প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
মূর্তি ভাঙ্গার সেই ক্ষণে!
একটু পর আল্লাহ্র রাসূলের নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরাম ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলেন কাবায় স্থাপিত তিনশত ষাট দেবতার মূর্তি। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম তখন পড়েছিলেন আয়াত
সত্য এসে গেছে, মিথ্যা অপসৃত হয়েছে। মিথ্যা সব অপসৃয়মান। (সূরা বানী ইসরাঈল)
কিছুক্ষন পর এলো যখন নামাযের সময়, হযরত বেলাল (রাযি.) আরোহণ করলেন কাবার ছাদে। আযান দিলেন গলা খুলে। আল্লাহর রাসূলের ইমামতিতে সবাই নামায আদায় করলেন এখানে।
হোনায়ন যুদ্ধ :
পৌত্তলিকতার শেষ কামড়
মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। দলে দলে, গোত্রে গোত্রে মানুষ ইসলাম কবুল করতে লাগলো। কিন্তু কিছু গোত্র তখনো জাহেলিয়াত ও পৌত্তলিকতার অন্ধকারেই ডুবে ছিলো। হৃদয়ে তাদের ইসলামের আলো প্রবেশ করলো না। কুফরীর অন্ধকার বের হলো না। ইসলামের প্রতি ঘৃনা ও বিদ্বেষে তারা বরং জ্বলছিলো এখনো, আর মক্কা বিজয়ের পরও ইসলামকে মিটিয়ে দেওয়ার দুঃস্বপ্ন দেখছিলো। এদের মধ্যে হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্রের লোকজন ছিলো পুরোভাগে। হাওয়াযেন গোত্রের লোকেরা যখন দেখলো যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম এর হাতে মক্কার পতন ঘটেছে এবং কাবার শত শত দেবতার আসন ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে, তখন দলপতিরা ভীষন ক্ষেপে গেলো। অবিলম্বে তারা এক জরুরি সভা তলব করলো। সবাই এক বাক্যে মত প্রকাশ করলো
মক্কা এখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম -এর পদানত। আমাদের খুব কাছেই এখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম অবস্থান করছেন। যে কোনো মুহূর্তে আমরা আক্রান্ত হতে পারি। সুতরাং আগেই আমাদের আক্রমন করা উচিত।
এ কথায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পর সবাই মালিক ইবনে আওফের নেতৃত্বে যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে হোনায়ন অভিমুখে যাত্রা করলো। হোনায়ন-এ পৌছে তারা শিবির স্থাপন করলো এবং মুসলমানদের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রইলো। সেনাপতি মালিক ইবনে আওফের নির্দেশে একদল দক্ষ তীরন্দাজও প্রস্তুত ছিলো। তাদের লক্ষ্য ছিলো- পৌঁছা মাত্রই মুসলমানদের উপর আকস্মিকভাবে আক্রমন করা এবং পরে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়া। যাতে সূচনাতেই মুসলমানগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং বিজয়-লাভ সহজ হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি সফল গেরিলা আক্রমনের লক্ষ্যে তারা এখানে গোপনে অপেক্ষা করেছিলো।
এদিকে দুশমনের যুদ্ধযাত্রার সংবাদ যথা সময় জানতে পারলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম । দেরি না করে তিনিও বার হাজারের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রওয়ানা দিলেন হোনায়ন প্রান্তরের উদ্দেশ্য। কিন্তু আাগেই যেমনটা বলেছি, দুশমন এখানে আকস্মিক গেরিলা হামলার জন্যে ওঁৎ পেতে বসে ছিলো। তাই মুসলমানগণ হোনায়ন এসে একটু স্থির হয়ে দাঁড়াতেও পারলেন না, অমনি তাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে নিক্ষিপ্ত হতে লাগলো তীর-বৃষ্টি। দুশমনের পরিকল্পনা সফল হলো। তীর-বৃষ্টির তীব্রতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। এরপর যখন আরো আকস্মিকভাবে দুশমন তাদের উপর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তখন মুসলিম শিবিরে চরম বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়লো। যে যেদিকে পাড়লো ছুটে গেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলো। এ দিকে এ খবর ও রটিয়ে দেওয়া হলো যে রাসূল নিহত হয়েছেন। মুসলিম শিবিরের বিশৃংখলার সাথে তখন যোগ হলো হতাশা। কিন্তু নিবেদিতপ্রাণ সাহাবায়ে কেরাম পরিস্থিতি সামলে উঠলেন। পরে রাসূলের বেঁচে থাকার খবরে তাঁরা উদ্দীপ্ত হয়ে দুশমনের মুকাবিলায় রুখে দাঁড়ালেন। বীর-বীক্রমে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত বিজয়ও ছিনিয়ে আনলেন।
আসলে হোনায়ন যুদ্ধে প্রথম দিকের বিপর্যয় ছিলো মুসলমানদের জন্যে একটা পরীক্ষা। কেননা এ যুদ্ধে মুসলমানগণ সংখ্যাধিক্যের কারনে বেশ উৎফুল্ল ছিলেন। অনেকেই ভাবছিলেন যে আজ আমরা অনেক বেশি। বিজয় আমাদের হবে। এ বিজয়-চিন্তাটা আল্লাহ পচ্ছন্দ করেন নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামও পছন্দ করেন নি। তাই প্রথমে আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিপদের মুখোমুখি করে জানিয়ে দিলেন-সংখ্যাবলে বিজয় আসে না। বিজয় আসে শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে। (চলবে)
