প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৬৫.হকদারের হক ন করলে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে

হক্কুল ইবাদ বা মানুষের হক কড়ায়-গণ্ডায় আদায়যোগ্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ মানুষকে সচরাচর এ বিষয়ে পরোয়া করতে দেখা যায় না। ধর্মপরায়ণতা কেবল নামায, কুর্তা ও দাঁড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখা যায়। হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলেন, কিয়ামতের দিন কোন ব্যক্তির একশতটি নাফরমানী (অবাধ্যাচরণ) নিয়ে ওঠার অপরাধ; অন্য ব্যক্তির একটি মাত্র ক্ষুন্নকৃত অধিকার ও দায় নিয়ে উঠার চেয়ে অধিকতর হালকা হবে। কারণ তার পক্ষে অন্যের হকসমূহ আদায়ের প্রতি অধিক যতœশীল হওয়া এবং মানবাধিকার সম্পর্কে পূত্র-পবিত্র হয়ে (পরকালে) ওঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয়। পরজীবনে পাওনাদার ব্যক্তির নিকট থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার আশা করা নির্বুদ্ধিতা ও বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষ সেখানে অত্যন্ত অসহায় অবস্থার মুখোমুখি হবে। অনেকের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও দুঃখজনক হবে। চরম নিরুপায় ও বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে একটু ঠাঁই ও মুক্তির চিন্তায় বিভোর থাকবে। প্রত্যেকে তার প্রাপ্য কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নিয়ে যাবে। উপমহাদেশের প্রচলিত উত্তরাধিকার সম্পর্কে দাবিদার পীর, ফকির ও ভণ্ড ব্যক্তি প্রমুখ স্বাভাবিকভাবে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হবে।

মৃত ব্যক্তি ইন্তেকালের পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ শরীয়তের বিধান অনুযায়ী স্বার্থপর ও লোভী ব্যক্তি মৃতের ইয়াতীম সন্তান ও বিধবা স্ত্রীর অংশ সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ ও ভক্ষণ করে। আবার অনেকে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানদের টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি যৌথসম্পদের মধ্যে মিশ্রিত করে খরচ করে। বিনিময় নিয়ে কুরআন শিক্ষা দেয় ইত্যাদি হারাম ও নিষিদ্ধ। ত্রিশা, চল্লিশা ইত্যাদি পালন করা হয় ইত্যাদি নবসৃ (বিদআত) কাজ। এসব কাজের মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য থাকে। ইয়াতীম ও বিধবাদের সম্পদ (যা তারা উত্তরাধিকার হিসেবে পায়) কুসংস্কার ও বিদআতী কাজে ব্যয় করে। অথচ শরীয়া মুতাবিক মীরাস বণ্টন সম্পর্কে গলাবাজি করে। সাধারণত দেখা যায়, দুই স্ত্রী ও সন্তানের মধ্যে যে স্ত্রী ও সন্তানের অধীনে যতটুকু ধনসম্পদ থাকে ততটুকুই তারা জোরপূর্বক ভক্ষণ করে। অথচ চিন্তা করে না যে তা যৌথ সম্পদ বিধায় উভয় স্ত্রী ও সন্তানদের প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ রয়েছে শরীয়তের নিয়ম সীমানার মধ্যে থেকে উত্তরাধিকারী আইন (বণ্টন নীতি) কার্যকর ও প্রয়োগ হবে। যদি শরীয়তসম্মত পন্থায় ধনসম্পদ বণ্টন করা না হয়, বরং যার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে সম্পদ আছে সে যদি প্রাপকদের যথাযথ প্রাপ্য অংশ পৌছে (বুঝে) না দেয় বরং নিজে বিভিন্ন প্রকার কৌশল অবলম্বন করে আত্মসাৎ করে তবে সে হারাম ও অন্যের হক ন করার মহাপাপে লিপ্ত হবে। সম্পদের প্রতি এমন অন্যায় ও অসত্য লিপ্সা পরকালে মানুষকে কঠিন আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করবে। দুনিয়াবাসীদের অবস্থা বর্ণনা করে সূরা ফজরের মধ্যে বলা হয়েছে : না কখনও নয়, বরং আপনারা ইয়াতীমকে সম্মান করেন না এবং অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত করেন না এবং উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পদ সম্পূর্ণরূপে ভক্ষণ করে ফেলেন এবং ধনসম্পদ অতিশয় ভালোবাসেন।’ (ফজর : আয়াত-১৭-২০)

প্রকৃতপক্ষে মানুষের সম্পদের প্রতি লোভ-লালসা ইয়াতীমকে সম্মান করতে দেয় না। এতে তাদের প্রতি চরম অত্যাচার করা হয়। তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অংশ গায়েব করা হয়, লুটপাট করা হয়। এভাবে বিভিন্ন প্রকার হীন কৌশল ও পন্থায় তাদের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়। কোন ইয়াতীমকে দেখিয়ে চাঁদা উঠিয়ে যে সম্পদ সঞ্চয় করা হয় তা আত্মসাৎ বা ভক্ষণ করলে সরাসরি ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণের অন্তর্ভুক্ত হবে। বস্তুত বর্তমান সমাজে সুুভাবে মীরাস বণ্টন না করে ঘরে ঘরে অসহায় ইয়াতীমের সম্পদ লুটপাট ও আত্মসাৎ করা হচ্ছে। যেমনÑ সূরা নিসার মধ্যে বলা হয়েছে : যারা সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তো তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে; তারা অচিরেই দোযখের জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করবে।’ (নিসা : আয়াত-১০)

৬৬.ঋণের দ্বারা সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়

ঋণ একটি অশুভ বিপদ। বড়দের পক্ষ থেকে এ প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, ঋণ ভালোবাসার কাঁচি স্বরূপ।’ করজ শব্দের আভিধানিক অর্থ কর্তন করা। অনেকে ঋণ গ্রহণ করতে খুবই অভ্যস্ত। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করতে থাকে। যখন বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে যায় একপর্যায়ে নির্ভিক ও বেপরোয়া হয়ে যায়। এরা সর্বদা এমন ব্যক্তিকে টার্গেট করে যার কাছে চাওয়া মাত্র অতি সহজে ঋণ পাওয়া যায়। কোন স্থানে অপরিচিত ও নতুন ব্যক্তির কাছে উঠাবসা করলে ঋণ নিয়ে তাকে করে মধ্যে নিক্ষেপ করে। ঋণ গ্রহণের পর আশে-পাশে ঘোরাফেরা করে কিন্তু ঋণ পরিশোধের নাম উচ্চারণ করে না।

নেওয়ার সময় ভিন্নমুখ (সুর) ছিল। নেওয়ার সময় অনুনয়-বিনয়ের সাথে চেয়েছিল। পালিত বিড়ালের মতো নরম ও কোমল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঋণদাতা টাকা ফেরৎ চাইলে গ্রহীতা তার চেহারা পর্যন্ত দেখতে নারাজ। হঠাৎ দেখে ফেললে তার মধ্যে জ্বর উঠে যায়। আবার অনেকে দুঃসাহস দেখিয়ে বলে, আমি দিতে পারব না, যা পার কর ইত্যাদি। লক্ষণীয় যে, ঋণ একান্ত নিরুপায় অবস্থায় গ্রহণ করতে হয়। আবার যখনই পরিশোধের ব্যবস্থা হয় যায় তখনই পরিশোধ করতে হবে। টাকা যখন উপার্জন হবে তখন পরিশোধ করবে বলে ঝুলিয়ে রাখবে না। প্রয়োজনে গৃহের জিনিসপত্র বিক্রয় করে, শ্রম বিক্রি করে যেভাবেই হোক এবং যতই ক হোক না কেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঋণ পরিশোধ করে দিবে। ঋণদাতা তাগাদা দেওয়ার পূর্বে তার নিকট উপস্থিত হয়ে দিবে। ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ না করে ঝুঁলিয়ে রাখাকে হাদীসের ভাষায় মাতাল বলা হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ধনীর টানাটানি করা অত্যাচার। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও টালাটালি করা, ঋণ না দেওয়া, অহেতুক বিলম্ব করা ইত্যাদি অত্যাচার। যার টাকা ছিল সে সৎ উদ্দেশ্যে তোমাকে টাকা দিয়েছে। তোমার বিপদ ও প্রয়োজনের সময় তোমার পাশে দাঁড়িয়েছে, অথচ তাকে তুমি পেরেশানি, অশান্তি, শাস্তি দিতে পার না। টাকা চাওয়ার জন্য বার বার তাগাদা করতে বাধ্য করতে পার না। টাকা আছে অথচ দিচ্ছ না এটা এক প্রকার শাস্তি ও মানসিক ক। এটা শরীয়ত ও বিবেকের দিক থেকে সরাসরি অত্যাচার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঋণ ব্যতীত শহীদের সকল পাপ মাফ করা হয় ।