প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
৮০. বাক চাতুর্যে সম্পদ উপার্জন
১. শরীয়ত সম্মত পন্থায় পয়সা উপার্জনে দোষের কিছু নেই। জজ, উকিল ও ব্যারিাগণ এ নিয়েই বেতন ভূক্ত চাকুরী করে থাকেন। কিন্তু ভ্রান্ত কথা, ব্যবসায় মিথ্যা শপথ, আর অধিক চাপাবাজিকে পেশা হিসেবে গ্রহণকে ইসলাম সম্পূর্ণ নিন্দা করে।
২. উমর বিন সাঈদ বিন আস্ (রাঃ) একদা পিতা বরাবর একটি আবেদন পেশ করলেন। আবেদন পাঠ শেষ হলে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন- তোমরা কথা কি শেষ হয়েছে? ছেলে বলল- জ্বি হ্যাঁ..। পিতা বললেন (ওহে বৎস! ভেবো না যে, তোমাকে আমি অবহেলা করছি অথবা তোমার আবেদন পূরণে আমি অসম্মত। তবে শুনে রাখ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আমি বলতে শুনেছি- অচিরেই এমন জাতির আবির্ভাব হবে, যারা গরু-গাভীর মত -মূখ ব্যবহার করে উপার্জন করবে। (মুসনাদে আহমাদ)
৩. আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন- কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে
১। অসৎ ব্যক্তিদের মর্যাদা দান
২। সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদেরকে অসম্মান
৩। অশ্লীল সংলাপ ব্যাপক আকার ধারণ
৪। (দ্বীন ছাড়া) সকল কাজ সুচারুরূপে সম্পাদন
৫। সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক অনাচার প্রকাশ
ব্যাপক অনাচার- কি ? জিজ্ঞেস করা হলে নবীজী বললেন- আল্লাহর কালাম ছেড়ে যা কিছুই লেখা হবে, সবই অন্যায় । (তাবারানী)
৮১. কুরআন অবহেলা ও অনর্থক গ্রন্থের ছড়াছড়ি
কিয়ামাতের অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, মানুষ প্রচুর পরিমাণে বই-পুস্তক পড়বে। বিভিন্ন বিষয়ের বই দিয়ে ঘরোয়া লাইব্রেরী সাজিয়ে তুলবে। কোরআনের জ্ঞান অবহেলা করে পার্থিব জ্ঞান অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
উপরোক্ত হাদীসেই এর প্রমাণ পাওয়া যায় …সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক অনাচার প্রকাশ পাবে।ব্যাপক অনাচার কি? জিজ্ঞেস করা হলে নবীজী বললেন- আল্লাহর কালাম ছেড়ে যা কিছুই লেখা হবে, সবই অন্যায়। (তাবারানী)
৮২. সময় দ্রুত পার হবে
দ্রুত সময় পার হয়ে যাওয়াকে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিয়ামাতের নিদর্শন বলে চিহ্নিত করেছেন। আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না সময় পরস্পর নিকটবর্তী হবে তথা দ্রুত গমন করবে। (বুখারী ৭১২১)
সময় দ্রুত পার হওয়ার ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম এখানে কয়েকটি সম্ভাবনার কথা বলেছেনঃ
১। সময়ের বরকত শেষ হয়ে যাবে। পূর্ববর্তী লোকেরা (দ্বীনী বিষয়ে) যে কাজ এক ঘন্টায় সেরে ফেলত পরবর্তীগণ কয়েক ঘন্টায়ে-ও তা পারবে না।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেন- আমরা দ্রুত সময় পার হওয়ার বিষয়টি অনুভব করছি। অথচ পূর্বের যুগে এমনটি ছিল না। (ফাতহুল বারী)
২। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মানুষ একে অন্যের কাছাকাছি হয়ে যাবে,কেউ কাউকে দূরে ভাববে না।
৩। বাহ্যিক সংকোচন। হতে পারে শেষ জমানায় আল্লাহ পাক সময়কে দ্রুত করে দেবেন । আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে দিবস দীর্ঘ করতে পারেন,ইচ্ছা করলে সংকীর্ণ করতে পারেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে মহা ক্ষমতাবান। কারণ, দাজ্জাল আবির্ভাবের প্রথম তিনদিন এরকমই হবে। প্রথম দিনটি এক বৎসরের ন্যায় দীর্ঘ হবে। দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের ন্যায় দীর্ঘ হবে। তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের ন্যায় দীর্ঘ হবে। তদ্রপ আল্লাহ চাইলে দিবসকে সংকীর্ণ ও করতে পারেন।
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন- কিয়ামাত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না সময় কাছাকাছি হয়ে যাবে। ফলে বৎসরকে মাসের মত মনে হবে। মাসকে সপ্তাহের মত মনে হবে। সপ্তাহকে এক দিনের মত মনে হবে। দিনকে এক ঘন্টার মত মনে হবে। এক ঘন্টাকে বাতাসে উড়ে যাওয়া অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত মনে হবে। (মুসনাদে আহমদ ২/৫৩৭ সহীহুল্ জামি,হাদীস ৭২৯৯ তিরমিযী)
৪। কেউ কেউ এখানে -মানুষের আয়ূ হ্রাস পাওয়া -উদ্দেশ্য বলেছেন।
৮৩. হাট-বাজার ও দোকান পাট কাছাকাছি হয়ে যাওয়া
১. বর্তমানকালে বাজারগুলো কাছাকাছি হয়ে গেছে। এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হয়ে গেছে। অল্প সময়ের ব্যবধানেই মানুষ একাধিক শপিংমল ঘুরে কেনাকাটা করে আসছে। টেলিভিশন. মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আগেই পণ্যের নির্ধারিত মূল্য জানতে পারছে। কোনটা আসল, কোনটা নকল বাড়ীতে বসেই চিনতে পারছে।
২. রিক্সা, গাড়ী, ট্যাক্সি, কার, মাইক্রো বাস, বাস, ট্রেন ও বিমান ইত্যাদি অত্যাধুনিক যান-বাহন আবিষ্কারের ফলে দূরের মার্কেটগুলো এখন আর দূরের মনে হয় না। শত শত মাইল দূর থেকে মানুষ রাজধানীর অভিজাত মার্কেটগুলোতে ঈদের মার্কেট করতে আসছে। বিয়ের মার্কেট করতে এক দেশ থেকে মানুষ অন্য দেশে যাচ্ছে।
৩. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- কিয়ামাত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ফিতনাসমূহ প্রকাশ পায়, মিথ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বাজারসমূহ নিকটবর্তী হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমাদ, ২/৫১৯)
৪. বাজার নিকবর্তী হওয়ার ব্যাখ্যা তিনভাবে করা যেতে পাবেঃ
১। প্রথম: বাজার -দর সম্পর্কে দ্রুত জ্ঞান হয়ে যাবে।
২। দ্বিতীয়: শত শত মাইল দূরে হওয়া সত্ত্বেও এক বাজার থেকে অন্য বাজারে দ্রুত যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকবে।
৩। তৃতীয়: এক মার্কেটের দর অন্য মার্কেটের কাছাকাছি হবে। সমিতি ভিত্তিক চুক্তি করে ব্যবসায়ীগণ সব মার্কেটের দর সমান রাখবে। (আল্লাহই ভাল জানেন)
শেখ আব্দুল আজীজ বিন বায্ রহ. হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ
সম্প্রতি আধুনিক সড়ক, পরিবহণ ও বিমান আবিষ্কারের ফলে দূর দূরান্তের শহরগুলি নিকটবর্তী হয়ে গেছে। যাতায়াত ও ভ্রমণের জন্য এখন আর পূর্বের মত ক করতে হয় না। এক ঘন্টার ব্যবধানেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া যায়। হাদিসে কাছাকাছি হওয়ার অর্থ এভাবেই করা যেতে পারে।
৮৪. অত্যাধুনিক যানবাহন আবিষ্কার
১. শেষ জামানায় আধুনিক যানবাহন আবিস্কৃত হওয়ার বিষয়টি একাধিক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, দোকানপাট নিকটবর্তী হয়ে যাবে। অনেক উলামায়ে কেরাম এর মাধ্যমে আধুনিক যানবাহন উদ্দেশ্য করেছেন। দ্রুতগামী গাড়ী আবিষ্কারের ফলে দুরের মার্কেটগুলো-ও তখন কাছের মনে হবে।
২. সহীহ ইবনে হিব্বান-এ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন- আমার শেষ উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা প্রদীপের মতো কিছু যানবাহনে উঠে ভ্রমণ করবে। এগুলো নিয়ে তারা মসজিদের সামনে অবতীর্ণ হবে। তাদের মহিলারা বস্ত্র-বাহী নগ্নদেহ বিশি হবে।
উপরোক্ত হাদিসে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অদেখা আরোহণ বস্তুর কথা বলেছেন। মনে হচ্ছে এর মাধ্যমে বর্তমান কালের আধুনিক যানবাহনের দিকে-ই ইঙ্গিত করেছেন।
৮৫. মক্কার ভু-গর্ভস্থ টানেল
কিয়ামাতের আলামত গুলোর মধ্যে এও একটি যে, মক্কার পাহাড়গুলোর নীচ দিয়ে মাঠির নীচ বা শুরঙ্গ পথ তৈরী হবে। এই শুড়ঙ্গ পথগুলো একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত হবে। (নিহায়াতুল আলম,ডাঃ মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান আরেফী জাহাঙ্গীর ৫০৭)
আমরা যারা মক্কা শরীফ গিয়েছি তারা দেখেছি যে, পুরো মক্কার মাটির নীচ জুড়ে অসংখ্য সুড়ঙ্গ পথ তৈরী করা হয়েছে, যা মক্কার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
