প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
শবে বরাতে হালুয়া-রুটি, ঈদের দিনে সেমাই ও আশুরার সময় খিচুড়ী-শরবতের ব্যবস্থা করাও বর্তমান কালে একটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। হাদীসে শবেবরাত সম্পর্কে এতটুকু বর্ণিত হয়েছে যে, সে রাতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার হুকুমে জান্নাতুল বাকীতে তশরীফ নিয়ে সেখানকার কবরবাসীদের রূহে মাগফেরাতের জন্য মোনাজাত করেছিলেন। এ হাদীসের উপর আমল করা ছাড়া অন্য সব রীতি-নীতি পালন কুসংস্কারের অন্তর্ভুক্ত। এসবের ক্ষতিকারক দিকগুলো নি¤েœ সংক্ষেপে বর্ণিত হলো
এক. কোন কোন জাহেল বলে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ার পর তিনি হালওয়া শিরনী করেছিলেন। একথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। একথা বিশ্বাস করা জায়েয হবে না। সাধারণ বিবেচনায়ও তা সম্ভব নয়। কারণ, ওহুদ যুদ্ধ শাবান মাসে নয় বরং শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছিল।
দুই. কেউ কেউ বলেন, এইদিনে হযরত আমীর হামযা (রা.) শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তারই রূহের মাগফেরাতের উদ্দেশ্যে এই দিন হালুয়া-রুটি বিতরণ করা হয়। এটা একটা অমুলক ধারণা। কেননা, তার শাহাদাতও শাওয়াল মাসে হয়েছিল; শাবানে নয়।
তিন. অনেক লোকের বিশ্বাস, শবে-বরাত ইত্যাদি পুণ্যময় রজনীসমূহে মৃত আত্মীয়-স্বজনের রূহ ঘেরে ঘরে হাজির হয়ে দেখে তাদের জন্য কেউ কোন কিছু রান্না করছে কিনা? বলাবাহুল্য, এ জাতীয় গোপন তত্ত্ব সম্পর্কে শাস্ত্রীয় অকাট্য দলিল ভিন্ন অন্য কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয়। আর শাস্ত্রে এর কোন দলির নেই।
চার. অনেকের ধারণা, শবে-বরাতের পূর্বে যার মৃত্যু হয়েছে, শবে-বরাতে ফাতেহা আদায় না করা পর্যন্ত তার রূহ অন্যান্য মৃতদের সাথে মিশতে পারবে না। এ ধারণাও সম্পূর্ণ বানোয়াট।
হাদীসে আছে, ‘কারো মৃত্যু হলে তার রূহ সাথে সাথেই তার সমপর্যায়ের লোকদের কাছে পৌঁছে যায়। এটা তো কোথাও নেই যে-‘শবে বরাত পর্যন্ত রুহ আটকে থাকে।’
পাঁচ. হালুয়া-রুটি না হলে যেন শবে-বরাতই হলো না। এ রাতে হালুয়া প্রস্তুত করাকে অতীব জরুরি মনে করে লোকজন আক্বীদাগত ভ্রান্তিতে পতিত হয়। আর এ প্রথাকে ফরয-ওয়াজিবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কার্যগত ভ্রান্তির শিকার হয়। এ উভয় প্রকার ভ্রান্তি যে অত্যন্ত গর্হিত কাজ তা প্রথম অনুচ্ছেদে বিস্তারিত ভাবে আলোচিত হয়েছে। তাছাড়াও এ প্রথা পালন করতে গিয়ে নিয়তেও ভ্রান্তি সৃষ্টি হয় বলে বিজ্ঞজনের নিশ্চিত বিশ্বাস। বর্তমান কালে সওয়াব লাভের আশায় হালুয়া-রুটি প্রস্তুত করা হয় না; বরং আসলে উদ্দেশ্য থাকে যে, শবে-বরাতে যে করেই হোক তা পালন করতে হবে, নতুবা লোকে মন্দ বলবে। এই নিয়তে খরচ করা অপব্যয় ও অহংকার-তাই তা পাপ। অনেক সময় প্রথা পালনের জন্য সুদে ঋণ নিতেও দেখা যায়, যা একটা স্বতন্ত্র গোনাহ।
ছয়. সাহায্য পাওয়ার যোগ্য লোকজন শবে-বরাতের হালুয়া-রুটি থেকে বঞ্চিত হয়, অথবা নি¤œমানের শিরনী প্রস্তুত করে তাদের মাঝে বিতরণ করা হয়। আর ভালোগুলো কেবল আত্মীয়-স্বজন ও বড়লোকদের বাসায় আদান-প্রদান করা হয়। এই সময় সকলেরই নিয়ত থাকে যে, ‘অমুক আমার বাসায় শিরনী পাঠিয়েছে, আমি যদি তার বাসায় কিছু না পাঠাই তাহলে সে কি মনে করবে?’ অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রেও রিয়া ও অহংকারের উপস্থিতি সুস্পষ্ট।
সাত. অনেকে এই রাতে মুশুরীর ডাল রান্না করে থাকে। এই প্রথার উৎপত্তির কারণ আজ পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি, তবে একে অত্যাবশ্যক মনে করা যে গোনাহের কাজ তা নিঃসন্দেহে বলতে পারি। খাদ্য রান্না করার কুসংস্কার ছাড়াও এ রাতে আতশবাজিও করা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রথম অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা এসে গেছে।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো কিছু লোক শবে-বরাতে সারারাত জেগে থাকার জন্য এত গুরুত্ব সহকারে আত্মীয়-স্বজনদেরকে নিজ বাড়িতে জড়ো করে থাকে যে তাতে ফরয কর্তব্যও গুরুত্বহীন বলে মনে করে। ঘরে বেশি লোকের সমাগম হলে রাত জাগা সহজতর হয় সত্য, তবে নফর ইবাদতের জন্য এত গুরুত্ব দিয়ে বেশি লোক জমা করা শরীয়তী বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হ্যাঁ, আমন্ত্রণ ছাড়াই যদি কিছু লোক একস্থানে জড়ো হয়ে যায় তাহলে কিছু আসে যায় না।
আট. কিছু লোক শবে-বরাতের সময় ঘরের বাসন-কুসন পরিবর্তন করা, ঘর লেপা এবং এই রাতে অতিরিক্ত বাতি জ্বালিয়ে ঘর আলোকিত করাকে অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। এ জাতীয় রুসুম কাফেরী রীতির অনুরূপ। আর হাদীসে বিজাতীয়দের অনুকরণকে হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
হাদীসে শবে-বরাতের সময় তিনটি কাজ সুন্নত মতো করাকে সওয়াব ও বরকত লাভের উপায় বলা হয়েছে। প্রথমতঃ পনেরো তারিখ রাতে কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা। সাথে সাথে গরীব-মিসকীনদেরকে কিছু দান করে সে দানের সওয়াবটুকু ঐ মৃতদের নামে বখশে দিলে আরো ভাল হবে। সেই মুহূর্তে হাতে না থাকলে অন্য সময় গোপনে কিছু দান করে দেবে। তবে প্রচলিত প্রথার অনুকরণ করলে শরীয়তের সীমা লঙ্ঘিত হবে। দ্বিতীয়তঃ রাত জেগে একা একা বা বিনা আমন্ত্রণে জড়ো হয়ে যাওয়া দু’চার জনের সাথে ইবাদতে মশগুল থাকা। তৃতীয়তঃ শাবানের পনেরো তারিখ নফল রোজা রাখা।
ঈদুল ফিতরের দিন সেমাই তৈরি করা মূলতঃ মুবাহ কাজ। কিন্তু সাধারণ লোকেরা এতে নানাপ্রকার কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়েছে।
এক. তারা একে এতই জরুরি মনে করে যে, সেমাই না হলে যেন ঈদটাই মিছে। একটা মুবাহ কাজকে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা যে শরীয়ত বিরোধী কাজ তা আগেই বলা হয়েছে।
দুই. নিজের অর্থ না থাকলে সুদে ঋণ নিয়ে হলেও এ রীতি পালন করা হয়। অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে ঋণ করা শরীয়তে জায়েয নাই।
তিন. এই সম্পর্কিত একটি বানোয়াট বর্ণনা সাধারণ্যে প্রচলিত রয়েছে যে, ফাতেমা (রা.) আটার সেমাই তৈরি করেছিলেন। এটা একটা অপবাদ ছাড়া কিছু নয়। হাদীস গ্রন্থসমূহে এ জাতীয় কোন বর্ণনা খুঁজে পাওয়া যায় না।
চার. আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবগণ পরস্পরের বাড়িতে ঈদের সেমাই প্রেরণ করে থাকেন। গ্রহীতাগণ এ দানকে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে সাথে সাথেই বা পরবর্তী ঈদের তা পরিশোধ করে থাকেন। এমতাবস্থায় তুলনামূলক ভাবে সচ্ছল ব্যক্তি অসচ্ছল বন্ধুর বাড়িতে ঈদের সেমাই পাঠিয়ে তাকে ঋণগ্রস্ত হতে বাধ্য করেন। কেননা, এ দান পরিশোধ করা সমাজের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। ঈদের দিন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু পরিমাণ খুরমা সাথে করে ঈদগাহে নিয়ে যেতেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সুস্বাদু খাদ্য হিসাবে দুধ সেমাই ইত্যাদি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে তা যেন প্রথা পালনের উদ্দেশ্যে না হয়। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলে অযথা সংকোচ বোধ করা উচিত।
দশই মহররম সম্পর্কে হাদীসে যে দুইটি বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলো, এক, নয় ও দশই মহররম রোযা রাখা এবং দুই, দশ তারিখ পারিবারিক প্রয়োজনে সামর্থানুযায়ী বেশি করে ব্যয় করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে আছে, এই কাজ করলে সারা বছর আয়-রোজগার বরকত হয়। এই দুই কাজ ছাড়া অন্য সব কিছু নিষিদ্ধ।
নিষিদ্ধ প্রথাসমূহের বর্ণনা নিচে প্রদত্ত হলো-
এক. তাজিয়া প্রস্তুত করা। অনেক প্রকার ফাসেকী ও মুশরেকী চিন্তাধারার ফসল এ তাজিয়া (নাউযুবিল্লাহ), এতে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) সমাসীন হয়ে থাকেন বলে কোন কোন জাহেলের বিশ্বাস। এ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই তারা তাজিয়া পাদদেশে নযর-নিয়াজ দিয়ে থাকে। গায়রুল্লাহর নামে উৎসর্গ করার দরুন এসব নযর-নিযাজ খাওয়া হারাম। তাজিয়ার সামনে হাত জোড় করে বিনয়াবনত অবস্তায় দাঁড়ানো, এর দিকে পশ্চাৎ না ফিরানো, এতে বিভিন্ন প্রতীক ও ব্যানার টাঙ্গানো, একে দেখতে যাওয়াকে যিয়ারত বলে অভিহিত করা ইত্যাদি আরো নানাধরনের শেরেকী ব্যবহার করা হয় এ তাজিয়ার সাথে। তাজিয়ার সাথে জাহেলদের এ ব্যবহার করা কোরআন শরীফের আয়াত-‘তোমরা কি নিজেদের গড়া বস্তুর পুজা কর’ এর বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। যে তাজিয়াকে একদিন সীমাতিরিক্ত সম্মান করা হয়, তাকেই আবার একদিন অবর্ণনীয় অবহেলা ভরে জনহীন প্রান্তরে ফেলে দেওয়া হয়-এর রহস্য কি? সত্যিই, শরীয়ত যাকে অন্যায় মনে করে তা বুদ্ধিরও পরিপন্থী। কোন কোন অপদার্থ বলে, হযরত হুসাইন (রা.)-এর সাথে এই তাজিয়ার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায়, তাই তো এটা সম্মান পাবার যোগ্য। এর জবাবে বলবো, হযরত হুসাইনের সাথে যা সম্পর্কিত তাকে সম্মান করা তো খারাপ কিছু নয়, কিন্তু সম্পর্কটা বাস্তবিক হতে হবে অবশ্যই। যেমন, হযরত হুসাইন (রা.)-এর পোশাক-আশাক ইত্যাদি আমাদের কাছেও সম্মানের। মনগড়া সম্পর্ক সৃষ্টি করলে সেটা কোন মতেই সম্মানযোগ্য হবে না। নতুবা, ভবিষ্যতে কেউ স্বয়ং হুসাইন (রা.) হওয়ার দাবি করলে তাকে আরো বেশি সম্মান করতে হবে। অথচ, হুসাইন হওয়ার মিথ্যা দাবিদারকে প্রতারক ও মিথ্যাবাদী বলতে কেউ ছাড়বে না, এটা সুনিশ্চিত। অতএব, বুঝা গেল মিথ্যা সম্পর্কের দরুন কোন বস্তু সম্মানার্হ হতে পারে না, বরং আরো অপমানিত ও তিরস্কৃত হয়। এখন আপনারাই বিবেচনা করুন, তাজিয়া সম্মানিত হবার যোগ্য না অপমানিত হবার যোগ্য।
দুই. ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো। হাদীসে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় এর নিষিদ্ধতা বর্ণিত হয়েছে। হাদীসটি প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কাজ একদিকে যেমন শরীয়ত বিরোধী অপরদিকে তেমনি বিবেকেরও পরিপন্থী। এ বাদ্যযন্ত্রগুলো তো আসলে আনন্দ প্রকাশার্থে ব্যবহৃত হয়, শোকাহত অবস্থায় এগুলো বাজিয়ে কি প্রকৃতপক্ষে উল্লাস করা হয় না?
তিন. ফাসিক-ফাজিরগণ সম্মিলিত হয়ে অবর্ণনীয় কুকীর্তির সূত্রপাত ঘটায়।
চার. আশুরার দিনে আহাজারি করা বা জারী পেটানো। একে হাদীসে কঠোরভাবে তিরস্কৃত করা হয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর রেওয়ায়াতে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, ‘হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহাজারিকারী ও তা শ্রবণকারীর ওপর লানত করেছেন।’
পাঁচ. মর্সিয়া (শোকগাঁথা) পাঠ। ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে, ‘রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মর্সিয়া থেকে নিষেধ করেছেন।’
ছয়. আশুরা উপলক্ষে বানোয়াট হাদীস বর্ণনার হিড়িক পড়ে। একে হাদীসে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
সাত. আশুরা পালন উপলক্ষে সাজ-সজ্জা থেকে বিরত থাকাকে ‘শোক’ বলা হয়। ইসলামী শরীয়তে শোক পালন সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী চার মাস দশদিন এবং বিধবা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক পালন করবে। অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা জায়েয নয়। অতএব চৌদ্দশ’ বছর পর এখন সে শোক পালন নিঃসন্দেহে হারাম হবে।
আট. আশুরা উপলক্ষে বিশেষ ধরনের বা রঙের পোশাক পরে শোক প্রকাশ করা ইবনে মাজায় হযরত ইমরান ইবনে হোসাইনের (রা.) বরাত দিয়ে এই মর্মে এক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা এক জানাযায় গিয়ে দেখলেন সেখানে উপস্থিত লোকজন শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে চাদর ছেড়ে জামা গায়ে দিয়ে এসেছে, ঐ অঞ্চলে এই ভাবে শোক প্রকাশের রীতি প্রচলিত ছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ অবস্থা দেখে অত্যন্ত অসস্তুষ্ট হয়ে বললেন, তোমরা কি জাহেলী কাজ শুরু করেছ! না কি জাহেলী প্রথার অনুকরণ করছো? আমার ইচ্ছা হচ্ছিল, তোমাদের উপর এমন বদদোয়া করি যেন তোমাদের চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। একথা বলার সাথে সাথে সবাই নিজ নিজ চাদর খুলে ফেলেন এবং এরপর আর কোনদিন একাজ করেননি। উপরোক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন বিশেষ ধরণের বেশ ধারণ করা হারাম।
নয়. কোন কোন লোক আপন বাচ্চাদেরকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষা করিয়ে থাকে। একজন করলে বাচ্চা দীর্ঘায়ু হবে বলে বিশ্বাস করা একটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত আক্বীদা, যা সুস্পষ্ট শিরক। তাছাড়া একান্ত বাধ্য না হয়ে ভিক্ষা করাও হারাম।
দশ. মহররম উৎসব পালন করে সমাজে নবী-বংশের মানমর্যাদা ক্ষুণœ করা হয়। বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা কোন সম্ভ্রান্ত বংশের মহিলাগণ লাঞ্ছিতা হলে তা প্রচার করে বেড়ানো সেই বংশের পুরুষদের নিকট অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। অথচ বড়ই আফসোসের বিষয় যে, আশুরার দিনে নবী-বংশের অবস্থা প্রচার করতে তাদের লজ্জায় মোটেও বাঁধে না, বরং আরো অনেক ধরণের ঘৃণিত কাজে মত্ত হয়ে তারা আনন্দ অনুভব করে। যে সকল বৈঠকে এ ধরণের মানহানিকর বক্তব্য রাখা হয় সে সকল বৈঠকে অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান করা হারাম। ‘চেহলাম’ নামক প্রথা পালন করতে গিয়েও উপরোক্ত কু-রীতিসমূহ অনুসরণ করা হয়।
কোন কোন বিষয় এমনও রয়েছে যেগুলো মূলতঃ মুবাহ বা জায়েয হলেও আক্বীদাগত ও কার্যগত বিভ্রান্তি সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে সেগুলো নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। যেমন-
এক. খিচুড়ী ইত্যাদি রান্না করে আত্মীয়-বান্ধব ও গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তার সওয়াব ইমাম হুসাইন (রা.)-কে বখশে দেওয়া। ‘এ দিনে যে ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের জন্য মুক্ত হস্তে খরচ করবে, আল্লাহ তা’আলা সারা বছর তার আয়-রোজগারে বরকত দেবেন’। এই মর্মে বর্ণিত হাদীসের উপর ভিত্তি করে বলা যায়, আশুরা উপলক্ষে খিচুড়ী বা অন্যান্য খাদ্য-বস্তু প্রস্তুত ও বিতরণে কোন দোষ নেই।
দুই. শরবত পান করানোও মূলতঃ মুবাহ কাজ। কেননা, পানি পান করালেই যখন সওয়াব মিলে, শরবত পান করালে মিলবে না কেন? কিন্তু এক্ষেত্রেও রুসুমের দাসত্ব। এ প্রথার তৃতীয় একটি অন্তর্নিহিত দোষ হলো, লোকে মনে করে, কারবালার শহীদগণ যেহেতু পিপাসার্ত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেছেন, কাজেই তাদের সেই পিপাসা নিবারণের জন্য শরবত পান করানো উচিত। এই কারণেই তারা শরবত পান করায় এবং বিশ্বাস করে যে, এতেই কারবালার শহীদানের তৃষ্ণার উপশম ঘটবে। এ জাতীয় বিশ্বাস যে ভ্রান্ত ও কোরআন মজীদের শিক্ষার পরিপন্থী তা দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। যদি বলেন, পান করানোর সওয়াব পৌঁছে থাকে, তাহলে বলবো, শুধু যে শরবত পান করানোর সওয়াবই তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারে তা কিভাবে বুঝলেন। অন্যান্য সওয়াবও তো একই রকম, অন্য কাজের সওয়াবে তৃষ্ণা নিবারিত হবে না কেন? তাছাড়া, তাদের বিশ্বাস মোতাবেক মনে হয় যেন কারবালার শহীদগণ আজ পর্যন্ত পিপাসার্তই রয়ে গেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) কত বড় অশালীন বিশ্বাস ও কাজ। এ জাতীয় ভ্রান্তির দোষেই এই কাজ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
তিন. সহীহ রে
ওয়ায়েতসমূহের উদ্ধৃতি দিয়ে শাহাদাতের কারবালার ঘটনা বর্ণনা করা মূলতঃ জায়েয ছিল, কিন্তু নিম্নোক্ত অশুভ কারণসমূহের দরুন তা নাজায়েয হয়ে গেছে। যেমন-(এক) হায়-হুতাশ করা, শোক উদ্রেক করা ও আহাজারী করার উদ্দেশ্য নিয়েই কারবালার ঘটনা বর্ণনা করা হয়। অথচ তা সম্পূর্ণ শরীয়ত বিরোধী। কেননা, সহানুভ’তি প্রকাশ ও শোক-দুঃখে ধৈর্যধারণ করতে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যেই শরীয়ত শাহাদাতের বর্ণনা সম্বলিত বক্তব্যকে জায়েয রেখেছে। শরীয়তের বিরোধিতা করা জঘন্য অপরাধ ও হারাম। এই কারণেই স্বেচ্ছায় স্মরণ করে আহাজারী করা জায়েয নয়, তবে শোকে মুহ্যমান হয়ে চোখে অশ্রু আসলে তাতে গোনাহ হবে না। (দুই) আহাজারী করার জন্য লোকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শরীয়ত বিরোধী কাজের জমায়েত আহ্বান করাও নিষিদ্ধ। (তিন) এতে করে রাফেজীদের অনুকরণ করা হয়। কাজেই এ জাতীয় সমাবেশ অনুষ্ঠান করা বা এতে যোগদান করা উভয়ই নিষিদ্ধ। মুতালিবুল-মুনিনীন কিতাবে একে স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শরীয়তের নীতিমালা থেকেও এর পক্ষে সায় পাওয়া যায়।
