান তখন বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পলায়ন করে। তার উদ্দেশ্য হইল আযানের বাণী শুনবে না। আযান যখন শেষ হইয়া যায় তখন শয়তান ফিরে আসে আবার যখন একামত দিতে থাকে পুনঃ পলায়ন করে। একামত শেষ হলে ফিরে আসে। লোকটির মাঝে ও তার অন্তরের মাঝে খটকা সৃষ্টি করে ও বলে তুমি অমুক বস্তু অমুক বস্তু স্মরণ কর। যার দরুন সে ঠিক করিতে পারে না কত রাকয়াত নামায পড়া হইল, আস্তাগফিরুল্লাহ।
সকলে বর্ণিত হাদীস শরীফ হতে বুঝতে পারলেন, সমস্ত ইবাদতের মূল হলো নামায। আর ঐ নামায খুশু খুযু বিহীন হইলে আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। শয়তানের কারসাজী ও ওয়াস-ওয়াসার ফলে ইমাম মুক্তাদীর কিরাতে ভুল হয় এমনকি রাকয়াতেও ভুল হয়। যার ফলে কখনও ৪ রাকয়াত নামায ৩ রাকয়াত ৪ রাকয়াতের মধ্যে না বসে ৫ম রাকায়াতে বসে থাকে। পেছন থেকে মুক্তাদী তাকবীর বলে। ইমামকে হুশিয়ার করেন। অথচ নামায ভঙ্গ করা যাবেনা। এবং নামায ছাড়াও যাবে না। এক নামায হইতে অন্য এক ওয়াক্তের নামায পর্যন্ত দীর্ঘ টাইম তাতে শয়তান ফাদে ফেলে গুনাহের কাজ করাইয়া জাহান্নামী বানাইবার অপচেষ্টায় রত থাকিবে। তাই দয়ালু দয়াময় মহান আল্লাহ উপরে বর্ণিত আয়াতখানি নাযিল করিয়া জেকর করা ফরয করিলেন। বলিলেন তোমরা চাই দাঁড়াইয়া বসিয়া ও শুয়ে আমার আল্লাহর নামের জেকের কর।
সকলে হাদীস শরীফ হইতে প্রমাণ পাইলেন আযান শুনামাত্র শয়তান পলায়ন করে আযানের পর ফিরে এসে ধোকা দিতে থাকে। শয়তান মানব দেহের কোথায় যে অবস্থান করে এ তথ্য স্ত্রী পুরুষ প্রত্যেকের জানা আবশ্যক।

অর্থাৎ-হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত আছে তিনি বলিয়াছেন, হযরত রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মরদুদ শয়তান সর্বক্ষণ বণী আদমের কলবের উপর বসে আছে। যখন বনী আদম আল্লাহর জেকের করে ওমনি কলব হইতে সরে পড়ে। যখন জেকের হইতে গাফেল হয় তখন প্রতারণা করে।
কুরআন পাকে অনেক আয়াতে জেকের শব্দ আসছে। সব আয়াতে জেকেরের এক অর্থ নয়। কোথাও কুরআন অর্থে, কোথাও হুকুম অর্থে, কোথাও নছীহত, কোথাও বা জেকের অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। তাই প্রথমে জেকের শব্দের উল্লেখ কুরআন পাকে যত আয়াতে আছে সে আয়াতগুলি ধারাবাহিক লিখবো। পরবর্তী পর্যায়ে উহার ব্যাখ্যার মনোনিবেশ করবো।
সূরায়ে বাকারা ১৫২ নং আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেন-

অর্থাৎ-তোমরা আমাকে স্মরণ (জেকের) কর। আমি তোমাদেরকে স্মরণ করবো। আমার প্রদত্ত নিয়ামতের শুকুরিয়া আদায় কর। তোমরা আমার প্রদত্ত নিয়ামতের অবমাননা করিও না।
সূরায়ে আল এমরান ১৯১নং আয়াতে বর্ণিত আছে-

অর্থাৎ-যে সমস্ত ব্যক্তিগণ মহান আল্লাহকে স্মরণ করেন দাঁড়ানো বসা ও শোয়া অবস্থায় এবং আসমান ও যমীনের বিষয়ে গবেষণা করেন।
সূরায়ে নিসা ১০নং আয়াতে আল্লাহ পাক ফরমান-

অর্থাৎ-যখন তোমরা নামায আদায় করবে তখন আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করিবে দাঁড়াইয়া বসিয়া ও শয়ন করিয়া।
সূরায়ে মায়েদা ৯১নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ-নিশ্চয়ই শয়তান চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা সৃষ্টি করিতে মদপানের মধ্যে। তোমাদিগকে বিরত রাখতে আল্লাহর জেকের ও নামায হইতে। সূরায়ে আরাফ ২০৫নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ-তুমি তোমার প্রভুকে অন্তরে ও মনে বিনয় ও ভীতির সহিত জেকের কর সকাল সন্ধ্যায় বা পূর্বাহ্নে ও অপরাহ্নে অল্প আওয়াজে।
সূরায়ে আনফাল ২ নং আয়াতে এরশাদ হচ্ছে-

অর্থাৎ-মুমিন তাহারাই যারা আল্লাহর স্মরণ হওয়া মাত্র তাহাদের অন্তর কাঁপিয়া উঠে, আয়াত পাঠ করিলে ঈমান বৃদ্ধি হইতে থাকে এবং আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হয়। সূরায়ে ত্বোয়াহা ১২৪নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার জেকের করেনা এ ব্যক্তির জীবন যাপন করা অতি কষ্ট সাধ্য হইবে এবং রোজ কিয়ামতে তাহাকে অন্ধ করিয়া উঠাইবো।
সূরায়ে ত্বোয়ারা ১৪নং আয়াতে এরশাদ হচ্ছে-

অর্থাৎ- আমার স্মরণে নামায কায়ম কর।
সূরায়ে নূর ৩৭নং আয়াতে উল্লেখ আছে-

অর্থাৎ-এমন কতকগুলো লোক আছে যাহাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও বেচাকেনা, আল্লাহ পাকের জেকের, নামায প্রতিষ্ঠা ও যাকাত প্রদান হইতে গাফিল করেনা।
সূরায়ে আহযাব ৪১নং আয়াতে উল্লেখ আছে-

অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ পাকের জেকের মহান। অন্য আয়াতে আছে-

অর্থাৎ- ওহে ঈমানদারগণ! মহান আল্লাহর বেশি বেশি জেকের কর। সকাল ও সন্ধ্যায় তাহার তাসবীহ পাঠ কর।
সূরায়ে যুমার ২১ ও ২৩ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন-

অর্থাৎ- নিশ্চয়ই উল্লেখিত ঘটনায় জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ নিহিত। মহান আল্লাহর জেকের হইতে যাহাদের হৃদয় শক্ত ও কঠোর হইয়াছে। তাহাদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য। যারা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করেন, তাহাদের চামড়ার উপর লোমগুলি ভয়ে খাড়া হইয়া যায়। অতঃপর তাহাদের শরীরের চামড়াগুলি নরম হইয়া যায় ও অন্তরগুলি আল্লাহর জেকেরের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
সূরায়ে যুখরুফ ৩৬ নং আয়াতে উল্লেখ আছে-

অর্থাৎ- যে ব্যক্তি রহমান অর্থাৎ আল্লাহ মেহেরবানের জেকের হইতে বিরত থাকে আমি ঐ ব্যক্তির জন্য শয়তানকে কয়েদ (আবদ্ধ) করিয়া দেই। যার ফলে শয়তান তার জীবনের সাথী হইয়া যায়। সূরায়ে হাদীদ ১৬নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ-মহান আল্লাহর জেকের ও সত্য যা অবতীর্ণ হয়েছে, সেই জন্য মুমিনদের অন্তর ভীত হওয়ার সময় কি নিকটবর্তী হয়নি?
সূরায়ে মুযযাম্মিল ৮নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ- আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাহাতে মগ্ন হোন।
সূরায়ে মুনাফিকুন ৮নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ- ওহে ঈমানদারগণ! তোমাদিগকে মাল ও আওলাদ যেন আল্লাহর জেকের হইতে গাফিল না করে।
সূরায়ে মুজাদালা ১৯ নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ-শয়তান তাহাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতঃ তাহাদিগকে আল্লাহ তায়ালার জেকের ভুলাইয়া দিয়াছে। তাহারা হইল শয়তানের দল। সাবধান! শয়তানের দল নিঃসন্দেহে বিপর্যয়ের অধিকারী।
সুরায়ে জ্বিন ১৭নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার প্রভুর জেকের (স্মরণ) থেকে বিরত থাকবে, তজ্জন্য প্রভু তাহাকে ঊর্ধ্বে আরোহণের শাস্তি দিবে। সূরায়ে আ’লা ১৫ নং আয়াতে আছে-

অর্থাৎ- আর সে তার প্রভুর নাম জেকের করিয়া নামায পড়িল।