প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
১২৭. মদীনা জনশূন্য হয়ে যাবে
১. খারাপ লোকেদেরকে বের করে দিয়ে একদা জনশূন্য হয়ে যাওয়া কিয়ামাতের আরেকটি আলামত। আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ এমন এক সময় আসবে যখন জনৈক ব্যক্তি তার চাচাতো ভাই এবং নিকটাত্মীয়কে বলবেঃ মদীনা ছেড়ে সচ্ছলতার দিকে আসো! মদীনা ছেড়ে সচ্ছলতার দিকে আসো! অথচ মদীনা তাদের জন্য অনেক ভালো যদি তারা জানতো। সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! তাদের কেউ মদীনা ছেড়ে চলে গেলে আল্লাহ্ তা’আলা তারা চাইতেও আরো উত্তম ব্যক্তি সেখানে নিয়ে আসবেন। আরে মদীনা তো হাপরের মতো যা খারাপকে বের করে দিবে। কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না মদীনা তার খারাপ লোকগুলোকে সেখান থেকে বের করে দেয় যেমনিভাবে হাপর লোহার জং দূর করে। (মুসলিম ১৩৮১)
২. মদীনা থেকে খারাপ লোকদের বের করে দেয়ার ব্যাপারটি বিশেষ বিশেষ সময় এবং বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। যা একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ একদা জনৈক বেদুইন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললোঃ আমাকে ইসলামের উপর বায়আত করুন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- তাকে ইসলামের উপর বায়আত করেন। পরদিন সে জ্বরাক্রান্ত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বললোঃ আমার বায়আত খানা ফিরিয়ে নিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানান। সে ফিরে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ মদীনা তো হাপরের ন্যায়। সে খারাপকে দূরীভূত করে এবং ভালো তাতে আরো ভালো হয়ে দেখা দেয়। (বুখারী ৭২১৬;১৩৮৩)
৩. দাজ্জাল বের হওয়ার পরও তা আবার সংঘটিত হবে। আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ এমন কোন শহর থাকবে না যেখানে দাজ্জাল প্রবেশ করবে না। তবে মক্কা ও মদীনাতে সে প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানকার প্রতিটি গলি পথকে ফিরিস্তাগণ সারিবদ্ধভাবে পাহারা দিবে। অতঃপর তিন তিন বার মদীনা কেঁপে উঠবে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা সেখান থেকে প্রতিটি কাফির ও মুনাফিককে বের করে দিবেন। (বুখারী ১৮৮১; মুসলিম ২৯৪৩)
৪. বর্ণিত আছে, উমর বিন আব্দুল আজীজ (রহ.) যখন মদীনা থেকে বের হয়ে যান,তখন মুযাহিমের (কৃতদাস) দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন- “ওহে মুযাহিম! মদীনা কি আমাদের নির্বাসনে দিয়ে দিল?!!”
মদিনা ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসতি করলে-ই মুনাফিক হয়ে যাবে, এমনটি আবশ্যক নয়। সাহাবায়ে কেরাম-ও দাওয়াত এবং জিহাদের লক্ষে মদিনা ছেড়ে গিয়েছিলেন।
৫. কিয়ামাতের নিকটবর্তী সময়ে মদীনার সকল লোক মদীনা ছেড়ে চলে যাবে। আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ একদা সবাই এ সর্বশ্রেষ্ঠ মদীনা শহরটি ছেড়ে চলে যাবে। তখন তাতে থাকবে শুধু বুনো হিংস্র পশু ও পাখি। সর্বশেষ যাদের হাশর হবে তারা হবে মুযাইনাহ্ গোত্রের দু’জন রাখাল। তারা মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবে। মদীনায় পৌঁছে যখন তারা তাদের ছাগলপালকে ডাকবে তখন সেগুলো তাদেরকে দিকবিদিক ভাগতে থাকবে। পরিশেষে যখন তারা সানিয়াতুল ওদা‘ নামক স্থানে পৌঁছুবে তখন তারা উপুড় হয়ে পড়ে যাবে। (বুখারী ১৮৭৪;মুসলিম ১৩৮৯)
৬. বসবাসের উপযোগী সত্ত্বেও অধিবাসীগণ মদীনা ছেড়ে দেবেন। অথচ মদীনার ফসল-ফলাদি বরকতময়। বসবাস স্বাচ্ছন্দ্যকর। কিন্তু শেষ জমানায় নানান ফিতনা মানুষকে মদীনা ছাড়তে বাধ্য করবে। এক পর্যায়ে সকল ঘরবাড়ী বিরান পড়ে থাকবে। শেয়াল-কুকুর মসজিদে ঢুকে মিম্বরে পেশাব করবে, পরিস্কার করার কেউ থাকবে না।
৭. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমরা একদা অবশ্যই এ সুন্দর মদীনা শহরটি ছেড়ে চলে যাবে। এমনকি তখন কুকুর-শেয়াল মসজিদে নববীর কোন না কোন পিলার কিংবা মিম্বারের গোড়ায় প্রস্রাব করে দিবে। সাহাবাগণ বলেনঃ হে আল্লাহ’র রাসূল! তখন এ ফল-ফলাদির মালিক হবে কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ সেগুলো তখন হিংস্র পশু পাখির খাদ্য হবে । (মুযাস্তা মালিক:২/৮৮)
৮. জাবির (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ জনৈক আরোহী মদীনার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াবে অতঃপর বলবেঃ এতে তো একদা অনেক মুসলমানই না বসবাস করতো! (আহ্মদ্১/১২৪)
৯. ইমাম ইব্নু কাসীর (রহ.) বলেনঃ দাজ্জাল এবং ঈসা (আঃ) এর যুগেও মদীনায় জনবসতি থাকবে। ঈসা (আঃ) সেখানেই মৃত্যু বরণ করবেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হবে। এরপরই মদীনা ধ্বংস হয়ে যাবে।
১২৮. জেরুজালেম আবাদ
১. মুয়ায বিন যাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- “ জেরুজালেমে স্থাপত্য গড়ে ওঠা মদীনা বিনাশের নিদর্শন। মদীনার বিনাশ মানে বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। বিশ্বযুদ্ধের সূচনা মানে কনষ্ট্যান্টিপোল বিজয়। কনষ্ট্যান্টিপোল বিজয় মানে দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ। অতঃপর নবীজী সাহাবীর ঘাড়ে হাত মেরে বললেন-তুমি এখানে বসে আছ যেমন সত্য,এগুলোর বাস্তবায়ন তেমন-ই সত্য।”(আবু দাউদ)
বিনাশ বলতে এখানে-মদীনায় বসতি ও পর্যটক শূন্যতা উদ্দেশ্য।
২. অপর বর্ণনায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ বিশ্বযুদ্ধ, কনষ্ট্যান্টিপোল বিজয় এবং দাজ্জাল প্রকাশ। তিনটি ঘটনা সাত মাস অন্তর অন্তর ঘটে যাবে।” (তিরমিযী)
৩. একটা শেষ না হতে না হতেই অপরটা শুরু হয়ে যাবে। একটার সাথে অপরটা ওত-প্রোতভাবে জড়িত। জেরুজালেম তথা বায়তুল মাকসিদের আশপাশের প্রচুর জন-বসতি গড়ে উঠবে। এর পরপরই মদীনা-অধিবাসি শূন্য হয়ে যাবে। বর্তমান আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি,মদীনায় দিন দিন বসতি কমে যাচ্ছে উন্নত শহরগুলোর দিকে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে।
৪. জেরুজালেম আবাদ বলতে শেষ জমানায় সেখানে মুসলিম খেলাফত প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমনটি আব্দুল্লাহ বিন হাওয়ালা (রাঃ) এর হাদীসে এসেছেঃ তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে পদব্রজে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আনতে পাঠালেন। আমরা কিছু না পেয়ে খালী হাতে ফিরে এলাম। নবীজী আমাদের চেহারায় কষ্টের ছাপ দেখে দাড়িয়ে বলতে লাগলেন- হে আল্লাহ! একদা সার্বিক দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করবেন না! আমি অপারগ। এদের নিজেদের উপর-ও করবেন না! তারা-ও অপারগ। সর্বসাধারণের উপর-ও ন্যস্ত করবেন না! আত্মসাৎ করে ফেলবে!অতঃপর নবীজী আমার মাথার উপর হাত রেখে বলতে লাগলেন- ওহে ইবনে হাওয়ালা জেরুজালেমে যখন খেলাফত প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাবে, (মনে রেখো) তখন ভূ-কম্পন, বিপদাপদ এবং বৃহৎ নিদর্শনগুলো কাছিয়ে গেছে। কিয়ামাত তখন তোমার মাথা থেকে আমার হাত অপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী।” (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)
অর্থাৎ কোরআনের শাসন চালু হওয়ার পর সকল মুুসলমান বায়তুল মাকসিদে চলে যাবে। শামের দিকে মুসলমানদের হিজরতের বিষয়টি পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। এভাবেই মদীনা বসতি-শূন্য হয়ে পড়বে।
১২৯. কাহতান গোত্রে মান্যবর ব্যক্তির আর্বিভাব
১. কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, আরবের প্রসিদ্ধ ক্বাহতান গোত্র থেকে এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির আবির্ভাব হবে, একবাক্যে সবাই তাকে নেতা বলে মেনে নেবে।
২. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ কিয়ামাত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ক্বাহতান গোত্র থেকে একজন নেতার আর্বিভাব হবে। লাঠি দিয়ে সকল মানুষকে সে চালিয়ে নেবে।” ( বুখারী -মুসলিম)
৩. লাঠি দিয়ে চালানোর অর্থ হচ্ছে, তার নেতৃত্বে সবাই সরল পথে চলবে। একবাক্যে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেবে। এখানে কেবল-ই উদাহরণ দেয়া হয়েছে, লাঠি ব্যবহার উদ্দেশ্য নয়। বুঝাই যায়-খুব-ই কঠোর হবে।
৪. ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত অপর বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, “তিনি সৎ ও নিষ্টাবান হবেন।”
তিনি স্বাধীন হবেন, “জাহজাহ”- এর মত কৃতদাস নয়।
