প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

যিকর নং ১ : তাহলীল
লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) :

এটি এক্ষেত্রে সর্বশ্রে ও সর্বপ্রথম যিকর। অনেক আবেগী মানুষ লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু-কে যিকর হিসাবে পালন করা অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তারা বলেন, এ কালেমাই ঈমান। একবার সর্বাস্তকরণে বললেই হলো। এরপরের কাজ নিজের জীবনে, সমাজে ও রাষ্ট্রে এ কালেমাকে প্রতিষ্ঠা করা। বারবার আউড়ে কী হবে? বিবাহের কালেমা ও ইজাব কবুল তো একবারই বলা হয়। এতেই আজীবন স্বামীর ঘর করতে হয়। বারবার আউড়ানোর কোনো প্রয়োজন হয় না।
কথাটি শুনতে খুব যৌক্তিক মনে হলেও কিছুটা বিভ্রান্তিকর ও সুন্নাহ বিরোধী। কালেমার ঘোষণার মাধ্যমে ঈমান আনার পর আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিা করতে হবে একথা অবশ্যই ঠিক। কেউ যদি তার উপর অর্পিত ফরয দায়িত্ব পালন না করে নফল যিকরে রত থাকেন তাহলে তার এ কর্ম বাতুলতা ও ইসলামের শিক্ষা বিরোধী। কিন্তু এজন্য এ কালেমার যিকরকে অর্থহীন বললে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই অবমাননা করা হয়। কারণ, তিনি নিজেই এ কালেমাকে বেশি বেশি পাঠ করে যিকর করতে বলেছেন।

লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু বাক্যটি বারবার জপ করার মাধ্যমে আল্লাহর যিকর করার নির্দেশনায় এবং এ যিকরের অচিন্ত্যনীয় ফযীলতের ঘোষণায় অগণিত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (এ জাতীয় কিছু হাদীস দেখুন : তুহফাতুয যাকিরীন, পৃ. ২৩০-২৫২) আসলে ঈমান আনার পরে ঈমানকে মজবুত করতে ও নবায়ন করতে এ যিকর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে সুন্নাতের আলোকে আমরা জানতে পারি। জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : সর্বোত্তম যিকর লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু এবং সর্বোত্তম দুআ আলহামদুলিল্লাহ। হাদীসটি সহীহ। (তিরমিযী (৪৯-কিতাবুদ দাআওয়াত, ৯-বার. দাওয়াতার মুসলিম মুসতাজাবা) ৫/৪৩১ (ভা. ২/১৭৬); ইবন মাজাহ (৩৩-কিতাবুল আদাব, ৫৫-বাব ফাদলিল হামিদীন) ২/১২৪৯ (ভারতীয় ২/২৬৯); সহীহ ইবনু হিব্বান ৩/১২৬, মাওয়ারিদুয যামআন ৭/৩২৬-৩২৯, মুসতাদরাক হাকিম ১/৬৭৬, ৬৮১)
অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে অন্তরকে যিকিরের সাথে আলোড়িত করার চেষ্টা করতে হবে। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন :
কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত লাভকারী সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সে-ই হবে, যে তাঁর অন্তরের পরিপূর্ণ একাগ্রতা দিয়ে লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ বলবে। (বুখারী (৩-কিতাবুল ইলম, ৩৩-বাবুল হিরসি আলাল হাদীস) ১/৪৯ (এবং ৫/২৪০২); (ভা:১/২০)
উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি;
আমি এমন একটি বাক্য জানি, যে বাক্যটি যদি কেউ তাঁর অন্তর থেকে সত্যিকারভাবে বলে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে জাহান্নাম তাঁর জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বাক্যটি: লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ। হাদীসটি সহীহ। (মুসতাদরাক হাকিম ১/১৪৩, ৫০২
কাজেই মুমিন সর্বান্তকরণে অন্তরের সকল আবেগ ও অনুভূতি দিয়ে সর্বদা এ বাক্যটি বলবেন, যেন মৃত্যুর আগে এ বাক্যটি তাঁর শেষ বাক্য হয়। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
তোমাদের ঈমানকে নবায়ন কর। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো: ইয়া রাসূলুল্লাহ, কিভাবে আমরা আমাদের ঈমানকে নবায়িত করবো? তিনি বললেন: তোমরা বেশি বেশি লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু বলবে। হাদীসটির সনদে দুর্বলতা আছে। (পূর্ববর্তী সংস্করণে লিখেছিলাম যে, হাদীসটির সনদ হাসান। কিন্তু বিস্তারিত পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে হাদীসটি যয়ীফ। দেখুন: মুসতাদরাক হাকিম ৪/২৮৫, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৫২, ২/২১১, ১০/৮২, আত-তারগীব ২/৩৯৪; ইতহাফুল খিয়ারাহ ২/৩৪৬; আলবানী, যায়ীফাহ ২/৩০০)
অন্য হাদীসে মুআয ইবনু জাবাল (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
যার সর্বশেষ কথা হবে লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদীসটি সহীহ। (মুসতাদরাক হাকিম ১/৬৭৮)
বস্তুত, যে ব্যক্তি সর্বদা এ যিকিরে তাঁর জিহ্বাকে রত রাখবেন, ইন্শাআল্লাহ, এ বাক্য তাঁর জীবনের শেষ বাক্য হবে। আমরা পরবর্তী আলোচনায় লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু যিকর সম্পর্কে আরো অনেক হাদীস দেখব, ইনশা আল্লাহ।

(রাহে বেলায়েত)