প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

জলাঞ্জলি

জলাঞ্জলি শব্দটি ব্যবহার করা হয় অপচয়, অপব্যয় ও সম্পূর্ণ বরবাদ হওয়ার অর্থে। এ শব্দের দুটি রূপ আছে, একটি বাহিরের অন্যটি ভিতরের। বাহিরের রূপ বেশ সুন্দর, প্রয়োগও ভালো, কিন্তু ভিতরের রূপটা মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ শব্দের ভাবগত সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাও আপত্তিকর। জলাঞ্জলি হচ্ছে হিন্দুদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শব্দটি সংস্কৃত ভাষার বৈদিক সংস্কৃতির একটি শব্দ। এর সন্ধি বিচ্ছেদ করলে এই দাঁড়ায় : জল + অঞ্জলি = জলাঞ্জলি।

শবদাহের পর হিন্দুরা প্রেতাত্মার উদ্দেশ্যে আঁজলাপূর্ণ পানি চিতায় ছিটিয়ে দেয়। এই ধর্মীয় কর্মের নাম জলাঞ্জলি, অন্য নাম বিসর্জন। জলাঞ্জলির মতো আরও অনুষ্ঠান রয়েছে হিন্দু ধর্মে। যেমন ঘৃতাঞ্জলি (ঘৃত + অঞ্জলি), পুষ্পাঞ্জলি (পুষ্প + অঞ্জলি), শ্রদ্ধাঞ্জলি (শ্রদ্ধা + অঞ্জলি), কৃতাঞ্জলি (কৃত + অঞ্জলি), তিলাঞ্জলি (তিল + অঞ্জলি) প্রভৃতি অনুান। এসব পারিভাষিক শব্দ হিন্দুদের পূজা মন্দির এবং দেবদেবীর পূজার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়।

দুঃখের বিষয়, অনেক মুসলমান এসব শব্দের ব্যবহারে ঈমান-আক্বিদাগত কোন বাধা আছে বলে মনেই করেন না। মৃতজনের লাশের পাশে বা কবরে অথবা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য পুষ্পস্তবকের ওপর কাগজে লেখে দেয়া হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি-, এর নিচে পুষ্প অর্পণকারী ব্যক্তি, সংগঠন বা সংস্থার নাম দেয়া হয়। এই রেওয়াজ ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ, এ দ্বারা অন্য ধর্মের অনুকরণ ও অনুসরণ করা হয়।

মৃতজনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন বা ভালোবাসা প্রদর্শনের সর্বোত্তম ব্যবস্থা রয়েছে ইসলামে। সেই ব্যবস্থা অবলম্বন করলে মৃতজনের কল্যাণও হয়। কিন্তু পুষ্পাঞ্জলি দ্বারা মৃতজনের কোন কল্যাণ হয় না বরং তাতে আযাব বাড়িয়ে দেয়া হয়। শুধু ফুল বিক্রেতা ও ফুলের বাগানের মালিকের অর্থনৈতিক লাভ হয় এবং একটা বিদায়াতকে পৃাপোষকতা করা হয়। যা হোক, এসব অঞ্জলি-র ব্যবহার দ্বারা অপর ধর্মের সংস্কৃতিরই আমরা পৃপোষকতা করছি আর নিজস্ব সংস্কৃতিকে করছি অবহেলা। সঠিক আত্মপোলদ্ধি আমাদের মধ্যে জাগ্রত হোক।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধ

এই খণ্ড বাক্যের সঙ্গে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই পরিচিত। পত্রপত্রিকায় এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপনে এই বাক্য দেখা যায়। ওষুধ কোম্পানির ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ির বডিতেও বাক্যটি লেখা দেখা যায়। প্রত্যেক ওষুধই জরুরি এবং যে ওষুধ যে রোগের জন্য তৈরি করা হয়েছে, সে রোগের জন্য সে ওষুধ অত্যন্ত জরুরি। প্রশ্ন হচ্ছে, ওষুধ কি জীবন রক্ষাকারী? কখনো নয়। ওষুধ রোগ নিরাময়ে সহায়তা করে মাত্র। ওষুধই যদি জীবন রক্ষাকারী হতো, তাহলে কোন জীবনেরই মৃত্যু হতো না। বিশেষ করে ধনীরা ওষুধ ব্যবহার করে অমরত্ব লাভ করতেন। উন্নত, মহৎ ও সুস্থ জীবন-যাপনের জন্য অনেক কিছুরই আমরা সাহায্য গ্রহণ করি, কিন্তু কোনো কিছুকেই আমরা জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করি না। শুধু ওষুধকে কেন জীবন রক্ষাকারী বলি? ওষুধ ব্যবহার করে রোগী রোগমুক্ত হয়, আবার হয়ও না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিনা ওষুধেই রোগ মুক্তি ঘটে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করার দরকারই পড়ে না।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যখন আমরা বলি, তখন জ্ঞাতে হোক বা অজ্ঞাতে হোক আমরা শিরকের কাছাকাছি চলে যাই। নিরাময়কারী একমাত্র আল্লাহ। তিনিই রোগ মুক্তি করেন। তিনি রোগ দেন, ওষুধও তারই অবদান, সুস্থতা দান তারই দেয়া অশেষ নিয়ামত। আয়ু যতো দিন আছে, এ আয়ুর রক্ষাকারীও তিনি, ওষুধ নয়। আয়ু যখন শেষ হয়, তখন কোন ওষুধই কাজ করে না। মৃত্যুই তার ফয়সালা করে দেয়।

আমরা যেন আর জীবন রক্ষাকারী ওষুধ না বলি। ওষুধ মানেই ওষুধ, যার জন্য যেটা প্রযোজ্য তার জন্য তা অত্যন্ত জরুরি। ওষুধ হচ্ছে দৈহিক অসুস্থতা দূরীকরণের সহায়ক মাত্র, এর অধিক কিছু নয়।

তীর্থযাত্রী/তীর্থযাত্রা

১৯৮৪ সনের ৩১শে ডিসেম্বর সৌদি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাওয়াতে বাংলাদেশের ১৩ জন সাংবাদিক ১৬ দিনের সফরে সৌদি আরব যান। আমিও ছিলাম সফরকারী দলের অন্যতম সদস্য। রিয়াদ বিমানবন্দরে অবতরণের পর চেকিং ফরম্যালিটিজ শেষ হলে যখন আমরা বাহিরে আসি, তখন দেখি সৌদি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দু-তিনজন কর্মকর্তা ছাড়াও বাংলাদেশ দূতাবাদের কয়েকজন কর্মকর্তা আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। তাদের মধ্যে কে একজন আমাদেরই দলের এক প্রবীণ সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা করলেন, এ সফরের উদ্দেশ্য কি? ভদ্রলোকের ইনফরমেশন গ্যাপ ছিল। তিনি জানতেন না, আমাদের এ সফরের উদ্দেশ্য কি? যাকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উদ্দেশ্য-বিধেয় সবই ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেন এবং এর সাথে বললেন, আমার নিয়্যাত কিন্তু অন্য, তীর্থযাত্রীর নিয়্যাত। এই পবিত্র নিয়্যাত নিয়ে এসেছি। ওমরা করতে পারলেই মনে করবো, আমার এ আগমন সফল-।

তীর্থযাত্রী, তীর্থযাত্রা এসব শব্দ এই প্রবীণ সাংবাদিকের কণ্ঠে উচ্চারণ শুনে অবাক হলাম। এ শব্দ তো মুসলমানের শব্দ নয়, মুসলিম সংস্কৃতি কৃরি কোনো পরিভাষাও নয়, তাহলে কি তিনি না জেনে শব্দটি উচ্চারণ করলেন? তার ভুল শোধরিয়ে দেয়ার তাৎক্ষণিক ইচ্ছা জাগলো আমার। কিন্তু সফরের ক্লান্তি এবং আমার ছোট একটা ব্যাগ লাপাত্তা হওয়ার কারণে প্রতিবাদ করার বা ভুল শোধরিয়ে দেয়ার ইচ্ছাটা নিস্তেজ হয়ে পড়লো। কিছু বললাম না। ব্যাগটি অবশ্য পাঁচ দিন পর আমার হাতে পৌঁছে। রিয়াদ প্যালেস হোটেলে পৌঁছে বাদ এশা তার কাছে তীর্থ- সংক্রান্ত বিষয়টা উত্থাপন করলাম এবং আমি যতোদূর জানি, এ শব্দের সংজ্ঞা দিলাম এবং ব্যাখ্যা করলাম। আশ্চর্য হলাম, তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি, বিতর্কে অবতীর্ণ হননি। আমার কথা তিনি মেনে নিলেন এবং আশ্বাস দিলেন এ ভুল আর ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে হবে না। এ সুসংবাদ শুনে আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।

প্রকৃত পক্ষেই এ সংস্কৃত শব্দ তীর্থ মুসলিম পরিভাষায় নেই। তীর্থ যে ভাষার শব্দ সে ভাষার অভিধানে তীর্থ শব্দের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, তীর্থ- মানে পূণ্য স্থান (মিলন তীর্থ), হিন্দু দেবতা বা মহাপুরুষদের লীলা ক্ষেত্র বা বাস ভূমি, পাপ মোচনের স্থান (A place for Pilgrimage)। তীর্থ অর্থ গুরু, পণ্ডিত ইত্যাদি। ব্যাকারণ তীর্থ ও কাব্য তীর্থ প্রভৃতি শব্দ গুরু বা পণ্ডিত অর্থযুক্ত।

Dr. Annadale’s Concise English Dictionary তে তীর্থ যাত্রীর সংজ্ঞা এভাবে দেয়া হয়েছে a Traveller; One that travels to a distance from his own country to visit a shrine or holy place or to pay his devotion to the remains of dead saints..

ড. এন্নানডেল-এর সংজ্ঞা এবং সংস্কৃত অভিধানের সংজ্ঞা, এ দুয়ের কোন একটিও মুসলমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বাংলা একাডেমী তীর্থ–এর অর্থ লিখতে গিয়ে তীর্থ শব্দকে খতনা করে মুসলমান করেছেন, কিন্তু কালেমা পড়াননি। বাংলা একাডেমী তীর্থ লিখেছেন পাপ মোচন- আর ব্রাকেটে লিখেছেন (মক্কা তীর্থ)। নকল করতেও দক্ষতা লাগে, সে দক্ষতাও বাংলা একাডেমী দেখাতে পারেনি। মক্কায় মুসলমানরা তীর্থ করতে যান না, যান হজ বা ওমরা করতে। মুসলমানদের অভিধানে তীর্থ শব্দই নেই, কোন মুসলমান যদি মক্কা তীর্থ, মদীনা ও হৃদয়কে তীর্থ লেখেন, তাহলে এই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা তীর্থ সংস্কৃতিকে যে বরণ করে নিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা মনে হয়, মক্কা, মদীনা ও হৃদয়কে তীর্থ অভিধায় অভিহিত করে অজ্ঞাতে একটা গুণাহর কাজ করা হয়। তীর্থের কাক-ও পরিত্যজ্য। তীর্থকেই যখন স্বীকার করি না, তখন তীর্থের কাক আর চিলকে তো গ্রহণ করতে পারি না।

যা হোক, তীর্থ- যাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের জন্য যথার্থ শব্দই তীর্থ, আমাদের জন্য নয়। মুসলমানদের তিনটি মসজিদ জিয়ারতের জন্য সফরের অনুমতি আছে। তিনটি মসজিদ হলো মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী এবং মসজিদুল আকসা। কোন কবর জিয়ারতের জন্য সফরে বের হতেও শরীয়তে মানা আছে, তা যার মাযারই হোক।