প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
তায়েফ অবরোধ ও বার শহীদের রক্ত বৃথা যায়নি
মালেক ইবনে আওফ হোনায়েনে পরাজিত হয়ে তায়েফ পালিয়ে গেলো। আশ্রয় নিলো বনু সাকিফ-এর মজবুত কেল্লায়। তার হৃদয় পরাজয়ের লজ্জা থেকে জন্ম নিলো প্রতিশোধের আগুন। মুসলমানদেরকে পুনঃমুকাবিলা করার জন্যে সেখানে বসেই সে সৈন্য সংগঠিত করতে লাগলো। বনু সাকিফ তার পাশে দাঁড়ালো। পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিলো।
নবীজী তায়েফের দিকে রওয়ানা দিলেন। পৌঁছেই কেল্লা অবরোধের নির্দেশ দিলেন। অবরোধ ছিলো বেশ শক্ত। দুশমনের মনোবলও বেশ তুঙ্গে। তারা আত্মসমর্পন করলো না। দিনের পর দিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকলো। দুশমনের তীর-বৃষ্টির কারনে সামনে অগ্রসর হয়ে কেল্লা দখল করাও সম্ভব হলো না। কেল্লা দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। এ চেষ্টায় শহীদ হয়েছেন বারজন বীর মুজাহিদ। তবুও কোনো কাজ হলো না। দুশমনও আত্মসমর্পণ করলো না, কেল্লাও বিজিত হলো না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর সামনে বাড়লেন না। পরামর্শ করে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন। সবাইকে নিয়ে ফিরে গেলেন মক্কায়। তারপর মদীনায়। তবে তায়েফ অভিযান ব্যর্থ হয় নি। বার শহীদের রক্ত বৃথা যায় নি। বনু সাকিফ ও হাওয়াযেন গোত্রের অনেকেই এরপরে ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছিলেন।
রোম সম্রাটের দোরগোড়ায় জিহাদের কাফেলা
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস ইসলামের কথা বেশ আগেই জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি এবং এতো বিস্ময়করভাবে যে ইসলামের উত্থান-প্রবাহের ঢেউ জাযিরাতুল আরবের সীমানা পেরিয়ে অন্যান্য দেশেও আছড়ে পড়বে, তা রোম সম্রাট স্বপ্নেও ভাবেন নি। ইসলামকে এখন নিছক কোনো ধর্ম নয় – এক বিস্ময়কর বিজয়ী শক্তি হিসাবে বিবেচনা করতে বাধ্য হলেন তিনি। বাধ্য না হয়ে উপায় কী? তার সুসজ্জিত সেনাবাহিনী এবং তার দেশের নিরাপদ অস্তিত্বের জন্যে ইসলাম এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের বিস্ময়কর উত্থান এবং তার ক্রমপ্রসারমানতার সংবাদ যতোবার তার কানে আসছে ততোবারই কেঁপে উঠছে তার ক্ষমতার প্রাসাদ।
এখন তাহলে কী করা? … ভাবতে লাগলেন মহা শক্তিধর, রোম সম্রাট। ভেবে ভেবে অবশেষে তিনি স্থির করলেন যে, এক্ষুনি থামিয়ে দিতে হবে ইসলামের বিজয় অভিযান। এক্ষুনি বাঁধ দিতে হবে ইসলামের উত্থান-প্রবাহের মুখে।
তিনি আর দেরী করলেন না। ইসলামের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ন হতে সৈন্য বাহিনীকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। বন্ধু! এসো একটু পেছনে যাই।
মুতা যুদ্ধের কথা কি তোমাদের মনে আছে? যে যুদ্ধে তিন তিনজন বীর সেনাপতি লড়াই করতে করতে শহীদ হয়েছিলেন?
শেষে যে যুদ্ধের হাল ধরেছিলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ? এবং যে যুদ্ধে দুশমন নিধন করতে করতে নয় নয়টি তলোয়ার ভেঙ্গে গিয়েছিলো তাঁর হাতে? অতঃপর বিস্ময়কর রণ-কৌশল প্রয়োগ করে এবং দুশমনকে বোকা বানিয়ে যিনি ফিরে এসেছিলেন নিরাপদে মদীনায়?
হ্যাঁ, সব মনে পড়েছে? তোমাদেরকে পেছনে তাকাতে বললাম তার কারণ হলো- সেই মুতা যুদ্ধটা হয়েছিলো এই রোমক বাহিনীর সাথেই। ইসলামের বিজয়-অভিযানে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এখন আবার সেই রোমকরাই ইসলামের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে যুদ্ধের ডাক দিয়েছে।
যাই হোক; নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথা সময়ে রোম সম্রাটের রণ-প্রস্তুতির খবর পেলেন। তিনিও দিলেন জিহাদের ডাক । শুধু তাই নয়; একেবারে রোমকদের দোরগোড়ায় গিয়ে জিহাদ করার ডাক!
প্রতিকুলতার কাঁটাবনঃ তবুও লাব্বাইক!!
তখন সময়টা ছিলো বড়ো অসময়, কেননা সে সময় প্রতিপক্ষ ছিলো- রোমক পরাশক্তি। পথ ছিলো যেমন দূরের তেমনি কষ্টের। মওসুমও ছিলো প্রচণ্ড গরমের। সাহাবাদের কাছে নেই সওয়ারী, নেই প্রয়োজনীয় অর্থকড়ি।
তা ছাড়া সময়টা ছিলো গাছে গাছে ফল পাকার, ঘরে ঘরে ফসল তোলার। এই প্রতিকুলতার কাঁটাবনে যখন জিহাদের ডাক এলো, পৃথিবীর সেরা সমর শক্তি মুকাবিলার যখন ঘোষণা এলো, তখন সাহবায়ে কেরাম কী করলেন? ভয় পেলেন না সাড়া দিলেন? সতত স্বতস্ফূর্ততায় না অনিচ্ছায়- সাড়া দিলেন? কী মনে হয় বন্ধু!
আছে কি মনে সন্দেহের কোনো বিন্দু? অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম দিয়েছিলেন সাড়া!
স্বতস্ফূর্ত সাড়া!
কেনো দেবেন না তাঁরা সাড়া? মন-মানস যে তাঁদের নববী বিদ্যাপীঠে গড়া!! রাসূলের আহবানের সামনে কিসের আবার দূরের পথ? কষ্টের পথ?
রাসূলের আহবানের সামনে কিসের আবার ভয় মহাশক্তির? কিংবা পরাশক্তির?
রাসূলের আহবানের সামনে কিসের আবার ফল-ফসলের মায়া? গাছ-গাছালির ছায়া? রাসূলের আহবানের সামনে কেনো আসবে বাধা? কেনো থাকবে দ্বিধা? তাঁরা তো ঈমান এনেছেন দুনিয়ার মায়াজালকে ছিন্ন করতে! রক্ত-মূল্যে হলেও পরকালের ঠিকানা খরিদ করতে?
তাঁরা তো ঈমান এনেছেন যে কোনো কঠিনকে চোখ রাঙাতে! নাযুকতর পরিস্থিতিতেও লড়তে-বীর-বীক্রমে। শাহাদাতের পেয়ালা কে না চায় পান করতে। সুতরাং রাসূলের নেতৃত্বে এখন যাত্রা হবেই তাবুকের দেশে, রোমক বাহিনীর অহঙ্কারের দেশে! সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দেশে! ইসলামের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদানকারীদের দেশে!!
ইতিহাসের পাখায় ভর করে এসো চলে যাই আমরাও পুন্য যামানায়!
শরিক হয়ে যাই সেই পুন্য কাফেলায়!! কতো রোমই তো এখন সামনে, তাহলে তাবুক কেনো আসবে না সামনে?
যুদ্ধবীররা যখন দানবীর
এবার ডাক এলো দানের । ডাক এলো সাহায্যের। খোদ রাসূলের পক্ষ থেকে। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে তাই সাড়া পড়তে একটুও দেরী হলো না। যাঁর কাছে যা ছিলো, যাঁর ক্ষমতায় যতোটুকু কুলালো তা-ই নিয়ে সবাই ছুটে এলেন রাসূলের দরবারে।
আবদুর রহমান বিন আওফ (রাযি.) এলেন ঊনত্রিশ উক্বিয়া রূপা নিয়ে।
হযরত উসমান (রাযি.) এলেন নয়শত উট নিয়ে। একশত ঘোড়া নিয়ে। আরো অনেক দিরহাম-দীনার নিয়ে। হযরত আবু বকর ( রাযি.) হাজির হলেন সবকিছু নিয়ে। ঘরে কিছুই রেখে এলেন না । রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) জানতে চাইলেন
ঘরে কী রেখে এসেছো?
জবাব এলো বিনীত কন্ঠে
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে!
কী ঈমানদীপ্ত জবাব!
কী ভালবাসাময় জবাব!
আরো এগিয়ে এলেন হযরত আব্বাস (রাযি.)। হযরত তালহা (রাযি.)। হযরত তালহা (রাযি.)। হযরত আসেম ইবনে আদী (রাযি.)। আরো অনেক সাহাবী। রাযিআল্লাহু আনহুম।
এগিয়ে এলেন অনেক মহিলা সাহাবীও। কেউ নিয়ে এলেন স্বর্ণের অলংকার। কেউ নিয়ে এলেন নিজের ব্যবহার সামগ্রী। তারপর দেখতে দেখতেই প্রস্তুত হয়ে গেলো তাবুক অভিযানের জন্যে ত্রিশ হাজার বিশাল বাহিনী।
তাবুকের ময়দানে
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধে গেলে কোথায় যাচ্ছেন এবং কাদের এ যুদ্ধে, তা সাধারনত গোপন রাখতেন। এটা ছিলো তাঁর একটি কৌশল। উদ্দেশ্য ছিলো-শত্রু বাহিনী যেনো আগে-ভাগেই অভিযানের খবর না পেয়ে যায়। কিন্তু তাবুক অভিযান ছিলো ব্যতিক্রম। এ অভিযানের সব কথা তিনি সবাইকে আগে-ভাগেই জানিয়ে দিলেন । প্রস্তুতি শেষে একদিন সবাইকে নিয়ে তিনি তাবুকের পথে রওয়ানাও হয়ে গেলেন।
প্রায় পনের দিনের দীর্ঘ সফর শেষে কাফেলা একদিন তাবুক এসে পৌঁছলো। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে সেখানে হাজার হাজার তাঁবু খাটানো হলো।
রোমক বাহিনী কোথায় ? তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর কী? হ্যাঁ, রোমক বাহিনী খুব জোরেসোরে যুদ্ধপ্রস্তুতি নিলো ঠিকই, কিন্তু সিংহের গর্জনে সারা বনের অসহায় জীব-জন্তুর মাঝে যেমন ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে তাদের মাঝেও তেমন ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েলো। একেবারে তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় মুসলিম বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ ও সবর উপস্থিতিতে তাদের বীরত্ব ও সাহসিকতার অহংকার ধুলোয় মিশে গেলো। সকাল বেলার কুয়াশার মতো শুকিয়ে গেলো। তবে বনের ভীত-সন্ত্রস্ত জীব-জন্তুর মতো তারা ছুটোছুটি শুরু না করলেও অবশ মানুষের মতো সুরক্ষিত হিমস নগরীতে বসে থাকলো। কখন না আবার এই সুরক্ষিত দুর্গ-এ এসেই মুসলিম সৈন্যরা হামলা চালায়, সেই আশঙ্কায় তাদের বীর মন থরোথরো কাঁপতে লাগলো।
আল্লাহর নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) বিশ দিন তাবুক অবস্থান করলেন। এর মধ্যে দুর্ধর্ষ রোমক বাহিনী সুরক্ষিত হিমস নগরী থেকে একেবারের জন্যেও বের হয়ে একটু উঁকি পর্যন্ত দিলো না । নবীজীও একেবারে তাদের ঘরে ঢুকে আক্রমন করা ঠিক মনে করলেন না । তাই বিশ দিন পর মদীনার পথে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন।
ফিরে এলেন সবাই-
সোনালী বিজয়ের মালা গেঁথে
নবীজীর ফিরে আসার খবরে মদীনায় আনন্দের বান ডেকে গেলো। দলে দলে তারা ছুটে এলো সানিয়্যাতুল ওয়াদা পাহাড়ি উপত্যকার দিকে- নবীজীকে স্বাগত জানাতে ।
চোখে-মুখে তাদের দীপ্ত ছড়াচ্ছিলো খুশির আলো।
কন্ঠে-কন্ঠে তাঁদের বেজে উঠলো আবার সেই স্বাগত সঙ্গীত-
ঐ তো আমাদের আলো দিতে উদয় হয়েছে পূর্ণিমার চাঁদ সানিয়্যাতুল ওয়াদা উপত্যকার মুখে!
